
শেষ আপডেট: 15 September 2021 12:51
মতিলাল চট্টোপাধ্যায় ও ভুবনমোহিনী দেবীর পাঁচ সন্তানের অন্যতম ছিলেন শরৎচন্দ্র। এছাড়াও প্রভাসচন্দ্র আর প্রকাশচন্দ্র নামে তাঁর দুই ভাইও ছিলেন। আর ছিলেন দুই বোন, অনিলা ও সুশীলা। বড়বোন অনিলা দেবীর নামের আড়ালেই শরৎচন্দ্রের লেখালিখির সূত্রপাত। তাঁর ছদ্মনাম 'অনিলাদেবী'র কথা অনেকেই জানেন, কিন্তু সেটি যে আদতে তাঁর প্রিয় বড়দিদির নাম, সে কথা বিস্মৃত হয়েছেন অনেকেই।
আপাত সামাজিক শরৎচন্দ্রের মধ্যে বাস করতেন নির্লিপ্ত, বাসনাশূন্য, সংসারবিবাগী আরেক শরৎচন্দ্র। তাঁর উপন্যাসগুলো গভীরভাবে পাঠ করলেই সেই মানুষটার ছায়া চোখে পড়বে। প্রথম জীবনেও তাঁর মতিগতি ছিল কিছুটা ছন্নছাড়া। বাবার উপর রাগ করে বেশ কিছুদিনের জন্য বাড়িও ছেড়েছিলেন শরৎচন্দ্র। কত বয়স তখন তাঁর, ২৫ কি ২৬! অভিমানে সংসার ত্যাগ করে সন্ন্যাসী সেজে গেরুয়া পরে কয়েকদিন ঘুরে বেড়ালেন পথে পথে। এই সময়কালেই তিনি খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন দরিদ্র, লাঞ্ছিত, ধর্ম আর জাতপাতের বেড়ায় খন্ডিত ভারতবর্ষের আসল চেহারা। পরবর্তীতে তাঁর আত্মজীবনীমূলক রচনা 'শ্রীকান্ত' সহ একাধিক উপন্যাসে যার ছায়াপাত দেখা যাবে।
ছেলের ঘর ছাড়ার বেশ কিছুদিন পরেই মারা যান বাবা মতিলাল চট্টোপাধ্যায়। বাবার মৃত্যুর খবর পেয়ে ভবঘুরে জীবনে ইতি টেনে শরৎচন্দ্র আবার ফিরে আসেন ভাগলপুরে৷ সেখানে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ও শ্রাদ্ধশান্তির পর শরৎচন্দ্র রওনা দিলেন কলকাতার উদ্দেশ্যে। দারুণ অর্থাভাব, টাকাপয়সা নেই। কী খাবেন, কোথায় থাকবেন জানেন না! এমন সময় সুযোগ এসে গেল আকস্মিক ভাবেই।
কলকাতা হাইকোর্টের উকিল ছিলেন লালমোহন গঙ্গোপাধ্যায়, তাঁরই বাড়িতে কিছু হিন্দি বইয়ের ইংরেজি তর্জমা করার জন্য মাসিক ত্রিশ টাকা বেতনের একটি চাকরি জুটে যায় শরৎচন্দ্রের। কাছাকাছি এই সময়ই, মানে ১৯০২-০৩ নাগাদ তাঁর লেখা মন্দির’ গল্পটি কুন্তলীন' প্রতিযোগিতায় পাঠালে প্রায় দেড়শতাধিক গল্পের মধ্যে তা বিজয়ী ঘোষিত হয়। 'মন্দির' যদিও শরৎচন্দ্রের লেখা, কিন্তু এটি তখন তাঁর মামা ও বাল্যবন্ধু সুরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের নামে মুদ্রিত হয়েছিলো। এটিই শরৎচন্দ্রের প্রথম প্রকাশিত গল্প। কিন্তু প্রথম লিখিত গল্প নয়। লেখালিখিতে শরৎচন্দ্র হাত পাকিয়েছিলেন তার অনেকদিন আগেই। ১৮৯২ সালে, যখন তিনি হুগলি ব্রাঞ্চ স্কুলের ছাত্র, সেসময়ই 'কাশীনাথ' আর 'ব্রহ্মদৈত্য' নামে দুটো অসাধারণ ছোটগল্প লিখে ফেলেন, লেখেন ছোট বড় নানা গদ্যও।
