
শেষ আপডেট: 15 October 2022 13:16
রূপাঞ্জন গোস্বামী
উত্তর অসমের জেলা শোণিতপুর। বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে আছে বুড়াচাপরি, সোনাই-রূপাই, বেহালি, নাদুয়ার, সিংগ্রি, চারদুয়ার, বালিপাড়া, ভোমোরাগুড়ি, গোরিমারি ও চেঙ্গালিমারি অরণ্য। যে অরণ্যগুলিতে নির্ভয়ে বাস করে বাঘ, হাতি, ভাল্লুক, চিতাবাঘ, ভারতীয় বাইসন, বুনো কুকুর, হরিণ, শিয়াল ও শত শত প্রজাতির পাখির দল।
এই দুর্ভেদ্য অরণ্যগুলিই একসময় ছিল বোড়ো উগ্রপন্থীদের আঁতুড়ঘর। অরণ্যগুলিকে ডেরা করে উত্তর আসামের জেলাগুলিতে তারা চালাত নারকীয় গণহত্যা। তাদের হাতে প্রাণ হারাতে শুরু করেছিলেন সাঁওতাল, বাংলাদেশ থেকে আসা শরণার্থী ও স্থানীয় মানুষেরা। অসম পুলিশ ও সেনাবাহিনী শুরু করেছিল অপারেশন। কিন্তু সুচতুর বোড়ো উগ্রপন্থীরা ভয় দেখিয়ে বশ করে রেখেছিল অরণ্যের ভেতরে থাকা বোড়ো অধ্যুষিত গ্রামগুলিকে। তাই অপারেশনের খবর আগে থেকেই পেয়ে যেত উগ্রপন্থীরা। তাই খালি হাতে ফিরে আসতে হত অসম পুলিশ ও সেনাবাহিনীকে।

তখন চলছিল ২০১৫ সাল। রাত প্রায় সাড়ে তিনটে। শোণিতপুরের এক গভীর অরণ্য পথ ধরে প্রায় নিঃশব্দে এগিয়ে চলেছিলেন অসম রাইফেল ও সিআরপিএফের 'কোবরা' ফোর্সের কমান্ডোরা। প্রত্যেকের হাতে একে-ফর্টি সেভেন (AK-47) অ্যাসল্ট রাইফেল। রাতের অরণ্য এমনিতেই ভয়ঙ্কর। হিংস্র বন্যপশুর আনাগোনা। তার ওপর শুরু হয়েছিল অবিশ্রান্ত বৃষ্টি।
ভিজে পাতার চাদরের ওপর দিয়ে এগিয়ে চলা দলটিকে ছেঁকে ধরেছিল জোঁকের দল। গাছের পাতা থেকে ঝরে পড়া জোঁকগুলি ঝাড়তে ঝাড়তে, সবার আগে এগিয়ে চলেছিলেন বছর ছত্রিশের এক দুঃসাহসী নারী। গায়ে বুলেট প্রুফ জ্যাকেট। পায়ে ভারী বুট। হাতে একে-ফর্টি সেভেন। তিনি শোণিতপুরের এসপি সংযুক্তা পরাশর (Sanjukta Parashar)।

রাতের অন্ধকারে চিতাবাঘের ক্ষিপ্রতায় এগিয়ে চলেছিলেন ৫ ফুট ৬ ইঞ্চির সংযুক্তা। সবার আগে পেরিয়ে যাচ্ছিলেন ক্ষরস্রোতা নালা। ওপার থেকে শোনা যাচ্ছিল তাঁর চাপা কন্ঠস্বর, "ছোটা কদম, ছোটা কদম"। প্রতিবার নালা পার হওয়ার সময় তিনি কমান্ডোদের মনে করিয়ে দেন, ছোট ছোট পদক্ষেপে নালা পেরোনোর কথা।
অরণ্যপথে প্রায় পঁচিশ কিলোমিটার হাঁটার পর সংযুক্তা এসে পৌঁছেছিলেন, আরও একটি নালার পাশে। তাঁর সংকেত পেয়ে নালার পাশে থাকা বিরাট ঝোপটিকে লক্ষ্য করে অবিশ্রান্ত গুলিবর্ষণ করতে শুরু করেছিল কমান্ডোদের রাইফেলগুলি। নিজের একে-ফর্টি সেভেনের ম্যাগাজিন খালি করে দিয়েছিলেন সংযুক্তাও। মাত্র আড়াই-তিন মিনিটের অপারেশন।

