Date : 14th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
West Bengal Election 2026 | ‘৫০-আসন জিতে তৃণমূলকে ১৫০-আসনে হারাব’ মাতৃত্বের দুশ্চিন্তা, ‘ভাল মা’ হওয়ার প্রশ্ন—সদগুরুর পরামর্শে স্বস্তি পেলেন আলিয়ালক্ষ্য ২০২৯ লোকসভা ভোট, তড়িঘড়ি মহিলা সংরক্ষণ কার্যকরে মরিয়া মোদী! বাধা হয়ে দাঁড়াবে কি কংগ্রেস?Gold investment: যুদ্ধের বাজারে সোনার দাম কমছে! এটাই কি বিনিয়োগের সেরা সময়? কী বলছেন বিশেষজ্ঞরারহস্য আর মনের অন্ধকারে ঢুকে পড়ল ‘ফুল পিসি ও এডওয়ার্ড’! টিজারে চমকজিৎ-প্রযোজক দ্বন্দ্বে আটকে মুক্তি! ‘কেউ বলে বিপ্লবী, কেউ বলে ডাকাত’-এর মুক্তি বিশ বাঁও জলে?কিউআর কোড ছড়িয়ে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ! কীভাবে রাতারাতি নয়ডার বিক্ষোভের প্ল্যানিং হল, কারা দিল উস্কানি?নয়ডা বিক্ষোভ সামাল দিতে 'মাস্টারস্ট্রোক' যোগী সরকারের! শ্রমিকদের বেতন বাড়ল ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত Jeet: ভুয়ো প্রচার! ভোট আবহে গায়ে রাজনীতির রঙ লাগতেই সরব জিৎ৪ হাজার থেকে নিমেষে ১ লক্ষ ৮৫ হাজার ফলোয়ার! এক স্পেলেই সোশ্যাল মিডিয়ার নতুন তারকা প্রফুল্ল

অবৈধ ছেলেই নষ্ট হতে দেয়নি বাবার শরীর, পচন ঠেকিয়েছিল আশ্চর্য উপায়ে

শাশ্বতী সান্যাল পৃথিবীর দেবতা গেব প্রেমে পড়ে বিয়ে করেছিলেন তাঁরই বোন আকাশ আর স্বর্গের দেবী নুটকে। ভাইবোনের মধ্যে বিয়ে ব্যাপারটা প্রাচীন মিশরে খুবই পবিত্র বলে মনে করা হত৷ রক্তের বিশুদ্ধতা ধরে রাখার জন্য মিশরের রাজপরিবারগুলোতে প্রজন্মের পর প্

অবৈধ ছেলেই নষ্ট হতে দেয়নি বাবার শরীর, পচন ঠেকিয়েছিল আশ্চর্য উপায়ে

শেষ আপডেট: 26 January 2022 16:09

শাশ্বতী সান্যাল

পৃথিবীর দেবতা গেব প্রেমে পড়ে বিয়ে করেছিলেন তাঁরই বোন আকাশ আর স্বর্গের দেবী নুটকে। ভাইবোনের মধ্যে বিয়ে ব্যাপারটা প্রাচীন মিশরে খুবই পবিত্র বলে মনে করা হত৷ রক্তের বিশুদ্ধতা ধরে রাখার জন্য মিশরের রাজপরিবারগুলোতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ভাইয়ের সঙ্গে বোনের বিয়ে হয়ে এসেছে৷ বিয়ের পর পরই দেবতা গেব ও ন্যুট একে একে জন্ম দিলেন চার ছেলেমেয়ের। [caption id="attachment_2426443" align="aligncenter" width="900"] পৃথিবীর দেবতা গেব, আর আকাশের দেবী নুটের প্রেম[/caption] এই চার সন্তানের মধ্যে প্রথম জন ওসাইরিস বা ওসিরিস। মিশরীয় পুরাণ অনুসারে পুনর্জন্ম, মদ, শস্য তথা উর্বরতার দেবতা ছিলেন এই ওসাইরিস। পৃথিবী ও আকাশের সঙ্গমে তাঁর জন্ম, প্রকৃতির সম্মিলিত শক্তির প্রতীক বলা চলে তাঁকে। বিয়ের বয়স হওয়ার পর পরিবারের ঐতিহ্য মেনে নিজের সুন্দরী বোন আইসিস'কে বিয়ে করেন ওসাইরিস। আইসিস ছিলেন যাদুবিদ্যা, মাতৃত্ব ও প্রকৃতির দেবী৷ সারল্য আর শিশুদের রক্ষাকর্ত্রী দেবীও তিনি। মিশরের রাজা মানে 'ফারাও'দের বলা হত 'আইসিসের সন্তান'। [caption id="attachment_291133" align="aligncenter" width="600"] আদি দেবের বংশলতিকা[/caption] গেবের ছোট ছেলে ওসাইরিসের ভাই সেথ ছিলেন মরুভূমি, ঝড় আর অন্ধকারের দেবতা। ছোটবেলা থেকেই সে ছেলে ভারী অহংকারী, দুর্দমনীয়, কপট। গেব তার দুই পুত্রের মধ্যে রাজত্ব ভাগ করে দিতে চেয়েছিলেন। ঠিক হল মিশরের দক্ষিণ অংশ বড় ভাই ওসাইরিসের দখলে থাকবে। আর উত্তর অংশ থাকবে কনিষ্ঠ সেথের দখলে। কিন্তু এসব ভাগাভাগিতে আপত্তি ছিল সেথের। সে তো চায় সম্পূর্ণ মিশরের আধিপত্য৷ এই অন্যায় দাবিতে রেগে গেলেন আকাশ-বাবা। ছেলের অপশাসন আর নিষ্ঠুরতার প্রমাণও মিলেছিল। সবদিক ভেবে বাবা গেব ওসাইরিসকেই সমগ্র মিশরের একছত্র অধিপতি ঘোষণা করেন। [caption id="attachment_291156" align="aligncenter" width="600"] বর্বর রাজ্যলোভী সেথ[/caption] রাজা হিসাবে ওসাইরিস ছিলেন প্রজাদরদি, সুশাসক। যে সময় তিনি সিংহাসনে বসেন, তখন প্রাচীন মিশরের মানুষ ছিল বর্বর। মানুষ মানুষেরই কাঁচা মাংস খেত। রাজা হয়েই ওসাইরিস রদ করলেন সেই নরমাংস ভক্ষণ রীতি। মিশরীয়দের চাষবাস করতে শেখালেন তিনি। ফলাতে শেখালেন গম, বার্লি, আঙুর। তৈরি করলেন উৎকৃষ্ট মদ। শুধু সুসভ্য করাই নয়, কৃষিকাজ এবং তামার ব্যবহার সম্পর্কেও মিশরীয়দের শিক্ষিত করে তোলেন রাজা ওসাইরিস। বর্বর প্রাচীন মিশরীয়দের মধ্যে নিয়ে আসেন শৃঙ্খলা। গড়ে তোলেন প্রশাসক, স্থপতি ও কৃষিবিজ্ঞানীদের ফৌজ। সমাজের নিয়মকানুন, আইন-শৃঙ্খলা প্রণয়ন করতে তাঁর আমন্ত্রণে এগিয়ে আসেন জ্ঞানের দেবতা থোথও। দুই দেবতায় মিলে শিল্পকলা আর বিজ্ঞানে পারদর্শী করে তোলেন মিশরবাসীকে। [caption id="attachment_291137" align="aligncenter" width="356"] প্রজাবৎসল রাজা ওসাইরিস[/caption] পরস্পরকে খুব ভালোবাসতেন ওসাইরিস ও আইসিস। যখনই রাজ্য ছেড়ে অন্য দেশ ভ্রমণে যেতেন রাজা, রাজত্বভার দিয়ে যেতেন রানি আইসিসের উপর। কিন্তু সুখ জিনিসটাই ক্ষণস্থায়ী। এই দুই দেবতার সুখী দাম্পত্যেও কাঁটা হয়ে দাঁড়াল তাঁদেরই লোভী ভাই সেথ। তারও আগে ওসাইরিস নিজেই ভ্রান্তিবশত জড়িয়ে পড়লেন সেথের স্ত্রী নেফথিসের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কে, যার পরিণামে তাদের একটি ছেলে জন্মায়। এই অবৈধ সন্তানই শেয়াল-দেবতা আনুবিস।