দীর্ঘ তেরো বছর সুদূর বার্মাদেশে কাটিয়েছেন শরৎচন্দ্র। ১৯০৩ সাল নাগাদ তিনি রেঙ্গুনে যান, এবং ১৯১৬ সালে স্বদেশে ফিরে আসেন। এর মধ্যে মাত্র একবারই ১৯১২ সালের অক্টোবরে মাসখানেকের ছুটি নিয়ে স্বদেশে ফিরেছিলেন। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, শরৎচন্দ্র রেঙ্গুন অর্থাৎ বর্তমানের ইয়াঙ্গুন শহর থেকে মোটামুটি দু'মাইল দূরে ঐরাবতী নদীর কাছে বোটাটং পোজনডং অঞ্চলে একটি কাঠের দোতলা টিনের ঘরে বাস করতেন। ভদ্রপাড়া বলতে যা বোঝায়, ঠিক তেমন এলাকা ছিল না সেটা। অবস্থাপন্ন শিক্ষিত লোকজন বিশেষ বসবাস করতেন না সেখানে।
বেশিরভাগ লোকই কলকারখানায় মিস্ত্রি মজুরের কাজ করত। সেসব মিস্ত্রিদের সঙ্গে অবাধ মেলামেশা ছিল শরৎচন্দ্রের। তিনি তাঁদের ব্যক্তিগত চিঠি, চাকরির দরখাস্ত - এসব লিখে দিতেন, বিপদে আপদে পাশে দাঁড়াতেন, ঝগড়া বিবাদে মধ্যস্থতা করতেন, ছোটখাটো অসুখে হোমিওপ্যাথি ওষুধ দিয়ে চিকিৎসাও করতেন। এমনকি এদের নিয়ে একটা সংকীর্তনের দলও খুলেছিলেন লেখক। এই মিস্ত্রিরা ভীষণ ভালোবাসতেন শরৎবাবুকে, ডাকতেন 'দাদাঠাকুর' বলে। 'ভারতবর্ষ' পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু প্রমথনাথ ভট্টাচার্য'কে লেখা কিছু চিঠি থেকে তাঁর রেঙ্গুন-জীবনের টুকরো ছবি পাওয়া যায়। তেমনই এক চিঠিতে শরৎচন্দ্র লিখছেন -
"চাকরি করি। ৯০ টাকা মাহিনা পাই এবং ১০ টাকা অখখঙডঅঘঈঊ পাই। একটা ছোট দোকানও আছে। ওটা দেখাশোনার জন্য একজন কর্মচারী আছে মূলত ওটা চায়ের দোকান। সকাল বেলায় অফিসে যাওয়ার আগে, চা-চিনি-দুধ হিসাব মতো দিয়ে যাই। জানি কতটা চা-চিনি-দুধে কত কাপ চা হতে পারে। অফিস থেকে ফিরে এসে, হিসাব নেই।"
রেঙ্গুনেই কন্যাদায়গ্রস্ত এক মিস্ত্রির মেয়েকে বিবাহ করেন শরৎচন্দ্র। শোনা যায় চক্রবর্তী উপাধিধারী ওই মিস্ত্রি তাঁর মেয়ের চাইতে বয়সে ঢের বড়, এক বুড়ো মাতালের হাতে মেয়েকে তুলে দিচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই খবর পেয়ে ত্রাতার ভূমিকায় আসরে নামেন শরৎচন্দ্র স্বয়ং। বিয়ে ভন্ডুল হলে মেয়ে যাতে লগ্নভ্রষ্টা না হয়, তাই তাঁকে নিজেই বিবাহ করেন লেখক৷ স্ত্রী শান্তিদেবীর সঙ্গে দাম্পত্য সুখের হলেও বেশিদিন স্থায়ী হয়নি সেই সুখ। সেইসময় রেঙ্গুনে প্লেগের প্রকোপ দেখা দেয়। শরৎচন্দ্রের স্ত্রী এবং এক বছরের শিশুপুত্র দুজনেই সেই রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এর বেশ কিছু বছর পর রেঙ্গুনেই