রূপাঞ্জন গোস্বামী
জায়গাটা চেন্নাইয়ের হাসপাতাল বা পুলিশ থানার
মর্গ-এর উঠোন। হয়তো সেখানে
শুয়ে আছেন একটি পুরুষ বা মহিলা নিথর হয়ে। তিনি কোনও দিন কারও বাবা, মা , ছেলে, মেয়ে, ভাই বা বোন ছিলেন। আজ তিনি কারও নন। তাঁর ঠিকানা নেই, নাম নেই, তিনি তাই বেওয়ারিশ লাশ।
মানবসভ্যতা নিজের কাজে ব্যস্ত। অথচ একটা মানুষ চলে গেছে। আশেপাশে একফোঁটা চোখের জল ফেলার লোক নেই। দূরে কয়েকটা কাক শকুন লোভাতুর দৃষ্টিতে চেয়ে আছে পচতে থাকা শরীরটির দিকে। প্রকৃতি ভাবছে, মৃতদেহটির শেষকৃত্যকে কে করবে, মানুষ না ব্যাকটিরিয়া!
ঠিক সেই মুহুর্তে
দেহটির পাশে এসে দাঁড়ান তেইশ বছরের মিষ্টি চেহারার এক যুবক, খালিদ আহমেদ। সঙ্গে তাঁর কয়েকজন ছেলে মেয়ে। তাঁদের মধ্যে অনেক আবার টিন-এজার। হাতে গ্লাভস পরে , মুখে মাস্ক লাগিয়ে, বেওয়ারিশ লাশকে যত্ন করে মুড়ে নেন সাদা কাপড়ে। খুব সাবধানে, ধরাধরি করে দেহটিকে তোলেন শববাহী অ্যাম্বুলেন্সে। গাড়ি ছোটে নির্দিষ্ট কবর স্থানের দিকে।
কবর স্থানে পৌঁছে, খালিদ ও তাঁর বন্ধুরা, নিজেরাই কোদাল চালিয়ে কবর খোঁড়েন। তারপর গর্তে নেমে নিথর মানুষটিকে পরম মমতায় শেষ বিছানায় শুইয়ে দেন। কবরে মাটি চাপা দিয়ে মানুষটির জন্য প্রার্থণা করেন খালিদরা। না কোনও ধর্মীয় প্রার্থণা নয়। মানুষটির জন্য কয়েক মুহুর্ত চিন্তা করা।
মানুষটি যেন মনে করেন, পৃথিবী থেকে তাঁর চিহ্ন হারিয়ে যাওয়ার দিনে, তিনি একলা ছিলেন না। তাঁর পাশেই ছিলেন খালিদ ও তাঁর বন্ধুরা। এবং পৃথিবী থেকে মানুষটিকে অসম্মানজনক ভাবে বিদায় নিতে হয়নি।
আমিই থাকব ওঁদের পাশে
২০১৫ সালে বন্ধুদের সঙ্গে খালিদ গিয়েছিলেন কোয়েম্বাটোর। সেখানে দেখেছিলেন একজন গৃহহীন রাস্তায় শুয়ে কাতর ভাবে জল চাইছিলেন পথচারীদের কাছ থেকে।
"হয়তো তাঁর গায়ের গন্ধ পথচারীদের দূরে রেখেছিল। আমি আমার বন্ধুরা তাঁকে জল দিয়েছিলাম। জল দেওয়ার কিছু পরেই তিনি মারা গেলেন।"
খালিদ সঙ্গে সঙ্গে খবর দিয়েছিলেন পুলিশকে। কিন্তু লোকটি কে, কোথা থেকে এসেছিলেন, তাঁর পরিবারে কে কে আছেন, তার কোনও হদিশ পাওয়া গেল না।
“ পুলিশ একটা এফআইআর করে তাঁর মৃতদেহ মর্গে পাঠিয়ে দিল কয়েকদিনের জন্য। কেউ যদি খোঁজ করে। কিন্তু পনেরো দিন পরেও কেউ খোঁজ করেনি। আমরাই হতভাগ্য ব্যক্তিটির শেষকৃত্য করি পুলিশের সহায়তায়।"
