রূপাঞ্জন গোস্বামী
জার্মানির রেইন-ওয়েস্টফালিয়া স্টেটের রাজধানী ডুসেলডর্ফ থেকে কিছু দূরে আছে ভেলবার্ট। সেখানে সাততলার অফিসের বড় জানালা দিয়ে, হ্রদের নীল জলের দিকে তাকিয়ে থাকতেন ইন্সিওরেন্স কোম্পানির সেলসম্যান ম্যানফ্রেড বাজোরাট। অফিসে বসে বসেই স্বপ্নের নীল সমুদ্রে নিজের জাহাজ নিয়ে নেমে পড়তেন। ছোট্ট ইয়ট জাতীয় জলযানে বিশ্বভ্রমণ করার অদম্য ইচ্ছা ম্যনফ্রেডের। তাঁর জীবনের একমাত্র লক্ষ এটাই।
রোজ বাড়ি ফিরে স্ত্রী ক্লডিয়া ও মেয়ে নিনাকে বলতেন তাঁর স্বপ্নের কথা। সাধারণত, এসব ক্ষেত্রে স্ত্রীরা বাধা দেন। কিন্তু ক্লডিয়া উৎসাহ দিয়ে যেতেন। ইন্সিওরেন্স ব্যবসায় মোটা মুনাফা ম্যানফ্রেডকে সাততলার অফিসে বন্দী করেছিল। তবুও অতলজলের আহ্বানে, ম্যানফ্রেডের মন পালাতে চাইত অফিসের জানলার কাঁচ ভেঙে।
“সাগরে একদিন ভাসবই“
সমুদ্রে ভাসার শখ সেই ছোটবেলা থেকেই। বাবা মা’র সঙ্গে ছুটিতে বেলজিয়াম বেড়াতে গিয়ে মোটরবোটের স্টিয়ারিং ধরায় হাতেখড়ি। তারপর বড় হয়ে রীতিমতো ছোট ও বড় ইয়ট চালানোর প্রশিক্ষণ নিয়ে ফেলেছিলেন। কিন্তু ইন্সিওরেন্স ব্যবসা ফুলে ফেঁপে ওঠায় জাহাজের ক্যাপ্টেন হয়ে সমুদ্রে আর ভাসা হয়নি।
ম্যানফ্রেডের সঙ্গে ১৯৮০ সালে বন্ধুত্ব হয়েছিল ব্যবসায়ী রেনর কার্সনারের। প্রত্যেক উইকএন্ডে, ম্যানফ্রেডের বাড়ির ব্যাকইয়ার্ডে বারবিকিউ পিকনিক হত। সেখানে বিয়ারের গ্লাস ঠুকে শপথ করতেন ম্যানফ্রেড, “সাগরে একদিন ভাসবই“। এরকমই এক রঙিন সন্ধ্যায় ম্যানফ্রেড বন্ধু রেনরকে বলেছিলেন তাঁর স্বপ্ন পূরণ হতে যাচ্ছে। সালটা ছিল, ২০০৪।
[caption id="attachment_204242" align="aligncenter" width="768"]

ছবির ডানদিক থেকে প্রথম, ম্যানফেড বাজোরাট। দ্বিতীয়, মেয়ে নিনা। তৃতীয়, স্ত্রী ক্লদিয়া।[/caption]
এসেছিল নতুন প্রেমিকা ‘সায়ো’, ছেড়ে গিয়েছিলেন স্ত্রী ক্লদিয়া
চালু ব্যবসা বেচে দিয়েছিলেন ম্যানফ্রেড। কিনে ফেলেছিলেন ৪০ ফুট লম্বা অত্যাধুনিক ও বিলাসবহুল একটি ইয়ট। জাপানি শব্দ‘সায়োনারা’কে (
goodbye) ছোট করে ইয়টের নাম রেখেছিলেন 'সায়ো'। মেয়ে নিনাকে নামী স্কুলের হস্টেলে রেখে বেরিয়ে পড়েছিলেন স্ত্রীর সঙ্গে সাগর অভিযানে। ছোট ছোট অভিযান দিয়ে শুরু হয়েছিল বড় স্বপ্নকে অবয়ব দেবার চেষ্টা।
এভাবেই সুখের সাগরে ভেসে কেটে যাচ্ছিল বছরের পর বছর। হঠাৎ একদিন ঝড় উঠেছিল সংসারে, তিরিশ বছরের বিবাহিত জীবন কাটানোর পর স্বামী ম্যানফ্রেডের কাছে বিবাহবিচ্ছেদ চেয়েছিলেন স্ত্রী ক্লদিয়া। ম্যানফ্রেডের পায়ের তলায় মাটি সরে গিয়েছিল সে দিন। কোনও অনুরোধ শোনেননি ক্লডিয়া, ম্যানফ্রেডকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন ক্যারিবিয় দ্বীপপুঞ্জের মার্টিনিকে, নতুন প্রেমিকের কাছে। মেয়ে তখন কলেজে পড়ে।
[caption id="attachment_204244" align="aligncenter" width="590"]

