
শেষ আপডেট: 9 May 2023 08:01
ভারতীয় সংস্থা গোদরেজের (Godrej) বয়স আজ ১২৩ বছর। শতাব্দী প্রাচীন সংস্থাটির মুকুটে আছে সাফল্যের নানান পালক। ভারতে স্প্রিং ছাড়া তালা প্রথম বানিয়েছিল গোদরেজ। ভারতে টাইপরাইটার প্রথম বানিয়েছিল গোদরেজ। ভারতে নির্বাচনের ব্যালট-বক্স প্রথম বানিয়েছিল গোদরেজ। ভারতে রেফ্রিজারেটর প্রথম বানিয়েছিল গোদরেজ। গোদরেজ আজ পৃথিবী জুড়ে প্রায় ৪৭০ কোটি ডলারের ব্যবসা করে।
শুরুটা হয়েছিল ব্যর্থতা দিয়েই
১৮৬৮ সালে মুম্বইয়ের পার্সি পরিবারে জন্ম নিয়েছিলেন আর্দেশির গোদরেজ। পার্সি ভাষায় 'আর্দেশির' শব্দের অর্থ 'অকুতোভয়'। পড়াশুনায় ভালো ছিলেন আর্দেশির। তখনকার দিনের মুম্বাইয়ের অভিজাত পার্সি পরিবারগুলির সন্তানদের মতোই আইন নিয়ে স্নাতক হয়েছিলেন। কিন্তু আইনজীবী হতে গিয়ে সম্মুখীন হয়েছিলেন মানসিক দ্বন্দ্বের। আইনজীবী পেশায় অনেকসময় অপরাধীকে বাঁচাতে গিয়ে অন্যায়কে মেনে নিতে হয় । তা পারবেন না বলেই আইনজীবীর পেশা ছেড়ে একটি ওষুধের ফার্মে আর্দেশির তাঁর কর্মজীবন শুরু করেছিলেন।
ওষুধের ফার্মে কাজ করতে গিয়ে আর্দেশির দেখেছিলেন ভারতীয় বাজারে শল্যচিকিৎসার সরঞ্জামের বিপুল চাহিদা আছে। সেই তুলনায় উৎপাদন খুবই কম। চাকরি ছেড়ে শল্যচিকিৎসার সরঞ্জাম তৈরি করার ব্যবসা শুরু করেছিলেন আর্দেশির। প্রবল আশা নিয়ে শুরু করলেও আর্দেশিরের প্রথম ব্যবসা শুরু হয়েছিল ব্যর্থতা দিয়ে। বন্ধ করে দিতে হয়েছিল উৎপাদন।
[caption id="attachment_254715" align="alignnone" width="435"]
আর্দেশির গোদরেজ[/caption]
তৈরি হয়েছিল গোদরেজ ব্রাদার্স
১৮৯৭ সালে মুম্বাইয়ে চুরির ঘটনা আশঙ্কাজনক পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছিল। কাগজে সেই সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন পড়েছিলেন আর্দেশির। মাথায় এসে গিয়েছিল দ্বিতীয় ব্যবসার শুরুর পরিকল্পনা। ভাই পিরোজশা গোদরেজকে নিয়ে তৈরি করেছিলেন 'গোদরেজ ব্রাদার্স' নামে একটি কোম্পানি। শুরু করেছিলেন স্প্রিং ছাড়া 'তালা' বানানো। দামে কম ও সুরক্ষার দিক থেকে অতুলনীয় হওয়ায় মুম্বাইয়ের বাজারে আসা মাত্রই জনপ্রিয় হয়ে গিয়েছিল গোদরেজের তালা। কয়েকমাসের মধ্যেই মুম্বাইয়ের ঘরে ঘরে পৌঁছে গিয়েছিল গোদরেজ ব্রাদার্সের নাম।
১৯০২ সাল থেকে গোদরেজ ব্রাদার্স শক্তিশালী সিন্দুক তৈরি করতে শুরু করেছিল। একে একে গোদরেজ ব্রাদার্স এনেছিল, আয়রন চেস্ট, ভল্ট, দরজার ফ্রেম ও ডাবল প্লেটের দরজা। গোদরেজ ব্রাদার্সের সব পণ্যের দাম আয়ত্বের মধ্যে থাকায় ক্রেতাদের ধরতে অসুবিধা হয়নি আর্দেশিরের। এভাবেই গোদরেজ ব্রাদার্স একশো বছর আগে মুম্বাইতে হয়ে উঠেছিল সুরক্ষার প্রতীক। শোনা যায় ১৯১২ সালে ভারত সফরকালে ইংল্যান্ডের রানি সঙ্গে রেখেছিলেন গোদরেজ ব্রাদার্সের বানানো সিন্দুক।
