শেষ আপডেট: 30 November 2019 12:37
জোরাবার সিং[/caption]
লাদাখ তখন ছিল গিয়ালপো (রাজা) সেপাল নামগিয়ালের অধীনে। তাঁর অধীনে লাদাখের বিভিন্ন এলাকায় আবার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শাসকগোষ্ঠী ছিলেন। এঁদেরই একজন ১৮৩৪ সালে জোরাবার সিং কে জানিয়েছিলেন, তিনি গিয়ালপোর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে চান, জোরাবার সিং যেন তাঁকে সাহায্য করেন। ফলে ডোগরা রাজ্যের কাছে উত্তরে সাম্রাজ্য বিস্তারের পথ সুগম হয়ে গিয়েছিল।
এই পথেই লাদাখের দিকে এগিয়েছিলেন জোরাবার[/caption]
কেটে গেছিল শীত, লাদাখে এসেছিল বসন্ত। লাদাখের মালভূমিতে ফুটে উঠেছিল লাল হলদে গোলাপি ঘাস ফুল। অতর্কিতে হানা দিয়েছিল ডোগরা ফৌজ। দাঁড়িয়ে দঁড়িয়ে হার মেনেছিল অপ্রস্তুত লাদাখি সেনা।
ডোগরা ফৌজ দখল করেছিল রাজধানী লে। জোরাবারের প্রভু গুলাব সিংয়ের বশ্যতা স্বীকার করেছিলেন গিয়ালপো সেপাল নামগিয়াল। রাজি হয়েছিলেন যুদ্ধের ক্ষতিপূরণবাবদ ৫০০০০ টাকা এবং বার্ষিক ২০০০০ টাকা খাজনা দিতে।
ডোগরাদের লাদাখ জয়ে অশনি সঙ্কেত দেখেছিলেন ছিলেন কাশ্মীরের শিখ রাজ্যপাল মেহান সিং। তাঁর আশঙ্কা ছিল ডোগরারা এবার কাশ্মীরের দিকে বাঁক নিতে পারে। ১৮৩৬ সালে তিনি গিয়ালপোকে বলেছিলেন গুলাব সিংয়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করতে ।
মাত্র ১০ দিনের মধ্যে জোরাবার সিং লাদাখে পৌঁছে শক্ত হাতে দমন করেছিলেন বিদ্রোহ। সরিয়ে দিয়েছিলেন গিয়ালপো নামগিয়ালকে। তাঁর জায়গায় সিংহাসনে বসিয়েছিলেন নামগিয়ালের সেনাপতি নগরাব স্টানজিনকে।
আবার যাতে লাদাখে বিদ্রোহ না হয় তার জন্য লে শহরের বাইরে জোরাবার বানিয়েছিলেন একটি দুর্গ তাঁর বিশ্বস্ত। বিশ্বস্ত ডোগরা কম্যান্ডার দালেল সিংয়ের দায়িত্বে সেখানে রেখে দিয়েছিলেন ৩০০ জন সশস্ত্র ডোগরা সেনা।
[caption id="attachment_163729" align="aligncenter" width="600"]
আজও আছে লে শহরের উপকণ্ঠে জোরাবারের সেই দূর্গ[/caption]
বালটিস্তান[/caption]
কিন্তু লাদাখে তখন অন্য খেলা চলছে। ডোগরাদের বিরুদ্ধে আবার বিদ্রোহের প্রস্তুতি নিয়েছিল লাদাখ। তাই জোরাবার সিংয়ের সাহায্য চাইতে গিয়ে লাদাখে বন্দি হয়ে গিয়েছিলেন মুহম্মদ শাহ। বালটিস্তানের শাসক আহমেদ শাহকে লাদাখ জানিয়েছিল, ছেলেকে বন্দি করে বিদ্রোহ রুখে দেওয়ার বিনিময়ে আহমেদ শাহকে ডোগরাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে হবে।
দূত খবর এনেছিল। জোরাবার সিং সোজা গিয়েছিলেন লাদাখ। সেখানে বিদ্রোহ দমন করে ১৮৩৯ সালের শীতে ডোগরা ফৌজ নিয়ে আক্রমণ করেছিলেন বালটিস্তান। এই অভিযানে জোরাবার সিংয়ের ফৌজে ছিল প্রচুর লাদাখি সেনা।
[caption id="attachment_163735" align="alignnone" width="1772"]
বালটিস্তানের স্কার্দু ,এখানেই হানা দিয়েছিল জোরাবারের বাহিনী[/caption]
জোরাবারের এক কম্যান্ডার নিধান সিংয়ের নেতৃত্বে ৫০০০ ডোগরা ও লাদাখি সৈন্য বরফে পথ হারিয়ে ফেলেন। প্রচণ্ড ঠান্ডায় জমে মারা গিয়েছিলেন অনেক সেনা। এই অবস্থায় ডোগরা ফৌজকে ঘিরে ধরেছিল বালটিস্তানি ফৌজ। কিন্তু ঠিক সময়ে খবর পৌঁছায় জোরাবার সিংয়ের কাছে। ভোজবাজির গতিতে আরও সেনা নিয়ে রণক্ষেত্রে পৌঁছে আক্রমণ শানান জোরাবার সিং।