পুবের আকাশ ক্রমশ ফরসা হতে শুরু করেছিল। রাইফেলের কান ফাটানো আওয়াজে ভয় পেয়ে উড়তে শুরু করেছিল সময়ের আগেই ঘুম ভেঙে যাওয়া পাখির দল। ঝোপের ডালপালা সরিয়ে সবার আগে ভেতরে প্রবেশ করেছিলেন সংযুক্তা। ঝোপের মাঝখানের অংশ পরিষ্কার করা। মাটিতে পাতা প্লাস্টিক শিট। তার উপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছিল কয়েকজন প্রথম সারি বোড়ো উগ্রপন্থীর নিথর ছিন্নভিন্ন দেহ।
গুয়াহাটির হোলি চাইল্ড স্কুলে পড়ার সময় স্কুলের ম্যাগাজিনের জন্য সংযুক্তা সাক্ষাৎকার নিতে গিয়েছিলেন অসম পুলিশের কমান্ডান্ট মনোরমা কাকোতি ভুঁইয়ার দফতরে। সেই প্রথম সংযুক্তা দেখেছিলেন পুলিশের উর্দি পরা কোনও নারীকে। যাঁর দৃপ্ত বাচনভঙ্গি ও ব্যক্তিত্ব গভীর প্রভাব ফেলেছিল কিশোরী সংযুক্তার মনে।
পরবর্তীকালে দিল্লির ইন্দ্রপ্রস্থ কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক হয়েছিলেন সংযুক্তা। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়েছিলেন জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তখনও সংযুক্তা ভাবেননি পুলিশে যোগ দেবেন। ২০০৬ সালে পিএইচডি করার সময়, প্রস্তুতি না নিয়েই বসেছিলেন ইউপিএসসি (UPSC) পরীক্ষায়। সারা দেশের মধ্যে তাঁর র্যাঙ্ক ছিল ৮৫। ইন্ডিয়ান পুলিশ সার্ভিসকেই (IPS) বেছে নিয়েছিলেন চোখে পড়ার মত সুন্দরী সংযুক্তা।

প্রথম পোস্টিং হয়েছিল তিনসুকিয়া জেলার মাখুম শহরে। অসম পুলিশের অ্যাসিস্ট্যান্ট কমান্ডান্ট সংযুক্তার দাপটে বাঘে গরুতে এক ঘাটে জল খেতে শুরু করেছিল। ২০০৮ সালে সংযুক্তা বিয়ে করেছিলেন অসম ক্যাডারের আইএএস ও চিরাং জেলার ডেপুটি কমিশনার পুরু গুপ্তাকে। কিন্তু দু'জনে দুই জায়গায় থাকায় ছুটি ছাড়া দেখা হত না।
বিয়ের বছরেই সংযুক্তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল উদালগিরিতে। কারণ সেখানে তখন বোড়ো উগ্রপন্থী ও বাংলাদেশী শরণার্থীদের মধ্যে চলছিল চোরাগোপ্তা সংঘর্ষ। মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই আইপিএস সংযুক্তা থামিয়ে দিয়েছিলেন রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। গ্রেফতার করেছিলেন প্রচুর উগ্রপন্থীকে। উদ্ধার করেছিলেন প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র। লৌহমানবী সংযুক্তাকে সেই প্রথম ভয় পেতে শুরু করেছিল বোড়ো উগ্রপন্থীরা (bodo militants)।

উদালগিরিতে প্রায় তিন বছর কাটানোর পর ২০১১ সালে জানুয়ারি মাসে তাঁকে জোরহাটের এসপি (SP) করে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। জোরহাটে সংযুক্তা কাটিয়েছিলেন চার বছর। ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে তাঁকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল বোড়ো উগ্রপন্থী অধ্যুষিত শোণিতপুরে। এসপির চেয়ারে বসার কিছুদিন পরেই ঘটে গিয়েছিল এক মর্মান্তিক ঘটনা। ২৮ জানুয়ারি সকালে ঢেকিয়াজুলি এলাকায় বোড়ো উগ্রপন্থীরা গুলি করে হত্যা করেছিল এএসপি (ASP) গুলজার হোসেনকে। সেই বছর ডিসেম্বর মাসে প্রায় ৬২ জন আদিবাসীকে হত্যা করেছিল উগ্রপন্থীরা।
ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে গিয়েছিল সংযুক্তার। বুঝেছিলেন বাবা বাছা করে সমাজের মূলস্রোতে উগ্রপন্থীদের ফিরিয়ে আনার দিন শেষ। তাই সংযুক্তা নিয়েছিলেন এনকাউন্টারের মত ভয়াবহ পথ। প্রত্যেকটি এনকাউন্টারে সবার আগে থাকতেন সংযুক্তা। কমান্ডোদের সঙ্গেই আগুন ছোটাত সংযুক্তার একে-ফর্টি সেভেন। মাত্র পনেরো মাসের মধ্যে সংযুক্তা খতম করে দিয়েছিলেন প্রথমসারির ষোলজন বোড়ো উগ্রপন্থীকে। গ্রেফতার করেছিলেন ৩৪৮ জন ক্যাডার ও চরকে। উদ্ধার করেছিলেন বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র। বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গিয়েছিল উগ্রপন্থীরা। এক রূপসী নারীর চোখে জ্বলতে থাকা বদলার আগুন দেখে।

শান্ত হয়ে গিয়েছিল শোণিতপুর। ২০১৬ সালের অগস্ট মাসে, সংযুক্তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল গুয়াহাটির হেডকোয়ার্টাসে। আজ সংযুক্তা এনআইএ'র (NIA) এসপি। ২০২২ সালে ২১ এপ্রিল এনআইএ দিবসে তাঁকে পুরষ্কৃত করেছে ভারত সরকার। ছুটি পেলে স্বামী ও পুত্রকে নিয়ে সমুদ্র, পাহাড় ও অরণ্যে ঘুরে বেড়ান ডঃ সংযুক্তা। মৃদু হেসে তিনি সংবাদমাধ্যমকে বলেন, "জানেন, অপরাধীরা ছাড়া আমায় কেউ ভয় পায় না। মাছ চিনতে না পারার জন্য, আমায় নিয়মিত বকুনি দেয় বিক্রেতারা।"
