
শেষ আপডেট: 7 November 2018 11:43
রূপাঞ্জন গোস্বামী
আয়ুব খান এর রাজত্ব থেকে জেনারেল জিয়াউল হকের রাজত্ব। প্রায় ২৫ বছর পাকিস্তানকে সুরের মূর্ছনায় ভাসিয়েছেন এক বাঙালি। সৃষ্টিলগ্ন থেকেই আন্তর্জাতিক রাজনীতি থেকে ক্রিকেট মাঠ সব বিষয়েই ভারত পাকিস্তানে ঠোকাঠুকি লেগেই থাকে,তাই এই ২৫ বছরও তার ব্যতিক্রম ছিল না। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ক্ষমতা দখলের ময়দানে ইয়াহিয়া খান-ইন্দিরা গান্ধী, জুলফিকার আলি ভুট্টো-ইন্দিরা গান্ধী, তো ক্রিকেটের ময়দানে গাভাসকার-সরফরাজ নওয়াজ থেকে জাভেদ মিঁয়াদাদ- কৃষ্ণমাচারি শ্রীকান্ত, সব ক্ষেত্রেই ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে সেয়ানে সেয়ানে টক্কর চলছে। ়ইতিমধ্যে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছিল। বাঙালি মুক্তিবাহিনী রূপকথার যুদ্ধ লড়ছিল শেখ মুজিবের নেতৃত্বে। ভারত যথাসম্ভব সাহায্য করছিল মুক্তিবাহিনীকে। জেনারেল নিয়াজি হার মানছিলেন, পাকিস্তানি সেনা আত্মসমর্পণ করছিল ইস্টার্ন কমান্ডের লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে। পরাজয়ের অভিঘাতে ভারত আর বাংলাদেশের প্রতি, প্রকারান্তরে বাঙালির প্রতি তীব্র ঘৃণা উগরে দিচ্ছিলেন পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ। অন্যদিকে ভারত আর বাংলাদেশের সাধারণ মানুষও পাকিস্তানের প্রতি ততোধিক ঘৃণার বিস্ফোরণ ঘটাচ্ছিলেন। [caption id="attachment_49601" align="aligncenter" width="800"]
পাকিস্তানি সিনেমার অন্যতম সেরা সঙ্গীত পরিচালক রবীন ঘোষ[/caption]
আগ্নেয়গিরির মতো এহেন পরিস্থিতিতেও প্রায় পঁচিশ বছর ধরে পাকিস্তানের সিনেমা জগৎ বা ললিউড'কে সুরের জাদুতে মুগ্ধ রেখেছিলেন এক বাঙালি, রবীন ঘোষ। ভারতীয় বাঙালিরা তাঁর নাম না জানলেও, পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম তাঁর সঙ্গে ভারতের সবচেয়ে বিখ্যাত সঙ্গীত পরিচালক আর ডি বর্মণের তুলনা করে। কেউ রবীন ঘোষকে বলেন পাকিস্তানের আর ডি, কেউ আরেকটু এগিয়ে বলেন পাকিস্তানের নৌশাদ। ১৯৬১ থেকে ১৯৮৬,এই পঁচিশ বছর তিনি পাকিস্তানের ফিল্মজগতকে তাঁর গানে এবং সুরে মাতিয়ে দিয়েছিলেন।
[caption id="attachment_49579" align="aligncenter" width="736"]
লাহোরে বন্ধন ছবির সেটে রবীন ঘোষ (ছবির একেবারে বাম দিকে )[/caption]
প্রথম যৌবনে অবিস্মরণীয় বাঙালি সঙ্গীত পরিচালক সলিল চৌধুরীর সহকারী হয়ে কাজ করতে করতে ফিল্মে সঙ্গীত পরিচালক হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন রবীন ঘোষ। ১৯৬০-এর দশকের শুরুতে পাকিস্তানের ফিল্ম ডিরেক্টর এহতেশাম সাহেব ঢাকায় আসেন। তিনি শ্রী ঘোষকে তাঁর বাংলা ছবি 'রাজধানীর বুকে'-এর মিউজিক ডিরেক্টর হওয়ার প্রস্তাব দেন। এই ছবির গান সুপারহিট হওয়ার পর, ফিল্ম ডিরেক্টর এহতেশামের আমন্ত্রণ গ্রহণ করে রবীন ঘোষ চলে আসেন পশ্চিম পাকিস্তানের লাহোরে।
শুরু হয় সূরের মূর্ছনায় এক বাঙালির পাকিস্তান দখলের পালা। তাঁর সুর দেওয়া প্রথম সুপারহিট ছবিটি ছিল চকোরি (১৯৬৭)। সেই ছবিতে তাঁর সুরে 'জাঁহা তুম উঁহা হাম' গেয়েছিলেন পাকিস্তানের সেরা প্লে-ব্যাক সিঙ্গার,পাকিস্তানের মহম্মদ রফি আহমেদ রুশদি। এর পর রবীন ঘোষকে আর ফিরে তাকাতে হয়নি। শুধু তাঁর সুর দেওয়া গানের জন্যই ছবি হিট হতে থাকে পাকিস্তানে।
