Date : 15th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
ক্যান্ডিডেটস জিতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে গুকেশের মুখোমুখি সিন্দারভ, ড্র করেও খেতাবের লড়াইয়ে বৈশালীIPL 2026: চেন্নাইয়ের বিরুদ্ধে হেরে টেবিলের তলানিতে কেকেআর! গুরুতর বদলের ইঙ্গিত রাহানের নববর্ষের 'শুভনন্দন'-এও মুখ্যমন্ত্রীর SIR তোপ! বাংলায় পয়লা বৈশাখের শুভেচ্ছা প্রধানমন্ত্রীরইরানের সব পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ করে‌ দেওয়া হয়েছে, দাবি আমেরিকার, চিন্তা ইরানি ল্যান্ডমাইনও Poila Baisakh: দক্ষিণেশ্বর থেকে কালীঘাট, নববর্ষে অগণিত ভক্তের ভিড়, পুজো দিতে লম্বা লাইনপয়লা বৈশাখেই কালবৈশাখীর দুর্যোগ! মাটি হতে পারে বেরনোর প্ল্যান, কোন কোন জেলায় বৃষ্টির পূর্বাভাসমেয়েকে শ্বাসরোধ করে মেরে আত্মঘাতী মহিলা! বেঙ্গালুরুর ফ্ল্যাটে জোড়া মৃত্যু ঘিরে ঘনীভূত রহস্য UCL: চ্যাম্পিয়নস লিগের শেষ চারে পিএসজি-আতলেতিকো, ছিটকে গেল বার্সা-লিভারপুল‘ইরানকে বিশ্বাস নেই’, যুদ্ধবিরতির মাঝে বিস্ফোরক জেডি ভ্যান্স! তবে কি ভেস্তে যাবে শান্তি আলোচনা?১৮০ নাবালিকাকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে শোষণ! মোবাইলে মিলল ৩৫০ অশ্লীল ভিডিও, ধৃতের রয়েছে রাজনৈতিক যোগ

অকল্পনীয়ভাবে পাঁচটি মৃত্যু রুখেছিলেন রঞ্জন, বেঁচে গিয়েছিল অনাহারে থাকা মৌজউদ্দিনের পরিবার

রূপাঞ্জন গোস্বামী ২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসের এক সকাল গত সাতদিন ধরে প্রচুর বরফ পড়েছে কাশ্মীরের হাপাতনারে। তিন চার ফুট বরফের নীচে ডুবে গিয়েছে কাশ্মীরি গ্রামগুলি। রাস্তাঘাট বরফে ঢাকা। গাড়ি চলছে না। মানুষজনের চলাফেরা প্রায় বন্ধ। সেই সকালে, এক কো

অকল্পনীয়ভাবে পাঁচটি মৃত্যু রুখেছিলেন রঞ্জন, বেঁচে গিয়েছিল অনাহারে থাকা মৌজউদ্দিনের পরিবার

শেষ আপডেট: 6 April 2020 04:48

রূপাঞ্জন গোস্বামী
২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসের এক সকাল
গত সাতদিন ধরে প্রচুর বরফ পড়েছে কাশ্মীরের হাপাতনারে। তিন চার ফুট বরফের নীচে ডুবে গিয়েছে কাশ্মীরি গ্রামগুলি। রাস্তাঘাট বরফে ঢাকা। গাড়ি চলছে না। মানুষজনের চলাফেরা প্রায় বন্ধ। সেই সকালে, এক কোমর বরফ ভেঙে এগিয়ে চলেছিলেন  রঞ্জন যোশী। চলেছিলেন  পাহাড়ের ওপরে থাকা চারাগপোরা গ্রামে। যুবক রঞ্জন জম্মু-কাশ্মীর সরকারের সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার দপ্তরের কর্মী। কী করে গ্রামটির কাছে পৌঁছবেন, তা তিনি জানতেন