
শেষ আপডেট: 29 December 2020 09:10
পৃথিবীর দেবতা গেব, আর আকাশের দেবী নুটের প্রেম[/caption]
এই চার সন্তানের মধ্যে প্রথম জনই হলেন আমাদের আলোচ্য দেবতা ওসাইরিস বা ওসিরিস। মিশরীয় পুরাণ অনুসারে পুনর্জন্ম, মদ, শস্য তথা উর্বরতার দেবতা ছিলেন ওসাইরিস। পৃথিবী ও আকাশের সঙ্গমে তাঁর জন্ম, প্রকৃতির সম্মিলিত শক্তির প্রতীক বলা চলে তাঁকে। বয়ঃপ্রাপ্তির পর নিজের সহোদরা বোন সুন্দরী আইসিস'কে বিয়ে করেন ওসাইরিস। আইসিস ছিলেন যাদুবিদ্যা, মাতৃত্ব ও প্রকৃতির দেবী৷ সারল্য আর শিশুদের রক্ষাকর্ত্রী দেবীও তিনি। মিশরের রাজা মানে 'ফারাও'দের বলা হত 'আইসিসের সন্তান'।
[caption id="attachment_291133" align="aligncenter" width="600"]
আদি দেবের বংশলতিকা[/caption]
গেবের দ্বিতীয় পুত্র, ওসাইরিসের ভাই সেথ ছিলেন মরুভূমি, ঝড় আর অন্ধকারের দেবতা। ছোটবেলা থেকেই সেথ অহংকারী, দুর্দমনীয়, কপট। গেব তার দুই পুত্রের মধ্যে রাজত্ব ভাগ করে দিতে চেয়েছিলেন। সেই অনুসারে ঠিক হল মিশরের দক্ষিণ অংশ বড় ভাই ওসাইরিসের দখলে থাকবে। আর উত্তর অংশ থাকবে কনিষ্ঠ সেথের দখলে। কিন্তু ভাগাভাগিতে আপত্তি ছিল সেথের। সে চায় সম্পূর্ণ মিশরের আধিপত্য৷ এই অসঙ্গত দাবিতে রুষ্ট হয়ে, এবং তার অপশাসনের প্রমাণ পেয়ে বাবা গেব ওসাইরিসকেই সমগ্র মিশরের একছত্র অধিপতি ঘোষণা করেন।
[caption id="attachment_291156" align="aligncenter" width="600"]
বর্বর রাজ্যলোভী সেথ[/caption]
রাজা হিসাবে ওসাইরিস ছিলেন প্রজাদরদি, সুশাসক। যে সময় তিনি সিংহাসনে বসেন, তখন প্রাচীন মিশরের মানুষ ছিল বর্বর। মানুষ মানুষেরই কাঁচা মাংস খেত। রাজা হয়েই ওসাইরিস রদ করলেন সেই নরমাংস ভক্ষণ রীতি। মিশরীয়দের চাষবাস করতে শেখালেন তিনি। ফলাতে শেখালেন গম, বার্লি, আঙুর। তৈরি করলেন উৎকৃষ্ট মদ। শুধু সুসভ্য করাই নয়, কৃষিকাজ এবং তামার ব্যবহার সম্পর্কেও মিশরীয়দের শিক্ষিত করে তোলেন রাজা ওসাইরিস। বর্বর প্রাচীন মিশরীয়দের মধ্যে নিয়ে আসেন শৃঙ্খলা। গড়ে তোলেন প্রশাসক, স্থপতি ও কৃষিবিজ্ঞানীদের ফৌজ। সমাজের নিয়মকানুন,আইন-শৃঙ্খলা প্রণয়ন করতে তাঁর আমন্ত্রণে এগিয়ে আসেন জ্ঞানের দেবতা থোথও। দুই দেবতায় মিলে শিল্পকলা আর বিজ্ঞানে পারদর্শী করে তোলেন মিশরবাসীকে।
[caption id="attachment_291137" align="alignnone" width="356"]
প্রজাবৎসল রাজা ওসাইরিস[/caption]
