শেষ আপডেট: 16 January 2021 09:13
১৮০৫ সালে মহীশূর রাজদরবারে যখন দেবজম্মনির সঙ্গে তৃতীয় কৃষ্ণরাজ ওয়াদিয়রের বিবাহ হয়, তখন বর ও বধূ দুজনেরই বয়স ছিল ১২ বছর। সেদিন কে জানতো, আগামীতে বসন্তরোগের টিকার প্রচার ও প্রসারের কাজে নিজেকে সম্পূর্ণ নিয়োজিত করবেন এই অসমসাহসী রাজবধূ!
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ ডাঃ নাইজেল চ্যান্সেলর মনে করেন, বসন্তের টিকার প্রচলনে এই ভারতীয় রানির অলিখিত ভূমিকাটিই ধরা আছে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির তৈরি এক বহু আলোচিত তৈলচিত্রে। বসন্তের টিকাকে জনপ্রিয় করে তুলতে সেসময় আঁকা হয়েছিল তৈলচিত্রটি। সোথবাই সংগ্রহে থাকা দু'শো বছরেরও বেশি পুরোনো এই ছবিটির দাম বর্তমানে ৪ লাখ ডলার থেকে ৬ লাখ ডলারের মধ্যে।
এ ছবি যখন আঁকা হচ্ছে, তার মাত্র ছ'বছর আগেই ইংরেজ চিকিৎসক এডওয়ার্ড জেনার আবিষ্কার করেছেন গুটিবসন্তের টিকা। গোরুর শরীরে হওয়া এক বিশেষ ধরনের বসন্তের গুটি থেকে পুঁজ সংগ্রহ করে তার সাহায্যেই তৈরী হত এই প্রতিষেধক। কিন্তু ইংরেজ রাজশক্তির এই টিকাকরণের ঘটনাকে খুব সহজে মেনে নেননি এ দেশের মানুষ। এ নিয়ে, বলাইবাহুল্য সেসময় তাদের মধ্যে অবিশ্বাস, সন্দেহ আর জোরালো প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল।
ব্রিটিশরা অবশ্য এত সহজে হাল ছাড়ার পাত্র ছিলেন না। সেসময় ভারতবর্ষ ছিল ব্রিটিশদের সর্ববৃহৎ উপনিবেশ। পৃথিবীর প্রথম ভ্যাকসিনের টিকাকরণের জন্য তারা বেছে নিয়েছিলেন বিরাট জনসংখ্যার এই দেশটিকেই। আর সেইজন্য নিজেদের যোগ্যতা, ক্ষমতা, রাজনৈতিক চাপ কোনও কিছুই ব্যবহার করতে পিছপা ছিলেন না তারা। ব্রিটিশ ডাক্তার, এ দেশের টিকা প্রস্তুতকারী সংস্থা, বিভিন্ন উদ্যোগপতি, মিত্রভাবাপন্ন দেশীয় রাজারা - সকলেই নানাভাবে জড়িয়ে পড়েছিলেন এই বিরাট কর্মকাণ্ডে।
ডঃ চ্যান্সেলরের মতে ১৮০৫ সালের এই চিত্রকর্মটি শুধু ভারতীয় রানিদের টিকাকরণের সাক্ষ্যই দেয়না। এই ছবির মধ্যে দিয়ে সেসময় বসন্ত মরামারী প্রতিকারে ব্রিটিশদের প্রচেষ্টার দিকটিও তুলে ধরার চেষ্টা হয়েছিল৷ এতদিন অব্দি মনে করা হত, এটা হয়তো ভারতীয় নারীদের নাচের ছবি বা রাজপরিবারের সৌজন্যসংক্রান্ত কোনও মুহূর্তের ছবি৷ ডাঃ নাইজেল চ্যান্সেলরই প্রথম সেই ধারণা ভেঙে দিলেন। তাঁর মতে ছবির ডানদিকের মহিলাই রাজপরিবারের কনিষ্ঠ বধূ দেবজম্মনি। শাড়ির আঁচলে ঢেকে রাখার বদলে এই প্রতিকৃতির উন্মুক্ত বামহাত আসলে টিকাকরণের প্রমাণ বহন করে। ছবির বাঁ দিকের মহিলার নামও দেবজম্মনি। ডঃ চ্যান্সেলরের মতে তিনি ছিলেন রাজার প্রথমা স্ত্রী। খেয়াল করলে দেখা যাবে, এই প্রতিকৃতির মুখ আর নাকের আশেপাশে বেশ কিছু অংশ ফ্যাকাশে। ডঃ চ্যান্সেলর মনে করেন, একমাত্র বসন্ত রোগের সংক্রমণেই মুখের চামড়ার এই পরিবর্তন সম্ভব। আর ছবির মাঝখানের মহিলা সম্ভবত রাজার বিধবা ঠাকুমা লক্ষ্মী আম্মানি।