[caption id="attachment_49581" align="aligncenter" width="702"]
রবীন ঘোষ সুরারোপিত 'ভুল' ছবির পোস্টার[/caption]
চান্দা (১৯৬২), তালাশ (১৯৬৩),প্যায়সা (১৯৬৪), ভাইয়া (১৯৬৬), চকোরি (১৯৬৭), এহসাস (১৯৭২), চাহাত (১৯৭৪),আইনা (১৯৭৭), বন্দিশ(১৯৮০), দুরিয়াঁ (১৯৮০), পাকিস্তানের চলচ্চিত্র জগতকে একের পর এক হিট ছবি দিয়ে গেছেন, স্রেফ গানের জোরে। প্রায় একশোর বেশি হিট পাকিস্তানি ছবিতে সুর দিয়েছেন রবীন বাবু।
পাকিস্তানের মিডিয়ার সামনে রবীন ঘোষ ও স্ত্রী শবনম[/caption]
রবীন ঘোষের সুরে হারানো দিন ছবির 'আমি রূপ নগরের রাজকন্যা', নাচের পুতুল ছবির ‘আয়নাতে ওই মুখ দেখবে যখন’ গানগুলি সুপারহিট হয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুম গুলিতে ছাত্ররা গাইত রবীন ঘোষের সুর দেওয়া ‘পিচ ঢালা এই পথটারে ভালবেসেছি’ গানটি। তবে, পাকিস্তানের সেরা মিউজিক ডিরেক্টর রবীন ঘোষের জীবনের শুরুর ছবিটির মতো শেষ ছবিটিও ছিলো বাংলা। জীবনের শেষবারের মতো বাঙলা ছবিতেই সঙ্গীত পরিচালনা করেছিলেন, ছবির নাম ছিল আমার সংসার (১৯৯২)।
[caption id="attachment_49584" align="aligncenter" width="400"]
রবীন ঘোষের অন্যতম হিট ছবি 'আয়না'-এর পোস্টার[/caption]
পাকিস্তানের সেরা সঙ্গীত পরিচালক রবীন ঘোষ,তাঁর চলচ্চিত্র অভিনেত্রী স্ত্রী শবনম'কে নিয়ে ১৯৯৮ সালে স্থায়ীভাবে ফিরে এসেছিলেন বাংলাদেশে। আর গানে সুর দিতেন না। ছিলেন বিশ্রামে। অবশেষে, ২০১৬ সালে ঢাকার গুলশনে ৭৮ বছর বয়সে প্রয়াত হন এই উপমহাদেশের একজন শ্রেষ্ঠ মিউজিক ডিরেক্টর রবীন ঘোষ।
যাঁর সুর পাকিস্তানে পরিচিত ছিলো 'সিরাপি' হিসেবে। কারণ সিরাপের মতোই মিষ্টি সুর দিতেন। তাঁর মৃত্যুর পর পাকিস্তানের বিখ্যাত পত্রিকা ডন লিখেছিল , সুরের জাদুতে একই সময় দুটি পৃথক রাষ্ট্রকে (১৯৭১ পরবর্তী) মুগ্ধ করেছেন এক ব্যক্তি,এরকম উদাহরণ বিশ্বে বিরল।
[caption id="attachment_49578" align="aligncenter" width="731"]
সুপারহিট আয়না ছবির রেকর্ড হাতে রবীন ঘোষ[/caption]
'ডন'পত্রিকাটি তাঁর সুরারোপিত সেরা দশটি গানের লিস্ট তৈরি করেছিল পাকিস্তানের জনমত অনুসারে। সেই দশটি গান হল,
কভি তো তুমকো ইয়াদ আয়েগি - গায়ক আহমেদ রুশদি (চকোরী, ১৯৬৭)
হামে খোকর বহত পচতাওগে - গায়িকা রুনা লায়লা (এহসাস, ১৯৭২)
সাওন আয়ে – গায়ক গায়িকা ইখলাক আহমেদ ও রুনা লায়লা, (চাহত ১৯৭৪)
পেয়ার ভরে দো শর্মিলে নয়ন- গায়ক মেহেদী হাসান (চাহত ১৯৭৪)
দেখো ইয়ে কোন আগায়া- গায়ক ইখলাক আহমেদ (দো সাথী,১৯৭৫)
মুঝে দিল সে না ভুলানা - বিভিন্ন শিল্পী (আয়না ১৯৭৭)
কভি ম্যায় সোচতা হুঁ -গায়ক মেহদী হাসান (আয়না, ১৯৭৭)
মিলে দো সাথী- গায়ক এ, নাইয়ার ( অম্বর,১৯৭৮)
সোনা না চান্দি না কোই মহল- গায়ক ইখলাক আহমেদ (বন্দিশ ১৯৮০)
শাম্মা, উয়ো খোয়াব সা শাম্মা - গায়ক ইখলাক আহমেদ (নহি আভি নহি, ১৯৮০)
কিন্তু একটাই দুঃখ, বাঙালি হয়েও পশ্চিমবঙ্গের বাংলা সিনেমায় আমরা রবীন ঘোষকে পেলাম না। ভাবুন তো পর্দায় উত্তমকুমারের লিপে মান্না দে'র কণ্ঠে রবীন ঘোষের 'সিরাপি' সুর। অবাক লাগে, কেউ কেন ভাবেননি এই কম্বিনেশন! আকাশজোড়া আক্ষেপটা তাই থেকেই গেল।