আবার বিয়ে করেন শরৎচন্দ্র। বিয়ের আগে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রীর নাম ছিল 'মোক্ষদা'। নামটা একেবারেই অপছন্দ হওয়ায় ১৪ বছরের কিশোরী বউয়ের নাম পালটে তিনি নতুন নাম রাখেন 'হিরণ্ময়ী'। লেখকের জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত যথার্থ সহধর্মিণীর মতো তাঁর পাশে ছিলেন দ্বিতীয়া স্ত্রী হিরণ্ময়ী দেবী।
রেঙ্গুন থেকে ফিরে তিনি নিজের রুজিরুটির পথ হিসাবে বেছে নিয়েছিলেন সাহিত্যকেই। তখনকার দিনেও যথেষ্ট সাহস আর আত্মবিশ্বাস না থাকলে এই পদক্ষেপ নেওয়া যায় না। তাঁর জীবিতকালেই তাঁর লেখা কাহিনি অবলম্বনে তৈরি হয়েছে একের পর এক চলচ্চিত্র। এ প্রসঙ্গে ১৯২২ সালে প্রকাশ পাওয়া নির্বাক ছবি ‘আঁধারে আলো’ এবং ১৯৩১ সালে প্রকাশিত সবাক ছবি ‘দেনা-পাওনা’র কথা বলতেই হয়। তবে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় হয়েছিল ১৯৩৫ সালে প্রকাশিত ‘দেবদাস’ ছবিটি। এই ছবিতে প্রমথেশ বড়ুয়ার অভিনয় সেসময়কার দর্শকদের অকুণ্ঠ প্রশংসা লাভ করেছিল।
[caption id="attachment_2218575" align="aligncenter" width="404"]
'দেবদাস' ছায়াছবিতে প্রমথেশ বড়ুয়া[/caption]
একটু আত্মমগ্ন হলেও ব্যক্তিগত জীবনে শরৎচন্দ্র বেশ রসিক আর আমুদে মানুষ ছিলেন। শেষ করা যাক,শরৎবাবুর তেমনই এক মজার গল্প দিয়ে। সেসময় ধারাবাহিকভাবে 'অরক্ষণীয়া' উপন্যাসটি প্রকাশিত হচ্ছে 'ভারতবর্ষ' পত্রিকায়। শেষ কিস্তিটি পড়ে হরিদাস চট্টোপাধ্যায় শরৎচন্দ্রকে অনুরোধ করলেন উপন্যাসের শেষ অংশটুকু বদলে দিতে।
অনুরোধ ঠেলতে না পেরে শেষমেষ কথাসাহিত্যিক বদলেও দিলেন শেষটা। উপন্যাসের শেষে দেখা গেল, জ্ঞানদাকে শ্মশান থেকে নিয়ে যাচ্ছে অতুল। কিন্তু তারপর তাদের কী হল, সে বিষয়ে বিস্তৃতভাবে আর কিছুই লেখেননি শরৎবাবু। কিন্তু পাঠকেরা মানবেন কেন! জ্ঞানদা-অতুলকে নিয়ে তাদের কৌতুহল তো বাঁধভাঙা। ব্যস, একের পর এক চিঠি আসতে শুরু করল দপ্তরে। সকলেই জানতে চায়, এরপর কী হবে! অতুল কি বিয়ে করবে জ্ঞানদাকে! পাঠকদের চিঠির ধাক্কায় তখন তো 'ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি' দশা সম্পাদকের। তিনি শরৎচন্দ্রকে অফিসে ডেকে পাঠালেন। প্রায় কাঁদো কাঁদো স্বরে মিনতি করলেন, 'কিছু একটা করুন শরৎবাবু!' সব শুনে শরৎচন্দ্র হাসতে হাসতে বললেন,' বলে দিন না, তারপর জ্ঞানদা বা অতুল কারও সঙ্গেই আর শরৎবাবুর দেখা হয়নি। তাহলেই লেঠা চুকে যায়।' হ্যাঁ, এমনই আশ্চর্য মানুষ ছিলেন বাঙালির অতিপ্রিয় লেখক শরৎচন্দ্র।