রূপাঞ্জন গোস্বামী
১৯৪৬ সালে হলিউডে অভিনয় শুরু করেন নর্মা জীন বেকার নামে সোনালি চুলের এক লাস্যময়ী যুবতী। কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর নাম পালটে হয় মেরিলিন মনরো। বিশ্বের চলচ্চিত্র ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দরী ও আকর্ষণীয়া নায়িকা ছিলেন মেরিলিন। সম্ভবত পৃথিবীর সবচেয়ে গ্ল্যামারাস নারীও।
মাত্র ৩৬ বছর বয়েসে সেই
মেরিলিন মনরো-এর আকস্মিক মৃত্যুর খবর পৃথিবীকে স্তম্ভিত করে দিয়েছিল। পুলিশ প্রথমে বলেছিল এটা একটা অ্যাক্সিডেন্ট। কিন্তু মৃতদেহ পরীক্ষকরা
(coroner) বলেছিলেন এটা আত্মহত্যা।
১৯৬২ সালের ৫ আগস্ট
অভিনেত্রীর লস অ্যাঞ্জেলসের বাড়িতে শুয়েছিলেন মেরিলিন মনরোর মহিলা হাউসকিপার
ইউনিস মুরে। রাত তিনটের সময় হাউসকিপার মুরে উঠে দেখলেন মেরিলিনের ঘরে আলো জ্বলছে। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। মেরিলিনের নাম ধরে ডাকলেন মুরে। দরজায় করাঘাত করলেন। কিন্তু কোনও সাড়া পেলেন না। মুরে ফোন করলেন মনরোর সাইক্রিয়াটিস্ট
র্যালফ গ্রিনসনকে।
তিনি ছুটে এলেন মনরোর বাড়িতে। ঘরের জানলা ভাঙলেন। ভেতরে ঢুকলেন দেখলেন হলিউডের সর্বাকালের সেরা তারকা নগ্ন অবস্থায় চাদরের তলায় শুয়ে আছেন। হাতে ধরা ছিল টেলিফোন।
র্যালফ গ্রিনসন শান্ত গলায় মুরেকে বললেন, "
মনে হচ্ছে মেরিলিন আর নেই"। পাশের টেবিল ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল ওষুধের বোতল।
[caption id="attachment_95189" align="aligncenter" width="800"]
বিছানায় নিথর মেরিলিন[/caption]
গ্রিনসন ফোন করলেন অভিনেত্রীর চিকিৎসক
ডঃ হেম্যান এঙ্গেলবার্গকে। তিনি এসে মেরিলিনকে মৃত বলে ঘোষণা করলেন এবং পুলিশকে ডাকলেন। ভোর সাড়ে চারটের সময় পুলিশ এল। ইতিমধ্যে বাড়ির বাইরে ভিড় জমিয়েছেন শয়ে শয়ে সাংবাদিক আর মেরিলিনের ফ্যান।
আত্মহত্যা!
মৃত্যুর পর মেরিলিন মনরোর দেহ আনা হয় লস অ্যাঞ্জেলস কাউন্টির করোনারের অফিসে। ওই দিনই মৃতদেহের পোস্টমর্টেম হয়। রাতে আসে
toxicology report। জানা যায় অভিনেত্রীর রক্তে অস্বাভাবিক পরিমাণে ঘুমের ওষুধ
chloral hydrate পাওয়া গেছে। যকৃতে পাওয়া গেছে
barbiturate Nembutal।
[caption id="attachment_95190" align="aligncenter" width="702"]
মর্গের টেবিলে বিশ্বের চলচ্চিত্র ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দরী নায়িকা[/caption]
মৃতদেহ পরীক্ষা করে করোনাররা বললেন, এটা সম্ভবত আত্মহত্যার ঘটনা। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ রিপোর্ট বলেছিল মেরিলিনের মৃত্যু হয়েছে দুর্ঘটনায়। পোস্টমর্টেমের পর পুলিশ বলল, এটা সম্ভবত আত্মহত্যাই।
কেন আত্মহত্যা করলেন মেরিলিন!
যাঁর ছবি আজকের মূল্যে দুই বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা করেছিল। সেই মেরিলিন মনরোর গ্ল্যামারের আড়ালে দুর্ভাগ্যজনক ভাবে লুকিয়েছিল একটি ভাঙা মন। ১৯২৬ সালে ক্যালিফোর্নিয়ায় পিতৃপরিচয়হীন অবস্থায় মানসিক ভারসাম্যহীন মায়ের গর্ভে জন্ম নেন। কাটিয়েছেন আদরহীন ছেলেবেলা। বিখ্যাত হওয়ার পরও তাঁর দেহকে ইচ্ছেমত ব্যবহার করেছিল আমেরিকার রুপোলি জগত থেকে রাজনৈতিক জগত। হাজার হাজার কিলোওয়াটের আলোর সামনে থেকেও একাকীত্ব কুরে কুরে খেত তাঁকে।
[caption id="attachment_95191" align="aligncenter" width="748"]
একাকীত্ব কুরে কুরে খেত মেরিলিনকে[/caption]
জেমস ডগার্থি,
জো ডিমাজ্জিও এবং
আর্থার মিলার-----তিনটি বিয়ে করেছিলেন মেরিলিন। টেকেনি একটাও। সন্তানসম্ভবা হলেও শারীরিক জটিলতার কারণে তিনি মা হতে পারেননি। একাকীত্ব আর হতাশায় চেতনানাশক পিল নিতে শুরু করেন। একই সঙ্গে বেড়ে যায় মদ্যপানের পরিমাণ।
ক্যারিয়ারের মধ্য গগনে পিল আর মদের নেশা তাঁর স্মৃতিশক্তিতে আঘাত করল। সংলাপ মনে রাখতে পারতেন না। পরিচালকদের কাছেও দ্রুত অপ্রিয় হতে শুরু করলেন মেরিলিন মনরো।
[caption id="attachment_95300" align="aligncenter" width="562"]
বাসস্টপ ছবিতে মেরিলিন মনরো[/caption]
মেরিলিন মনরোর ঘনিষ্ঠ বন্ধু
জেমস বেকন একদিন তাঁকে দেখেছিলেন চূড়ান্ত মাদকাচ্ছন্ন অবস্থায়।
“মেরিলিন শ্যাম্পেন আর নিট ভদকা পান করছিলেন। একই সঙ্গে পিলও। আমি বলেছিলাম পিল আর অ্যালকোহলের কম্বিনেশন তোমাকে শেষ করে দেবে।"
জড়ানো গলায় বলেছিলেন মেরিলিন,
"এটা আমাকে এখনও মারে নি"। বলেই আবার একটা ড্রিঙ্ক নিয়েছিলেন সঙ্গে আরেকটা পিল।
[caption id="attachment_95193" align="aligncenter" width="702"]
তিন স্বামীর সঙ্গে মেরিলিন। ওপরে জেমস ডগার্থি, মাঝে জো ডিমাজ্জিও, নীচে আর্থার মিলার[/caption]
মেরিলিনের আকাশছোঁয়া একাকীত্ব আর হতাশা দেখে তাঁর মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলেই মনে করেছিলেন সবাই।
তবে আজও কেন উঠে আসে খুনের তত্ব
● এমন অনেকেই আছেন যাঁরা বিশ্বাস করেন মেরিলিনকে হত্যা করা হয়েছে। এবং সরকারি পোস্টমর্টেম রিপোর্টটি অসত্য।প্রথমে মনে করা হয়েছিল তিনি প্রচুর পিল খেয়ে মারা গেছেন। কিন্তু তাঁর পাকস্থলীতে একটিও পিল পাওয়া যায়নি।
● মেরিলিনের নিম্নাঙ্গে কিছু রহস্যময় ক্ষতচিহ্ন পাওয়া যায়। যার সম্পর্কে পোস্টমর্টেম রিপোর্ট নীরব।
● জুনিয়র মেডিকেল এক্সামিনার, যিনি মেরিলিনের পোস্টমর্টেম করেছিলেন, সেই
টমাস নোগুচি নিজেরই মেরিলিন মৃত্যুর কারণ নিয়ে সন্দেহ ছিল। তাই তিনি মৃত্যুর তদন্ত আবার শুরু করার আহ্বান জানান।
● ডেপুটি করোনার, যিনি মেরিলিন মনরোর ডেথ সার্টিফিকেটে সই করেছিলেন, তিনি পরবর্তীকালে বলেন, তাঁকে সই করতে বাধ্য করা হয়েছিল।
●মেরিলিনের ঘরে কোনও সুইসাইড নোট পাওয়া যায়নি।
ক্রমে মানুষের মনে সন্দেহ দানা বাঁধতে লাগল। দূর্ঘটনা নয়, আত্মহত্যা নয়, খুনই হয়েছেন
মেরিলিন মনরো।
[caption id="attachment_95195" align="aligncenter" width="768"]
মেরিলিনের অ্যাপার্ট্মেন্ট থেকে মেরিলিনের মর্মান্তিক প্রস্থান[/caption]
সন্দেহের তির গেল হোয়াইট হাউসের দিকে
জীবনের শেষ লগ্নে
মেরিলিন মনরো নাকি একই সাথে প্রেম করছিলেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জন এফ. কেনেডি ও তাঁর ভাই রবার্ট কেনেডির সাথে। দু'জনের সঙ্গেই নাকি মেরিলিন মনরোর দৈহিক সম্পর্ক ছিল। মনরো এই কথাটি তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও মনস্তত্ববিদদের জানিয়ে ছিলেন।
মনরোর হাউসকিপারের জানিয়েছিলেন , মৃত্যুর ঘন্টা খানেক আগেও দুজনের সাথে মেরিলিনের কথা কাটাকাটি হয়েছিল। মনরো জীবনের শেষ ফোন করেছিলেন জন এফ. কেনেডিকেই। তাঁদের সম্পর্ক জনসমক্ষে আনার হুমকি দিয়েছিলেন মনরো। খুনের তত্ত্বে যাঁদের বিশ্বাস, তাঁরা বলেছিলেন, কেনেডি ভাইরা সরিয়ে দিয়েছিলেন মেরিলিন মনরোকে।
এবং খুন করা হয়েছিল
barbiturate Nembutal ইনজেকশন দিয়ে।
[caption id="attachment_95197" align="aligncenter" width="619"]
মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন কেনেডির সঙ্গে মেরিলিন মনরো[/caption]
নতুন করে তদন্ত
কয়েক দশক ধরে মেরিলিনের মৃত্যু নিয়ে ঝোড়ো হাওয়া বয়ে চলে।
১৯৮২ সালে লস অ্যাঞ্জেলসের
কাউন্টি অ্যাটর্নি অফিস মেরিলিনের মৃত্যু নিয়ে নতুন করে তদন্তের আদেশ দেয়। এবং তদন্ত শেষে জানায়, খুন হননি মেরিলিন মনরো। কিন্তু সেই তদন্ত রিপোর্টে লেখাছিল একটি ভয়ংকর শব্দ।
“factual discrepancies and unanswered questions.”
এই লাইনটা কিন্তু বলতে চাইছে,মেরিলিনের মৃত্যু আত্মহত্যায় নাও হতে পারে। তাই কি
গডফাদার ছবির অভিনেতা
জিয়ান্নি রুশো (
৭৫) এখনও অনড় তাঁর দাবিতে,
"খুন হয়েছিলেন মেরিলিন মনরো"!