
শেষ আপডেট: 22 October 2021 16:36
মনোবিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন: 'যাঁরা বিষণ্নতায় ভোগেন, তাঁদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি থাকে। কারণ জীবন নিয়ে তাঁদের ভিতরে প্রচণ্ড নেতিবাচক ধারণা কাজ করে। শৈশব থেকে যাঁদের নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকে না তাঁদের মধ্যেও আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি দেখা যায়।’
রবীন্দ্রনাথ যতই বলুন 'মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে/ মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই/'
তবুও প্রতিদিন প্রতিবছর বেশ কিছু মানুষ আত্মহননের পথ বেছে নেবেই। ঝাটিঙ্গার রহস্যময় পাখিদের আগুনে ঝাঁপ দিয়ে মৃত্যু-প্রবণতার গূঢ় কারণ বলতে পারব না, তবে মানুষ ছাড়া সম্ভবত আর কোনও প্রাণী আত্মহত্যা করে না। দুরন্ত শিশুর হাতে বন্দি ফড়িঙের ঘন শিহরণ মরণের সঙ্গে লড়াই করে। গলিত স্থবির ব্যাঙ আরও দুই মুহূর্তের ভিক্ষা চায় অনুমেয় উষ্ণ অনুরাগে। মশা তার অন্ধকার সঙ্ঘারামে জেগে থাকে জীবনের স্রোত ভালোবেসে। শুধু কিছু কিছু আশ্চর্য মানুষ জীবনের বিপরীত স্রোতে হাঁটতে চায়। মধ্যরাতে ঘুম ভেঙে যায় তাদের। হাতে তুলে নেয় আত্মহননের দড়ি কিংবা বিষ অথবা আগুন, ঘুমের ওষুধ, ব্লেড, বন্দুক। কেউ কেউ শুনতে পায় অতল জলের আহ্বান। কেউ বা নিশির ডাকে সাড়া দিয়ে চুপি চুপি উঠে যায় উঁচু ছাদের কার্নিশে। কেউ অতর্কিতে ঝাঁপ দেয় চলন্ত ট্রেনের নীচে। হেমন্তের মধ্যরাতে অশ্বত্থের ডালে গলায় দড়ি দিয়ে মরে যাওয়া এরকমই এক মানুষের কাছে কবি জীবনানন্দ দাশের অমোঘ জিজ্ঞাসা ছিল:
'জীবনের এই স্বাদ– সুপক্ব যবের ঘ্রাণ হেমন্তের বিকেলের–
তোমার অসহ্য বোধ হ’লো;
মর্গে কি হৃদয় জুড়োলো
মর্গে— গুমোটে
থ্যাঁতা ইঁদুরের মতো রক্তমাখা ঠোঁটে।'
কবি শিল্পী সাহিত্যিকদের কাছে আমরা সব সময়েই চাই জীবনের প্রতি আশাবাদিতার কথা শুনতে। 'পথের পাঁচালি' উপন্যাসে দেখি নিশ্চিন্দিপুর গ্রামে দুর্গার মৃত্যুর পর বিভূতিভূষণ দুর্গোৎসবের বর্ণনা দিয়েছেন। 'রূপসী বাংলা'র কবি জীবনানন্দও লিখেছেন:
'মৃত্যুরে কে মনে রাখে?… কীর্তিনাশা খুঁড়ে খুঁড়ে চলে বারো মাস
নতুন ডাঙার দিকে – পিছনের অবিরল মৃত চর বিনা
দিন তার কেটে যায় – শুকতারা নিভে গেলে কাঁদে কি আকাশ?'
কিন্তু সমগ্র বিশ্বের কবি, শিল্পী, সাহিত্যিকদের জীবনের দিকে দৃষ্টিপাত করলে আমরা দেখি বহু বিশিষ্ট ও বিখ্যাত কবি ও সাহিত্যিক জীবনের প্রতি বিমুখ হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন, অথবা আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন। বিচিত্র তাঁদের আত্মহননের প্রক্রিয়া ও পদ্ধতি, যা আমাদের বিস্মিত, বিমূঢ়, বিভ্রান্ত ও হতবাক করে। জীবনের দুর্বহ ভার বহন করতে না পেরে তাঁরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন এই অনিন্দ্যসুন্দর জীবনপ্রবাহ থেকে!