না। তবুও তাঁকে যেতেই হবে। যে খবরটা তিনি পেয়েছিলেন, সেটা শোনার পর চুপ করে ক্যাম্পে বসে থাকতে পারেননি। তাই হাড় কাঁপানো ঠান্ডায়, মাট্টানেরর ক্যাম্প থেকে হেঁটেই রওনা হয়েছিলেন চারাগপোরা গ্রামের উদ্দেশ্যে। কাশ্মীরের এই এলাকাটা জঙ্গি অধ্যুষিত। যেকোনও মুহূর্তে ভারতীয় সেনার লোক বা চর ভেবে পাহাড়ের ওপর থেকে গুলি ছুটে আসতে পারে। রঞ্জনকে কিডন্যাপ করা হতে পারে। কেউ জানতেও পারবে না, কোন পাহাড়ের কোন খাদে রঞ্জনের লাশ পড়ে আছে। তবুও রঞ্জন বরফ ঠেলে এগিয়ে চলেছিলেন। প্রায় চার ঘন্টা বরফ ঠেলে গ্রামটির কাছে অবশেষে পৌঁছে গিয়েছিলেন রঞ্জন। প্রবল শৈত্যপ্রবাহের জন্য গোটা গ্রাম ঘরবন্দি। কুকুরের ডাক ছাড়া আর কোনও শব্দ কানে আসে না। রঞ্জনের কাছে থাকা পরিসংখ্যান বলছে, হতদরিদ্র গ্রামটির প্রায় সবাই ঠিকা শ্রমিক। নিজেদের নামমাত্র কৃষি জমিও নেই। রঞ্জনের পায়ের তলায় বরফ ভাঙার শব্দ পেয়ে একজন মধ্যবয়স্ক ব্যক্তি জানলা ফাঁক করেছিলেন। রঞ্জন তাঁর কাছ থেকে আবার খবরটির সত্যতা যাচাই করে নিয়েছিলেন। ব্যক্তিটি, দূরে একটি টিনে ছাদ দেওয়া ঘর দেখিয়ে দিয়েছিলেন।
“মৌজউদ্দিন সাব, ম্যায় আ গায়া হুঁ”
ভগ্নপ্রায় মাটির বাড়িটির কাছে পৌঁছে, ভাঙা দরজায় আস্তে ধাক্কা দিয়েছিলেন রঞ্জন। মিনিট দশেক পর দরজা খুলেছিলেন বছর তিরিশের এক মহিলা। দরজা খুলেই মাটিতে বসে পড়েছিলেন মহিলাটি। কয়েক মিনিট দাঁড়িয়ে থাকারও শক্তি ছিল না তাঁর। দেরি না করে দরজা ঠেলে, ঘরের ভেতর ঢুকে পড়েছিলেন রঞ্জন। চেঁচিয়ে বলেছিলেন, “মৌজউদ্দিন সাব, ম্যায় আ গায়া হুঁ”। কাশ্মীরের হাড় কাঁপানো ঠান্ডায়, ঘরের তোষকহীন মেঝেতে শোয়া চারটি শরীর নড়ে উঠেছিল। অবাক বিস্ময়ে রঞ্জন দেখেছিলেন, মেঝেতে পাতা চাদরের ওপর শুয়ে আছেন এক বৃদ্ধ, এক বৃদ্ধা আর দুটি বাচ্চা। ঘরে ন্যূনতম খাবার কিছু পাননি রঞ্জন,তন্নতন্ন করে খুঁজেও। কয়েকদিন আগেই সোর্স মারফৎ এই ভয়ঙ্কর খবরটি পেয়েছিলেন রঞ্জন। হাপাতনারের এই পরিবারটি দীর্ঘদিন অনাহারে আছে। ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন ৭৮ বছরের মৌজউদ্দিন ভাট, তাঁর স্ত্রী রাজা বেগম, তাঁদের পুত্রবধূ ও ছোট্ট দুই নাতি। অনাহারের ফলে উঠে বসা আর কথা বলার ক্ষমতা হারিয়েছেন প্রায় সবাই। ঘরের ভেতরের মলমুত্র ত্যাগ করে ফেলেছেন। [caption id="attachment_205218" align="aligncenter" width="533"] মৌজউদ্দিন ভাট।