ঢুকে পড়েন রাজধানী স্কার্দুতে। দখল করেন রাজার দুর্গ। আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছিলেন রাজা আহমেদ শাহ। ডোগরা রাজ্যের বকলমে শিখ সাম্রাজ্যের অধীনে চলে গিয়েছিল বালটিস্তানও। বালটিস্তানের সিংহাসনে জোরাবার সিং বসিয়েছিলেন মহম্মদ শাহকে। বার্ষিক ৭০০০ টাকা খাজনার বিনিময়ে।
এরপরও পূর্বে না ফিরে জোরাবার সিং তাঁর বিশ্বস্ত ওয়াজির লাখপতের নেতৃত্বে ডোগরা ফৌজকে পাঠিয়েছিলেন আরও পশ্চিমে। তারা দখল করেছিল গিলগিটও। বন্দি করেছিল গিলগিটের রাজাকে। বালটিস্তানের সঙ্গে ডোগরা রাজ্যের হাতে এসেছিল গিলগিটও।
[caption id="attachment_163748" align="alignnone" width="800"]
জোরাবারের দখলে এসেছিল গিলগিটও[/caption]
কিন্তু গিলগিটের রাজা কাশ্মীরের শিখ রাজ্যপাল মেহান সিংয়ের অনুগত থাকায়, তিনি খবর পাঠান লাহোরে। শিখ সম্রাটের দূত সে খবর জানায় গুলাব সিংহকে। গুলাব জোরাবারকে বলেন গিলগিটের রাজাকে মুক্তি দিতে। পশ্চিমের দিকে আরও এগোনোর পথ বন্ধ হয়ে যায় জোরাবারের সামনে।
মানস সরোবর ও গুরলা মান্ধাতা পর্বতশ্রেণী[/caption]
প্রথম যুদ্ধে জেতার পর ডোগরা ফৌজ চলেছিল দক্ষিণে তাকালাকোটের দিকে। মায়ুম পাসের (১৭০০০ ফুট) ওপরে হয়েছিল দ্বিতীয় লড়াই। সাড়ে তিন মাসের লড়াইয়ে তিব্বতের কাছ থেকে প্রায় ৮৮৫ কিলোমিটার এলাকা ছিনিয়ে নিয়েছিলেন জোরাবার সিং। তখনও পর্যন্ত অপরাজেয় তিব্বতীরা জোরাবার সিংকে ভেবেছিল অপদেবতা। যাকে হারানো সম্ভব নয়।
ওদিকে দ্রুত নেমে আসছিল তিব্বতী শীত। জোরাবার সিদ্ধান্ত নেন তীর্থপুরীতে থেকে যাবেন এবং পরবর্তী গ্রীষ্মের জন্য অপেক্ষা করবেন। যাতে তিব্বতী সেনারা ফিরে না আসে তাই সিল করে দিয়েছিলেন মায়ুম পাস।
[caption id="attachment_163759" align="aligncenter" width="1000"]
এই সেই মায়ুম পাস[/caption]
কিন্তু এখানেই তিনি তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় কৌশলগত ভুলটি করে বসেন। তিব্বতীরা মায়ুম গিরিপথের দক্ষিণে থাকা মাতসাং গিরিপথ দিয়ে যে তাঁর ফৌজকে আক্রমণ করতে পারে, এটা তাঁর কল্পনাতে আসেনি। এমন কি শীতকালেও মাতসাং গিরিপথ চলাচলের উপযুক্ত থাকে।
এসে গিয়েছিল ১৮৪১ সালের শীত। এ শীত তিব্বতের শীত। লাদাখের থেকেও ভয়াবহ ও প্রাণঘাতী। প্রবল তুষারপাতে সামনে ও পিছনের পথ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ডোগরা ফৌজকে ছোবল মেরেছিল তুষার ঝড়। প্রচুর ডোগরা সেনা তুষারক্ষতের কারণে হারিয়েছিলেন আঙুল ও পায়ের পাতা। শরীর গরম রাখতে নিজেদের বন্দুকের কাঠের বাট জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন অনেক ডোগরা সেনা।
[caption id="attachment_163764" align="aligncenter" width="1200"]
বরফ ও তুষার ঝড় এখানেই অবরুদ্ধ করে রেখেছিল ডোগরা ফৌজকে[/caption]
চেনা আবহাওয়ার সুযোগে তিব্বতী ফৌজ তাদের সঙ্গী চিনা ফৌজকে নিয়ে মাতসাং গিরিপথ দিয়ে ফিরে এসে অতর্কিতে আক্রমণ চালিয়েছিল জোরাবার সিংয়ের অসহায় ডোগরা ফৌজের ওপর।
জোরাবার সিংয়ের সম্মানার্থে তিব্বতীরা তাকলাকোটে বানিয়েছিল এই স্মৃতিসৌধ[/caption]
তিব্বতীরা তাদের ইতিহাসের অন্যতম সেরা শত্রুকে সম্মান জানিয়েছিল একটি স্মৃতিসৌধ বা চোর্তেন বানিয়ে। তাকলাকোটে আজও তা সিং-বা চোর্তেন নামে খ্যাত। কিন্তু অপরাজেয় হয়েও ভারতবাসীর কাছে প্রায় অপরিচিত এই রাজপুত বীর জোরাবার সিং কাহলুরিয়া। বিশ্বের ইতিহাসবিদরা যাঁকে আখ্যা দিয়েছেন ভারতের নেপোলিয়ন।