
শেষ আপডেট: 17 November 2018 10:11
অতিপ্রাকৃতিক ও আজগুবি তত্ত্ব
কেউ বলেছেন, ডুবে যাওয়া নগরী অাটলান্টিস থেকে নাকি অপদেবতারা আগুনের গোলা ছোঁড়েন। সমুদ্রগর্ভ থেকে উঠে আসে সেই সব আগুনের গোলা। আবার কারওর মত, সমুদ্রে নেমে আসা ভিনগ্রহের মহাকাশযান নাকি ধ্বংস করে দেয় জাহাজ ও বিমানগুলিকে।
কেউ বলেন, সাগরের নীচে থাকা চুম্বক-পাহাড় নাকি লোহার জাহাজ আর বিমানকে আকর্ষণ করে জলে আছড়ে ফেলে। ফোর্থ ডাইমেনশন বা চতুর্থ মাত্রার প্রসঙ্গও উঠেছে। মনে করা হয়, সময়ের এক অনন্ত ফাটল বারমুডা ট্রায়াঙ্গলে সক্রিয় থাকে। জাহাজ ও বিমান, সময়ের সেই রহস্যময় ফাটলে পড়ে হারিয়ে যায় বর্তমান কালের কাছ থেকে। তারা চলে যায় সুদূর অতীতের কোনও সময়ে, নয়তো ভবিষ্যতের গর্ভে।
যুদ্ধ বা শত্রুতা
যুদ্ধের সময় অনেক জাহাজ শত্রু পক্ষের অতর্কিত আক্রমণে ডুবে গিয়ে থাকতে পারে বলে মনে করা হয়। এ কারণেও জাহাজ বা বিমান নিখোঁজ হতে পারে বলে অনেকের ধারণা। যেমন মনে করা হয় ১৯১৮ সালে ইউ এস এস সাইক্লপস ( USS Cyclops) এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে সিস্টার শিপ প্রোটিয়াস (Proteu) এবং নিরিয়াস ( Nereus)-কে জার্মান সাবমেরিন ডুবিয়ে দেয়। কিন্তু পরবর্তীকালে জার্মান রেকর্ড ঘেঁটেও এর সত্যতা প্রমাণ করা যায়নি।
জলদস্যু এবং মাফিয়া
অনেকে বলেছেন, জলদস্যুদের আক্রমণে অনেক জাহাজ নিখোঁজ হয়ে থাকতে পারে। সে সময়ে প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিমাংশে এবং ভারত মহাসাগরে মালবাহী জাহাজ চুরি খুব সাধারণ ঘটনা ছিল। ১৫৬০ থেকে ১৭৬০ পর্যন্ত ক্যারিবিয়ান অঞ্চল ছিল জলদস্যুদের আখড়া। কুখ্যাত জলদস্যু এডওয়ার্ড টিচ (Blackbeard)) এবং জেন ল্যাফিট্টি ছিলেন এই অঞ্চলের বিভীষিকা। জলদস্যুরা সমুদ্রের ধারে রাতে আলো জ্বালিয়ে জাহাজের নাবিকদের বিভ্রান্ত করত।
নাবিকরা ওই আলো দেখে লাইট হাউস মনে করে সেদিকে এগিয়ে যেত, এবং ফাঁদে পড়ে সমুদ্রের গভীরে লুকিয়ে থাকা ডুবোপাহাড়ের ধাক্কা খেয়ে ডুবে যেত। ডোবা জাহাজের মালপত্র ঢেউয়ে ভেসে তীরে এলে দস্যুরা সেগুলো নিয়ে নিত। এও শোনা যায়, এই অঞ্চলের কুখ্যাত মাদক চোরাচালানকারীরা সুবিধা মত জাহাজ, নৌকা, ইয়ট ইত্যাদি চুরি করত মাদক চোরাচালানের জন্য। যাতে সেটা নির্বিঘ্নে করা যায়, তাই তারা বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের গল্প লিখিয়েছিল নিজস্ব লেখকদের দিয়ে।

জলের দানব ঘূর্ণি
বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের পশ্চিম প্রান্তে এক অদ্ভুত জিনিস দেখা গেছে। এখানে জলে তৈরি হওয়া অতিকায় ঘূর্ণিগুলি প্রচন্ড শক্তিশালী। এরা আশপাশে থাকা জাহাজগুলিকে অনায়াসে তার অতলস্পর্শী গহ্বরে টেনে নিতে পারে। প্রাচীন যুগের মানুষরা এই অতিকায় ঘূর্ণি দেখেই সমুদ্রের নিচে থাকা দৈত্যের কথা বলতেন।
নীল গহ্বর
বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের কালচে-নীল জলের তলায় রয়েছে অজস্র গুহা। ভৌগোলিক কারণে এগুলির আকার হয় বোতলের মতো। বোতলের মুখটা থাকে উপরের জলস্তরের ঠিক নীচে। এই বোতলগুলির নিচ দিয়ে আবার সুড়ঙ্গ পথ আছে। যেগুলি সংযুক্ত থাকে অন্য বোতল গুহার সঙ্গে। এগুলিকে নীল গহ্বর বলা হয়। যেগুলির মধ্যে বিচিত্রভাবে সমুদ্রের জল ঘোরাফেরা করে। নানা সময় তারা ভয়ঙ্কর শক্তিশালী স্রোত তৈরি করে সব কিছু টেনে নেয় নিজেদের ভেতরে।
বিস্ময়কর তলদেশ
বারমুডা ট্রায়াঙ্গল হিসেবে যে এলাকাকে চিহ্নিত করা হয়, আটলান্টিক মহাসাগরের সেই অংশের তলদেশের গঠন কিছুটা বিস্ময়কর। বিজ্ঞানীরা Sonar Mapping প্রযুক্তিতে বা শব্দ তরঙ্গ ছুঁড়ে তৈরি করা ম্যাপে কিছু অস্বাভাবিক বৈচিত্র বা বৈশিষ্ট্য পেয়েছেন। বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের ভেতরে ভয়ঙ্কর কিছু খাদ পাওয়া গেছে যেগুলি বেশ গভীর। এর ভেতরে জাহাজ বা বিমান ডুবে গেলে খুঁজে পাওয়া মুশকিল। কারণ এগুলির তলদেশে পৌঁছনো এখনও সম্ভব হয়নি।
গালফ স্ট্রিম
গালফ স্ট্রিম হল, মেক্সিকো উপসাগর থেকে Straits of Florida হয়ে উত্তর আটলান্টিকের দিকে প্রবাহিত উষ্ণ জলের স্রোত। বলা যেতে পারে মহাসাগরের মাঝে থাকা এক নদী। নদীর স্রোতের মতোই গালফ স্ট্রিম ভাসমান বস্তুকে স্রোতের দিকে ভাসিয়ে নিতে পারে। এমনই নাকি ঘটেছিল ১৯৬৭ সালের ২২ ডিসেম্বর। উইচক্রাফট নামের একটি প্রমোদতরী মিয়ামি উপকূল থেকে কয়েক মাইল দূরে ইঞ্জিনের সমস্যায় পড়ে। জাহাজের ক্যাপ্টেন তখন জাহাজটির অবস্থান মিয়ামি কোস্ট গার্ডকে জানায়। কিন্তু কোস্ট গার্ডরা সেখানে দ্রুত পৌঁছেও জাহাজটিকে খুঁজে পায়নি।
বিস্ময়কর আবহাওয়া
বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের ছোটো এলাকা জুড়ে কয়েক মিনিটের মধ্যে বিপজ্জনক ঝড় উঠতে পারে। ফলে আবহাওয়া বিজ্ঞানীরা ঝড়ের আগাম সতর্কতা দিতে পারেন না। স্যাটেলাইটও ওই এলাকার আবহাওয়ার গতি প্রকৃতি চিহ্নিত করতে পারে না। কিন্তু এই মারাত্মক ঝড়গুলি মুহূর্তের মধ্যে জাহাজ ও বিমান ধ্বংসের শক্তি রাখে। তা ছাড়াও এই এলাকায় দেখা যায় সামুদ্রিক টর্নেডো। যার ফলে সমুদ্রের জলে তৈরি জলস্তম্ভ আকাশ ছোঁয়। তার গতিপথে জাহাজ ও বিমান এসে পড়লে ধ্বংস অনিবার্য।
কম্পাসের গন্ডগোল
চুম্বকের উত্তর মেরু আর ভৌগোলিক উত্তর মেরু এক নয়। এর অর্থ হলো কম্পাস যেটাকে উত্তর (Magnetic North)দেখায়, সেটাই ভৌগোলিক উত্তর (True Geographic North Pole) নয়। সুতরাং, প্রতিমুহূর্তে দুই উত্তরের মধ্যে সামঞ্জস্য রেখে চলতে হয় জাহাজদের। কিন্তু, বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের ভেতরে একটি সঙ্কীর্ণ স্থানে কম্পাসের উত্তর মেরু ও ভৌগোলিক উত্তর মেরু এক হয়ে যায়। ফলে জাহাজ বা বিমান সঠিকভাবে দিক চিনতে না পারার জন্য কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে ভুল দিকে এগোয় ও ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনার কবলে পড়ে।
হারিকেন