ঘটনাটি খালিদের মনে ভীষণভাবে প্রভাব ফেলল। ২০১৭ সালের জুলাই মাসে খালিদ ঠিক করলেন একটি সংস্থা তৈরি করবেন, যা বেওয়ারিশ মৃতদেহকে মৃত্যুর পরেও অসম্মানিত হতে দেবে না।
তৈরি হল উরাভুগাল
নিজের পকেট মানি দিয়ে খালিদ তৈরি করলেন
উরাভুগাল ট্রাস্ট। তামিলে শব্দটির অর্থ
আত্মীয়তা। বেওয়ারিশ লাশেদের সঙ্গে আত্মীয়তা গড়লেন খালিদ। সঙ্গে রইলেন তাঁর বন্ধুরা। প্রথম দিকে মাসে দু এক বার ডাক পড়ত, অসনাক্ত মৃতদেহের শেষকৃত্যের জন্য। ধীরে ধীরে এই অসাধারণ যুবকগুলির কথা চেন্নাই শহরে ছড়িয়ে পড়ল। বাড়তে লাগল ফোনের সংখ্যা। ফোন আসতে লাগল চেন্নাই এর সবকটি পুলিশ স্টেশন থেকে।

এখন মাসে কমপক্ষে কুড়িটা বেওয়ারিশ লাশের সৎকার করে খালিদের
উরাভুগাল ট্রাস্ট।
২৪x৭ ঘন্টা খালিদকে পাওয়া যাবে এই কাজে। যতই অন্য কোনও কাজ থাকুক। খালিদ সেই বেওয়ারিশ মানুষটির জন্যই সময় বের করবেনই, যাঁর জন্য আজ কারও সময় নেই।
মৃত প্রত্যেকটি মানুষকে আমাদের পরিবারের লোক ভেবেই আমরা তাঁর সৎকার করি। তিনি যে ধর্মেরই লোক হন না কেন। আমরা এটাকে কাজ ভাবি না। আমরা এটা বাড়ির প্রিয়জনের প্রতি আমাদের কর্তব্য ভাবি। আমার মনে পড়ে গৃহহীন, পরিত্যক্ত মৃত্যুপথযাত্রী কিছু মানুষের শেষ ইচ্ছার কথা।
তাঁদের মধ্যে বেশিরভাগ মানুষই আমাকে বলেছিলেন, তাঁদের যেন শেষকৃত্য হয়। লাঞ্ছনাময় জীবন কাটিয়ে তাঁরা চান না মৃত্যুর পরেও তাঁদের মৃতদেহ লাঞ্ছিত হোক। আমরা তাঁদের হাত ধরে কথা দিই, তাঁর শেষ ইচ্ছাকে সম্মান দেব আমরা।
এগিয়ে এলেন আরও বন্ধু
শুরু করেছিলেন
খালিদ, আজ ট্রাস্টের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন প্রায়
৪০০ সেচ্ছাসেবক। খালিদের সঙ্গী সেচ্ছাসেবকদের বয়েস শুনলে অবাক হতে হয়। ১৮ থেকে ২৫। এই বয়েসের ছেলে মেয়েরা কেরিয়ার, প্রেম আর ইন্টারনেট নিয়ে পড়ে থাকে। সেখানে এরা ঘুণ ধরা সমাজ বদলাতে নেমেছেন। এখনও পর্যন্ত প্রায় ২৫০ বেওয়ারিশ লাশের অন্ত্যেষ্টি করেছেন খালিদ ও তাঁর সঙ্গীরা।
খালিদ দুটি হোয়াটস অ্যাপ গ্রুপ চালান। তাঁর কাছে কোনও বেওয়ারিশ লাশের খবর এলেই তিনি গ্রুপে জানান। সঙ্গে সঙ্গে পাচঁ ছ'জন যুবক যুবতী চেন্নাইয়ের বিভিন্ন জায়গা থেকে বেরিয়ে পড়েন সৎকারের জন্য। আজ উরাভুগালের ট্রাস্টের নিজস্ব শববাহী অ্যাম্বুলেন্স হয়েছে।