(সুস্থ হওয়ার দশ দিন পরের ছবি )[/caption] বাড়িতে পুরুষ বলতে একমাত্র মৌজউদ্দিন ভাট। আট বছর আগে, সত্তর বছর বয়েসে শ্রমিকের কাজ করতে গিয়ে ডান পা ভেঙ্গে প্রতিবন্ধী। উপার্জনের ক্ষমতা হারিয়েছিলেন। ঘটনাটির ৬ মাস আগে মৌজউদ্দিন ভাটের একমাত্র ছেলে ফাইয়াজ আহমেদকে জম্মুর পুলিশ ড্রাগ পাচারের দায়ে গ্রেফতার করেছিল। ফাইয়াজ শ্রমিকের কাজ করত। সে গ্রেফতার হওয়ায় পরিবারটির আয়ের একমাত্র উৎসও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ফলে গত ছমাস ধরে প্রায় অনাহারে ছিল পরিবারটি।
চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি রঞ্জন
শীর্ণ শিশুগুলি শেষ তিন চারদিন কিছু খায়নি। রঞ্জন সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, "আমি দারিদ্র দেখেছি, কিন্তু মানুষকে এত ভয়ংকর অবস্থায় থাকতে সেই প্রথম  দেখেছিলাম।" রঞ্জন যোশী ভেবেছিলেন, পাঁচটি প্রাণ বাঁচাবার কিছু ব্যবস্থা সেই মুহূর্তেই করতে হবে। বরফ ঠেলে আবার কয়েক কিলোমিটার নীচে নেমে এসেছিলেন রঞ্জন। বরফে ঢাকা একটি মুদির দোকান প্রায় জোর করে খুলিয়েছিলেন। তারপর, যতটা ওজন তাঁর পক্ষে কাঁধে নিয়ে বরফ ভাঙা সম্ভব, ততটা ওজনের খাবার কিনে আবার পাহাড় চড়তে শুরু করেছিলেন। মৌজউদ্দিন ভাটের বাড়িতে ফিরে, কাঠ জ্বালিয়ে, দুধ গরম করে নিজের হাতে সবাইকে খাইয়েছিলেন। সারাদিন ধরে পরিবারের সদস্যদের সুস্থ করে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছিলেন। সন্ধ্যা নামার আগে ফিরে এসেছিলেন নিজের ক্যাম্পে। দু’দিন পরে তিনি আবার চারাগপোরা গ্রামে ফিরে গিয়েছিলেন, আবার কয়েক কিলোমিটার বরফ ভেঙে। সহকর্মীদের দেওয়া কিছু খাবার পরিবারটিকে দিয়ে এসেছিলেন। রঞ্জন দেখেছিলেন, প্রবল ঠান্ডায় পরিবারটির গায়ে শীতবস্ত্র বলতে কিছু ছিল না। দরজার ভাঙা পাল্লা দিয়ে হু হু করে বরফ ঠান্ডা হাওয়া ঢুকছিল। ঠান্ডায় বাচ্চাগুলোর অবস্থা একেবারে সঙ্গীন। সেদিন ক্যাম্পে ফিরে নিজেকেই প্রশ্ন করেছিলেন রঞ্জন, এ ভাবে কতদিন চলবে! [caption id="attachment_205222" align="aligncenter" width="500"] ডান দিক থেকে দ্বিতীয় মৌজউদ্দিন ভাটের স্ত্রী, তাঁর পাশে দুই নাতি ও পুত্রবধু (সুস্থ হওয়ার দশ দিন পরের ছবি )[/caption]
চারদিনে ১৭ লাখ টাকা তুলে দিয়েছিল সোশ্যাল মিডিয়া