ম্যানফ্রেড বাজোরাটের শেষ সমুদ্র অভিযানের রুট।[/caption]
শেষবারের মতো জলে ভেসেছিলেন ম্যানফ্রেড
মেয়ে নিনাকে নিজের সব সম্পত্তি বুঝিয়ে দিয়ে ‘সায়ো‘কে নিয়ে জলে ভেসেছিলেন ম্যানফ্রড। এতদিন পর্যন্ত সব অভিযানে, ক্যাপ্টেনের পাশের চেয়ারে বসতেন ক্লদিয়া। জলে ভাসার দিন সেই চেয়ারে ম্যানফ্রেড রেখেছিলেন ক্লদিয়ার একটা ছবি। তারপর দুরন্ত গতিতে উত্তর সমুদ্রে ঢেউ তুলে অ্যাটলান্টিক মহাসাগরের দিকে ছুটে গিয়েছিল ক্যাপ্টেন ম্যানফ্রডের জলযান ‘সায়ো’। এর পর দু’বছর ম্যানফ্রেডের কোনও খোঁজ মেলেনি।
২০১০ সালে ক্যারিবিয় দ্বীপপুঞ্জের মার্টিনিকে প্রেমিকের বাড়িতেই ক্যানসারে ভুগে মারা গিয়েছিলেন ম্যানফ্রেডের প্রাক্তন স্ত্রী ক্লদিয়া। স্যাটেলাইট ফোনের মাধ্যমে মেয়ে নিনার কাছ থেকে খবরটি পেয়েছিলেন ম্যানফ্রেড। চুপ করে ছিলেন কিছুক্ষণ। তারপর, “ভালো থাকিস” বলে ফোনটা কেটে দিয়েছিলেন। নিনা বাবার সঙ্গে এরপর আর যোগাযোগ করতে পারেননি। হবু স্বামীকে নিয়ে নিনা চলে গিয়েছিলেন মায়ের শেষকৃত্যে।
[caption id="attachment_204245" align="aligncenter" width="1000"]

খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল উদ্দেশ্যহীন ভাবে ভেসে চলা সায়ো'কে।[/caption]
কেটে গিয়েছিল ছ'বছর, সবাই ভুলে গিয়েছিল ম্যানফ্রেডকে
২০১৬ সাল। ফিলিপিন্সের
সুরিগাও ডেল সার থেকে ৫০ মাইল দূরে, উদ্দেশ্যহীন ভাবে একটি ইয়টকে প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে ভাসতে দেখা যায়। ইয়টটিকে দেখতে পেয়েছিলেন দু’জন ফিলিপিনো মৎস্যজীবী। তাঁদের মাছ ধরার নৌকাটিকে ইয়টের কাছে নিয়ে গিয়ে, অনেক ডাকাডাকি করেও কারও সাড়া পাননি তাঁরা। অগত্যা জলযানটির গায়ে নৌকা ঠেকিয়ে, দুই মৎস্যজীবী উঠে পড়েছিলেন ইয়টটির ডেকে।
ঢেউয়ের তালে তালে নাচছিল আধডোবা ‘সায়ো‘। ইয়টটির পিছনের অংশ জলে ডুবে গিয়েছিল। কী করে ভেসে আছে ইয়টটি, বুঝে উঠতে পারছিলেন না দুই মৎস্যজীবী। ইয়টের পিছন দিকটা যেভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে, তাতে বড় ঢেউয়ের ধাক্কায় ইয়টটি ডুবে যাওয়ার কথা। কিন্তু ইয়টটি ডুবে গেলে হয়ত পৃথিবী জানতেই পারত না এক মর্মান্তিক ঘটনা।
ক্যাপ্টেনের টেবিলে সেদিনও বসেছিলেন ম্যানফ্রেড
মৎস্যজীবীরা ভাঙা মাস্তুলের পাশ দিয়ে নীচে নেমেছিলেন। চিৎকার করে বলেছিলেন, “কেউ আছো?“। সাড়া মেলে না। সিঁড়ি ধরে দুজনে নীচে নামেন। সামনে ক্যাপ্টেনের কেবিন। কেবিনটি অন্ধকার। কেবিনের ভেতর টর্চের আলো ফেলতেই, আঁতকে উঠেছিল দুজন। ক্যাপ্টেনের কেবিনের মাঝখানে রাখাছিল একটি টেবিল। টেবিলের ওপর ছিল রেডিও সেট। রেডিও সেটের সামনে খালি গায়ে মাথা হেলিয়ে বসে আছেন একাকী ক্যাপ্টেন। সামনে খাতা আর পেন। একটা হাত বাড়ানো ছিল রেডিও সেটের দিকে।
ক্যাপ্টেন ম্যানফ্রেডের ছাই রঙা মৃতদেহে পচন ধরেনি। ঘরে এতটুকু দুর্গন্ধ নেই। দুর্গন্ধ হওয়ার কথাও নয়। কারণ মমি হয়ে গিয়েছিলেন উনষাট বছরের ম্যানফ্রেড বাজোরাট। মৃত্যুর আগে আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন স্যাটেলাইট রেডিওর মাধ্যমে তীরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে। পারেননি, তার আগেই ঢলে পড়েছিলেন মৃত্যুর কোলে।
[caption id="attachment_204247" align="aligncenter" width="700"]