[caption id="attachment_2383658" align="aligncenter" width="600"]
দুর্গার মৃত্যুদৃশ্য, ছবি- পথের পাঁচালী[/caption]
প্রখ্যাত রোমান দার্শনিক (স্টোয়িক) ও নাট্যকার সেনেকা সম্রাট নিরোর রোষের আগুনে পড়ে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছিলেন। নিরো ছিলেন সেনেকার ছাত্র। ৬৫ খ্রিস্টাব্দে নিরোকে হত্যার জন্য যে ষড়যন্ত্র হয়েছিল, সেই ষড়যন্ত্রকারীদের মধ্যে ছিলেন সেনেকার এক ভ্রাতুষ্পুত্র। ফলে অভিযুক্তদের তালিকায় সেনেকার নামটিও সন্দেহবশত যুক্ত হয়ে যায়। গুরুকে মেরে ফেলার জন্য জল্লাদ নিয়োগ না করে নিরো সেনেকাকে আত্মহত্যা করতে নির্দেশ দেন। সেনেকা প্রথমে নিজের পায়ের শিরা কেটে ফেলেন। তাতে যথেষ্ট রক্তপাত না হওয়ায় তিনি হেমলক বিষ পান করেন। অবশেষে তিনি সৈনিকদের বলেন, তাঁকে গরম জলের চৌবাচ্চায় নিক্ষেপ করতে। এভাবেই বহু উৎকৃষ্ট ট্রাজেডির রচয়িতা সেনেকার ভয়ংকর ট্রাজিক মৃত্যু ঘটে। 'দ্য ম্যাডনেস অব হারকিউলিস', 'আগামেমনন', 'ঈদিপাস' এবং 'মেদেয়া'র মতো উল্লেখযোগ্য নাটক ছাড়াও সেনেকার প্রসিদ্ধ গদ্যগ্রন্থ ‘অন দ্য শর্টনেস অব লাইফ’।
[caption id="attachment_2383662" align="alignnone" width="600"]
সেনেকার আত্মহত্যা[/caption]
ভার্জিনিয়া উলফ (১৮৮২) বিশ্বসাহিত্যের এক গুরুত্বপূর্ণ লেখিকা। তিনি সাহিত্যে চেতনাপ্রবাহ রীতির অন্যতম স্রষ্টা। ‘মিসেস ডাল্লাওয়ে’ তাঁর অবিস্মরণীয় সৃষ্টি। তাঁর ‘টু দ্য লাইটহাউজ’, ‘ওরলান্ডো’ প্রভৃতি গ্রন্থ আজও স্মরণীয়। তিনি ‘ডিপোলার ডিজঅর্ডার’ নামক দুরারোগ্য মানসিক রোগে আক্রান্ত ছিলেন। ১৯৪১ সালে তিনি তাঁর শেষ উপন্যাস ‘বিটুইন দ্য অ্যাক্টস’ লেখার পর অদ্ভুত উপায়ে আত্মঘাতী হন। প্রথমে তিনি তাঁর ওভারকোটের সব কটা পকেটে ভারী ভারী পাথর ভরে নেন। তারপর হাঁটতে হাঁটতে নেমে যান খরস্রোতা নদীতে। কুড়ি দিন পর নদী থেকে তাঁর গলিত মৃতদেহ পাওয়া যায়। আত্মহত্যার আগে তিনি তাঁর স্বামীকে লিখে গিয়েছিলেন নিজের মানসিক বিষাদগ্রস্ততার কথা। লিখেছিলেন: 'তুমি আমাকে যতটুকু সম্ভব সুখী করেছ।... আমার মনে হয় না দুইজন মানুষ মিলে তোমার-আমার চেয়ে বেশি সুখী হতে পারত, যতদিন না আমার এই ভয়ংকর অসুখটা দেখা দেয়। আমি এই অসুখের সঙ্গে আর যুদ্ধ করতে পারছি না।... তোমার জীবনটা আমি নষ্ট করে ফেলছি। আমি না থাকলেই তুমি ঠিকমতো কাজ করতে পারবে।’
[caption id="attachment_2383660" align="alignnone" width="600"]
ভার্জিনিয়া উলফ[/caption]