পরস্পরকে খুব ভালোবাসতেন ওসাইরিস ও আইসিস। যখনই রাজ্য ছেড়ে অন্য দেশ ভ্রমণে যেতেন রাজা, রাজত্বভার দিয়ে যেতেন রানি আইসিসের উপর। কিন্তু সুখ জিনিসটাই ক্ষণস্থায়ী। এই দুই দেবতার সুখী দাম্পত্যেও কাঁটা হয়ে দাঁড়াল তাঁদেরই লোভী ভাই সেথ। তারও আগে ওসাইরিস নিজেই ভ্রান্তিবশত জড়িয়ে পড়লেন সেথের স্ত্রী নেফথিসের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কে, যার পরিণামে তাদের একটি ছেলে জন্মায়। এই অবৈধ সন্তানই শেয়াল-দেবতা আনুবিস।
জন্মগ্রহণ করলেন শেয়াল দেবতা আনুবিস[/caption]
চেহারার দিক থেকে অবশ্য ওসাইরিসের তুলনায় সেথের সঙ্গেই 'শেয়াল দেবতা' আনুবিসের মিল বেশি। যা হোক, স্ত্রীর পরকীয়া আর অবৈধ সন্তানজন্মের কথা যখন সেথের কানে গেল, রাগে দিকবিদিক জ্ঞান হারালেন তিনি। মনস্থির করলেন ওসাইরিসকে হত্যা করেই এর প্রতিশোধ নেবেন।
নেপথিসের সঙ্গে ওসাইরিস[/caption]
ইথিওপিয়ার রানির সহায়তায় এক প্রকাণ্ড কাঠের সিন্দুক তৈরি করলেন সেথ। এক মানুষ দীর্ঘ সেই সিন্দুকের গায়ে অসাধারণ কারুকাজ। খুব গোপনে ওই সিন্দুক তৈরি করা হয়েছিল ওসাইরিসের শরীরের মাপে।
ওসাইরিস বিদেশ ভ্রমণ শেষে দেশে ফিরলে তাঁর রাজত্বের ২৮ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে এক বিরাট ভোজসভার আয়োজন করেন সেথ। ভাইকে সসম্মানে আমন্ত্রণ জানান সেই মহাভোজে। আমন্ত্রণ করেন নিজের ৭২ জন বন্ধু ও অনুসারীকেও।
ভোজসভা যখন জমে উঠেছে, হাতে হাতে ঘুরছে সুস্বাদু পানীয়ে ভরা পানপাত্র, তখনই বুদ্ধি করে সেথ সেই বিরাট কাঠের সিন্দুকটাকে নিয়ে আসেন ভোজসভায়, আর ঘোষণা করেন যার শরীরের মাপের সঙ্গে এই সিন্দুকের মাপ মিলে যাবে তাকেই উপহার দেওয়া হবে এই মহার্ঘ সিন্দুক৷ এত অপূর্ব কারুকাজ করা সিন্দুক কেউ আগে দেখেনি। সবাই একে একে গিয়ে সিন্দুকের ভিতর শুয়ে দেখতে লাগল। কিন্তু কারও শরীরের মাপের সঙ্গেই মিলল না সিন্দুকের মাপ। মিলবে কী করে! ও সিন্দুক যে তৈরি হয়েছে ওসাইরিসের মাপে। একে একে বিফল মনোরথ হয়ে ফিরে এলেন সবাই। সবার শেষে এল ওসাইরিসের পালা। ভাইয়ের প্রতি অন্ধবিশ্বাসে কোনওরকম সন্দেহ না করেই ওসাইরিস গিয়ে শুলেন ওই প্রকাণ্ড সিন্দুকে। যেই না সিন্দুকে প্রবেশ করলেন রাজা ওসাইরিস, সঙ্গে সঙ্গে তাঁর শরীরের মাপে সিন্দুকের মাপ গেল মিলে। আর দুষ্টু সেথ বাইরে থেকে সেই সিন্দুক বন্ধ করে তার উপর ঢেলে দিলো গলানো সীসা। তারপর ওসাইরিস সহ সেই সিন্দুক নিক্ষেপ করা হল নীলনদের জলে। সিন্দুকের ভিতর ছটফট করতে করতে মারা গেলেন দেবতা ওসাইরিস।
মৃত ওসাইরিসের দেহের পাশে আইসিস ও তাঁর যমজ বোন নেফথিস[/caption]