[caption id="attachment_254718" align="aligncenter" width="467"]
স্প্রিং ছাড়া গোদরেজ 'তালা'[/caption]
ডানা মেলেছিল স্বদেশী আন্দোলন
১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনের ফলে সৃষ্টি হওয়া গণজাগরণের অভিঘাতে, শুরু হয়েছিল ছিল স্বদেশী আন্দোলন। এই আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশ পণ্য বয়কট করা এবং ভারতেই সেই সব পণ্য উৎপাদন করে ব্রিটিশরাজকে অর্থনৈতিক দিক থেকে পঙ্গু করে দেওয়া। ব্রিটিশ পণ্য বর্জনের কথা প্রচার করে চলেছিলেন অরবিন্দ ঘোষ, বিনায়ক দামোদর সাভারকর, বাল গঙ্গাধর তিলক, লালা লাজপত রায়, গান্ধীজি,রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সহ আরও অনেক মনীষী।
স্বাধীনতা আন্দোলনে নিজেকে সামিল করার জন্য ভারতীয় ব্যবসায়ীরা নেমে পড়েছিলেন পণ্য উৎপাদনের কাজে। গুণগত মানের দিক থেকে ভারতীয় পণ্যগুলি কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও, সেই সব স্বদেশী পণ্যকেই বুকে আঁকড়ে ধরেছিলেন ভারতীয়রা। ব্যবসায়ীরাও নিজেদের মুনাফার লোভ ত্যাগ করে, দেশীয় পণ্যগুলির মান বিশ্বমানে তোলার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিলেন।
তৈরি হয়েছিল 'গোদরেজ সোপ লিমিটেড'
১৮৯৭ সালে ভারতের মাটিতে প্রথম সাবান তৈরি করতে শুরু করেছিল মেরঠের 'নর্থ ওয়েস্ট' কোম্পানি। কিন্তু সেই সাবান ব্রিটিশ লগ্নি ও প্রযুক্তিতে তৈরি হতো। ১৯১৬ সালে, স্বদেশী আন্দোলনের জোয়ারে ভেসে মহীশুররাজ কৃষ্ণ রাজা ওয়াদিয়ার তৈরি করেছিলেন মাইশোর সোপ ফ্যাক্টরি। ভারতবাসীর হাতে এসেছিল চন্দনের গন্ধে সুরভিত 'মাইশোর স্যান্ডেল সোপ'। মাত্র দু'বছর পরে, ১৯১৮ সালে, স্বদেশী পণ্য বানানোর ভাবনা থেকেই সাবানের ব্যবসায় এসে পড়েছিল টাটাগোষ্ঠী। উৎপাদন করতে শুরু করেছিল কাপড় কাচার সাবান।
সাবানের বাজারে মহীশুররাজ ও টাটাগোষ্ঠীর সাফল্য দেখে, আর্দেশির ও পিরোজশা গোদরেজ পরীক্ষামূলকভাবে নেমে পড়েছিলেন সাবানের বাজারে। ১৯১৮ সালেই পথচলা শুরু করেছিল গোদরেজ সোপ লিমিটেড। বাজারে এসেছিল গোদরেজ সোপ লিমিটেডের কাপড় কাচার বার সাবান। কিন্ত যে বাজারে টাটাগোষ্ঠী আছে সেখানে একই ধরণের পণ্য নিয়ে টিকে থাকা খুবই কঠিন। সাবানের বাজারে অস্তিত্ব রক্ষার উপায় ভাবতে ভাবতে আর্দেশিরের মাথায় এসেছিল এক যুগান্তকারী পরিকল্পনা।
[caption id="attachment_254728" align="alignnone" width="222"]
পিরোজশা গোদরেজ[/caption]
গোদরেজ বাজারে এনেছিল পৃথিবীর প্রথম 'অহিংস' সাবান