২০০১ সালে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ইতিহাসবিদ তাঁর তত্ত্বের সমর্থনে কিছু প্রমাণ পেশ করেন। তাতে তিনি দেখান, ওয়াদিয়র রাজার বিয়ের তারিখের সঙ্গে এই ছবিটির তারিখ মিলে যাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে ১৮০৬ সালের জুলাই মাসে লেখা একটি সরকারি নথিরও উল্লেখ করেন তিনি, যেখানে বলা হয়েছিল, রানি দেবজম্মণির এই টিকাকরণ আগামিতে আরও বহু মানুষকে এই টিকা নিতে উৎসাহিত করবে। মহীশূর ইতিহাস নিয়ে দীর্ঘ গবেষণা সূত্রে তিনি নিশ্চিত ছিলেন, এই হাত ভর্তি সোনার চুড়ি আর মাথায় বিশেষ ধরণের সোনার অলঙ্কার ওয়াদিয়র পরিবারের রাজবধূদের সাজসজ্জার অঙ্গ ছিল৷ এই যুক্তির সমর্থন পাওয়া যায় ওয়াদিয়র পরিবারের পুরোনো চিত্রকর থমাস হিকির কাজকর্ম ও লেখালিখিতেও।
যে সময় এ ছবি আঁকা হয়, সেসময় ভারতের রাজপরিবারগুলি যথেষ্ট রক্ষণশীল ছিল। একজন ব্রিটিশ চিত্রশিল্পীর সামনে রাজপরিবারের বধূরা হাসিমুখে স্বাভাবিকভাবে পোজ দিচ্ছেন, এ প্রায় কল্পনার অতীত ছিল সেসময়৷ ওয়দিয়র পরিবার সে অর্থে এই ছবির জন্য অনেকখানি কলঙ্কের ঝুঁকি নিয়েছিল বলা যায়। রাজা এবং রানি দুজনেরই বয়স কম থাকায়, প্রায় কিছু না ভেবেই এই সামাজিক বিপ্লবের শরিক হয়ে পড়েন তাঁরা, এমনটাই মনে করছেন এই বিখ্যাত ইতিহাসবিদ।
দেশে তখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন চলছে। মহীশূরে কোম্পানির ঘোষিত প্রধান শত্রু ছিলেন টিপু সুলতান। টিপুর পতনের পর কোম্পানির ইচ্ছানুসারেই মহীশূরের সিংহাসনে বসে ওয়াদিয়র রাজপরিবার। মাদ্রাজের (বর্তমান চেন্নাই) গভর্নর সেসময় উইলিয়াম বেন্টিক।
প্রায় একইসময় বসন্তরোগ মরামারীর আকার নিচ্ছে দেশজুড়ে। প্রবল জ্বর, গাঁটে গাঁটে ব্যথা, সারা শরীরে মারাত্মক অস্বস্তি, মুখে গলায় বা শরীরের অন্যান্য অংশে লাল লাল ফুসকুড়ি - এই ছিল গুটিবসন্তের স্বাভাবিক লক্ষণ। এ দেশের মানুষ একে অসুখ মনে করতেন না। মনে করতেন 'দেবীর দয়া'। কুপিত দেবতার রোষানল
কমাতে স্থানভেদে কোথাও মারিয়াম্মা, কোথাও শীতলার পুজো করা হত।
কুসংস্কার আর ধর্মবিশ্বাসের এই দেশে পক্সের গণ-টিকাকরণ যে খুব সহজ ব্যাপার ছিল না, তা বলাই বাহুল্য। সেই অসাধ্যসাধনের পথেই অগ্রণী ভূমিকা নেন ওয়দিয়র রাজপরিবারের বধূরা। এমনকি মডেলের ভূমিকায় এক বিদেশি চিত্রকরের সামনে নিজেদের দাঁড় করাতেও দুবার ভাবেননি।ইতিহাস ভুলে গেছে তাঁদের। ভুলে গেছে এ দেশের মানুষও।