সময় অল্প, তাই জ্ঞান আর মৃত্যুদেবতার সাহায্য নিয়ে ওসাইরিসের দেহখণ্ডগুলো পরপর সাজিয়ে তাতে প্রাণসঞ্চার করলেন দেবী আইসিস। সেথের কাছে সে খবর পৌঁছলেও রানি ও তাঁর অনুগামীদের ডিঙিয়ে ওসাইরিসের কাছে এবার আর পৌঁছতে পারলেন না অন্ধকারের দেবতা সেথ। রাজার দেহে সাময়িকভাবে প্রাণসঞ্চার হল ঠিকই, কিন্তু উদ্দেশ্য পূরণ হবে কী করে! উদ্দেশ্য আর কিছুই না, ওসাইরিসের ঔরসে মিশরের যোগ্য উত্তরসূরীর জন্ম। কিন্তু ওসাইরিসের দেহের অন্যান্য টুকরোগুলো খুঁজে পাওয়া গেলেও নীলনদের জলে চিরতরে হারিয়ে গেছে তাঁর পুরুষাঙ্গ। পুরুষাঙ্গ ছাড়া মিলন তো সম্ভব নয়। শেষমেশ এরও সমাধান বের করলেন যাদুর দেবী আইসিস। সোনার এক পুরুষাঙ্গ স্থাপিত হল ওসাইরিসের দেহে৷ এরপর মিলিত হলেন মৃতরাজা ওসাইরিস ও রানি আইসিস। এই মিলনেরই ফল দেবতা হোরাস।
[caption id="attachment_291161" align="aligncenter" width="480"]
আনুবিসের কোলে ওসাইরিসের মমি[/caption]
স্ত্রীর শরীরে বীজটুকু রেখে শেষ ঘুমে ঢলে পড়লেন ওসাইরিস। যাতে কোনওভাবেই তাঁর শরীরে পচন না ঘটে,তাই আইসিস আর নেপথিস জ্ঞানের দেবতা থোথ আর মৃত্যুর দেবতা আনুবিস মিলে খুব গোপন পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করলেন রাজার দেহ। এই প্রথম মিশরের ইতিহাসে কোনও মৃতদেহকে পচন আটকাতে মমি করা হল। সেই প্রথম মমি আর কেউ নয়, স্বয়ং দেবতা ওসাইরিস। তবে ওসাইরিসের গল্প এখানেই শেষ নয়৷
আইসিসের কোলে শিশু হোরাস - প্রাচীন মিশর স্থাপত্য[/caption]
কিন্তু সেথও ছাড়ার পাত্র নয়। আইনের মারপ্যাঁচে সে আটকে দিতে চাইল হোরাসের অধিকার। মামলা চলল দীর্ঘদিন। শেষে ফয়সালা হল, দুপক্ষের শক্তির লড়াই হোক। যুদ্ধে যে জিতবে সিংহাসন তার।
মারামারির কত যে প্রতিযোগিতা হল দুজনের! মানুষ-পশুর রূপ ধরে কত টক্কর! প্রতিবারই জিতল হোরাস। কিন্তু এত সহজে দাবি ছাড়ার লোক নন অন্ধকারের রাজা সেথ। শুরু হল তুমুল যুদ্ধ৷ যুদ্ধে হোরাস ছিঁড়ে নিলেন সেথের অন্ডকোষ। যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে প্রবল আক্রমণ শানালেন সেথ। হোরাসের বাম চোখ উপড়ে ছ'টুকরো করে ফেলল সে৷ সে এক নৃশংস ভয়াবহ যুদ্ধ। যুদ্ধের এক পর্যায়ে হোরাসকে বাগে পেয়ে ধর্ষণের চেষ্টা করে সেথ। উভকামী সেথের হাত থেকে খুব অল্পের জন্য রক্ষা পায় হোরাস। সেথের বিষাক্ত বীর্য, যা সে হোরাসের শরীরে ঢোকাতে চেয়েছিল, তা হোরাস লুকিয়ে এনে দেয় মা আইসিসকে। সেই বিষ আইসিস মিশিয়ে দেয় সেথের খাবারে৷ নিজের অজান্তে নিজেরই বীর্য পান করে সেথ। শেষমেশ দেবতাদের হস্তক্ষেপে ইতি পড়ে সেই ভয়ানক যুদ্ধে৷
[caption id="attachment_291158" align="aligncenter" width="600"]
