শেষ আপডেট: 26 February 2020 15:15
কপোতাক্ষ নদ[/caption]
রাড়ুলী গ্রামে আজও আছে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের বাড়ি।[/caption]
কপোতাক্ষের বুক বেয়ে রায় বাড়ির নৌকাগুলির আসা যাওয়া লেগেই থাকত। নৌকায় থাকা বাবু কিংবা মাঝিদের কাছ থেকে রায় বাড়ির সব খবর পেত কপোতাক্ষ। এছাড়া ফুলু নিজেই আসত কপোতাক্ষের তীরে। ছোটবেলায় পরিবারের কারও সঙ্গে, একটু বড় হওয়ার পর একা। কপোতাক্ষের বুকে দু'চোখ ভাসিয়ে বসে কীসব ভাবত ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কপোতাক্ষও একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকত বন্ধুর দিকে।
জমিদার হয়েও ফুলুর বাবা ছিলেন ইংরাজি , আরবি ও ফারসী ভাষায় বিশারদ। বাড়িতে ছিল প্রকাণ্ড এক লাইব্রেরি। দেশী বিদেশী বই কতো যে ছিল সেই লাইব্রেরিতে তার ইয়ত্বা নেই। জমিদারী ভুলে সব সময় জ্ঞানার্জনের চেষ্টা করতেন। হিন্দু জমিদার হয়েও ফুলুর বাবার সামান্যতম ধর্মীয় গোঁড়ামি ছিল না। উদারচেতা এবং অসাম্প্রদায়িক মানুষটি বাড়িতে একজন মৌলবী নিয়োগ করেছিলেন আরবি ও ফারসী ভাষা শেখা ও কোরান বোঝার জন্য।
নারীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা বুঝে হরিশচন্দ্র রায় ফুলুর জন্মের অনেক আগে গ্রামের বালিকাদের পড়াশুনার জন্যএকটি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন । স্ত্রী ভূবন মোহিনীর নামে। এটা ছিল খুলনা জেলার প্রথম বালিকা বিদ্যালয়। ফুলুর মা ভূবনমোহিনী দেবী সে যুগের আর পাঁচজন সাধারণ গৃহিণীর মতো ছিলেন অন্তঃপুরবাসিনী ছিলেন না। স্বামীর লাইব্রেরিতে দিনের কিছু সময় কাটত তাঁরও। ফুলুর লেখাপড়ার হাতেখড়ি হয়েছিল তাঁরই হাতে।
[caption id="attachment_190074" align="aligncenter" width="2591"]
রাড়ুলীর সেই ভূবন মোহিনী বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়। বয়স এখন ১৭০ বছর।[/caption]
ছোটবেলায় ভীষণ দুরন্ত ছিল ফুলু। তাকে বাগে আনতে হিমশিম খেয়ে যেত সবাই। কিন্তু বই হাতে পড়লেই পালটে যেত ফুলু। মায়ের কাছটিতে বসে চুপ করে লক্ষী ছেলের মত পড়া করে নিত। বাবার স্থাপন করা এম ই স্কুলে ভর্তি হয়েছিল ফুলু। পড়াশুনায় বরাবর চৌখশ ছিল সে। কপোতাক্ষের বুক পেরিয়ে ফুলুর শিক্ষকেরা যখন বিকেল বেলা বাড়ি ফিরতেন। তাঁদের মুখ থেকে ফুলুর প্রশংসা শুনতে পেত কপোতাক্ষ।
ফুলু প্রথম গ্রাম ছেড়েছিল ১৮৭২ সালে, চলে গিয়েছিল কলকাতায় পড়াশুনা করতে। কপোতাক্ষের মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু দুবছর পরেই ফুলু আবার ফিরে এসেছিল। কপোতাক্ষ শুনেছিল কলকাতায় গিয়ে ফুলু রক্ত আমাশায় ভুগত । ফিরে এসে এসে রাড়ুলিতে দুই বছর ছিল ফুলু। খুব খুশি হয়েছিল কপোতাক্ষ। তখন অবশ্য ফুলুর দাপাদাপি অনেক কমে গিয়েছিল। নদীর তীরে বড় একটা আসত না। অসুস্থ ফুলুকে যদিও দেখতে ইচ্ছা করত কপোতাক্ষের। কিন্তু সে জানত ঈশ্বর তাকে সে ক্ষমতা দেয়নি।
[caption id="attachment_190077" align="aligncenter" width="3000"]
বাড়িটির যে অংশে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় থাকতেন।[/caption]
অন্যদিকে তার প্রিয় কবি ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ফুলুকে একবার বিশ্বকবি লিখেওছিলেন, “...যেসব জন্ম-সাহিত্যিক গোলমালের মধ্যে ল্যাবরেটরির মধ্যে ঢুকে পড়ে, জাত খুইয়ে বৈজ্ঞানিকের হাটে হারিয়ে গিয়েছেন তাদের ফের জাতে তুলব। আমার এক একবার সন্দেহ হয় আপনিও বা সেই দলের একজন হবেন।" আসলে বিশ্বকবি অনুভব করেছিলেন, বিলেতে পড়াশুনা করলেও এবং ইংরেজিতে চোস্ত হলেও বাংলা ভাষা ছিল ফুলুর প্রাণ এবং ফুলুর মধ্যে লুকিয়ে ছিল এক সাহিত্যিক।
