
শেষ আপডেট: 29 June 2019 12:30
'পাকিস্তান' গ্রামের একটি অংশ[/caption]
গ্রামটির মানুষদের দেখে অভিজ্ঞ আধিকারিক বুঝলেন এটি আদিবাসী অধ্যুষিত গ্রাম। তিনি অবাক হয়েছিলেন এখানে সাঁওতালদের দেখতে পেয়ে। গ্রামটির নাম জিজ্ঞেস করলেন তিনি। উত্তর এলো, 'পাকিস্তান'। 'অ্যাঁ' চমকে উঠলেন আধিকারিক। তাঁর সঙ্গে মস্করা! আবার জিজ্ঞেস করলেন গ্রামের নাম। এবার উত্তর এলো, 'পাকিস্তান টোলা"। আধিকারিক জিজ্ঞেস করেছিলেন, "গ্রামটির নাম পাকিস্তান কেন"?
গ্রামবাসীরা বলেছিলেন, তাঁরা জানেন না গ্রামটির নাম কীভাবে পাকিস্তান টোলা হলো। বহু বছর ধরে আশেপাশের গ্রামগুলির সবাই এই গ্রামকে চেনে পাকিস্তান নামে। টোলা শব্দটাও বলে না কেউ। শুধু বলে 'পাকিস্তান'। একটি বাড়ির বারান্দায় ধপাস করে বসে পড়েছিলেন আধিকারিক। এরা বলে কী! কিন্তু সরল গ্রামবাসীদের মুখের অভিব্যক্তি দেখে মনে হচ্ছে না এরা মিথ্যে বলছে। ভারতের একটা গ্রামের নাম পাকিস্তান! ভারতের চিরশত্রুর নামে গ্রাম! না এ চলবে না। কোনও মতেই না।
[caption id="attachment_118904" align="aligncenter" width="702"]
পাকিস্তান টোলার এক সাঁওতাল পরিবারের বাড়ি[/caption]
হুঙ্কার ছাড়লেন আধিকারিক। গ্রামের নাম পাল্টাতে হবে। পাল্টাতেই হবে। বসে বসে তিনি ভেবে ফেললেন গ্রামের একটা নাম। সেটা চেঁচিয়ে ঘোষণা করেও দিলেন। সবাইকে আজ থেকে গ্রামের এই নামটা বলতে হবে। সরকারি সঙ্গীদের বললেন। কাগজে কলমে গ্রামের নাম এটাই লিখতে হবে। কিন্তু কী নামটা বলেছিলেন সেটাই আজ আর কারও মনে নেই। কারণ নতুন নামটা সরকারি খাতাতে ওঠেনি। কারণ উনি বদলি হয়ে গিয়েছিলেন। ফলে 'পাকিস্তান টোলা' রয়ে গেছে পাকিস্তান নামটি নিয়েই। এমনকি সরকারি খাতাতেও। আজও।
এই গ্রামটি থেকে পূর্ব-পাকিস্তানে চলে যাওয়া মুসলিম পরিবারগুলির সঙ্গে ও পূর্ব-পাকিস্তান থেকে ভারতে আসা হিন্দুদের মধ্যে সম্পত্তি বদলাবদলি হয়। এই গ্রামে এসে ওঠেন বহু সাঁওতাল পরিবার। যেহেতু এই গ্রামের সাবেক অধিবাসীরা পাকিস্তান (পূর্ব) চলে গেছেন। তাই এই গ্রামের নাম হয়ে যায় 'পাকিস্তান টোলা'। সরকারি খাতাতেও। শুনতে আশ্চর্য লাগলেও এটা সত্যি, গ্রামটির নাম পরিবর্তনের কোনও চেষ্টা হয়নি কোনও দিন।
গ্রামের একমাত্র দর্শনীয় বস্তু চার দশকের পুরোনো এই টিউবওয়েল[/caption]
১৯৪৭ সালের পরে এই গ্রামে একঘরও মুসলিম নেই।যাঁরা আছেন তাঁরা সবাই হিন্দু। সবাই সাঁওতাল। জনসংখ্যা ৩০০। অত্যন্ত গরিব গ্রাম। ন্যূনতম সুবিধা নেই। বিদ্যুৎ, পানীয় জল, রাস্তা, স্কুল হাসপাতাল দূরের কথা, শিক্ষার হার মাত্র ৩৫.৫১%। আজও এই গ্রামে একটিও টেলিভিশন সেট নেই। কারও মোবাইল নেই। বর্ষার সময় গ্রামটি আজও সভ্যতা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