আনুবিসের জন্ম

গেব ও নুটের ছোট মেয়ে ছিলেন নেপথিস৷ ওসাইরিস ও আইসিসের মতো নেপথিসও বিয়ে করেন নিজের দাদা অন্ধকারের দেবতা সেথকে। নেপথিসের গোপন দুর্বলতা ছিল বড়ভাই ওসাইরিসের উপর। কিন্তু ওসাইরিস স্ত্রীর প্রতি একনিষ্ঠ ছিলেন। অন্যের প্রেমপ্রস্তাবে সাড়া দেবেন না। তাই অন্য ফন্দি আঁটলেন দেবী নেপথিস। একদিন তিনি আইসিসের ছদ্মবেশে হাতে পানপাত্র নিয়ে গেলেন ওসাইরিসের ঘরে। একে ছদ্মবেশ, তার উপর মদের প্রভাব, চিনতে ভুল করলেন ওসাইরিস। মিলিত হলেন নেফথিসের সঙ্গে৷ তাঁদের মিলনেই জন্ম নিল মৃত্যু বা পরলোকের দেবতা আনুবিস। [caption id="attachment_291141" align="aligncenter" width="600"] জন্মগ্রহণ করলেন শেয়াল দেবতা আনুবিস[/caption] চেহারার দিক থেকে অবশ্য ওসাইরিসের তুলনায় সেথের সঙ্গেই 'শেয়াল দেবতা' আনুবিসের মিল বেশি। যা হোক, স্ত্রীর পরকীয়া আর অবৈধ সন্তানজন্মের কথা যখন সেথের কানে গেল, রাগে দিকবিদিক জ্ঞান হারালেন তিনি। মনস্থির করলেন ওসাইরিসকে হত্যা করেই এর প্রতিশোধ নেবেন।

