
শেষ আপডেট: 28 December 2023 18:03
দ্য ওয়াল ব্যুরো: জলবায়ু বদলের বড় প্রভাব পড়ছে মশাদের উপর। খামখেয়ালি আবহাওয়ায় আরও ক্ষেপছে মশারা। সংখ্যায় বেড়ে হামলা করছে ঝাঁকে ঝাঁকে। ডেঙ্গি, ম্যালেরিয়ায় বিপর্যস্ত হচ্ছে শহর। একেই তো প্যানডেমিকের প্যানিক এখনও যায়নি। তার মধ্যেই নতুন করে তেড়েফুঁড়ে উঠেছে মশক প্রজাতি। ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়াদের সঙ্গে সন্ধি করে তারাও বদলে ফেলছে মতিগতি। আস্ত অ্যানোফিলিস, এডিস মশাও তাদের চরিত্র বদলে ফেলছে ফটাফট। কীটনাশককেও করছে ‘ডোন্ট কেয়ার’। মশাদের রুখতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে।
ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের লেখায় ডমরুর বন্ধু শঙ্কর ঘোষ বলেছিলেন, “হাতি আসলে একটি মশার প্রজাতি, মশার যেমন শুঁড় আছে হাতিরও আছে, কেবল হাতি গাছপালা খায়, রক্ত খায় না, কারণ তা হলে পৃথিবীতে আর কোনও প্রাণী অবশিষ্ট থাকত না।” এহেন ডমরুধর নাকি বাদুড়ের মতো পেল্লায় সাইজের মশাদের সঙ্গে তীর-ধনুক নিয়ে লড়াই করেছিল। পঁয়ত্রিশ দিনে কয়েক লক্ষ মশা মেরেছিল ডমরুধর। তারপর সেইসব মৃত মশাদের শুঁড় কেটে নিয়ে ফিরেছিল।
ভার্জিনিয়া কমনওয়েলথ ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানীরা এই মশককূল নিয়েই গবেষণারত। ত্রৈলোক্যনাথের গল্প হয়ত তাঁরা পড়েননি, তবে তাঁরা দাবি করছেন, মশারাও একদিন এমন পেল্লায় সাইজেরই হয়ে উঠবে। জলবায়ু বদলের এত খারাপ পড়ছে যে স্বভাব-চরিত্র বদলে ফেলছে মশারা। ঠিক ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়াদের জেনেটিক মিউটেশনের (জিনের রাসায়নিক বদল)মতো। এরপরে ডেঙ্গি, ম্যালেরিয়া, চিকুনগুনিয়ার মশারা রীতিমতো বিদ্রোহ ঘোষণা করে মানুষের উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। সংখ্যায় বাড়বে ঝাঁকে ঝাঁকে, কীটনাশকেও আর রোখা যাবে না তাদের।
আমেরিকার ইকোলজিক্যাল সোসাইটি তাদের গবেষণার খবর ‘ইকোলজি’ নামক এক বিজ্ঞান পত্রিকায় ছেপেছে। সেখানে বিজ্ঞানীরা জোর দিয়ে দাবি করেছেন, জলবায়ু ও তাপমাত্রার এত ঘন ঘন অদলবদল মশাদের উপর প্রভাব বিস্তার করছে। অ্যানোফিলিস, এডিস মশাদের জিনেও ঘটছে বিস্তর বদল। একটা সময় জলাশয়, ছোট ডোবা, পুকুরে মশাদের লার্ভা গিলে ফেলত ব্যাঙ, গাপ্পি, তেলাপিয়া মাছেরা। এখন উষ্ণায়ণের থাবায় পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ছে, জলবায়ু বদলাচ্ছে, স্থল ও জলভাগের বাস্তুতন্ত্রে দেদার বদল হচ্ছে, আর সেই সঙ্গেই ভ্যানিশ হয়ে যাচ্ছে মশাখেকো এইসব মাছেরা। তাই মশার বংশও বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে।