রুশ কবি ও নাট্যকার মায়াকোভস্কি ছিলেন রুশ বিপ্লবের অন্যতম পথিকৃৎ। ব্যক্তিগত জীবনে ও সাহিত্যচর্চায় যিনি আমরণ শ্রেণিসংগ্রামের কথা বলেছেন, অবিশ্বাস্য হলেও তিনিও শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা করেছিলেন (১৯৩০ সালের ১৪ এপ্রিল)। প্রণয়-সম্পর্কের টানাপোড়েনে মানসিকভাবে বিপন্ন মায়াকোভস্কি ওইদিন সকাল দশটায় রিভলবার দিয়ে নিজের মাথায় গুলি করে আত্মহত্যা করেন। তাঁর মৃত্যুতে সমগ্র রাশিয়ায় গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে। ১৫ লক্ষ মানুষ তাঁর শেষকৃত্যে অংশগ্রহণ করেছিল।
উরুগুয়ের প্রখ্যাত ছোটোগল্পকার হোরাসিও কিরাগোর (জন্ম: ১৮৭৮) জীবন ছিল অত্যন্ত শোকাবহ। পারিবারিক জীবনে তিনি ছিলেন চরম অসুখী। তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তান আত্মঘাতী হয়েছিলেন। প্রবল বিষাদ থেকে মুক্তি পাবার দুরাশায় তিনি ক্রমশ মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন। অবশেষে আর্জেন্টিনার একটি হাসপাতালে তিনি সায়ানাইড পান করে আত্মহত্যা করেন।
কবি সিলভিয়া প্লাথ আত্মহত্যা করেন ১৯৬৩ সালে। তাঁর মধ্যে আত্মহত্যার একটা দুরারোগ্য প্রবণতা ছিল। বিবাহবিচ্ছেদের পর দুই সন্তানকে নিয়ে আলাদা থাকার সময় গভীর বিষাদগ্রস্ততা পেয়ে বসেছিল তাঁকে। তিনি একদিন রান্নাঘরের দরজা জানলা বন্ধ করে দিয়ে গ্যাসের উনুনে মাথা রেখে আত্মহত্যা করেন (১১ ফেব্রুয়ারি)। কবিতার জন্য তাঁকে মরণোত্তর পুলিৎজার পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়।
[caption id="attachment_2383672" align="aligncenter" width="272"]
সিলভিয়া প্লাথ[/caption]
নোবেল পুরস্কার বিজয়ী আর্নেস্ট হেমিংওয়ের ‘দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’ পড়েননি এমন পাঠক বিরল। বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই উপন্যাসে লেখক তুলে ধরেছেন জীবনযুদ্ধে হার-না-মানার আত্মবিশ্বাসকে। তিনি বলতেন: 'মানুষ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে, কিন্তু পরাজিত হয় না।' সেই হেমিংওয়ে একটি ভয়াবহ দুর্ঘটনার পরে মানসিক ও শারীরিক কষ্ট সহ্য করতে না পেরে ১৯৬১ সালের ২ জুলাই ভোরবেলা নিজের মুখে বন্দুকের নল ঢুকিয়ে গুলি করে মাথার ঘিলু উড়িয়ে দিয়ে আত্মহত্যা করেন।
[caption id="attachment_2383676" align="aligncenter" width="600"]
আর্নেস্ট হেমিংওয়ে[/caption]
জাপানের প্রথম নোবেল বিজয়ী সাহিত্যিক ইউসুনারি কাওয়াবাতা ৭৩ বছর বয়সে গ্যাস টেনে নিয়ে আত্মহত্যা করেন। যদিও তাঁর আত্মহত্যা নিয়ে যথেষ্ট ধোঁয়াশা রয়েছে। তাঁর স্ত্রী দাবি করেছেন, কাওয়াবাতার মৃত্যু ছিল দুর্ঘটনাজনিত। স্ত্রী হিডেকোর সঙ্গে জীবন কাটলেও প্রথম যৌবনে তিনি দু’বার হৃদয়-ভাঙা প্রেমে জড়িয়ে পড়েছিলেন। ধারণা করা হয়, পরবর্তী সময়ে আরও একটি পরকীয়া সম্পর্ক তাঁকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেয়। আবার অনেকে মনে করেন, ভাঙা স্বাস্থ্যের কারণেই তিনি আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন। তবে কেউ কেউ মনে করেন, বন্ধু ইয়োকি মিশিমার আত্মহত্যার ব্যাপারটি সহ্য করতে না পেরে তিনিও আত্মহত্যা করেছিলেন।
