রূপাঞ্জন গোস্বামী
হিমালয় পর্বতমালার পূর্ব প্রান্তের শেষ শৃঙ্গ যেমন
নামচা বারওয়া (৭৭৮২ মিটার), তেমন পশ্চিমপ্রান্তের শেষ শৃঙ্গ হল
নাঙ্গা পর্বত ( ৮১২৬ মিটার)। পাকিস্তানের গিলগিট-বালটিস্তান অঞ্চলের দিয়ামির জেলায়, সিন্ধু নদের দক্ষিণে এই পর্বতের অবস্থান। নাঙ্গা পর্বত পৃথিবীতে নবম এবং পাকিস্তানে দ্বিতীয় উচ্চতম পর্বত। পৃথিবীর ১৪টি ৮০০০ মিটারের উঁচু পর্বত শৃঙ্গের মধ্যে, আরোহণের জন্য অন্যতম কঠিন শৃঙ্গ এই নাঙ্গা পর্বত।
যে পর্বত শৃঙ্গ, ১৮৮৫ সালের ২৪ আগস্ট কেড়ে নিয়েছিল ইংল্যান্ডের কবি ও প্রবাদপ্রতিম মাউন্টেনিয়ার অ্যালবার্ট মামেরিকে। অস্ট্রিয়ার বিখ্যাত পর্বতারোহী হার্মান বুল, ১৯৫৩ সালের ৩ জুলাই নাঙ্গা পর্বতের শীর্ষে প্রথম আরোহণ করেন। তত দিনে নাঙ্গা পর্বতের কুখ্যাত রাখিয়ট ফেস কেড়ে নিয়েছে ৩১ জন পর্বতারোহীর প্রাণ। তাই পর্বতারোহী মহলে নাঙ্গা পর্বত পরিচিত 'কিলার মাউন্টেন' নামে।
[caption id="attachment_137374" align="aligncenter" width="702"]
নাঙ্গা পর্বত[/caption]
২০১৩ সালের জুন মাস
বসন্ত মরসুমের আরোহণ জোর কদমে শুরু হয়ে গিয়েছিল নাঙ্গা পর্বতে। বিভিন্ন দেশের প্রায় ৫১ জন পর্বতারোহী নাঙ্গা পর্বতের তিনটে ফেস (রাখিয়ট, দিয়ামির, রূপাল) দিয়ে শৃঙ্গে আরোহণের জন্য রওনা হয়ে গিয়েছিলেন।
১৪০০০ ফুট উঁচু দিয়ামির বেসক্যাম্পে অপেক্ষা করছিল, বিভিন্ন দেশের আরোহীদের নিয়ে গড়া আর একটি টিম। নীল হলুদ লাল ফুলের মতো ফুটে উঠেছিল অভিযাত্রীদের টেন্টগুলি, দিয়ামির বেসক্যাম্পের গালচের মতো সবুজ ঘাসে। টিমটি অপেক্ষা করছিল আর একটু ভাল আবহাওয়ার জন্য।
[caption id="attachment_137383" align="aligncenter" width="600"]
নাঙ্গা পর্বতের দিয়ামির ফেস, নীচে দিয়ামির বেসক্যাম্প, যেখানে ঘটেছিল নারকীয় হত্যাকাণ্ড[/caption]
টিমটিতে ছিলেন ইউক্রেনের তিন পর্বতারোহী।
ইগর স্বোয়েহান (৪৭),
বাদাভি কাশায়েভ(৫৪),
দিমিত্র কনিয়ায়েভ(৪৩)। এঁদের মধ্যে ইহর স্বোয়েহান হলেন পুরো দলটির লিডার। যিনি নাঙ্গা পর্বতে আসার আগে ৬টি ৮০০০ মিটারের শৃঙ্গ আরোহণ করে এসেছেন। দু'জন পর্বতারোহী এসেছিলেন স্লোভাকিয়া থেকে। তাঁরা হলেন
অ্যান্টন ডবেস(৫০),
পিটার স্পারকা(৫৭)।
[caption id="attachment_137092" align="aligncenter" width="600"]
হতভাগ্য অভিযাত্রী দলের হতভাগ্য নেতা ইউক্রেনের ইগর স্বোয়েহান[/caption]
[caption id="attachment_137100" align="aligncenter" width="450"]
স্লোভাকিয়ার অ্যান্টন ডবেস[/caption]
[caption id="attachment_137095" align="aligncenter" width="500"]
চিনের রাও জিয়াংফেং[/caption]
তিন জন এসেছিলেন চিন থেকে,
চুংফেং ইয়াং (৪৫) এবং
রাও জিয়াংফেং (৪৯) ও
ঝাং জিংচুয়ান (৩৫)। চুংফেং ১১টি এবং জিয়াংফেং ১০টি ৮০০০ মিটারের শৃঙ্গ আরোহণ করে এসেছিলেন নাঙ্গা পর্বতে। টিমটিতে ছিলেন একজন আমেরিকান, তাঁর নাম ছিল হংলু চেন (৫০)। যিনি ছিলেন একই সঙ্গে আমেরিকা ও চিনের নাগরিক ।
[caption id="attachment_137105" align="aligncenter" width="499"]
লিথুয়ানিয়ার আর্নেস্টাস মার্ক্সাইটিস[/caption]
টিমটিতে ছিলেন লিথুয়ানিয়ার বিখ্যাত পর্বতারোহী
আর্নেস্টাস মার্ক্সাইটিস (৪৪)। যিনি ২০১২ সালে পাকিস্তানের
ব্রড পিক (৮০৫১ মিটার) আরোহণ করেন। ছিলেন নেপালের
সোনা শেরপা (৩৫)। যিনি ২০১২ সালে পৃথিবীর দ্বিতীয় উচ্চতম শৃঙ্গ
কে-টু (৮৬১১ মিটার) আরোহণ করেছিলেন। দলে ছিলেন পাকিস্তানের
শের খান (৫০) নামে এক পর্বতারোহী এবং
আলি হুসেইন (২৮) নামে এক গাইড কাম কুক।
[caption id="attachment_137098" align="aligncenter" width="600"]
নেপালের সোনা শেরপা[/caption]
২২ জুন, রাত ১০ টা
দিনভর কন্ডিশনিং ও শেষ মুহূর্তের চূড়ান্ত প্রস্তুতি সেরে, সবাই একটু আগে ভাগেই ডিনার করে নিয়েছিলেন সেদিন। ডিনারের শেষে কফির পেয়ালা নিয়ে টেন্টের বাইরে বসে গল্প করছিলেন পর্বতারোহীরা। সবার অলক্ষে আকাশের চাঁদটাকে ঢেকে দিচ্ছিল মেঘ। হয়তো শুনতে পেয়েছিল এক অভিশপ্ত রাতের আগমনবার্তা। যে রক্তাক্ত রাত আগে দেখেনি নাঙ্গা পর্বত।
টেন্ট থেকে ১০০০ গজ দূরে, হঠাৎ দেখা গিয়েছিল অনেকগুলি টর্চের আলো। অভিযাত্রীরা ভেবেছিলেন নতুন কোনও অভিযাত্রী দল আসছে। ১৬-২০ জনের দলটি একটু কাছে এলে বোঝা গেল এটি পাকিস্তানের একটি সেনা দল। কারণ প্রত্যেকের গায়ে গিলগিট প্যারামিলিটারি অফিসারদের ইউনিফর্ম।
[caption id="attachment_137395" align="aligncenter" width="481"]
নাঙ্গা পর্বতের মায়াবী রাত সেদিন ছিল রক্তাক্ত[/caption]
দলটির নেতা কাছে এসেই চিৎকার করে উঠেছিল, "সবাই স্যারেন্ডার করো। আমরা আল-কায়দা, আমরা তালিবান।" মুহূর্তের মধ্যে ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল অভিযাত্রীদের মুখ। অভিযাত্রীরা বুঝতে পেরেছিলেন এরা সেনা নয়, সেনার পোশাক পরা সন্ত্রাসবাদী।
দলটির নেতা চেঁচিয়ে পাকিস্তানি পর্বতারোহী শের খানকে বলেছিল, "আমরা জানি তোমরা ইংরেজি জানো, ওদের (বিদেশী পর্বতারোহীদের) জিজ্ঞেস করো, কাদের কাছে টাকা আছে।" শের খান সবাইকে সে কথা বলতেই বিদেশী পর্বতারোহীরা বলে ওঠেন, "হ্যাঁ আমাদের কাছে টাকা আছে।" কেউ বলেন তাঁর কাছে ডলার আছে, কেউ বলেন তাঁর কাছে ইউরো আছে। সন্ত্রাসবাদীরা একে একে প্রত্যেক পর্বতারোহীকে তাদের টেন্টে নিয়ে গিয়ে টাকা সংগ্রহ করে।

এর পরেই অভিযাত্রীদের সেলফোন এবং টু-ওয়ে রেডিও ধ্বংস করে ফেলে সন্ত্রাসবাদীরা। কেড়ে নেয় স্যাটেলাইট ফোন, পাসপোর্ট ও ক্যামেরা। কিন্তু সন্ত্রাসবাদীরা ইংরেজি না জানায় পর্বতারোহীরা কে কোন দেশের মানুষ বুঝতে পারেনি। সন্ত্রাসবাদীদের দলনেতা এর পর শের খানের মাধ্যমে জিজ্ঞেস করে, পর্বতারোহীদের মধ্যে আমেরিকার কে আছে।
হংলু চেন (৫০) ছিলেন আমেরিকার। তিনি চুপ করে ছিলেন। জন্মসূত্রে চিনা বলে চেহারা দেখে সন্ত্রাসবাদীরা তাকে আমেরিকান বলে ভাবতে পারেনি। কেউ কোনও সাড়া না দেওয়ায়
সন্ত্রাসবাদীরা একে একে সমস্ত পর্বতারোহীকে পিছমোড়া করে বাঁধতে থাকে।
আতঙ্কে পর্বতারোহীরা চিৎকার করে বলতে থাকেন, "আমরা আমেরিকান নই, আমাদের ছেড়ে দাও, দয়া করো। আমি ইউক্রেনের। আমি লিথুয়ানিয়ার। আমি স্লোভাকিয়ার।" নিজেদের ভাষায় গালাগালি দিতে দিতে ও লাথি মারতে মারতে পর্বতারোহীদের হাত বেঁধে ফেলে হাঁটু গেড়ে বসিয়ে দেওয়া হয়।
আমেরিকার নাগরিক হংলু চেন'কে বাঁধতে যেতেই বাধে বিপত্তি। মার্শাল আর্ট বিশারদ হংলুর পালটা আক্রমণে হকচকিয়ে যায় দলটি। কিন্তু তা কয়েক মুহূর্তের জন্য। এক সন্ত্রাসবাদীর অটোমেটিক রাইফেলের গুলি, নিমেষেই ঝাঁঝরা করে দেয় হংলু চেনের শরীর। ঘাসে লুটিয়ে পড়েন, সে রাতের প্রথম বলি হংলু।
[caption id="attachment_137103" align="aligncenter" width="540"]
আমেরিকার হংলু চেন[/caption]
এর পর ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে ওঠে
সন্ত্রাসবাদীরা। হাঁটুগেড়ে বসে থাকা পর্বতারোহীদের লক্ষ্য করে পিছন থেকে গর্জে ওঠে খান পনেরো একে-৪৭। মুখ থুবড়ে পড়ে যায় আরও দশটি নিষ্প্রাণ শরীর। মিনিট খানেকের মধ্যে কয়েকশো রাউন্ড গুলি চালাবার পর শান্ত হয় বন্দুকগুলো।
এ বার এগিয়ে আসে দলনেতা। দায়ামির বেসক্যাম্পের সবুজ ঘাস আঁকড়ে শুয়ে থাকা প্রাণহীন অভিযাত্রীদের প্রত্যেকের কাছে গিয়ে আরও একবার মাথায় গুলি করতে থাকে সে।
এর পরেই উপত্যকা কাঁপিয়ে স্লোগান ওঠে, "সালাম জিন্দাবাদ। ওসামা বিন লাদেন জিন্দাবাদ। আজকের হত্যা ওসামা বিন লাদেনের হত্যার বদলা।" তার পর তারা নিজেদের মধ্যে হাসি মশকরা করতে করতে অন্ধকারে মিলিয়ে গিয়েছিল।