ষড়যন্ত্র ও হত্যা

মাঝেমধ্যে বিদেশভ্রমণের শখ ছিল ওসাইরিসের। বেড়াতে বেড়াতে চলে যেতেন সুদূর ভারতবর্ষের সীমা অব্দি। এমনই একবার, যখন রাজ্যভার রানি আইসিসের উপর দিয়ে রাজা বিদেশে বেড়াতে গেছেন, সেসময় গোপনসূত্রে রানি আইসিস জানতে পারলেন রাজাকে মারার জন্য নতুন করে ষড়যন্ত্র শুরু করেছে ভাই সেথ। ছোটবেলায় একবার সেথকে লাথি মেরেছিলেন ওসাইরিস। সে অপমান ভোলেনি সেথ। তার উপর পৃথিবীর রাজা হওয়ার লোভ, তাকে পাগল করে তুলেছিল। আসলে ওসাইরিসের সৌভাগ্য আর ক্ষমতাকে শুরু থেকেই হিংসে করত সেথ। নানাভাবে চেষ্টা চালাত তাঁর ক্ষতি করার। সেই ঈর্ষার আগুনে ঘি ফেলেছিল স্ত্রী নেপথিস ও ওসাইরিসের অবৈধ সম্পর্ক। [caption id="attachment_291140" align="aligncenter" width="189"] নেপথিসের সঙ্গে ওসাইরিস[/caption] ইথিওপিয়ার রানির সহায়তায় এক প্রকাণ্ড কাঠের সিন্দুক তৈরি করলেন সেথ। এক মানুষ দীর্ঘ সেই সিন্দুকের গায়ে অসাধারণ কারুকাজ। খুব গোপনে ওই সিন্দুক তৈরি করা হয়েছিল ওসাইরিসের শরীরের মাপে। ওসাইরিস বিদেশ ভ্রমণ শেষে দেশে ফিরলে তাঁর রাজত্বের ২৮ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে এক বিরাট ভোজসভার আয়োজন করেন সেথ। ভাইকে সসম্মানে আমন্ত্রণ জানান সেই মহাভোজে। আমন্ত্রণ করেন নিজের ৭২ জন বন্ধু ও অনুসারীকেও। ভোজসভা যখন জমে উঠেছে, হাতে হাতে ঘুরছে সুস্বাদু পানীয়ে ভরা পানপাত্র, তখনই বুদ্ধি করে সেথ সেই বিরাট কাঠের সিন্দুকটাকে নিয়ে আসেন ভোজসভায়, আর ঘোষণা করেন যার শরীরের মাপের সঙ্গে এই সিন্দুকের মাপ মিলে যাবে তাকেই উপহার দেওয়া হবে এই মহার্ঘ সিন্দুক৷ এত অপূর্ব কারুকাজ করা সিন্দুক কেউ আগে দেখেনি। সবাই একে একে গিয়ে সিন্দুকের ভিতর শুয়ে দেখতে লাগল। কিন্তু কারও শরীরের মাপের সঙ্গেই মিলল না সিন্দুকের মাপ। মিলবে কী করে! ও সিন্দুক যে তৈরি হয়েছে ওসাইরিসের মাপে। একে একে বিফল মনোরথ হয়ে ফিরে এলেন সবাই। সবার শেষে এল ওসাইরিসের পালা। ভাইয়ের প্রতি অন্ধবিশ্বাসে কোনওরকম সন্দেহ না করেই ওসাইরিস গিয়ে শুলেন ওই প্রকাণ্ড সিন্দুকে। যেই না সিন্দুকে প্রবেশ করলেন রাজা ওসাইরিস, সঙ্গে সঙ্গে তাঁর শরীরের মাপে সিন্দুকের মাপ গেল মিলে। আর দুষ্টু সেথ বাইরে থেকে সেই সিন্দুক বন্ধ করে তার উপর ঢেলে দিলো গলানো সীসা। তারপর ওসাইরিস সহ সেই সিন্দুক নিক্ষেপ করা হল নীলনদের জলে। সিন্দুকের ভিতর ছটফট করতে করতে মারা গেলেন দেবতা ওসাইরিস।