[caption id="attachment_2383675" align="aligncenter" width="322"]
ইউসুনারি কাওয়াবাতা[/caption]
এনি সেক্সটন নামে অন্য এক নোবেলবিজয়ী সাহিত্যিক কাওয়াবাতার মতোই গ্যাস টেনে ১৯৭৪ সালে আত্মহত্যা করেন। আত্মহত্যার আগে তিনি প্রচুর ভদকা পান করেছিলেন। তারপর গ্যারেজে ঢুকে গাড়ির ইঞ্জিন চালিয়ে ইঞ্জিনের কার্বন মনোঅক্সাইড গ্যাস টেনে মারা যান। মানসিক অবসাদে আক্রান্ত এই সাহিত্যিক ১৯৬৭ সালে পুলিৎজার পুরস্কারে ভূষিত হন।
সুইডিশ কবি ও কথাশিল্পী কারিন বোয়ে ধর্ম, লেসবিয়ানিজম, সমকালীন যুগযন্ত্রণা ও মানুষের সংগ্রামকে তাঁর উপন্যাসে গুরুত্ব দিয়েছেন। টি এস এলিয়টের কবিতার অসামান্য অনুবাদের জন্যেও পাঠক তাঁকে মনে রেখেছে। ১৯৪১ সালের ২৪ এপ্রিল একটি পাহাড়ের নীচে তাঁর মৃতদেহ পাওয়া যায়। ময়নাতদন্তের পর জানা যায়, অতিরিক্ত ঘুমের ওষুধ সেবন করেই কারিন বোয়ের মৃত্যু হয়।
[caption id="attachment_2383684" align="aligncenter" width="324"]
কারিন বোয়ে[/caption]
বিশিষ্ট ঔপন্যাসিক ডেবিড ফস্টার ওয়ালেস ছিলেন এক বিষাদগ্রস্ত মানুষ। চিকিৎসায় এবং মেডিটেশনে কোনও ফল হয়নি। দীর্ঘ ২০ বছর গভীর অবসাদে ডুবে থেকে অবশেষে ২০০৮ সালের ২৩ অক্টোবর তিনি গলায় দড়ি দিয়ে নিজের অভিশপ্ত জীবনকে শেষ করে দেন।
ওয়ালেসের বিখ্যাত উপন্যাস Infinite jest প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৯৬ সালে। এই বই তাঁকে আন্তর্জাতিক সুখ্যাতি এনে দেয়।
এছাড়া আরও বহু বিশ্ববিশ্রুত সাহিত্যিক দুর্ভাগ্যজনকভাবে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন। যেমন হার্ট ক্রেন, জুকিয়ো মিশিমা, হান্টার এস থম্পসন, জন ব্যারিম্যান, হ্যারি মার্টিনসন, মেরিনা তসভেতেইভা, স্টিফেন জোয়েগ, সের্গেই এসেনিন। এদের অনেকেই melancholia আর depressionকে সঙ্গী করে দীর্ঘদিন বেঁচে থেকে শেষপর্যন্ত আর জীবনকে বয়ে বেড়াতে পারেননি। অনেকেরই প্রেম, দাম্পত্যজীবন ও শারীরিক কষ্ট অসহনীয় হয়ে উঠেছিল।
প্রখ্যাত সাহিত্যিক হার্ট ক্রেন মাত্র ৩২ বছর বয়সে একদিন হঠাৎ সবাইকে 'গুডবাই' জানিয়ে মেক্সিকান উপসাগরে একটি নৌকা থেকে ঝাঁপ দিয়ে মারা যান। অন্য এক স্বনামধন্য সাহিত্যস্রষ্টা পল ক্লি ঝাঁপ দিয়েছিলেন সিন নদীতে। তখন তাঁর বয়স ৪৯ বছর। কবি গিলিজ ডিলুয়েজ বেঁচে থাকার প্রয়োজনে অক্সিজেন মেশিন ব্যবহার করতেন। একদিন তিনি মেশিনটি জানালার বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে মৃত্যুকে ডেকে নেন। জন কেনেডি টুলকে ছিলেন পুলিৎজার পুরস্কারপ্রাপ্ত সাহিত্যিক। তিনি বিষাক্ত কার্বন-মনো অক্সাইড গ্যাস দিয়ে আত্মহত্যা করেন। লেখিকা ‘সারাহ কেন’ মাত্র ২৮ বছর বয়সে লন্ডনের এক হাসপাতালের বাথরুমে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেন।