ঘড়িতে তখন বাজে রাত ১২টা। নক্ষত্রখচিত গিলগিটের আকাশে তখনও মেঘের আড়ালে মুখ লুকিয়েছিল চাঁদ। আর, নির্জন প্রাণহীন প্রান্তরে পড়েছিল ১১টি গুলিবিদ্ধ লাশ। সবুজ ঘাসে মিশে যাচ্ছিল বিভিন্ন দেশের রক্ত।
[caption id="attachment_137403" align="aligncenter" width="450"]
সেই অভিশপ্ত দল, এই দশ জনের একজনও বেঁচে ফেরেননি[/caption]
বেঁচে গিয়েছিলেন দু'জন
সেদিনের সেই হামলায় প্রাণ হারান টিমটির ১১ সদস্য। বরাত জোরে বেঁচে গিয়েছিলেন চিনের এক পর্বতারোহী ঝাং জিংচুয়ান। টেন্টগুলি থেকে কিছুটা দূরে ছিলেন তিনি। বিপদ বুঝে একটি অগভীর খাদে ঝাঁপ মেরেছিলেন। কয়েক ঘন্টা পর সেখান থেকে উঠে এসেছিলেন।
বেঁচে গিয়েছিলেন পাকিস্তানী পর্বতারোহী শের খান।
সন্ত্রাসবাদীরা তাঁর নাম শুনে নিজেদের ধর্মমতের ভেবে তাকে মারেনি। কিন্তু তিনি ছিলেন ইসমাইলি শিয়া সম্প্রদায়ের।
সন্ত্রাসবাদীরা তা জানতে পারলে তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত ছিল। কারণ পাকিস্তানে ইসমাইলি শিয়াদের কাফের বলে মনে করা হয়।
[caption id="attachment_137406" align="aligncenter" width="225"]
বেঁচে গিয়েছিলেন পাকিস্তানি পর্বতারোহী শের খান[/caption]
সেদিনের হামলায় শের খান বেঁচে গেলেও, মারা গিয়েছিলেন দলের পাকিস্তানি গাইড কাম কুক, হাসিখুশি যুবক আলি হুসেইন। তাঁর নাম শুনে
সন্ত্রাসবাদীরা আন্দাজ করে তিনি শিয়া। তাই তাঁকে নির্দ্বিধায় মেরে ফেলে।
[caption id="attachment_137101" align="aligncenter" width="540"]
পাকিস্তানের আলি হুসেইন, ভাগ্য সহায় ছিল না তাঁর[/caption]
এই নির্মম গণহত্যার হত্যার দায় প্রথমে নিয়েছিল তালিবান থেকে বেরিয়ে আসা
জুন্দুল হাফসা নামে একটি সন্ত্রাসবাদী সংগঠন। কিন্তু তার কয়েকদিনের মধ্যেই
তেহরিক-ই- তালিবান-পাকিস্তান (
TTP) হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে। তাদের মুখপাত্র এশানুল্লাহ এহশান বলেছিল, "এই হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে আমরা আন্তর্জাতিক মহলকে তালিবানদের ওপর ড্রোন হামলা বন্ধের বার্তা দিতে চাই।"
এই হত্যাকাণ্ডের ২৪ দিন আগে, ২৯ মে ২০১৩, পাকিস্তানের উত্তর ওয়াজিরিস্তানে আমেরিকা ড্রোন হামলা চালায়। সেই হামলায় নিহত হন, মোস্ট ওয়ান্টেড তালিবান কমান্ডার ওয়ালিউর রহমান। এই গণহত্যা ছিল তার বদলা।
গত দুই শতাব্দীর পর্বতারোহনের ইতিহাসে সেই প্রথম এত জন পর্বতারোহী সন্ত্রাসবাদের বলি হয়েছিলেন। রক্তাক্ত সেই রাত আজও ভুলতে পারেনি, নাঙ্গা পর্বতের অভিশপ্ত দিয়ামির বেসক্যাম্প।