প্রথম দিন মৌজউদ্দিন ভাটের ঘরে ঢুকেই মোবাইল ফোনে ২০ সেকেন্ডের একটি ভিডিও তুলেছিলেন রঞ্জন। ঘরের ভেতরের ছবি, পরিবারটির মৃতপ্রায় সদস্যদের ছবি। এর কারন হিসেবে রঞ্জন বলেছিলেন,“ আমি শুধু এঁদের অবস্থাটা মনে রাখার জন্যই ভিডিওটা নিয়েছিলাম,যাতে এত মানুষের ভিড়ে তাঁদের কথা ভুলে না যাই। তাছাড়া, এই ভিডিওটা দেখিয়ে আমি আমার দফতরকে বোঝাতে পারব এঁদের অবস্থা।” রঞ্জনের বন্ধুরা বলেছিলেন ভিডিওটি ফেসবুকে পোস্ট করতে। মৌজউদ্দিন ভাটের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের ডিটেলস দিয়ে, পরিবারটির জন্য সাহায্য চেয়ে ফেসবুকে একটি পোস্ট করেছিলেন রঞ্জন। অবিশ্বাস্য সাড়া এসেছিল ফেসবুক থেকে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মুম্বাই, দিল্লি এমনকি বিদেশ থেকেও মেসেঞ্জারে ফোন আসতে শুরু করেছিল। সবাই জানতে চেয়েছিলেন, কী ভাবে তাঁরা সাহায্য করবেন। রঞ্জন তাঁদের বলেছিলেন, যে যা দিতে চান তা যেন মৌজউদ্দিন সাহেবের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমা করে দেন। মাত্র ৪ দিনে উঠেছিল ১৭ লাখ টাকা। রঞ্জন নিজে ৩৫০০০ টাকা দিয়েছিলন। সেই মুহূর্তে তার বেশী দেওয়ার ক্ষমতা তাঁর ছিল না। [caption id="attachment_205223" align="aligncenter" width="800"] বাড়ির সামনে রাজ বেগম ও তাঁর পুত্রবধু (সুস্থ হওয়ার পরের ছবি)[/caption]
সুস্থ হয়ে উঠেছিল পরিবারটি
ইতিমধ্যে, খাবার ও শীতবস্ত্র পেয়ে মৌজউদ্দিনের পরিবারের সবাই অনেকটা সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন। তাঁরা মহান আল্লাহ‘র কাছে রঞ্জনের জন্য প্রার্থনা করেছিলেন। প্রার্থনা করেছিলেন তাঁদের জন্যও, যাঁরা দেশ বিদেশ থেকে সাহায্য পাঠিয়েছেন।মৌজউদ্দিন ভাটের স্ত্রী রাজ বেগম সজল চোখে সাংবাদিকদের বলেছিলেন,”চোখের সামনে মৃত্যুকে দেখে, আমরা ভেবেছিলাম মানবিকতা মরে গেছে। রঞ্জনকে দেখে বুঝলাম মানবিকতা এখনও খুন হয়নি।” [caption id="attachment_205224" align="aligncenter" width="959"] রুপকথার রাজপুত্র রঞ্জন যোশী।[/caption] ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসের ২৮ তারিখে, পৃথিবী থেকে চলে গিয়েছিলেন মৌজউদ্দিন ভাট। তাঁর অ্যাকাউন্টে জমা অর্থ, পরিবারের প্রত্যেকের নামে অ্যাকাউন্ট খুলে সমান ভাগে ভাগ করে দিয়েছিলেন রঞ্জন। এমনকি শিশু দুটির জন্যে খুলে দিয়েছিলেন মাইনর অ্যাকাউন্ট। বাবার মৃত্যুর কয়েকদিন পর কারাগার থেকে ছাড়া পেয়েছিলেন ছেলে ফাইয়াজ। চারাগপোরা ফিরে আবার হাল ধরেছিলেন সংসারের। বাড়ি ফিরে মায়ের কাছে ফাইয়াজ শুনেছিলেন এক রূপকথার নায়কের কথা। যিনি তাঁর পরিবারের কাছে মসিহা হয়ে এসেছিলেন। বরফ ঢাকা পথ সেই রাতেই পেরিয়ে রঞ্জনের ক্যাম্পে গিয়ে ফাইয়াজ বুকে জড়িয়ে ধরেছিলেন রঞ্জনকে। সেই রঞ্জন যোশীকে, যাঁর পরিবারকে তিরিশ বছর আগে কাশ্মীর থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।

```