Date : 16th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
বিরাট ঝড়ে লণ্ডভণ্ড লখনউ! রশিখ-ভুবনেশ্বরদের বোলিং দাপটে পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে আরসিবি‘লালা প্যাড’ ও ১০ টাকার নোটের কারসাজি! কয়লা পাচারের অভিনব কৌশলে পর্দাফাঁস ইডিরটাইম ম্যাগাজিনের ১০০ প্রভাবশালীর তালিকায় তারেক রহমান, কেন তাঁকে বাছল খ্যাতনামা মার্কিন সাময়িকী?West Bengal Election 2026 | ‘ভবানীপুরে কেন শুভেন্দু’, ‘ফাটকা’র ব্যাখ্যায় দিলীপ ঘোষ‘অন্যের ভোট কেউ দিয়ে দেবে, সেটা আর হবে না’, মুখ্যমন্ত্রীর গাড়ি সার্চ নিয়েও মুখ খুললেন সিইওবাংলা নববর্ষের সূচনায় তারেকের বিরুদ্ধে সুর চড়িয়ে হাসিনা পুত্রের অভিযোগ, দেশ বিদেশি প্রভুদের দখলেপুলিশ তো বটেই, সরকারি গাড়িতেও এবার তল্লাশি হবে! অবাধ ভোটের লক্ষ্যে নজিরবিহীন নির্দেশিকা এডিজি-রWest Bengal Election 2026 | ভোটের আঁচে ফুটছে মেদিনীপুরকর্নাটকে 'পিরিয়ড লিভ' এবার বাধ্যতামূলক! গোটা রাজ্যেই ১ দিন বেতন-সহ ছুটির নির্দেশ হাইকোর্টের'জয় বাংলা' স্লোগান শুনে মেজাজ হারালেন শুভেন্দু, তেড়ে গেলেন! বালি থানার আইসি-কে হুঁশিয়ারি

প্রথম বাঙালি পাইলট, গুলি করে নামিয়েছিলেন শত্রুপক্ষের দশ-দশটা ফাইটার প্লেন

দ্য ওয়াল ম্যাগাজিন ব্যুরো ১৯১৪ সালের অগস্ট মাস নাগাদ শুরু হয় 'গ্রেট ওয়ার অফ দ্য নেশনস'। ইতিহাসের পাতায় তাকে আমরা চিনি 'প্রথম বিশ্বযুদ্ধ' নামে। ধ্বংস আর হত্যার সেই ভয়াবহ রূপ সত্যিই বিশ্ববাসী এর আগে দেখেনি। ৪ বছর ধরে চলা এই যুদ্ধে নিহত হয়েছি

প্রথম বাঙালি পাইলট, গুলি করে নামিয়েছিলেন শত্রুপক্ষের দশ-দশটা ফাইটার প্লেন

শেষ আপডেট: 12 September 2022 16:55

দ্য ওয়াল ম্যাগাজিন ব্যুরো ১৯১৪ সালের অগস্ট মাস নাগাদ শুরু হয় 'গ্রেট ওয়ার অফ দ্য নেশনস'। ইতিহাসের পাতায় তাকে আমরা চিনি 'প্রথম বিশ্বযুদ্ধ' নামে। ধ্বংস আর হত্যার সেই ভয়াবহ রূপ সত্যিই বিশ্ববাসী এর আগে দেখেনি। ৪ বছর ধরে চলা এই যুদ্ধে নিহত হয়েছিল প্রায় ১ কোটি সামরিক এবং ৭০ লক্ষ বেসামরিক মানুষ। সেই মারণ-যুদ্ধের আঁচ লেগেছিল এ দেশের বুকেও। ভারত তখন পরাধীন, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের মুঠোয় বন্দি। ইচ্ছে থাক আর না থাক, তথ্য অনুযায়ী প্রায় পনের লাখ ভারতীয় সৈন্য অংশ নিয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধে। এর মধ্যে প্রায় ৭৪ হাজার সেনা যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ হারায়। ভারতীয় সেনাবাহিনীর কথা থাক, আজ আমরা শুনব এক অসমসাহসী বাঙালি তরুণের গল্প। বীরত্ব আর এডভেঞ্চারের নেশায় প্রায় অভিমন্যুর মতো যে স্বেচ্ছায় একলাটি ঝাঁপিয়ে পড়েছিল বিশ্বযুদ্ধের চক্রব্যূহে।

