
শেষ আপডেট: 13 April 2019 11:41
জালিয়ানওয়ালাবাগে উপস্থিত ৫০০০ ভারতবাসীর মধ্যে ছিলেন ডাক্তার ষষ্ঠী চরণ মুখার্জী। আদি নিবাস হুগলি। কিন্তু ডাক্তারি করতেন এলাহাবাদে। শিক্ষাবিদ ও ভারতের কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট মদন মোহন মালব্যর প্রিয়পাত্র ছিলেন। ডাক্তার ষষ্ঠী চরণ মুখার্জীকে ১৯১০ সালে মদন মোহন মালব্য পার্টির কাজে অমৃতসর পাঠান। আর এলাহাবাদ ফেরেননি তিনি।
১৯১৯ সালের অভিশপ্ত ১৩ এপ্রিল, ডাক্তার ষষ্ঠী চরণ মুখার্জী ঘটনাস্থলে ছিলেন। মঞ্চ থেকে পরিচালনা করছিলেন সভা।বুলেট বৃষ্টির সময় মঞ্চের নীচে থাকায় প্রাণ বেঁচে যায়। কিন্তু চোখের সামনে ১৫০০ নিরপরাধ নারী পুরুষ এবং শিশুর মৃত্যু প্রত্যক্ষ করেন।
[caption id="attachment_95322" align="aligncenter" width="960"]
কর্নেল ডায়ার[/caption]
শোকাহত ডাক্তার মুখার্জী মনস্থির করলেন, জালিয়ানওয়ালাবাগে শহিদ হওয়া নারী পুরুষের স্মৃতিতে একটি স্মৃতিসৌধ গড়ে তুলবেন। শহিদ হওয়া ১৫০০ স্বাধীনতা সংগ্রামীকে যাতে ভারত না ভোলে। তিনি জাতীয় কংগ্রেসকে স্থানটি অধিগ্রহণ করতে অনুরোধ করেন। অন্যদিকে ব্রিটিশরাও নেমে পড়েছিল স্থানটি অধিগ্রহণ করতে। এই নৃশংস গণহত্যার প্রমাণ লোপ করার জন্য। জালিয়ানওয়ালাবাগ অধিগ্রহণ করে, ১৫০০ শহিদের রক্তে ভেজা পূণ্যভূমিতে ব্রিটিশরা কাপড়ের মার্কেট করতে চেয়েছিল।
[caption id="attachment_95319" align="aligncenter" width="550"]
এই মাঠেই শহিদ হয়েছিলেন ১৫০০ ভারতবাসী[/caption]
১৯২০ সালে কংগ্রেসের বৈঠকে জমি অধিগ্রহণের পিটিশনটি পাস হয়। সাড়ে ছয় একর জমিটির মালিক ছিলেন হিম্মত সিং। দাম ঠিক হয় ৫ লাখ ৬০ হাজার টাকা। কিন্তু অত টাকা আসবে কোথা থেকে! জমিটি কেনার জন্য, গান্ধীজি ভারতবাসীকে অর্থ দান করার জন্য আবেদন জানালেন। ষষ্ঠী চরণ মুখার্জি নিজে দরজায় দরজায় ঘুরে অর্থ ভিক্ষা করতে লাগলেন। প্রায় ৯ লাখ টাকা উঠল। ১৯২০ সালের ১ আগষ্ট, ষষ্ঠী চরণ মুখার্জি নিলামে কিনে নিলেন জালিয়ানওয়ালাবাগের পবিত্র ভূমি।
জমি হাতছাড়া হওয়ার রাগে, বিনা অপরাধে ডাক্তার মুখার্জিকে জেলে পাঠিয়ে ছিল ব্রিটিশরা। কিন্তু বেশিদিন আটকে রাখতে পারেনি। তারপর থেকে কেটে গেল কয়েক দশক। সবার নজর ঘুরে গেছিল দিল্লির দিকে। কিন্তু নাছোড়বান্দা ছিলেন ষষ্ঠী চরণ মুখার্জি।
১৯৫১ সালের ১ মে তৈরি হল জালিয়ানওয়ালাবাগ ন্যাশনাল মেমোরিয়াল ট্রাস্ট। যার প্রথম সম্পাদক হলেন ষষ্ঠী চরণ মুখার্জি। চেয়ারম্যান হলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। বানানো হল স্মৃতিসৌধের নকশা। সেই নকশা বানালেন আমেরিকার বেঞ্জামিন পোলক। ১৯৬১ সালের ১৩ এপ্রিল, বৈশাখীর দিন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর উপস্থিতিতে ভারতের রাষ্ট্রপতি ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদ উদ্বোধন করলেন জালিয়ানওয়ালাবাগ শহিদ স্মৃতিসৌধ।
[caption id="attachment_95314" align="aligncenter" width="640"]
জালিয়ানওয়ালাবাগ শহিদ স্মৃতিসৌধ[/caption]
আজ সেই ১৩ এপ্রিল। আজও জালিয়ানওয়ালা বাগ ন্যাশনাল মেমোরিয়াল ট্রাস্ট ও স্মৃতিসৌধটির দায়িত্বে আছেন ষষ্ঠী চরণ মুখার্জির পরিবার। বর্তমানে ট্রাস্টের সম্পাদক ডাক্তারবাবুর নাতি সুকুমার মুখার্জি। যাঁকে এই দায়িত্বে নিয়ে এসেছিলেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী।
সুকুমার মুখার্জির আগে জালিয়ানওয়ালাবাগ ন্যাশনাল মেমোরিয়াল ট্রাস্ট-এর সম্পাদকের দায়িত্ব সামলেছেন তাঁর বাবা উত্তম চরণ মুখার্জি। ষষ্ঠী চরণ মুখার্জির পুত্র উত্তম চরণ মুখার্জি, তাঁর বাবার মতই বুকে আগলে রেখেছিলেন জালিয়ানওয়ালাবাগকে।
[caption id="attachment_95310" align="aligncenter" width="960"]
বর্তমানে ট্রাস্টের সম্পাদক ডাক্তারবাবুর নাতি সুকুমার মুখার্জি[/caption]
১৯৮০-র দশক, পাঞ্জাবে তখন খলিস্তানি উগ্রপন্থীদের দাপট চলছিল। খলিস্তানি উগ্রপন্থীরা একবার কৃপাণ নিয়ে হত্যা করতে এসেছিল উত্তম চরণ মুখার্জিকে। দখল করতে চেয়েছিল জালিয়ানওয়ালাবাগ। বুক চিতিয়ে খালি হাতে উন্মুক্ত কৃপাণের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন উত্তম চরণ মুখার্জি। তাঁর রুদ্রমূর্তি দেখে জালিয়ানওয়ালাবাগে আরেকবার রক্ত ঝরাতে সাহস করেনি উগ্রপন্থীরা। তাই, আজও বাঙালির হাতে সুরক্ষিত আছে রক্তে রাঙা জালিয়ানওয়ালাবাগ।