তবে একটা ঘটনার কথা খালিদ ভুলতে পারেন না। ডাস্টবিন থেকে নিজের হাতে তুলেছিলেন, ছয়মাসের একটি ফুটফুটে শিশুর মৃতদেহ। কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন দলের সবাই। খালিদের চোখে এখনও জল আসে ভাবলেই,
এই পৃথিবীতে এরকমও নির্দয় মানুষও থাকতে পারে! আজও ভুলিনি তার মুখ।
নিঃশব্দ বিপ্লব ঘটিয়ে ফেললেন খালিদ
ট্রাস্টের বর্তমান সেক্রেটারী একজন যুবতী,
ডক্টর ভুবনেশ্বরী। উরাভুগালের প্রথম মহিলা সেচ্ছাসেবক। একদিন উরাভুগালের মূল দলটি একটি সৎকারের কাজে বেরিয়ে পড়েছিল, কিন্তু লোকের সংখ্যা কম ছিল। তাই ডক্টর ভুবনেশ্বরী গিয়েছিলেন ওদের সঙ্গে বেওয়ারিশ লাশের অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়ায়। সেই শুরু, এখন উরাভুগাল ট্রাস্টে প্রায় ৭০ জন মহিলা সেচ্ছাসেবক আছেন।

এদিক থেকে খালিদ একটা নিঃশব্দ বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলেছেন। ভারতের প্রায় সব ধর্মেই, মহিলাদের অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়ায় যাওয়া ও সক্রিয় ভূমিকা নেওয়া বারণ। সেই সংস্কারের মূলে আঘাত করেছেন খালিদ।
প্রশংসা চান না খালিদ,চান, বাড়িয়ে দেওয়া হাত
এরকম একটি মহান সংকল্পের পরেও অস্বাভাবিক রকমের নিরুত্তাপ, শান্ত ও বিনয়ী যুবক খালিদ। তিনি চান তাঁর আন্দোলন ভারতের প্রতিটি রাজ্যে ছড়িয়ে পড়ুক। হাতে হাত দিয়ে এগিয়ে আসুক যুবসম্প্রদায়। তিনি তাঁর সকল ভারতীয় তরুণ বন্ধু বান্ধবীদের বলতে চান,
জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে, আমাদের প্রত্যেককেই মৃত্যুকে ছুঁতে হবে। এটাই আমাদের জীবনের চরম সত্য। ফেলে দেওয়া, বাতিল মানুষদের জীবন ও মৃত্যু দুটোই মর্মান্তিক। আসুন, আমরা সবাই মিলে বেওয়ারিশ লাশ হয়ে যাওয়া মানুষগুলির শেষ বিদায়টা অন্তত মানুষের মত করার চেষ্টা করি।
[caption id="attachment_99167" align="aligncenter" width="670"]
খালিদ আহমেদ[/caption]
আজ তাই সমাজ উঠে দাঁড়িয়ে কুর্নিশ করে খালিদকে। কামনা করে ঘরে ঘরে যেন খালিদের মত ছেলে, ভুবনেশ্বরীর মত মেয়ে জন্মায়।
তবে, সে দিকে খালিদের নজর নেই। সব সময় তাঁর নজর তাঁর মোবাইলের দিকে, এই বুঝি বেজে ওঠে ফোন,
" খালিদ ভাই...থানা থেকে বলছি...এক মহিলার লাশ...চলে আসুন"।