১৯ জুলাই ১৯১৮। ফ্রান্সের আকাশে জার্মান বিমানবাহিনী ও ব্রিটিশ রাজকীয় বিমানবাহিনীর মধ্যে চলছে ভয়ংকর আকাশযুদ্ধ। রাজকীয় বিমানবাহিনীর হয়ে অসীম সাহসে লড়ে যাচ্ছেন ১৯ বছরের এক তরুণ ফাইটার পাইলট। বেশ কিছুক্ষণ একটানা গুলি বর্ষণের পর একটি জার্মান জঙ্গীবিমান মাটিতে নামিয়ে আনলেন সেই তরুণ ফাইটার যুবক। হিসেব মতো, এটি ছিল তাঁর দশম শত্রুবিমান শিকার। যুদ্ধক্ষেত্রে এইভাবে একের পর এক শত্রুবিমানকে ঘায়েল করে ততদিনে বিখ্যাত এই যুবক। পেয়ে গেছেন অত্যন্ত প্রেস্টিজিয়স ‘ফ্লাইং এইস’ (Flying Ace) খেতাব। এই খেতাব পাওয়ার জন্য সাধারণত পাঁচটি শত্রুবিমান ঘায়েল করাই যথেষ্ট। কিন্তু অসমসাহসী এই যুবক একা হাতেই ধ্বংস করেছিলেন দশটি শত্রুপক্ষের বিমান! আকাশযুদ্ধের সেই প্রথম যুগে, সদ্যযুবক এক ফাইটার পাইলটের মাত্র তের দিনের, ১৭০ ঘণ্টার লড়াই আজও পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। শুনলে আশ্চর্য হবেন এই বীর সেনানী জন্মসূত্রে বাঙালি এবং কলকাতার ছেলে। কিন্তু বাঙালির ইতিহাস মনে রাখেনি তাঁকে। প্রথম বাঙালি ফাইটার পাইলট এবং প্রথম বাঙালি বা ভারতীয় ‘ফ্লাইং এইস’ এই অকুতোভয় বীরসেনানীর নাম ইন্দ্রলাল রায়। (Indra Lal Roy)

আম বাঙালির কাছে প্রায় অচেনা এই ফাইটারের জন্ম ১৮৯৮ সালের ২রা ডিসেম্বর কলকাতায়। বাবা প্যারীলাল রায় ছিলেন সেই আমলের নামী ব্যারিস্টার এবং কলকাতার পাবলিক প্রসিকিউশন্‌স-এর ডিরেক্টর। মা ললিতা রায় ছিলেন সাধারণ গৃহবধূ। বরিশালের ধনী পরিবারের ছেলে প্যারীলাল বিশ্বাস করতেন, একমাত্র ব্রিটিশরাই পারে ভারতীয়দের গড়ে তুলতে। ইংরেজি শিক্ষার প্রতি ছিল তাঁর অগাধ বিশ্বাস। আর এজন্যই ১৯০১ সাল নাগাদ ছয় সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে তিনি সটান চলে এলেন লন্ডনে। বাড়ি নিলেন হ্যামারস্মিথে, ৭৭ নম্বর ব্রুক গ্রিনে। পরেশ, ইন্দ্র ও ললিত— তিন ছেলেকে ভর্তি করে দিলেন হ্যামারস্মিথে সেন্ট পল বয়েজ় স্কুলে। আর লীলাবতী, মীরাবতী এবং হীরাবতী— তিন মেয়ে ভর্তি হল সেন্ট পল স্কুল অব গার্লস-এ। কিন্তু প্যারী নিজে শেষতক লন্ডনে থাকলেন না। সংসার গুছিয়ে দিয়ে স্ত্রী ললিতার দায়িত্বে সন্তানদের রেখে তিনি ফিরে আসেন কলকাতায়।