পুলিৎজার পুরস্কার বিজয়ী কবি ও অধ্যাপক জন ব্যারিম্যান তাঁর বাবার আত্মহত্যার পর মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। খ্যাতির চূড়ায় থাকাকালীন অবস্থায় ১৯৭২ সালে ওয়াশিংটন এভিনিউ ব্রিজ থেকে প্রায় ৯০ ফুট নীচে মিসিসিপি নদীতে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেন তিনি।
নিজের স্ত্রীর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলতে বলতে আত্মহত্যা করেছিলেন প্রখ্যাত মার্কিন কথাশিল্পী হান্টার এস থম্পসন। তাঁর শেষ লেখাটির নাম: ফুটবল খেলার মৌসুম শেষ।
স্ত্রী অনিতাকে উদ্দেশ্য করে জীবনের শেষ চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন: ‘আর কোনও খেলা নেই।... চলতে থাকা নেই। কোনও মজা নেই। সাঁতার কাটা নেই। ৬৭। ৫০ এর পরও ১৭টি বছর। আমার চাওয়ার অথবা দরকারের চেয়েও ১৭টি বাড়তি বছর। বিরক্তিকর। আমি সব সময়েই উদ্দাম। কারও জন্য কোনো আনন্দ নেই। ৬৭। তুমি লোভী হয়ে যাচ্ছ। বুড়োমি দেখাও। শান্ত হও- এটা ব্যথা দেবে না।’ এই লেখার চার দিন পর নিজের মাথায় গুলি করে আত্মহত্যা করেন থম্পসন। বহুদিন ধরে শারীরিক বিকলাঙ্গতায় ভুগছিলেন থম্পসন।
[caption id="attachment_2383690" align="alignnone" width="350"]
হান্টার এস থম্পসন[/caption]
জাপানের প্রখ্যাত লেখক ইউকিও মিশিমা রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে নিজের পেটে ধারালো অস্ত্র চালিয়ে আত্মহত্যা করেন। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ইউকিও মিশিমাকে অনেকেই নোবেল পুরস্কারের যোগ্য বলে মনে করতেন। পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন দক্ষ সামুরাই যোদ্ধা। সামুরাই যোদ্ধারা শত্রুর হাতে ধরা পড়ার পর আত্মসমর্পণ না করে হারিকিরি প্রথায় পেটে ছুরি চালিয়ে আত্মহত্যা করে। তিনিও সেই পদ্ধতি বেছে নিয়েছিলেন।
মানসিক বিষণ্নতা থেকে আত্মহত্যা করেন এডগার অ্যালান পো। মার্কিন সাহিত্যিক এডগার অ্যালান পো-র সারা জীবন কেটেছিল অভাব, অনটন ও দারিদ্র্যের মধ্যে। তাঁর বাউন্ডুলে জীবনযাপনে ছিল মদ আর জুয়া খেলার ভয়ানক নেশা। ১৮৮৯ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর তিনি বিনা নোটিশে বাড়ি থেকে বের হয়ে যান। এর কিছুদিন পর অক্টোবরের ৭ তারিখে বাল্টিমোরের রাস্তায় তাঁর প্রাণহীন দেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়। তখন তাঁর বয়স মাত্র ৪০ বছর। মৃত্যুর কারণ অজানা আজও, সম্ভবত মানসিক অবসাদেই এই আত্মহত্যা।
