
শেষ আপডেট: 3 October 2022 17:03
মহারাষ্ট্রের তুলিঞ্জ পুলিশ থানা। কিশোরী রাধিকার (পরিবর্তিত নাম) সামনে হাসি মুখে বসে আছেন মানুষটি। ঠিক, বাড়ির বড় দাদার মত। দুজনের হাতেই ধূমায়িত চায়ের কাপ। রাধিকার জন্য আনা হয়েছে ওর প্রিয় ‘বড়া পাও’। রাধিকা তার ট্রমা কাটিয়ে, স্যারের সঙ্গে এখন নির্ভয়ে গল্প করছে। স্যারের হাতে ডায়েরি। মাঝে মাঝে কী সব লিখছেন তাতে। রাধিকা সমানে স্যারকে বলে যাচ্ছে, তার বন্ধুকেও যেন উদ্ধার করা হয়। হাসিমুখে স্যার বলেছিলেন, “আমায় কয়েক ঘন্টা সময় দাও বোন”।
এক সপ্তাহ ধরে রাধিকাকে পালঘরের একটি কুখ্যাত যৌনপল্লীতে আটকে রাখা হয়েছিল। আটকে রেখে যৌন পেশায় নামার জন্য শারীরিক নির্যাতন করা হচ্ছিল। খাওয়া দাওয়া, এমনকী টয়লেট যাওয়া পর্যন্ত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। অমানুষিক অত্যাচারের শেষে রাধিকা ভেঙে পড়েছিল। প্রায় অন্ধকার, তালাবন্ধ, কুঠরির ভেতরে ফুটফুটে রাধিকা রাজি হয়েছিল যৌন পেশায় নামতে।
জানলা খুলে দিয়েছিল দালাল। বাইরে তখন সূর্য ডুবছে। সেই মুহুর্তেই ঈগলের মত অতর্কিতে হানা দিয়েছিলেন ভাসাই-ভিরার-এর অ্যাডিশনাল সুপারিনটেনডেন্ট, আইপিএস রাজ তিলক রৌশন(Raj Tilak Roushan)। হাতে উদ্যত রিভলবার। সাথে এক ঝাঁক ডাকাবুকো তরুণ পুলিশ অফিসার।

কে এই রাজ তিলক!
খড়গপুর আইআইটির কৃতী ছাত্র এই রাজ তিলক রৌশন। পাঁচ বছর উঁচু পদে কাজ করেছেন প্রাইভেট সেক্টরে। ভারতে ও বিদেশে। বছরে কোটিরও বেশি তাঁর বেতন ছিল। কিন্তু দেশের টানে এবং বিবেকের তাড়নায় লোভনীয় চাকরি হেলায় ছেড়েছিলেন। কারণ তাঁর মনে হয়েছিল, প্রাইভেট সেক্টরের কাজ হল ধনী মানুষকে ধনী করা। তিনি ধনী হতে চান না।
তিনি সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, “আমি তখন আমার প্রফেশনাল কেরিয়ারের শীর্ষে। হঠাৎ একদিন আমার মন আমাকে বলেছিল, দেশের জন্য কী করলে রাজ! প্রস্তুতি নিয়ে আইপিএস হয়ে গেলাম, রাস্তায় নেমে কাজ করব বলে।”
২০১৭ সালে ওসমানাবাদ থেকে পালঘরে বদলি হয়ে এসেছিলেন রাজ তিলক রৌশন। পালঘরের ভাসাই-ভিরারে আসার পর, তাঁকে অবাক করেছিল এলাকা থেকে হারিয়ে যাওয়া শিশুদের পরিসংখ্যান। শিশুগুলিকে খুঁজে পাওয়ার হারও প্রায় শুণ্যের কাছাকাছি। রাজ তিলকই প্রথম পুলিশ অফিসার যিনি এলাকার 'মিসিং' কেসগুলোতে খুনের তদন্তের সমান গুরুত্ব দেওয়ার কথা অনুভব করেছিলেন।

গবেষণায় পুলিশের কাজে প্রচুর অসঙ্গতি ও ফাঁকফোকর খুঁজে পেয়েছিলেন রাজ। তিনি দেখছিলেন পুলিশ অফিসারদের মধ্যে সদিচ্ছা ও সচেতনতার ভীষণ অভাব। এক একটি তদন্তে অস্বাভাবিক বেশি সময় লাগছে। তদন্তের মাঝপথেই হাল ছেড়ে দেওয়ার মানসিকতা গ্রাস করছে পুলিশকে।