সেই যুগে পশুর চর্বি ছিল সাবানের প্রধান উপকরণ। অহিংসা নীতি ও নিরামিষ আহারে বিশ্বাস রাখা বেশিরভাগ ভারতীয় তাই কোম্পানির তৈরি সাবান কিনতেন না। এই বিশাল সংখ্যক ক্রেতার কথা ভেবেছিলেন আর্দেশির। গোদরেজ সোপ লিমিটেডের নতুন সাবানে মিশিয়ে দিয়েছিলেন ভারতের চিরন্তন 'অহিংসা' নীতি। দু'বছর ধরে গোপনে গবেষণা চালিয়ে, ১৯২০ সালে আর্দেশির ভারতের বাজারে এনেছিলেন চাভি ব্র্যান্ডের 'No. 2' সাবান। এটিই পৃথিবীর প্রথম চর্বিমুক্ত সাবান। যে সাবানে চর্বির পরিবর্তে ব্যবহার করা হয়েছিল উদ্ভিজ্জ তেল। 'No. 2' সাবান বাজারে আসার পর এক সাক্ষাৎকারে আর্দেশির বলেছিলেন, “We launch Chavi, the first soap in the world to be made without animal fat. We score for Swadeshi and ahimsa.”।
[caption id="attachment_254730" align="aligncenter" width="600"]
বিশ্বের প্রথম চর্বিমুক্ত সাবান।[/caption]
প্রত্যেকটি উৎপাদক সংস্থা তাদের পণ্য তৈরির পদ্ধতি গোপন রাখে। কিন্তু আর্দেশির ঠিক উল্টোটাই করেছিলেন। 'No. 2' সাবান নিয়ে গুজরাতি ভাষায় লেখা একটি পুস্তিকা বিতরণ করেছিল গোদরেজ সোপ লিমিটেড। সেখানে সংস্থাটি জানিয়েছিল, কীভাবে উদ্ভিজ্জ তেল দিয়ে গোদরেজ সাবান তৈরি করে। পেটেন্ট পাওয়ার আগেই সিক্রেট বলে দেওয়াটা অনেকের কাছে বোকামি মনে হলেও, এটাই ছিল গোদরেজের 'চর্বিমুক্ত' সাবানের সাফল্যের মুলকারণ। নিরামিষাশী গুজরাতিরা আপন করে নিয়েছিলেন সাবানটিকে। তাঁদের দেখে অনান্য রাজ্যের নিরামিষাশী মানুষেরাও আপন করে নিয়েছিলেন চর্বিমুক্ত সাবানটিকে।
১৯২২ সালে বাজারে এসেছিল গোদরেজের 'No. 1' সাবান
ইচ্ছে করেই আর্দেশির গোদরেজ বিশ্বের প্রথম চর্বিমুক্ত সাবানটির নাম দিয়েছিলেন 'No. 2'। কারণ তাঁর মাথায় No.1 সাবান তৈরির পরিকল্পনা চলছিল। No. 1 সাবানটি হবে ব্রিটিশ সাবান গুলির থেকেও উন্নত। একেবারে বিশ্বমানের। কিন্তু দাম হবে 'No. 2' সাবানের থেকে সামান্য বেশী। ১৯২২ সালে তাই বাজারে এসেই তুফান তুলেছিল গোদরেজের No.1 সাবান।
তবুও বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ভারতে তৈরি বিশ্বমানের সাবানকে আরও ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন আর্দেশির। এর আগে 'No. 2' সাবানের বিজ্ঞাপনে দেখা গিয়েছিল অ্যানি বেসান্ত ও রাজাগোপালাচারিকে। তাঁরা স্বদেশী ব্র্যান্ডটিকে সফল করতে সর্বান্তকরণে সাহায্য করেছিলেন। No.1 সাবানের বিজ্ঞাপনের জন্য আর্দেশির বেছে নিয়েছিলেন এমন একটি মানুষকে, ভারত সহ বিশ্বের মানুষ যাঁকে এক ডাকে চেনেন। তিনি হলেন রবীন্দ্রনাথ।
[caption id="attachment_254731" align="alignnone" width="534"]
গোদরেজের 'No. 1' সাবান[/caption]
বাংলার বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে তখন রবীন্দ্রনাথের চাহিদা তুঙ্গে