মাত্র পাঁচ বছর বয়সে লন্ডনের একটি স্কুলে ভর্তি হন ইন্দ্রলাল। স্কুলজীবন থেকেই তিনি ছিলেন কৃতি ছাত্র। ইস্কুলের পড়া শেষ করে বিশেষ মর্যাদার স্কলারশিপ পেয়ে তিনি ভর্তি হন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। ইচ্ছে ছিল আইসিএস পরীক্ষা দিয়ে ভারতীয় প্রশাসনে চাকরি নিয়ে দেশে ফিরে আসবেন। কিন্তু মত বদলায় তাঁর দাদাকে দেখে। ইন্দ্রর দাদা পরেশলাল রায় কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য স্নাতক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন হঠাৎই। দাদাকে দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে মাত্র পনেরো বছর বয়সেই ইন্দ্রলাল ঠিক করে নেন যে ভবিষ্যতে তিনিও যোগ দেবেন সেনাবাহিনীতে। তাই স্কুলের পাঠ শেষ হলে তিনি তাঁর স্বপ্নপূরণে আশায় মেতে উঠলেন। বিমানবাহিনীতে যোগ দেবার ন্যূনতম বয়স ১৮ পেরোতেই তিনি রাজকীয় বিমানবাহিনী তথা রয়্যাল ফ্লাইং কোর-এ ক্যাডেটে পাইলট হবার জন্য কিংস কম রয়্যাল এয়ার কর্পস’-এ আবেদন করেন। কিন্তু বাদ সাধে চোখ, দূর্বল দৃষ্টিশক্তির জন্য প্রথমবার পাইলটের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেননি তিনি। তাতে অবশ্যি ভেঙে পড়েননি ইন্দ্রলাল। উলটে ব্রিটেনের সবথেকে নামী চোখের ডাক্তারের শরণাপন্ন হন তরুণ ইন্দ্রনাথ। ব্যয়বহুল হলেও চিকিৎসা করানোর সিদ্ধান্ত নেন। চিকিৎসার খরচ তুলতে তাঁর শখের দামি মোটরবাইকটিও বিক্রি করে দেন। (Indra Lal Roy)

চোখ ঠিক হয়ে যাবার পর ইন্দ্রলাল পুনরায় আবেদন করেন বিমানবাহিনীতে। দ্বিতীয়বারে আর তাঁকে ব্যর্থ হয়ে ফিরতে হয়নি। ছ মাস প্রশিক্ষণের পর পাইলট হিসেবে তিনি যোগ দেন কিংস কমিশনে। ভারতীয়দের মধ্যে তিনিই প্রথম এই যোগ্যতা অর্জন করেন। কমিশন লাভের পর ১৯১৭ সালের অক্টোবর মাসে ইন্দ্রলাল রায়কে ‘রয়্যাল ফ্লায়িং কোর’-এর ৫৬তম স্কোয়াড্রনে যোগ দেয়ার জন্য পাঠানো হয় ফ্রান্সে। সেসময় জোর ঘনিয়ে উঠেছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য তার অধিরাজ্য এবং উপনিবেশসমূহ নিয়ে যোগ দিয়েছে মিত্রশক্তিতে। যুদ্ধের ময়দানে এবার ডাক পড়ল বাঙালি ছেলে ইন্দ্রলালেরও। কর্তব্যের আহ্বানে সাড়া দিয়ে স্কোয়াড্রনে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট পদের দায়িত্ব নিয়ে ইন্দ্রলাল চলে যান ফ্রান্সের ভাদোমে। ভিনদেশে, অচেনা পরিবেশে, যুদ্ধ আর হিংসার প্রতিকূলতার মধ্যে সেই প্রথম বিমানচালক হিসেবে শুরু হয় বাঙালি যুবক ইন্দ্রলাল রায়ের কর্মজীবন। (Indra Lal Roy)

ব্রিটিশ বিমানবাহিনীতে কাজ করতে গিয়ে কার্জিস, বি ই টু, সপউইথ ক্যামেল, এস ই ফাইভ-এর মতো যুদ্ধবিমান চালাতে পারদর্শী হয়ে উঠেছিলেন ইন্দ্রলাল। টগবগে তরুণ, উদ্যমী এক যুবক নিজের প্রতিভাবলেই জায়গা করে নিচ্ছিলেন শ্বেতাঙ্গ বাহিনীতে। ঠিক এমন সময় ঘটে যায় এক চরম অঘটন। ১৯১৭ সালের ৬ ডিসেম্বর যুদ্ধ চলাকালীন মাঝ-আকাশে একটি জার্মান যুদ্ধবিমানের গুলি লেগে নো ম্যান’স ল্যাণ্ডে ভেঙে পড়ে ইন্দ্রলালের বিমান। অচৈতন্য ইন্দ্রলালকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে ডাক্তার তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। স্বাভাবিকভাবের সেনাবাহিনীর জন্য নির্দিষ্ট মর্গে নিইয়ে আসা হয় তাঁর দেহ। কিন্তু এত সহজেই ফুরিয়ে যাবেন ইন্দ্রলাল? তাও কি হয়! সম্ভবত অন্য কোনও গল্প লিখে রেখেছিল তাঁর নিয়তি। আর তাই প্রায় অবশ্বাস্যভাবে ঘটে যায় মির‍্যাকল। মর্গের বিছানায় হঠাৎ নড়ে ওঠে ইন্দ্রলালের নিথর শরীর। মৃতের শরীরে জীবনের লক্ষণ ফুটে উঠতে দেখে হতবাক ডাক্তারেরা তাঁকে তক্ষুনি স্থানান্তরিত করেন সেনা হাসপাতালে। (Indra Lal Roy)