রাজ তিলক বলেছিলেন, “আমি দেখেছিলাম, আমার এলাকায় এক মাসে ৩০-৪০ টি শিশু হারানোর কেস রয়েছে। আমি বসে চিন্তা করতাম। কত কী ঘটতে পারে হারিয়ে যাওয়া শিশুগুলিকে নিয়ে। তাদের যৌনপেশায় বা শিশুশ্রমিক হিসেবে কাজে লাগানো হতে পারে। এমনকী তাদের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ পর্যন্ত বেচে দেওয়া হতে পারে।” কিন্তু তা হতে দেবেন না রাজ, শুরু করেছিলেন এক অবিশ্বাস্য লড়াই। একক লড়াই। সম্বল বলতে ছিল মেধা আর অদম্য ইচ্ছা।

গবেষণা শুরু করার মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে এসে গিয়েছিল তাঁর নিজের গবেষণালব্ধ Standard Operating Procedure (SOP)। তদন্তকারী পুলিশ অফিসারদের জন্য ৭২ কলামের একটি বিজ্ঞানভিত্তিক গাইডলাইন তৈরি করেছিলেন মেধাবী রাজ। রাজের তৈরি SOP, এতদিন তদন্তের সাগরে হাবুডুবু খাওয়া তদন্তকারী অফিসারদের কাছে বাইবেল হয়ে উঠেছিল।
রাজের তৈরি গাইডলাইনে বলা হয়েছে, একটি কেসের তদন্তের ক্ষেত্রে, কোন কাজটা জরুরিকালীন ভিত্তিতে সবার আগে করতে হবে। এবং কাজটি কী ভাবে করতে হবে সেটাও বলে দিয়েছেন রাজ। ফলে, রাজের আবিষ্কৃত পদ্ধতির সাহায্যে খুব কম সময়ে হারিয়ে যাওয়া শিশু বা নারীদের উদ্ধার করা শুরু হয়েছিল। এলাকার স্থানীয় মানুষজনের কাছে একজন পুলিশ অফিসার হয়ে উঠেছিলেন ভগবান।
●পুলিশ অফিসারদের মনে করতে হবে, পরের শিশু নয়, নিজেদের বাড়ির শিশু বা মহিলা হারিয়ে গেছে। সব বাধা ডিঙিয়ে ঘরের ছেলে-মেয়ে-মা-বোনকে ঘরে ফেরাতে হবে। ফেরাতেই হবে।
● প্রত্যেকটি শিশু পাচারের কেসকে মানব পাচারের (Human trafficking) দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে হবে অফিসারদের । শিশু পাচারের কেসগুলি খুনের কেসের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পাচার হয়ে যাওয়া শিশু প্রতি মুহূর্তে খুন হয়। জোর করে তাকে জঘন্য কাজে লিপ্ত করানো হয়।
● লোকাল থানাগুলির পুলিশদের প্রতিদিন বাধ্যতামূলকভাবে তল্লাসী চালাতে হবে। তল্লাসী চলতেই থাকবে, থামানো যাবে না। ধরা যাক, নাগপুর এলাকা থেকে একটি মেয়েকে উদ্ধার করা হল। মেয়েটিকে উদ্ধারের পরও সেই এলাকায় আরও তল্লাসী করা হবে। মেয়েটির কেস বন্ধ হয়ে যাবে, কিন্তু তার পরেও তল্লাসী চলবে।
যে যে এলাকা দিয়ে মেয়েটিকে দালালরা নিয়ে গিয়েছিল বা যেখানে যেখানে তাকে রাখা হয়েছিল, সেখানে সেখানে তল্লাসী চলতেই থাকবে। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, রাজের ফর্মুলায় মহারাষ্ট্রের সবচেয়ে কুখ্যাত নারী পাচারকারী গ্যাং-এর বেশির ভাগ সদস্য এখন জেলের ঘানি টানছে। এরা বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৫০০ নাবালিকাকে যৌনব্যবসায় নামিয়েছিল।
