
শেষ আপডেট: 30 April 2023 17:24
নিউ জার্সির জন হেনরি (John Henry)। পেটাই চেহারার এক প্রতিবাদী কৃষ্ণাঙ্গ যুবক। কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর শ্বেতাঙ্গদের অত্যাচার সহ্য করতে পারতেন না ছোটবেলা থেকেই। দেখলেই প্রতিবাদ করতেন। ফলে দরিদ্র কৃষ্ণাঙ্গদের কাছে জন হেনরি ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয়। তাঁর এলাকায় শ্বেতাঙ্গদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে একটিই কন্ঠ গর্জে উঠত। সে কণ্ঠ ছিল জন হেনরিরই।
১৮৬৬ সাল, জন হেনরির বয়স তখন আঠারো। সেই সময় নিউ জার্সি শহরে ছিলেন এক অত্যন্ত বর্ণবিদ্বেষী ও অত্যাচারী শ্বেতাঙ্গ পুলিশ অফিসার, চার্লস বার্ড। কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর অকথ্য অত্যাচার করে পাশবিক সুখ পেতেন। একদিন হেনরির মুখোমুখি হয়েছিলেন সেই শ্বেতাঙ্গ অফিসার। প্রখর রোদে এক কৃষ্ণাঙ্গ বৃদ্ধকে দাঁড় করিয়ে চাবুক মারছিলেন অফিসার। বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন জন হেনরি। পুলিশ অফিসারের হাত থেকে চাবুক ছিনিয়ে নিয়েছিলেন। এই অপরাধ মেনে নেয়নি শ্বেতাঙ্গ সমাজ। জন হেনরির ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল দুই ডলার চুরির মিথ্যে অপবাদ। বিচারে আদালত জন হেনরিকে দিয়েছিল দশ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড। প্রতিবাদী নিরপরাধ জন হেনরির ঠাঁই হয়েছিল ভার্জিনিয়ার কারাগারে।

সেই সময়, আমেরিকার পশ্চিম ভার্জিনিয়ার পাহাড়ে সুড়ঙ্গ কেটে রেললাইন পাতার কাজ চলছিল। সুড়ঙ্গ কাটার বরাত পেয়েছিল যে কোম্পানি, তাদের প্রচুর শক্তিশালী শ্রমিকের দরকার ছিল। জেলের আয় বাড়ানোর জন্য, সুড়ঙ্গ কাটার কাজে কৃষ্ণাঙ্গ বন্দীদের পাঠাতে শুরু করেছিল জেল কতৃপক্ষ। প্রতিদিন প্রতি কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমিক পিছু, জেল আয় করত পঁচিশ সেন্ট। তার থেকে কয়েক সেন্ট দেওয়া হত শ্রমিকদের।
পাহাড়ের গায়ে স্টিল ড্রিল বসিয়ে কুড়ি পাউন্ড ওজনের একটা হাতুড়ি দিয়ে ড্রিলকে পিটিয়ে পিটিয়ে গর্ত খুঁড়তেন জন হেনরি। সেই গর্তে নাইট্রোগ্লিসারিন দিয়ে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে গর্তটি বড় করে, শ্রমিকদের দিয়ে সুড়ঙ্গ কাটাতেন শ্বেতাঙ্গ ঠিকাদারেরা। গলা ছেড়ে গান গাইতে গাইতে অমানুষিক পরিশ্রমের এই কাজটি করতেন হেনরি। সুড়ঙ্গের ভেতরে তাঁর প্রাণোচ্ছল উপস্থিতি অনান্য কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমিকদের নিস্প্রাণ জীবনে তুলত আনন্দের হিল্লোল। তাঁরা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতেন অফুরান প্রাণশক্তিতে ভরপুর জন হেনরির দিকে।

কিছুদিন পর কোম্পানি আরও দ্রুত সুড়ঙ্গের কাজ শেষ করার জন্য সদ্য আবিষ্কৃত স্টিম ড্রিল মেশিন নিয়ে এসেছিল। এই স্টিম-ড্রিল মেশিন, মানুষের চেয়ে অনেক দ্রুত পাথর কাটবে। ফলে সুড়ঙ্গ কাটতে সময় কম লাগার সঙ্গে শ্রমিকও কম লাগবে। শ্রমিক বাবদ খরচও কমবে। কোম্পানির এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিলেন চির প্রতিবাদী জন হেনরি। তিনি কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমিকদের একত্রিত করে বলেছিলেন, কৃষ্ণাঙ্গ বন্দীরাই শুধু সুড়ঙ্গ কাটার কাজ করেন না। সুড়ঙ্গ কাটার কাজ করেন হাজার হাজার দরিদ্র কৃষ্ণাঙ্গ নারী ও পুরুষ। স্টিম ড্রিল মেশিন এলে হাজার হাজার শ্রমিক কাজ হারাবেন। না খেতে পেয়ে মরতে হবে সবাইকে।
হেনরি ঘোষণা করেছিলেন,শ্বেতাঙ্গ ঠিকাদারদের এই অন্যায় কিছুতেই তিনি মেনে নেবেন না। পরদিন ভোরে, শ্বেতাঙ্গ ঠিকাদারের কাছে গিয়ে মাথা উঁচু করে, বুক চিতিয়ে জন হেনরি বলেছিলেন, সুড়ঙ্গ কাটার কাজে মানুষই সেরা, মেশিন নয়। মেশিন কখনওই মানুষের চেয়ে দ্রুত পাথর কাটতে পারবে না। তাই সুড়ঙ্গ কাটার কাজে মেশিন ব্যবহার করা যাবে না। প্রথম হেনরির ঔদ্ধত্যে হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন শ্বেতাঙ্গ ঠিকাদার। হেনরির প্রতিটি শব্দ আঘাত করেছিল তাঁর শ্বেতাঙ্গসুলভ অহমিকায়।