সংবাদমাধ্যমকে দেখলেই মুখে ফুটে ওঠে বিরক্তির চিনহ[/caption]
সেই গ্রামের সবচেয়ে শিক্ষিত মানুষ ১৫ বছরের এক কিশোরী। নাম তার দেসিকা হাঁসদা। পঞ্চম শ্রেণীতেই পড়াশুনা ছেড়ে দিয়েছে। সে হিন্দি লিখতে ও বলতে পারে। যখন দেশে বড় কিছু ঘটে বলে গ্রামবাসীরা খবর পান গ্রামের কেউ শহরে গিয়ে হিন্দি কাগজ কিনে আনেন। দেসিকা কাগজ পড়ে বিষয়টা তার কল্পনা মতো ব্যাখ্যা করে দেয়।
কাছাকাছি কোনও হাসপাতাল বা প্রাইমারি হেলথ সেন্টার না থাকাও পাকিস্তান টোলার আরেকটি বড় সমস্যা। যদি কেউ মাঝরাতে অসুস্থ হয়ে পড়েন, সকাল পর্যন্ত গ্রামবাসীদের অপেক্ষা করতে হয় শহরে পাঠানোর জন্য। তাতেও হয় সমস্যা। কারণ গ্রামে গাড়ি যাওয়া আসার রাস্তাই নেই। গ্রামের কেউ অসুস্থ হলে খারাপ রাস্তার জন্য অটোওয়ালারা গ্রামে আসতে চান না।
[caption id="attachment_118923" align="aligncenter" width="702"]
রাস্তার প্রকল্প উদ্বোধন হয়ে থমকে আছে গ্রাম থেকে কয়েক মাইল দূরে[/caption]
কৃষিই এই গ্রামের আয়ের একমাত্র পথ। তবুও কৃষিতে সরকারি সাহায্য মেলে না। বীজ, সার বাজার দরে কিনতে হয়। যেটা গ্রামবাসীরা ব্লক থেকেই পেতে পারতেন ভর্তুকি দেওয়া দামে। ধান, গম, ভুট্টা ফলান পাকিস্তান টোলার বাসিন্দারা। নিজেদের খাওয়ার জন্য রেখে বাকিটা বিক্রি করেন। যা ফসল ফলান তা বাধ্যতামূলক ভাবে বেচতে হয় ব্যবসায়ীদের। তারা ঘোড়ায় টানা গাড়ি নিয়ে আসে। ফসল জলের দরে কিনে নিয়ে যায়। সেই ফসল পূর্ণিয়ার হোলসেল মার্কেট গুলাববাগ মাণ্ডিতে বেচে। গুলাববাগ মাণ্ডিতে গিয়ে সরাসরি ফসল বেচার ক্ষমতা নেই গ্রামবাসীদের।
[caption id="attachment_118930" align="aligncenter" width="960"]
নিজের দেশে পরদেশী হয়ে বাঁচছেন এই মানুষগুলি[/caption]
তাই আজও পাকিস্তান টোলার ছিটেবেড়ার বাড়িগুলিতে রাতে টিম টিম করে জ্বলে কেরোসিনের বাতি। আজও পাকিস্তান টোলার বাসিন্দারা কাঠ পাতা কুড়িয়ে তা দিয়ে রান্না করেন মাটির উনুনে। বিহারের ভয়ঙ্কর গ্রীষ্ম কাটান এক চিলতে দখিনা বাতাসের আশায়। বেঁচে থাকেন প্রাগৈতিহাসিক যুগের যুথবদ্ধ আদিম মানবদের মতো।
দেশে সরকার পাল্টায়। রাজ্যে সরকার পালটায়। যুগের পর যুগ দিনের বেলাতেই অন্ধকারে ডুবে থাকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো গ্রাম,'পাকিস্তান টোলা'। পাকিস্তান নামেই কি আছে অভিশাপ, যার খেসারত দিচ্ছেন ৩০০ উপেক্ষিত ভারতীয়!