ইতি পড়ল সেথ আর হোরাসের তুমুল যুদ্ধে[/caption]
যাদুবিদ্যায় ফিরিয়ে দেওয়া হয় হোরাসের বাম চোখ আর সেতের অণ্ডকোষও। হোরাসের এই নতুন বামচোখটি ছিল অলীক ক্ষমতাসম্পন্ন। প্রাচীন মিশরের লোকজন বিশ্বাস করতেন, হোরাসের এই নবলব্ধ দৈবী চোখের অনেক মহিমা। তা শুধু অন্তর্ভেদীই নয়, এ চোখের দৃষ্টি সর্বরোগহর। আর এই বিশ্বাস থেকেই ক্রমশ জনপ্রিয় হতে থাকে হোরাসের চোখের প্রতীক। সেকালে মিশরের নানান ছবিতে, বইয়ে, স্থাপত্যের গায়ে, পিরামিডের ভিতরের কারুকাজে, নানা মূল্যবান ধাতু ও পাথরের উপর, এমনকি মৃতদেহের গয়নার গায়েও আঁকা থাকত এই 'আই অফ হোরাস'।
[caption id="attachment_291166" align="aligncenter" width="400"]
হোরাসের সেই রহস্যময় দৈবী চোখ[/caption]
মানুষের মৃত্যুর পর তাকে সোজা হাজিরা দিতে হত দেবতা ওসাইরিসের দরবারে৷ সেখানে তাঁর পাপ পুণ্যের বিচার হত। ফারাওদের মৃত্যুর পর তাদের লাশ যদি ঠিকঠাক সৎকার হত, এবং যদি ফারাওদের সঙ্গে পরকালে ভোগ করার মতো উপযুক্ত ধনসম্পত্তি দেওয়া হত, তাহলে ওসাইরিস তুষ্ট হতেন। মিশরের মানুষ বিশ্বাস করতেন জীবনে ভালো কাজ করলে, সচ্চরিত্র থাকলে, মৃত্যুর পর মমির কাপড়ে ঠিকঠাক মন্ত্র লেখা হলে, তবেই খুশি হবেন ওসাইরিস। মহাবিচারের পর তাদের জীবিত করে নিজের অনুগামী, অনুচর করে রাখবেন। মৃত্যুর পরও সুখভোগ করবেন ওসাইরিসের অনুগামীরা। আর যারা দুরাচারী, মিথ্যেবাদী, ধর্মভীরু নয়, ওসাইরিসের নির্দেশে তাদের শরীর ছিঁড়ে খাবে কুমিরের মাথা, সিংহের শরীর আর জলহস্তির মতো পেছনওয়ালা জন্তু আমিত।
[caption id="attachment_291168" align="alignnone" width="600"]
পরলোকে নতুন জীবনে ওসাইরিস[/caption]
ওসাইরিসের হাত ধরেই সভ্যতার শুরু। সমাজ জীবনের নিয়ম-কানুন তাঁরই হাতে গড়া। জীবনের দেবতা হিসাবে সেদিনও তিনি ছিলেন ন্যায়পরায়ণ। ছিলেন শস্য আর উর্বরতার দেবতা। নীলনদের জলে ফসল ফলত তাঁরই দয়ায়। সময়ের সঙ্গে চিরতরুণ আর শান্ত সেই দেবতার সত্যিই পুনর্জন্ম ঘটল। তিনি হয়ে গেলেন পরলোকের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা, পাতালদেবতা। আশ্চর্য এই বদল। অনেকের মনে করেন কৃষির উন্মেষ, সমাজজীবনের শুরু থেকে সম্পর্কের জটিলতা পেরিয়ে অধ্যাত্মজীবন তথা পরলোকের প্রতি মোহ- মানবজীবনের এই চরৈবতি ভাবনার ছবিই আঁকা রয়েছে দেবতা ওসাইরিসের জীবনচিত্রে। আজও প্রবল বর্ষণের পর নতুন ফসল জন্মায় যখন, যখন কালোরাতের শেষে ভোর হয়- মিশরের মানুষ প্রকৃতির বুকে খুঁজে পায় ওসাইরিসের মৃত্যু আর পুনর্জীবনের ছবি।