ইয়টের কেবিনে ক্যাপ্টেন ম্যানফেডের মমি।[/caption]
এসেছিল পুলিশ
ক্যাপ্টেন ম্যানফ্রেডের মৃতদেহ স্পর্শ করলেই, ধুলোর মতো গুঁড়ো ঝরে পড়ছিল। মৃতদেহটির পোস্টমর্টেম হয়েছিল বুতুয়ান সিটিতে। ক্যাপ্টেন ম্যানফ্রেড বাজোরাটের মৃত্যুর কারণ হিসেবে বলা হয়েছিল মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন।পোস্টমর্টেম রিপোর্টে বলা হয়েছিল ক্যাপ্টেন ম্যানফ্রেডের মৃত্যু হয়েছিল কমপক্ষে সাত বছর আগে। বিখ্যাত ফরেনসিক ক্রিমিনোলজিস্ট ডঃ মার্ক বেনেসকে বলেছিলেন, “যেভাবে ক্যাপ্টেন ম্যানফ্রেড বসে ছিলেন, তা থেকে বোঝা যাচ্ছে মৃত্যু এসেছিল অকস্মাৎ।
পুলিশি তদন্তে জানা গিয়েছিল, ম্যানফ্রেড বাজোরাটকে জীবিত অবস্থায় শেষ দেখতে পাওয়া গিয়েছিল ২০০৯ সালে। স্পেনের মাল্লোর্কা বন্দরে দেয়াখা গিয়েছিল তাঁকে। এর অর্থ,পরে জানা গিয়েছিল মৃত ক্যাপ্টেনকে নিয়ে তাঁকে সমুদ্রে ভেসেছে সায়ো, পুরো সাত বছর।
[caption id="attachment_204248" align="alignnone" width="768"]

হতবাক হয়েছিলেন পুলিশরাও।[/caption]
কীভাবে ম্যানফ্রেড মমি হয়ে গিয়েছিলেন!
জুরিখের, ইনস্টিউট অফ ইভোলিউশনারি মেডিসিনের ডিরেক্টর, প্রফেসর ফ্রাঙ্ক রূহলি বলেছিলেন, “মৃতদেহ অনেকসময়ই প্রাকৃতিকভাবে মমি হয়ে যেতে পারে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মমি হওয়া মৃতদেহের টিস্যু,জলশুণ্য হয়ে পড়ে। ফলে টিস্যুতে থাকা কোষগুলি সংকুচিত হয়, শুকিয়ে যায়। এছাড়াও সমুদ্রের নোনা ও নির্দিষ্ট গতির বাতাস মৃতদেহকে মমি হতে সাহায্য করে। একবার মমি হওয়া ধাপগুলি নিখুঁতভাবে হয়ে গেলে এবং আবহাওয়ার পরিবর্তন না হলে, মৃতদেহে আর পচন ধরতে পারে না। অনির্দিষ্ট কালের জন্য মৃতদেহটি মমি হয়ে থাকতে পারে”।
শেষ চিঠি
পুলিশ ক্যাপ্টেন ম্যানফ্রেড বাজোরাটের মমির পাশ থেকে উদ্ধার করেছিল একটি চিঠি। চিঠিটি ক্যাপ্টেন লিখেছিলেন, তাঁকে ছেড়ে চলে যাওয়া স্ত্রী ক্লদিয়াকে। চিঠি লেখার সময়, ম্যানফ্রেড মনের কোনে ক্লদিয়ার প্রতি কোনও অভিমান ছিল না। কারণ তিনি জানতেন, তাঁর স্ত্রী ক্লদিয়া ভোরের শুকতারা হয়ে গিয়েছেন। স্ত্রীয়ের সঙ্গে ২০০৮ সালে বিচ্ছেদ ঘটে গেলেও, মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তে, তাঁর প্রাণ কাঁদছিল ক্লদিয়ার জন্য। তাই লিখেছিলেন চিঠি, সে চিঠি ক্লদিয়ার কাছে কোনওদিন পৌঁছাবে না জেনেও।
[caption id="attachment_204249" align="aligncenter" width="306"]

ক্লদিয়া[/caption]
প্রিয়তমা,
তিরিশ বছর ধরে আমরা একসাথে জীবনের পথে হেঁটেছিলাম। বিধাতার বিচিত্র খেয়ালে অশুভ শক্তির কাছে পরাজিত হয়েছিল আমাদের জীবনের রঙিন স্বপ্নগুলি। আমি জানি তুমি চলে গেছ। তোমার আত্মা শান্তি খুঁজে পাক। আমিও আসছি ক্লদিয়া, শুধু সময়ের অপেক্ষা, হয়ত এই মাসেই। -
তোমার ম্যানফ্রেড
জীবনসাগরে প্রেম হারিয়ে, ব্যথার মহাসাগরে ভাসতে ভাসতে ক্যাপ্টেন ম্যানফ্রেড এভাবেই খুঁজে নিয়েছিলেন এক নাবিকের সেরা মৃত্যু।