ফুলুর ৭০ তম জন্মজয়ন্তীর দিনে রবীন্দ্রনাথ এসেছিলেন, আবেগমথিত কণ্ঠে বিশ্বকবি বলেছিলেন, ‘আমরা দুজনে সহযাত্রী, কালের তরীতে আমরা প্রায় একঘাটে এসে পৌছেছি।" সেদিন রবীন্দ্রনাথ ফুলুর হাতে তুলে দিয়েছিলেন একটি তাম্রফলক, তাতে খোদাই করা ছিল কবির লেখা দুটি লাইন -‘প্রেম রসায়নে ওগো সর্বজনপ্রিয়, করিলে বিশ্বের জনে আপন আত্মীয়।'
ফুলুকে বলা হয় 'বিজ্ঞানীদের বিজ্ঞানী'। ফুলুর ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন, ড: মেঘনাথ সাহা, হেমেন্দ্র কুমার সেন, বিমান বিহারী দে,জ্ঞানেন্দ্র নাথ রায়, জ্ঞান চন্দ্র ঘোষ, জ্ঞানেন্দ্র নাথ মুখোপদ্যায়, ড: কুদরত-ই-খুদা, প্রিয়দা ভন্জন রায়, রাজেন্দ্র লাল দে, ফজলুল হক, প্রফুল্ল কুমার বসু, বীরেশ চন্দ্র গুহ, অসীমা চ্যাটার্জী ও আরও অসংখ্য বিখ্যাত মানুষজন।
কপোতাক্ষ জানে ফুলু বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সভায় বলত জাতীয়তাবাদের কথা দেশপ্রেমের কথা, মুক্তি সংগ্রামের কথা।ব্রিটিশ গোয়েন্দারা বলত ফুলু নাকি বিজ্ঞানীর ছদ্মবেশে বিপ্লবী। ফুলু নাকি বঙ্গভঙ্গ আন্দোলোনের সময় বিপ্লবীদের অস্ত্র কেনার টাকা দিতো। ফুলুর দেশপ্রেম এতই উগ্র ছিল, যে ঢাকার একজন উচ্চপদস্থ অফিসার বলতে বাধ্য হয়েছিলেন, "স্যার পি.সি. রায়ের মতো লোক যদি আধ-ডজন থাকতেন, এতদিনে দেশ স্বাধীন হয়ে যেত।"
১৯১৯ সালে ফুলুকে ব্রিটিশরা দিয়েছিল Companion of the Indian Empire(C.I.E.) উপাধি, সেই বছরই কলকাতার টাউন হলে রাউলাট বিলের বিরোধিতায় গর্জে উঠেছিল ফুলু, বলেছিল, ‘দেশের জন্য প্রয়োজন হলে বিজ্ঞানীকে টেস্ট টিউব ছেড়ে গবেষণাগারের বাইরে আসতে হবে। বিজ্ঞানের গবেষণা অপেক্ষা করতে পারে, কিন্তু স্বরাজের জন্য সংগ্রাম অপেক্ষা করতে পারে না।"
[caption id="attachment_190096" align="aligncenter" width="930"]
আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের ল্যাবরেটরি[/caption]
এর কিছুক্ষণ পরেই কংগ্রেস নেতা ড. প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ এসেছিলেন ফুলুর কাছে, তাঁর তিনহাজার টাকা দরকার ছিল। যে যুগে এক পয়সায় দুটো কলা পাওয়া যেত, সে যুগে তিন হাজার টাকার মুল্য সহজেই অনুমেয়। বিনা বাক্যব্যয়ে তিনহাজার টাকার চেক লিখে দিয়েছিল ফুলু। খবরটা শুনে কপোতাক্ষ তার বুকে ঢেউ তোলা বাতাসকে বলেছিল,"ঠিক বাবার মতো হয়েছে ফুলুটা।"
'বিজ্ঞানীদের বিজ্ঞানী' রাড়ুলীর ফুলুর নাম তখন সারা বিশ্ব জানে। সাইমন কমিশনের সদস্যরা বিজ্ঞান কলেজের কথা ও ফুলুর কথা লন্ডনে অনেক শুনেছিল। তারা কলকাতায় এসে বিজ্ঞান কলেজ পরিদর্শনে এসেছিল, আসল উদ্দেশ্য ছিল ফুলুকে দেখা। এক দুপুরে তারা ফুলুর ঘরে এসে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গিয়েছিল। 'বিজ্ঞানীদের বিজ্ঞানী' মারকিউরাস নাইট্রাইটের আবিস্কারক স্যার পি,সি,রায় গামছা পরে চেয়ারে বসে আছেন। কারণ ফুলু তার ধুতি খানা কেচে রোদে শুকাতে দিয়েছিল। ঘরের এক কোণে স্টোভ জ্বলছে, নিজের খাবার নিজেই রান্না করছিল ফুলু। একটু লজ্জা না পেয়ে ফুলু নাকি সেই অবস্থাতেই সাইমন কমিশনের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেছিলেন।