
শেষ আপডেট: 30 July 2019 14:44
সিয়ালকোট,পাকিস্তান[/caption]
শর্তটি হল, একাধিক পুত্র সন্তান জন্ম নিলে, পীরবাবাকে প্রথম সন্তানটি উপহার দিতে হবে। রাজি হয়েছিলেন গিগা । পীরবাবা কিছু প্রসাদী শুকনো ফল দিয়েছিলেন ব্যক্তিটিকে। ফলগুলি স্বামী ও স্ত্রীকে খেতে বলেছিলেন।
অতীতের সিয়ালকোট শহর[/caption]
অপমানিত, অভিমানী পীরসাহেব নিজেকে স্বেচ্ছায় বন্দি করে ফেলেছিলেন দরগার গম্বুজওয়ালা ঘরটিতে। ভেতর থেকে বন্ধ করে দিয়েছিলেন ঘরের দরজা। শিষ্যদের বলেছিলেন তাঁকে যেন কেউ কোনও ভাবেই বিরক্ত না করে। তিনি তপস্যায় বসবেন।
ঘর থেকে বেরিয়ে আসবেন চল্লিশ দিন পর। সেদিন, বেইমান শহরবাসীর ওপর নেমে আসবে তাঁর অভিশাপ। প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়ে কেউ বাঁচবেন না। কেবল বেঁচে থাকবেন তিনি ও তাঁর গোটা কয়েক শিষ্য ছাড়া।
আগুনের মত খবরটি ছড়িয়ে গিয়েছিল সারা শহরে। শহরবাসীরা নিশ্চিত ছিলেন, পীর তাঁর দৈব ক্ষমতায় সিয়ালকোট শহর ধ্বংস করে দেবেন। হিন্দুরা বিভিন্ন দেবতার কাছে, মুসলিমরা বিভিন্ন মসজিদ, দরগা ও মাজারে মানত করতে শুরু করে দিয়েছিলেন শহর ও নিজেদের জীবন বাঁচাতে। ক্ষমা চাইতে বার বার পীরের দরজায় গিয়েছিলেন শহরবাসীরা। পীর ছিলেন অনড় ও নিশ্চুপ।
শহরে ইতিমধ্যে খবর ছড়িয়ে গিয়েছিল, শহরের বাইরে সাদা পোশাক পরা দেবদূত এসেছেন। তিনি চেষ্টা করেছেন পীরের সঙ্গে কথা বলার। কিন্তু পীর ফিরিয়ে দিয়েছেন। আতঙ্কিত শহরবাসী দৌড়ে এসেছিলেন গুরু নানকের কাছে। গুরুনানক শিষ্য মর্দানাকে আবার পাঠিয়েছিলেন পীরের দরজায়। শহরের মানুষেদের পক্ষ থেকে।
গুরুনানক বলে দিয়েছিলেন, যদি আবার মর্দানা ব্যর্থ হন, তিনি যেন পীরের মুরিদদের বলে আসেন, পীরের তপস্যা মাঝপথে ভঙ্গ হবেই। তাই ভক্তদের মুখের দিকে তাকিয়ে পীর যেন ঘরের বাইরে বেরিয়ে আসেন। সেবারও পীর ও তাঁর মুরিদরা ছিলেন অনড়।
মর্দানা ফিরে এসে গুরুকে জানিয়েছিলেন মুরিদদের বক্তব্য। গুরুনানক স্মিত হেসেছিলেন। সুমিষ্ট কন্ঠে ভজন গাইতে শুরু করেছিলেন শিষ্য মর্দানা। কুল গাছের নিচে উপবিষ্ট গুরু নানক অর্ধনিমীলিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন পীরের দরগার গম্বুজটির দিকে। হতাশ শহরবাসী বসে পড়েছিলেন কুলগাছটিকে ঘিরে।
[caption id="attachment_128060" align="aligncenter" width="700"]
গুরু নানকের ডান দিকে শিষ্য মর্দানা[/caption]
আজও গম্বুজটির মাথায় আছে সেই ফাটল[/caption]
গুরু নানক হেসে বলেছিলেন, "পীরের কাজ ক্ষমা করা, ধংস করা নয়। ঈশ্বর বা আল্লা, ভালোবাসারই অপর নাম। আমরা তাঁর দাস। খোদার ক্ষমার পথই আমাদের পথ হওয়া উচিত। পৃথিবীতে এমনিতেই অবিশ্বাস, দ্বন্দ্ব ও ঘৃণায় পরিপূর্ণ। আমরা ঈশ্বরের সেবকরা তাই ভালোবাসার বীজ বপন করব। আপনি যদি সন্তানের পিতা হতেন। কাউকে আপনার সন্তান মন থেকে চিরতরে দিয়ে দিতে পারতেন! আমার মনে হয় না পুরো শহর মিথ্যুক।
এই বলে গুরু নানক, শিষ্য মর্দানাকে শহরের দোকানে এক পয়সার সত্য আর এক পয়সার মিথ্যা কিনতে পাঠিয়েছিলেন । দোকানদাররা হেসে কুটোপাটি। সবাই ফিরিয়ে দিয়েছিলেন, একজন দোকানি ছাড়া। তিনি মৌলা কারার। তিনি একটি কাগজে মৃত্যুই সত্য জীবন মিথ্যা লিখে গুরুকে দেখাতে বলেছিলেন।
[caption id="attachment_128070" align="aligncenter" width="800"]
গুরু নানক ও পীর হামজা গাউস[/caption]
মর্দানা গুরু নানককে চিরকূটটি দিয়েছিলেন। তিনি স্মিত হেসে সেটি পীরবাবাকে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, "দেখুন আপনার কথা ঠিক নয়, আধ্যাত্মিক ভাবে জীবিত অন্তত একজন মানুষ এই শহরে আছেন। এবং সত্য কী আর মিথ্যা কী সবার জানা সম্ভব নয়। তাই সারা শহরের ওপর আপনার এই ভয়ঙ্কর ক্রোধ অযৌক্তিক।" পীরসাহেব তাঁর ভুল বুঝেছিলেন। গুরু নানককে অভিবাদন জানিয়েছিলেন।
[caption id="attachment_128064" align="aligncenter" width="702"]
আজও আছে গুরু নানকের স্মৃতি মাখা সেই কুল গাছ[/caption]
গুরুদ্বার বাবে-দি -বের সাহিব[/caption]
গুরু নানকের স্মৃতি মাখা কুল গাছটি আজও জীবিত আছে। আছে পীর হামজা গাউস সাহেবের সেই ফাটল ধরা গম্বুজটিও। দেশভাগের পর শিখ ধর্মের পবিত্র এই তীর্থস্থানটি ভারতীয় তীর্থযাত্রীদের জন্য বন্ধ করে দিয়েছিল পাকিস্তান।
কিন্তু সম্প্রতি তারা ভারতীয় তীর্থযাত্রীদের জন্য খুলে দিয়েছে ৫০০ বছর পুরোনো এই ঐতিহাসিক গুরুদ্বারটি। গুরু নানকের ৫৫০তম জন্ম জয়ন্তীকে স্মরণীয় করে রাখতে। নাকি, পীর সাহেবের মতই জেদ ধরে রাখতে না পেরে।