এক সময় ডেঙ্গি এমন বেড়ে গিয়েছিল যে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে জোড়াসাঁকো থেকে উঠে যেতে হয়েছিল পানিহাটির বাগানবাড়িতে। সে অনেক আগের কথা। কিন্তু তারপর মশা মারতে ব্যাপক কামান দেগেছিল পুরসভা। মশারাও সেই ঘায়ে উধাও হচ্ছিল ধীরে ধীরে। কিন্তু লড়াইয়ে টিকে থাকা গেল না। এখন আর কামানের গোলায় তেমন ভয়ডর পায় না মশারা। লালায় সংক্রামক ভাইরাস বয়ে নিয়ে তারা এখন অপ্রতিরোধ্য।
আগে দেখা যেত, অ্যানোফিলিস মশা নোংরা জলে ডিম পাড়ছে, কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, এই মশা পরিষ্কার জলেও ডিম পাড়ছে। ঘরের ভেতরে, প্লাস্টিকের জিনিসে জমা জলেও বংশবিস্তার করছে মশা। ফলে মশার সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনই রোগও ছড়াচ্ছে দ্রুত। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এডিস ইজিপ্টাই (Aedes aegypti), অ্যানোফিলিস স্টিফেনসাই (anopheles stephensi) ও কিউলেক্স বিশনোই (Culex vishnui) মশার সংখ্যা শত চেষ্টাতেও কমানো সম্ভব হচ্ছে না। এর কারণই হল, এই প্রজাতির মশারা তাদের জিনের গঠন বদলে ফেলছে। ফলে তাদের চরিত্রেও বদল আসছে। সংখ্যায় বেড়ে চলেছে।
মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যতটা কমেছে, মশাদের ততটাই বেড়েছে। বর্তমান সময়ে জাঙ্ক ফুড খাওয়া মানুষের চেয়ে মশক প্রজাতির হজম শক্তি কয়েকগুণ বেশি। তাই ঝাঁঝালো রাসায়নিকও তার হজম করে ফেলছে নির্দ্বিধায়। এক সময় ম্যালেরিয়ার মশা মারতে ডিডিটি দেওয়া হত, তাতে মশার সংখ্যা অনেক কমেছিল। কিন্তু দেখা গেল, মশারা শেষ পর্যন্ত হার মানেনি। ডিডিটি ছড়ালেও আর মশা মরছে না। জিনগত পরিবর্তন ঘটিয়ে তারা ডিডিটি প্রতিরোধী হয়ে গিয়েছে। ম্যালাথিয়ন কীটনাশকও হজম করে ফেলেছে মশারা। পুকুরে গাপ্পি ছাড়লে তাদেরও ফাঁকি দিচ্ছে কৌশলী স্ত্রী মশারা। এই মশাদের দাপট এতটাই বেড়েছে যে এখন দিনেও মশারি ঝুলিয়ে রাখতে বলছেন ডাক্তারবাবুরা। ভিয়েতনাম থেকে আবার স্পেশাল ওষুধ লাগানো মশারিও আমদানি করা হয়েছে।
কিন্তু সব ভাল যার, শেষ ভাল.. কিছুতেই হচ্ছে না। যে কোনও দুর্বোধ্য প্রতিরোধেও ফাঁক খুঁজে জিতে যাচ্ছে মশারাই। এর কারণই হল পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ছে। উষ্ণায়ণের ভেল্কিতে মশারা তাদের বেঁচেবর্তে থাকার উপায় খুঁজে নিচ্ছে। মানুষের তৈরি দূষণকেই হাতিয়ার করছে তারা। মানুষের শরীরে বাড়তে থাকা অসুখবিসুখ আর জীবনযাপনে অসংযমই মশাবাহিত রোগের মূল কারণ হয়ে উঠছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, আরও কয়েক দশক পরে তাপমাত্রার বৃদ্ধি আরও হবে। মশাদের সংখ্যাও বাড়বে। সেই সময় আর কামান দেগেও কোনও লাভ হবে না।