প্রথম মমি

যখন ষড়যন্ত্রের শিকার হচ্ছেন ওসাইরিস, তখন তাঁর থেকে বহুদূরে থিবিসের কাছে এক গ্রামে ছিলেন আইসিস। দুর্ঘটনার আঁচ পেয়েই তিনি ছুটলেন স্বামীর খোঁজে। বিরহে, কষ্টে ভেঙে পড়লেও স্বামীর মৃহদেহ যে খুঁজে বের করতেই হবে তাঁকে। দেহ ছাড়া অন্তেষ্টি হবে না৷ তার অন্তেষ্টি না হলে আত্মার সদগতি হবে কী করে!শেষে উপায় না দেখে তিনি গেলেন দেবতা থোথের কাছে। জ্ঞানের দেবতা থোথ তাঁকে বলে দিলেন কোথায় আছে ওসাইরিসের মৃতদেহ ভরা সিন্দুক। অনেক ঝঞ্ঝাট পার করে শেষমেশ স্বামীর মৃতদেহ খুঁজে পেলেন আইসিস। কিন্তু বিপদ কাটেনি তখনও। লোক মারফৎ সে খবর পৌঁছোল সেথের কাছেও। কালবিলম্ব না করে সেথ ওসাইরিসের দেহ ৪২ টুকরো করে ছড়িয়ে দিল সারা মিশরে। তারপর রাজা হয়ে বসলেন পৃথিবীর সিংহাসনে। স্বামী হারানো আইসিস আর উপায় না পেয়ে সেথের স্ত্রী নেফথিসের শরণাপন্ন হলেন। দুজনে মিলে পাখির রূপ ধরে সারা মিশর চষে তন্নতন্ন করে খুঁজে আনতে লাগলেন ওসাইরিসের দেহ খণ্ডগুলো। খুঁজতে লাগলেন চিল হয়ে, বাজপাখি হয়ে। একে একে খুঁজে পেলেন টুকরোগুলো। স্বামীর সেই দেহাবশেষ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়লেন আইসিস। দেবীর চোখের জলে বন্যা এল নীলনদে। [caption id="attachment_291154" align="aligncenter" width="600"] মৃত ওসাইরিসের দেহের পাশে আইসিস ও তাঁর যমজ বোন নেফথিস[/caption] সময় অল্প, তাই জ্ঞান আর মৃত্যুদেবতার সাহায্য নিয়ে ওসাইরিসের দেহখণ্ডগুলো পরপর সাজিয়ে তাতে প্রাণসঞ্চার করলেন দেবী আইসিস। সেথের কাছে সে খবর পৌঁছলেও রানি ও তাঁর অনুগামীদের ডিঙিয়ে ওসাইরিসের কাছে এবার আর পৌঁছতে পারলেন না অন্ধকারের দেবতা সেথ। রাজার দেহে সাময়িকভাবে প্রাণসঞ্চার হল ঠিকই, কিন্তু উদ্দেশ্য পূরণ হবে কী করে! উদ্দেশ্য আর কিছুই না, ওসাইরিসের ঔরসে মিশরের যোগ্য উত্তরসূরীর জন্ম। কিন্তু ওসাইরিসের দেহের অন্যান্য টুকরোগুলো খুঁজে পাওয়া গেলেও নীলনদের জলে চিরতরে হারিয়ে গেছে তাঁর পুরুষাঙ্গ। পুরুষাঙ্গ ছাড়া মিলন তো সম্ভব নয়। শেষমেশ এরও সমাধান বের করলেন যাদুর দেবী আইসিস। সোনার এক পুরুষাঙ্গ স্থাপিত হল ওসাইরিসের দেহে৷ এরপর মিলিত হলেন মৃতরাজা ওসাইরিস ও রানি আইসিস। এই মিলনেরই ফল দেবতা হোরাস।স্ত্রীর শরীরে বীজটুকু রেখে শেষ ঘুমে ঢলে পড়লেন ওসাইরিস। যাতে কোনওভাবেই তাঁর শরীরে পচন না ঘটে,তাই আইসিস আর নেপথিস জ্ঞানের দেবতা থোথ আর মৃত্যুর দেবতা আনুবিস মিলে খুব গোপন পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করলেন রাজার দেহ। এই প্রথম মিশরের ইতিহাসে কোনও মৃতদেহকে পচন আটকাতে মমি করা হল। সেই প্রথম মমি আর কেউ নয়, স্বয়ং দেবতা ওসাইরিস। তবে ওসাইরিসের গল্প এখানেই শেষ নয়৷ [caption id="attachment_2426451" align="aligncenter" width="576"] আনুবিসের কোলে ওসাইরিসের মমি[/caption]

 হোরাসের চোখ

আইসিস যখন গর্ভবতী হয়, তখন চারদিকে সেথের গুপ্তচর। তাদের হাত থেকে ওসাইরিসের সন্তানকে বাঁচাতেই হবে। তাই নীলনদের তীরে এক প্যাপিরাস বনে নিজেকে লুকোলেন দেবী আইসিস। সেই জঙ্গলেই জন্ম নিলেন আইসিস-পুত্র অমিতক্ষমতাধর হোরাস। মায়ের কড়া নজরদারি আর দেবতাদের পাহারায় বড় হয়ে উঠল হোরাস। কিন্তু সিংহাসনের উত্তরাধিকার পাবে কী করে! আসল রাজার পুত্র সে, ন্যায়ত ধর্মত তার দাবিই আগে। [caption id="attachment_291157" align="aligncenter" width="396"] আইসিসের কোলে শিশু হোরাস - প্রাচীন মিশর স্থাপত্য[/caption] কিন্তু সেথও ছাড়ার পাত্র নয়। আইনের মারপ্যাঁচে সে আটকে দিতে চাইল হোরাসের অধিকার। মামলা চলল দীর্ঘদিন। শেষে ফয়সালা হল, দুপক্ষের শক্তির লড়াই হোক। যুদ্ধে যে জিতবে সিংহাসন তার। মারামারির কত যে প্রতিযোগিতা হল দুজনের! মানুষ-পশুর রূপ ধরে কত টক্কর! প্রতিবারই জিতল হোরাস। কিন্তু এত সহজে দাবি ছাড়ার লোক নন অন্ধকারের রাজা সেথ। শুরু হল তুমুল যুদ্ধ৷ যুদ্ধে হোরাস ছিঁড়ে নিলেন সেথের অন্ডকোষ। যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে প্রবল আক্রমণ শানালেন সেথ। হোরাসের বাম চোখ উপড়ে ছ'টুকরো করে ফেলল সে৷ সে এক নৃশংস ভয়াবহ যুদ্ধ। যুদ্ধের এক পর্যায়ে হোরাসকে বাগে পেয়ে ধর্ষণের চেষ্টা করে সেথ। উভকামী সেথের হাত থেকে খুব অল্পের জন্য রক্ষা পায় হোরাস। সেথের বিষাক্ত বীর্য, যা সে হোরাসের শরীরে ঢোকাতে চেয়েছিল, তা হোরাস লুকিয়ে এনে দেয় মা আইসিসকে। সেই বিষ আইসিস মিশিয়ে দেয় সেথের খাবারে৷ নিজের অজান্তে নিজেরই বীর্য পান করে সেথ। শেষমেশ দেবতাদের হস্তক্ষেপে ইতি পড়ে সেই ভয়ানক যুদ্ধে৷ [caption id="attachment_291158" align="aligncenter" width="600"]  সেথ আর হোরাসের তুমুল যুদ্ধ[/caption] যাদুবিদ্যায় ফিরিয়ে দেওয়া হয় হোরাসের বাম চোখ আর সেতের অণ্ডকোষও। হোরাসের এই নতুন বামচোখটি ছিল অলীক ক্ষমতাসম্পন্ন। প্রাচীন মিশরের লোকজন বিশ্বাস করতেন, হোরাসের এই নবলব্ধ দৈবী চোখের অনেক মহিমা। তা শুধু অন্তর্ভেদীই নয়, এ চোখের দৃষ্টি সর্বরোগহর। আর এই বিশ্বাস থেকেই ক্রমশ জনপ্রিয় হতে থাকে হোরাসের চোখের প্রতীক। সেকালে মিশরের নানান ছবিতে, বইয়ে, স্থাপত্যের গায়ে, পিরামিডের ভিতরের কারুকাজে, নানা মূল্যবান ধাতু ও পাথরের উপর, এমনকি মৃতদেহের গয়নার গায়েও আঁকা থাকত এই 'আই অফ হোরাস'। [caption id="attachment_291166" align="aligncenter" width="400"] হোরাসের চোখ[/caption]