[caption id="attachment_2383693" align="aligncenter" width="345"]
এডগার অ্যালান পো[/caption]
দুর্দান্ত বাউন্ডুলে স্বভাবের তরুণ রুশ কবি সের্গেই এসেনিন ৩০ বছরের আয়ুষ্কালে মোট চার বার বিয়ে করেছিলেন। তাঁর স্ত্রীদের মধ্যে একজন ছিলেন ভুবনমোহিনী নৃত্যশিল্পী ইসাডোরা ডানকান। কোনও দাম্পত্যই স্থায়ী হয়নি তাঁর। তীব্র মানসিক অবসাদে লেনিনগ্রাদের এক হোটেলে হাতের শিরা কেটে সেই রক্ত দিয়ে লিখেছিলেন জীবনের শেষ কবিতা। তারপর গলায় ফাঁস লাগিয়ে মৃত্যুকে নিশ্চিত করেন তিনি।
যে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন: 'আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে।
তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে।
তাঁর মধ্যেও কখনও কখনও জেগেছিল অবসাদ ও মৃত্যুচিন্তা। তবে আমাদের সৌভাগ্য যে, সেই মৃত্যুবাসনা স্থায়ী হয়নি। ২৫ সেপ্টেম্বর, ১৯১৪
শ্রীনিকেতন থেকে রথীন্দ্রনাথকে এক চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ লিখলেন, ইউনানি ডাক্তারের ওষুধ খেয়ে তাঁর শারীরিক সমস্যা দূর হলেও কিছু মানসিক উপসর্গ দেখা দিয়েছে।
রথীন্দ্রনাথকে সেসময় তিনি আরও লিখেছিলেন: ‘'দিনরাত্রি মরবার কথা এবং মরবার ইচ্ছা আমাকে তাড়না করেছে. মনে হয়েছে আমার দ্বারা কিছুই হয়নি এবং হবেনা। আমার জীবনটা যেন আগাগোড়া ব্যর্থ...।’' অথচ তার এক বছর আগেই তিনি নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। তখন তাঁর বিশ্বজোড়া খ্যাতি।
২৯ জানুয়ারি ১৯১৫ প্রিয় বন্ধু অ্যান্ড্রুজকে তিনি লিখলেন প্রায় একই কথা: "I feel that I am on the brink of a breakdown". কী আশ্চর্য তাই না!
কানাডার রয়্যাল অটোয়া হাসপাতালের গবেষকরা দেখেছেন, নিউরোট্রান্সমিটার রিসেপটর জিনের বিভাজনে আত্মহত্যার প্রবণতা দ্বিগুণ বেড়ে যায়। এই রিসেপটরের নাম ৫-এইচটি ২ এ। এটা মস্তিষ্কের রাসায়নিক উপাদান ‘সেরোটোনিন' থেকে সংকেত বহন করে। মেন’স হেলথ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে এ-সংক্রান্ত একটি দরকারি প্রতিবেদন। একটি আন্তর্জাতিক সার্ভে বলছে পৃথিবীর যে ১০ টি দেশে আত্মহত্যার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি সেগুলি হল:
গায়্যানা (প্রতি ১ লক্ষ নাগরিকে আত্মহত্যার ঘটনা ৪৪.২ শতাংশ)
দক্ষিণ কোরিয়া (প্রতি ১ লক্ষ নাগরিকে আত্মহত্যার ঘটনা ২৮.৯ শতাংশ)
শ্রীলঙ্কা (প্রতি ১ লক্ষ নাগরিকে আত্মহত্যার ঘটনা ২৮.৮ শতাংশ)
লিথুয়ানিয়া (প্রতি ১ লক্ষ নাগরিকে আত্মহত্যার ঘটনা ২৮.২ শতাংশ)
সুরিনাম (প্রতি ১ লক্ষ নাগরিকে আত্মহত্যার ঘটনা ২৭.৮ শতাংশ)