না অর্থ উপার্জনের জন্য নয়, স্বদেশী কোম্পানিগুলির পায়ের তলার মাটি শক্ত করার জন্য রবীন্দ্রনাথ তখন দেখা দিচ্ছিলেন একের পর এক স্বদেশী পণ্যের বিজ্ঞাপনে। আজকের দিনে ভারতের সেলিব্রেটিরাও এতো বিজ্ঞাপন করেছিলেন কিনা সন্দেহ। রবীন্দ্রনাথের করা বিজ্ঞাপনগুলিকে নিয়ে অসামান্য গবেষণা করেছেন অরুণ কুমার রায়। ১৮৮৯ সাল থেকে ১৯৪১ সাল পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথের করা প্রায় ৯০টি পণ্যের বিজ্ঞাপন খুঁজে পেয়েছিলেন অরুণ বাবু। এর বাইরেও সম্ভবত অসংখ্য বিজ্ঞাপনে দেখা গিয়েছিল বিশ্বকবিকে।
প্রায় সব ধরণের পণ্যের বিজ্ঞাপনে দেখা যেতো রবীন্দ্রনাথের নাম ও উক্তি। কিংবা ছবি ও উক্তি। পণ্যগুলির মধ্যে ছিল বই থেকে শুরু করে স্নো, ক্রিম, ঘি, মিষ্টি, কেশ তেল, ওষুধ, লাইম জুস, তিল তেল, গ্লিসারিন, হারমোনিয়াম ও আরও কত কী। বিজ্ঞাপনগুলি প্রকাশিত হতো বসুমতী, ক্যালকাটা মিউনিসিপ্যাল গেজেট, ভাণ্ডার, সাধনা ম্যাগাজিনগুলিতে। প্রকাশিত হতো আনন্দবাজার, অমৃতবাজার ও স্টেটসম্যান পত্রিকাতে। ডঃ উমেশ চন্দ্র রায়ের 'পাগলের মহৌষধ' নামক একটি ওষুধের বিজ্ঞাপনে রবীন্দ্রনাথের একটি মজার উক্তি তো প্রবাদ হয়ে গিয়েছিল। পাগলের মহৌষধের বিজ্ঞাপনে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, "আমি ইহার উপকারিতা বহুকাল যাবৎ জ্ঞাত আছি।"
[caption id="attachment_254734" align="alignnone" width="413"]
পাগলের মহৌষধের বিজ্ঞাপনে রবীন্দ্রনাথের এই বিখ্যাত উক্তি।[/caption]
গোদরেজের No.1 সাবানের বিজ্ঞাপনে দেখা দিলেন রবীন্দ্রনাথ
বিশ্বকবির লেখার প্রেমে আগেই পড়েছিলেন সাহিত্যপ্রেমী আর্দেশির। No.1 সাবানের বিজ্ঞাপনে তাই চেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথকেই। যাঁর জনপ্রিয়তা বিশ্বজোড়া। গোদরেজের স্বদেশী সাবানের বিজ্ঞাপনের মডেল হওয়ার প্রস্তাব ফিরিয়ে দেননি রবীন্দ্রনাথ। ১৯২২ সালে সারা ভারত জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল গোদরেজ No.1 সাবানের বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপনের ছবিতে দেখা গিয়েছিল, হাত দুটো কোলের সামনে রেখে বসে আছেন ভারতীয় সাহিত্য ও সংস্কৃতির অন্যতম সেরা নক্ষত্র রবীন্দ্রনাথ।
[caption id="attachment_254738" align="aligncenter" width="494"]
গোদরেজের 'No. 1' সাবানের বিজ্ঞাপনে রবীন্দ্রনাথ।[/caption]
ছবির পাশে লেখা, “I know of no foreign soaps better than Godrej’s and I will make a point of using it.”। এ যেন এক অচেনা রবীন্দ্রনাথ। যাঁর জীবনে প্রেম নেই, পূজা নেই, মালা নেই, নেই অতীন্দ্রিয় সত্তার গূঢ় রহস্যময়তা, নেই মৃত্যুর নান্দনিকতা। হৃদয় জুড়ে আছে শুধু নিখাদ স্বদেশপ্রেম।
চিত্র কৃতজ্ঞতা- গোদরেজ আর্কাইভ, ইন্টারনেট