পুনরুত্থান হল, পৃথিবীতে ফেরা হল না

চোখ ফিরে পাওয়ার পর হোরাস সিদ্ধান্ত নিলেন বাবা ওসাইরিসকে পুনর্জীবিত করার। নতুন জীবন দেওয়ার ক্ষমতা ছিল তাঁর স্বর্গীয় চোখের। ছেলের দৈবী ক্ষমতাবলে আবার প্রাণ ফিরে পেলেন ওসাইরিস। কিন্তু জীবিত মানুষের সান্নিধ্যে আর থাকতে রাজি হলেন না তিনি। পৃথিবীর সিংহাসনে ছেলেকে বসিয়ে ফিরে গেলেন পাতালে, সেখানকার অধিপতি হয়ে। শুধু রাজাই নন, নতুন জীবনে ওসাইরিস হলেন পরকালের বিচারক দেবতা। মানুষের মৃত্যুর পর তাকে সোজা হাজিরা দিতে হত দেবতা ওসাইরিসের দরবারে৷ সেখানে তাঁর পাপ পুণ্যের বিচার হত। ফারাওদের মৃত্যুর পর তাদের লাশ যদি ঠিকঠাক সৎকার হত, এবং যদি ফারাওদের সঙ্গে পরকালে ভোগ করার মতো উপযুক্ত ধনসম্পত্তি দেওয়া হত, তাহলে ওসাইরিস তুষ্ট হতেন। মিশরের মানুষ বিশ্বাস করতেন জীবনে ভালো কাজ করলে, সচ্চরিত্র থাকলে, মৃত্যুর পর মমির কাপড়ে ঠিকঠাক মন্ত্র লেখা হলে, তবেই খুশি হবেন ওসাইরিস। মহাবিচারের পর তাদের জীবিত করে নিজের অনুগামী, অনুচর করে রাখবেন। মৃত্যুর পরও সুখভোগ করবেন ওসাইরিসের অনুগামীরা। আর যারা দুরাচারী, মিথ্যেবাদী, ধর্মভীরু নয়, ওসাইরিসের নির্দেশে তাদের শরীর ছিঁড়ে খাবে কুমিরের মাথা, সিংহের শরীর আর জলহস্তির মতো পেছনওয়ালা জন্তু আমিত। [caption id="attachment_291168" align="aligncenter" width="600"] পরলোকে নতুন জীবনে ওসাইরিস[/caption] ওসাইরিসের হাত ধরেই সভ্যতার শুরু। সমাজ জীবনের নিয়ম-কানুন তাঁরই হাতে গড়া। জীবনের দেবতা হিসাবে সেদিনও তিনি ছিলেন ন্যায়পরায়ণ। ছিলেন শস্য আর উর্বরতার দেবতা। নীলনদের জলে ফসল ফলত তাঁরই দয়ায়। সময়ের সঙ্গে চিরতরুণ আর শান্ত সেই দেবতার সত্যিই পুনর্জন্ম ঘটল। তিনি হয়ে গেলেন পরলোকের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা, পাতালদেবতা। আশ্চর্য এই বদল। ওসাইরিস বা ওসিরিসকে নিয়ে সবচেয়ে বিখ্যাত আলোচনাগুলো করেছেন গ্রিক পন্ডিত ডিওডোরাস ও প্লুটার্ক। যদিও তার বহু আগে থেকেই পিরামিড গাত্রে খোদাই করা হয়েছে ওসাইরিসের জীবনকাহিনী। সেইসব পিরামিড স্টোরি থেকেই প্রথম জানা যায় ওসাইরিসের জীবন, হত্যাচক্রান্ত ও পুনরুত্থানের গল্প৷ পুরাণের মতে মিশর ইতিহাসের সবচেয়ে পুরোনো মমিও ওসাইরিস। প্যাপিরাস সল্ট থেকে মৃতদেহ মমি করে পচনরোধের যে বিজ্ঞান, তারও প্রথম হাতেকলমে ব্যবহার হয় ওসাইরিসের উপরই। অনেকের মনে করেন কৃষির উন্মেষ, সমাজজীবনের শুরু থেকে সম্পর্কের জটিলতা পেরিয়ে অধ্যাত্মজীবন তথা পরলোকের প্রতি মোহ- মানবজীবনের এই চরৈবতি ভাবনার ছবিই আঁকা রয়েছে দেবতা ওসাইরিসের জীবনচিত্রে। আজও প্রবল বর্ষণের পর নতুন ফসল জন্মায় যখন, যখন কালোরাতের শেষে ভোর হয়- মিশরের মানুষ প্রকৃতির বুকে খুঁজে পায় ওসাইরিসের মৃত্যু আর পুনর্জীবনের ছবি।  

```