পরমুহুর্তেই হেনরিকে বিদ্রুপ করে শ্বেতাঙ্গ ঠিকাদার বলেছিলেন, মেশিনের চেয়ে মানুষ বড়, তা হেনরিকেই প্রমাণ করে দেখাতে হবে। হেনরিকে মেশিনের সঙ্গে পাথর কাটার লড়াইয়ে নামতে হবে। যদি হেনরি জিতে যান, স্টিম-ড্রিল মেশিন ফেরত চলে যাবে। আর যদি হেনরি হেরে যান, সমস্ত কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমিক কাজ হারাবেন। শ্বেতাঙ্গ শ্রমিকেরাই স্টিম-ড্রিল চালিয়ে পাথর কাটবে। শ্বেতাঙ্গ ঠিকাদারের ছুড়ে দেওয়া অবাস্তব চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছিলেন জন হেনরি। সারা বিশ্বের শ্রমিক শ্রেণীর সম্মান রক্ষার দায়িত্ব একার কাঁধে তুলে নিয়ে, স্টিম ড্রিল মেশিনের সঙ্গে এক ঐতিহাসিক লড়াইয়ে নেমেছিলেন জন হেনরি। তাঁর প্রিয় হাতুড়িটি সম্বল করে।
আকাশের দিকে তাকিয়ে ঈশ্বরের নামে শপথ নিয়েছিলেন জন হেনরি, মেশিনকে পরাজিত করবেনই। কারণ এই অসম লড়াইয়ে তাঁকে জিততেই হবে। তাঁর জেতা হারার ওপর নির্ভর করছে হাজার হাজার শ্রমিক ও তাঁদের পরিবারের পেট, ভাগ্য ও ভবিষ্যৎ। কাজ হারানোর ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে উঠেছিলেন কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমিকরাও। তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন মেশিনের সঙ্গে মানুষের যুদ্ধে, হেনরি হেরে গেলে তাঁদের জীবনে নেমে আসবে ঘন অন্ধকার। তবুও মনের কোণে উঁকি দিয়েছিল সামান্য একটু আশা। কারণ মেশিন যার সঙ্গে লড়াই করবে, সেই মানুষটার নাম জন হেনরি। অপরাজেয় জন হেনরি।

কোনও এক ভোরে, সুড়ঙ্গের ভেতর শ্বেতাঙ্গ ঠিকাদার ও শ্রমিক সর্দারদের সামনে শুরু হয়েছিল মানুষের সঙ্গে মেশিনের লড়াই। লুইস টানেলের পাথর খুঁড়ে গভীর থেকে আরও গভীরে যাওয়ার লড়াই করে চলেছিলেন একজন হার না মানা কৃষ্ণাঙ্গ যুবক। হাজার হাজার কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমিকের জীবনে অরুণ প্রভাত আনার লড়াই। বাধার বিন্ধ্যাচল সরানোর লড়াই। টানেলের ডানদিকে পাথর কাটছিলেন জন হেনরি। বাঁদিকে পাথর কাটছিল শ্বেতাঙ্গ শ্রমিক চালিত স্টিম-ড্রিল মেশিন। সুড়ঙ্গের বাইরে অপেক্ষা করছিল ম্লান মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমিকেরা। গালে হাত দিয়ে পাথরে বসে ছিলেন হেনরির স্ত্রী মেরি ম্যাকডেলিন। ভয়ে থরথর করে কাঁপছিলেন তিনি। কান পেতে শুনছিলেন, সুড়ঙ্গের ভেতর থেকে ভেসে আসা হেনরির হাতুড়ির শব্দ…ঠক…ঠক…ঠক।
পশ্চিম ভার্জিনিয়ার আকাশে সূর্য ডুবতে শুরু করেছিল। হঠাৎ থেমে গিয়েছিল সুড়ঙ্গের ভেতরে পাথর কাটার আওয়াজ। মেশিনের সঙ্গে মানুষের লড়াই শেষ হওয়ার কথা ছিল সূর্যাস্তের সময়। ক্লান্ত বিষণ্ণ সূর্য আগুন লাল মেঘের ওপারের মিলিয়ে যাওয়ার মুহুর্তে, খনির ভেতর থেকে ভেসে এসেছিল কৃষ্ণাঙ্গ সর্দারদের আকাশ কাঁপানো উল্লাসধ্বনি।