শক্তিশালী সামুদ্রিক ঝড় হলো হারিকেন। আটলান্টিক মহাসাগরে, বিষুব রেখার কাছাকাছি অঞ্চলে,শক্তিশালী হারিকেনের কারণে সমুদ্র ও তটভূমিতে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। রেকর্ড থেকে জানা যায়, ১৫২০ সালে স্প্যানিশ নৌবহর ফ্রান্সিসকো দ্য বোবাডিলা এমনই একটি বিধ্বংসী হারিকেনের কবলে পড়ে ডুবে যায়। তাই অনেকের মতে, বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের কাহিনীর সঙ্গে জড়িত ঘটনাগুলির জন্য দায়ী হারিকেন।
সমুদ্রতলের ভূমিকম্প
বিজ্ঞানীরা বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের জলের নীচে অদ্ভুত সব কম্পন লক্ষ করেছেন। সেগুলি বেশ বড় মাপের ভূমিকম্প। এই ভূমিকম্পের ফলে সাগরজলে সুনামি দেখা দেয় কখনও কখনও। জাহাজডুবির কারণ হিসেবে সুনামিকেও দায়ী করেছেন অনেকে।
বিজ্ঞান যখন সত্যান্বেষী ব্যোমকেশের ভূমিকায়
ইলেকট্রনিক কুয়াশা ও হাচিসন এফেক্ট
কানাডার স্বঘোষিত আবিষ্কারক ও বিজ্ঞানী John Hutchison একটি পরীক্ষায় ইলেকট্রনিক কুয়াশা তৈরি করে দেখিয়েছিলেন। সেই কুয়াশার ভেতরে প্রবেশ করলে যে কোনও বৈদ্যুতিক যন্ত্র উল্টোপাল্টা কাজ করতে শুরু করে। অনেক বিজ্ঞান অনুরাগী বারমুডা ট্রায়াঙ্গল রহস্যকে হাচিসন এফেক্টের সঙ্গে জুড়তে চেয়েছেন। বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের ভেতরে এরকমই কোনও ইলেকট্রনিক কুয়াশা তৈরি হয়, এবং এই বিপজ্জনক কুয়াশা, জাহাজ ও বিমানগুলির কলকব্জা বিগড়ে দিয়ে তাদের দুর্ঘটনায় ফেলে।
দস্যু ঢেউ
ব্রিটিশ বিজ্ঞানীদের মতে ৩০ মিটার উঁচু দস্যু ঢেউ (rogue waves) বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের জাহাজডুবির কারণ। ব্রিটেনের সাউদাম্পটন ইউনিভার্সিটির বিশেষজ্ঞরা বিশ্বাস করেন ভয়ানক এই ঢেউ তত্ত্বে। ১৯৯৭ সালে সাউথ আফ্রিকার তটভাগে নাকি সেই ঢেউ দেখা গিয়েছিল। The Bermuda Triangle Enigma নামে একটি তথ্যচিত্র তৈরি করে বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন কী ভাবে ইন্ডোর সুইমিংপুলে সিমুলেটরের সাহায্যে দৈত্যকার ঢেউ তৈরি করা যায়।
সেই ঢেউয়ের সাহায্যে রিসার্চ টিম USS Cyclop এর মডেল জাহাজ ডুবিয়েছেন। কেন ওঠে এই ঢেউ? সাউদাম্পটন ইউনিভার্সিটির সমুদ্রবিজ্ঞানী ডঃ সাইমন বক্সাল বলেছেন, এই ভয়ঙ্কর এলাকায় তিন দিক থেকে তিনটি মারাত্মক ঝড় এক সঙ্গে আসতে পারে। যা 'দস্যু ঢেউ' বা rogue wave তৈরি করতে পারে। তিনি বিশ্বাস করেন বারমুডা ট্রায়াঙ্গলে বেশির ভাগ জাহাজ ডুবেছে এই দস্যু ঢেউয়ের জন্য।
ষড়ভূজাকৃতি মেঘ ও বাতাস বোমা
সবচেয়ে আধুনিক ও জনপ্রিয় তত্ত্বটি অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানী রন্ডি সেভেনি আবিষ্কার করেছেন। তিনি বলেছেন, বারমুডা ট্রায়াঙ্গলে বেশিরভাগ জাহাজ ও বিমান হারিয়ে যাওয়ার পেছনে দায়ী হচ্ছে ষড়ভূজাকৃতি মেঘ আর বাতাস বোমা।
যা আচমকাই প্রকান্ড বিস্ফোরণ ঘটিয়ে প্রচন্ড গতির বাতাস পাঠিয়ে দেয় চারদিকে, এমনকি সমুদ্রের তলাতেও। ঘণ্টায় ১৭০ থেকে ২৫০ মাইল গতিসম্পন্ন বাতাসের ধাক্কায় মুহূর্তে উত্তাল হয় সমুদ্র। ১৪ থেকে ৫০ মিটার উঁচু ঢেউ তোলে। ডুবে যায় অতিকায় জাহাজও। মিসাইলের মতো ছুটে আসা বাতাসের প্রচন্ড ধাক্কায় সমুদ্রে ভেঙে পড়ে আকাশে থাকা বিমানও।