● পাচারকারীদের ধরতে গেলে সবাইকে সচেতন হতে হবে। বিভিন্ন স্কুলে নিয়মিত পুলিশ টিমকে যেতে হবে। সেই টিম গুড টাচ ও ব্যাড টাচ-এর বিষয়ে বাচ্চাদের সচেতন করবে। টিমটির সদস্যরা বাচ্চাদের জানিয়ে দেবে কী ভাবে পাচারকারীদের চিনতে হবে। টিমটি সচেতন করবে অভিভাবকদেরও। অভিভাবকরা বাচ্চা হারিয়ে গেলে কী ভাবে তাঁরা থানায় মিসিং রিপোর্ট করবেন, যাতে দ্রুত হারানো শিশুকে ফিরে পাওয়া যায়।
একই সঙ্গে পুলিশ টিম, অটো, বাস, ট্যাক্সির ড্রাইভার ও ট্রেনের হকারদের সচেতন করে যাবে। তাঁদের গাড়িতে বা ট্রেনে শিশু ও নারীপাচারের চেষ্টা হলে, তাঁরা কী করে বুঝবেন ও কী ভাবে পুলিশকে খবর দেবেন, তা জানিয়ে দিতে হবে। এই সব সচেতনতা অভিযান চলবে বছরের ৩৬৫ দিনই। একদিনও থামানো যাবে না।
● রাজের রাজত্বে শিশু বা মহিলাকে খারাপ উদ্দেশ্যে কাজে লাগানোর জন্য টোপ ফেললেই গ্রেফতার। কারণ শিশু ও নারী পাচারকারীদের ফাঁদে ফেলার জন্য রাজ নিজেই আগেভাগে টোপ ফেলে রেখেছেন। কোনও শিশু বা মহিলাকে পাচারকারীরা টোপ দিয়ে ফাঁদে ফেলতে গেলেই তা রাজের টিমের রাডারে ধরা পড়বে। ফাঁদে ফেলতে এসে পাচারকারীরা নিজেরাই পড়ে যাবে রাজের পাতা ফাঁদে। ছদ্মবেশ ধরা মহিলা পুলিশ অফিসারেরা অত্যন্ত গোপনে ও গোপন পদ্ধতিতে এই অসামান্য দায়িত্বটি রাজের নির্দেশে পালন করে চলেছেন।
● হারিয়ে যাওয়া মহিলা ও শিশুদের কেসকে গুরুত্ব সহকারে দেখার জন্য, রাজ প্রত্যেক থানাতে ভিন্ন ভিন্ন টিম তৈরি করেছেন। সেই টিমগুলিকে দেওয়া কাজ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রাজের দেখানো পদ্ধতিতে শেষ করতে হবে। করতেই হবে। এভাবেই রাজ, ২০ বছরের পুরোনো হারিয়ে যাওয়ার কেসেও সাফল্য এনেছেন।
● তদন্তের অগ্রগতি এক সেকেন্ডে বোঝার জন্য রাজ নির্দেশ মতো তদন্তের ফাইলে কালার কোডিং ব্যবহার করতে হবে। যে ফাইলের রঙ লাল, বুঝতে হবে সেই কেসে কোনও সূত্র মেলেনি এবং এই কেসটিকে সব চেয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। সব কাজ ফেলে সেই কেসটা সমাধান করার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করতে হবে। যে ফাইলের রঙ সবুজ, বুঝতে হবে হারিয়ে যাওয়া শিশু বা মহিলার সম্পর্কে সব তথ্য পাওয়া গেছে।

● নাবালিকাদের উদ্ধারের পর তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে সাহায্য করতেই হবে। এই জন্য পুলিশকে শহরের বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ও চাইল্ড ওয়েলফেয়ার সেন্টারের সঙ্গে প্রতিমুহূর্তে সংযোগ রেখে চলতে হবে।
রাজের আগমনে, ২০১৭ সালে পালঘর জেলায় পুলিশি তদন্তে সাফল্যের হার দাঁড়িয়েছিল ৮৯ শতাংশে। মাত্র এক বছরে ভাসাই-ভিরার এলাকা থেকে হারিয়ে যাওয়া ৪৫০ জন শিশুকে উদ্ধার করেছিল রাজের বাহিনী। শতাধিক পাচার হয়ে যাওয়া মহিলাকে যৌনপেশায় প্রবেশের আগেই পাচারকারীদের হাত থেকে ছিনিয়ে এনেছিলেন রাজ। ভারতের পুলিশের ছবিটা বুঝি এভাবেই একার হাতে বদলে দিতে চলেছেন বর্তমানে নাগপুর পুলিশের ডেপুটি কমিশনার রাজ তিলক রৌশন।