জীবনের প্রতি অদম্য প্রেম আর বেঁচে থাকার নাছোড় ইচ্ছেই কি সেদিন নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছিল ইন্দ্রলালকে? হয়তো তাই... হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই তাঁর জ্ঞান ফিরে আসে। আঘাত মারাত্মক, তবু দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই চালিয়ে যান ইন্দ্রলাল। ধীরে ধীরে সুস্থও হয়ে ওঠেন। শারীরিকভাবে সেরে উঠলেও যুদ্ধবিমান চালানোর ছাড়পত্র তাঁকে দেওয়া হয়নি তখনই। কিন্তু কোনও প্রতিকূলতার সামনেই হার মানতে শেখেননি ইন্দ্রলাল। সেনাবাহিনীতে ফেরার জন্য বারবার উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানাতে থাকেন তিনি। এই অদম্য প্রাণশক্তি ও জেদ দেখে স্তম্ভিত হন কর্তৃপক্ষ। শেষমেশ সম্মতি মেলে। আকাশে ওড়ার জন্য শারীরিকভাবে নিজেকে আবার প্রস্তুত করে তোলেন ইন্দ্রলাল। এইসময় ক্যাপ্টেন জর্জ ম্যাকরয়ের তত্ত্বাবধানে নতুন করে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন ইন্দ্রলাল। ফ্রান্স থেকে ফিরে ১৯১৮ সালের ২২ জুন পুনরায় রয়্যাল এয়ার কর্পস-এর ৪০ নম্বর স্কোয়াড্রনে যোগ দেন এই বাঙালি তরুণ। (Indra Lal Roy)

১৯১৮ সালের ৬ থেকে ১৮ জুলাই পর্যন্ত ইন্দ্রলাল তাঁর জঙ্গি প্লেন নিয়ে বহু দুঃসাহসিক অভিযান পরিচালনা করেন। এই সময় ১৩ দিন ধরে চলা যুদ্ধে তিনি সর্বমোট ৯টি জার্মান বোমারু এবং ফাইটার প্লেনকে গুলি করে মাটিতে নামিয়ে আনেন। অন্যদিকে, ১৮ জুলাই এক জার্মান যুদ্ধবিমান গুলিবিদ্ধ করে ইন্দ্রলালের প্লেনটিকে। ভাগ্য সঙ্গ দিল না এবার। এবার আর প্রাণে রক্ষা পেলেন না কুড়ির কোঠায় পা রাখা তরুণ বঙ্গসন্তান। সেই গুলিলাগা বিকল বিধ্বস্ত এরোপ্লেনের সঙ্গেই রক্তাক্ত অবস্থায় ছিটকে মাটিতে এসে পড়লেন ফাইটার এইস পাইলট। শেষ হল, ১৭০ ঘণ্টার এক তেজদীপ্ত লড়াই। চিরনিদ্রায় মাটির বুকে লুটিয়ে পড়লেন এক বীর বঙ্গসন্তান। ১৩ দিনে ৯টি জার্মান যুদ্ধবিমান ধ্বংস করার অনন্যসাধারণ কৃতিত্বের জন্য ব্রিটিশ রাজকীয় বিমান বাহিনীর তরফ থেকে মরণোত্তর বীরত্বের খেতাব ‘ফ্লাইং ক্রস’ উপাধিতে ভূষিত করা হয় তাঁকে। ভারতীয়দের মধ্যে এই পদবী তিনিই প্রথম লাভ করেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা ভুলে গেছি তাঁকে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঝাপসা হয়ে গেছে সেই দুঃসাহসী বাঙালি তরুণের বীরত্ব আর আত্মত্যাগের গল্প।


```