কৃষ্ণাঙ্গ সর্দাররা প্রত্যক্ষ করেছিলেন একটি অবিস্মরণীয় দৃশ্য। সূর্য অস্ত যাওয়ার আগে, সুড়ঙ্গের পাথরে হাতুড়ির আঘাত হে্নে, ১৪ ফুট গভীর গর্ত তৈরি করে ফেলেছেন জন হেনরি। আর স্টিম ড্রিল মেশিন তৈরি করতে পেরেছে মাত্র ৮ ফুটের একটি গর্ত। এক দুঃসাহসী কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমিকের মরণপণ সংগ্রামের কাছে দিনের শেষে হেরে গিয়েছে মানুষেরই তৈরি করা মেশিন।
সেই সুড়ঙ্গের বাইরে আছে জন হেনরির মূর্তি।[/caption]
সামান্য এক কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমিকের কাছে সম্মানের লড়াইয়ে হেরে শ্বেতাঙ্গ ঠিকাদারের মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছিল। কারণ জন হেনরির জয় ছিল, শ্বেতাঙ্গ প্রভুদের কফিনে শোষিত কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমিকশ্রেণীর মারা প্রথম পেরেক। কৃষ্ণাঙ্গ সর্দারদের উল্লাসধ্বনি বাতাস নিয়ে এসেছিল সুড়ঙ্গের বাইরে। আনন্দে চিৎকার করে উঠেছিলেন সুড়ঙ্গের বাইরে অপেক্ষা করা কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমিকেরা। দৌড়ে সুড়ঙ্গের ভেতরে গিয়েছিলেন তাঁরা, হেনরিকে কাঁধে করে বাইরে নিয়ে আসার জন্য।
সুড়ঙ্গের ভেতরে গিয়ে দেখেছিলেন, বিশ্বের সমস্ত মেহনতি মানুষের রক্ত, ঘাম ও শ্রমের বিজয় পতাকা, পশ্চিম ভার্জিনিয়ার আগুন-লাল আকাশে উড়িয়ে দিয়ে, সুড়ঙ্গের মধ্যেই শেষ ঘুমে ঘুমিয়ে পড়েছেন অপরাজেয় জন হেনরি। সুড়ঙ্গের বাইরে প্রিয়তম হেনরির অপেক্ষায় ছিলেন মেরি ম্যাকডেলিন। কোলে ছিল হেনরির ছোট্ট মেয়েটি। সে তখনও জানে না, তার বাবা তাকে ছেড়ে দূর আকাশের তারা হয়ে গিয়েছে। আর কোনও দিনও ফিরে আসবে না। তাকে কোলে নিয়ে গাছ থেকে লাল ফুল তুলে দেবে না।

জন হেনরির বিজয়গাথা ছড়িয়ে পড়েছিল বিশ্বের কোণায় কোণায়। তাঁকে নিয়ে বাঁধা হয়েছিল দুশোটিরও বেশি চারণগীতি বা ব্যালাড। জন হেনরিকে নিয়ে গান গেয়েছিলেন পল রবসন, হ্যারি বেলাফন্টে, পিঙ্ক অ্যান্ডারসন, লিওন বিব, লিড বেলি, জনি ক্যাশ, ব্রুস স্প্রিংস্টিন থেকে বাংলার হেমাঙ্গ বিশ্বাস। আজ পয়লা মে, আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস (May Day)। শ্রমিক বিপ্লবের ইতিহাসে এক স্মরণীয় দিন। এই মে দিবসের ভোরে প্রথম যে নামটা মনে আসে, তা হল জন হেনরি। কারণ, বিশ্ব জানে জন হেনরি আজও নিপীড়িত শ্রমিকশ্রেণীর কাছে অদম্য সাহস, প্রাণশক্তি ও প্রতিবাদের প্রতীক। বর্ণবিদ্বেষের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো শ্রমিকশ্রেণীর জয়ের প্রতীক। তাই বুঝি হেমাঙ্গ বিশ্বাস গেয়ে উঠেছিলেন,
"প্রতি মে দিবসের গানে গানে, নীল আকাশের তলে দূর
শ্রমিকের জয়গান কান পেতে শোন ওই হেনরির হাতুড়ির সুর।"
সূত্র: আমেরিকার লোকগাথা 'The Ballad of John Henry'