মোজাম্বিক (প্রতি ১ লক্ষ নাগরিকে আত্মহত্যার ঘটনা ২৭.৪ শতাংশ)
নেপাল (প্রতি ১ লক্ষ নাগরিকে আত্মহত্যার ঘটনা ২৪.৯ শতাংশ)
তানজানিয়া (প্রতি ১ লক্ষ নাগরিকে আত্মহত্যার ঘটনা ২৪.৯ শতাংশ)
কাজাখস্থান (প্রতি ১ লক্ষ নাগরিকে আত্মহত্যার ঘটনা ২৩.৮ শতাংশ)
বুরুন্ডি (প্রতি ১ লক্ষ নাগরিকে আত্মহত্যার ঘটনা ২৩.১ শতাংশ)
(তথ্যসূত্র: ওয়র্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন)
মাত্র তিনটি কবিতার বই: 'মা কিংবা প্রেমিকা স্মরণে', 'মূর্খ স্বপ্নের গান' আর 'শিকল আমার গায়ের গন্ধে'। তাতেই বিপুল সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন কৃত্তিবাস পুরস্কারের প্রথম বিজেতা শামশের আনোয়ার। ১৯৯২ এর অক্টোবরের এক রাতে একগাদা ঘুমের ওষুধ খেয়ে ফেলেন তিনি। কয়েক মাস কোমায় থাকার পর ১৯৯৩ এর ১২ জুন পি.জি. হাসপাতালের বিছানায় মারা যান এই প্রতিভাবান তরুণ কবি। তাঁর মৃত্যুর পর বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত লিখেছিলেন: 'মা কিম্বা প্রেমিকা স্মরণে’র কবি শামশের ভাবতে শুরু করল, কবিতা-ফবিতা কিচ্ছু হচ্ছে না। কী একটা খেয়ে পিজি হাসপাতালের বেডে একটানা এক মাস ঘুমিয়ে থাকল, সেই ঘুম থেকে নীচে নামতে নামতে, নামতে নামতে এক্কেবারে মাটির তলায় পচে গেল।'
আর সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন: ‘আজ সকাল ৮ টায় শামশের আনোয়ার শামশেরকে মেরে ফেলল। আত্মহত্যা করার কথা থাকে, অনেকেই করে না। প্রয়োজনও থাকে না। কারণ মৃত্যু তো আগেই হয়ে গেছে, শামশের ভীষণভাবে বেঁচে ছিল। তাই কলকাতার সাহিত্য-সংসারে সে ছিল একজন প্রকৃত একঘরে কবি।’
ফালগুনী রায় (জুলাই ৭, ১৯৪৫ − মে ৩১, ১৯৮১) হাংরি আন্দোলনের একজন প্রখ্যাত কবি। নানা নেশায়, উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপনে মাত্র ৩৫ বছর বয়সে মারা যান তিনি। সরাসরি না হলেও এও তো এক ধরণের আত্মহত্যাই।
'ব্যান্ডমাস্টার'-এর কবি তুষার রায় দারিদ্র্য, হতাশা, অবসাদ, মাদক ও আফিঙের নেশা আর যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে ৪৩ বছর বয়সে মারা যান। তিনিও সরাসরি আআত্মহত্যা করেননি, কিন্তু মৃত্যুর ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিলেন নিজের হাতে। শোনা যায়, তিনি মৃত্যু-মৃত্যু খেলতে ভালোবাসতেন। নেশায় আচ্ছন্ন হয়ে অনেক সময় চলমান গাড়ি-বাসের সামনে গিয়ে পড়তেন, আবার মৃত্যু-কে ফাঁকি দিয়ে পৌঁছে যেতেন অন্য ফুটপাথে। একবার নাকি ৫ টাকার বাজি জেতার জন্যে মৃত্যু অবধারিত জেনেও একগাদা ম্যান্ড্রেক্স খেয়ে ফেলেছিলেন। স্টমাক পাম্প করে কোনও রকমে তাঁকে বাঁচানো হয়েছিল সেবার। দু’হাত দিয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার এক অদ্ভুত নেশা ছিল তাঁর। একবার তিনি লিখেছিলেন, ‘আই ইউজড টু প্লে ডেথ ডেথ।’ নিজের স্মৃতিফলক-এর জন্য কবিতাও লিখে গেছিলেন তুষার। ‘মরুভূমির আকাশে তারা’-য় তিনি লিখেছেন:
'অবিরল শ্যাওলা সবুজ হয়ে ঢেকে দেবে,
তার আত্মার রস নিয়ে গজাবে ব্যাঙের ছাতা
মন্দির গড়বে না, যাবে না সেখানে কেউ
সেখানে নিঃসঙ্গ তিনি শুয়ে থাকবেন
জ্যোৎস্নার সুরভিত হাওয়া বয়ে গেলে পর
শবাধারে লম্বা হবে ফার্নের ছায়া।
এইটুকু নিয়ে, ব্যাস্ খুব খুশি হয়ে
জ্যোৎস্নার ফুল আর শ্যাওলায় দেখো
ভারী শান্ত ঘুমোবেন কেননা বিনিদ্র তিনি বহুকাল।'
তবুও সাধারণ মানুষ হিসেবে আমরা চাই কবি শিল্পী সাহিত্যিকেরা শেষ পর্যন্ত জীবনবিমুখ ও তিমিরবিলাসী না হয়ে তিমিরবিনাশী হবেন৷ অতীত ও ভবিষ্যতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তাঁরা আমাদের শোনাবেন অমরাবতীর গান। রুশ কথাশিল্পী ও নাট্যকার আন্তন চেখভের এক নায়ক আত্মহত্যা করতে গিয়েও ফিরে এসেছিল জীবনের মূল স্রোতে। সেই তরুণ নায়ক চরম দারিদ্র্য আর প্রেমের ব্যর্থতায় হতাশ হয়ে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেয়। সে ভাবতে থাকে আত্মহত্যার উপযুক্ত উপায়। গলায় ফাঁস লাগানো বা বিষপান করা-এসব পছন্দ হলো না তার। কারণ এভাবে মরলে মৃত্যুর পর তাঁর সুন্দর দেহটি মাতাল ডোমের হাতে ছিন্নভিন্ন হবে। সেটা খুব বিতিকিচ্ছিরি ব্যাপার হবে। শেষ পর্যন্ত নায়ক স্থির করল, সে জলে ডুবে মারা যাবে। সে-ক্ষেত্রে তার মৃতদেহ পুলিশ কিংবা ডোমের হাতে পড়ার সম্ভাবনা কম। কিন্তু ব্রিজের উপর থেকে নদীর জলে ঝাঁপিয়ে পড়ার পূর্বমুহূর্তে তাঁর মনে হল: ‘শহরের সমস্ত নর্দমা থেকে নোংরা-ময়লা নেমে আসে এ-নদীতে। ময়লার সঙ্গে থাকে অসংখ্য কীট। নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ার অর্থ, ওসব ময়লা ও কীট আমার নাক-মুখ দিয়ে ভেতরে ঢুকবে! বীভৎস ব্যাপার হবে সেটা!’
চেখভের সেই নায়ক শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যার নেতিবাচক চিন্তা বাদ দিয়ে, নতুন করে বাঁচার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। আসলে সে ছিল অমোঘ জীবন-প্রেমিক। তবুও বাস্তব বিশ্বে আত্মহত্যাকারীর সংখ্যা ক্রমবর্ধমান। যারা আন্তরিকভাবেই আত্মহত্যা করতে চায় তারা কখনওই চেখভের ওই নায়কের মতো মৃত্যুর পরে মৃতদেহের পরিণতি নিয়ে চিন্তা করে না। যে কোনওভাবেই হোক আত্মবিনাশই তাদের লক্ষ্য। এর শেষ কোথায়? কোথায় লুকোনো আছে সেই জীবনের আলো! তা খুঁজে নিতে হবে বলেই হয়তো জীবনানন্দ লিখেছিলেন- 'আমিও তোমার মতো বুড়ো হবো— বুড়ি চাঁদটারে আমি ক’রে দেবো
কালীদহে বেনোজলে পার;
আমরা দু-জনে মিলে শূন্য ক’রে চ’লে যাবো জীবনের প্রচুর ভাঁড়ার।'