Date : 15th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
‘ইরানকে বিশ্বাস নেই’, যুদ্ধবিরতির মাঝে বিস্ফোরক জেডি ভ্যান্স! তবে কি ভেস্তে যাবে শান্তি আলোচনা?১৮০ নাবালিকাকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে শোষণ! মোবাইলে মিলল ৩৫০ অশ্লীল ভিডিও, ধৃতের রয়েছে রাজনৈতিক যোগ ৩৩ বছর পর মুখোমুখি ইজরায়েল-লেবানন! ওয়াশিংটনের বৈঠকে কি মিলবে যুদ্ধবিরতির সমাধান?ইউরোপের আদালতে ‘গোপনীয়তা’ কবচ পেলেন নীরব মোদী, জটিল হচ্ছে পলাতক ব্যবসায়ীর প্রত্যর্পণ-লড়াইইরানের সঙ্গে সংঘাত এবার শেষের পথে? ইঙ্গিত ভ্যান্সের কথায়, দ্বিতীয় বৈঠকের আগে বড় দাবি ট্রাম্পেরওIPL 2026: টানা চতুর্থ হারে কোণঠাসা কেকেআর, ৩২ রানে ম্যাচ জিতল সিএসকে‘ভূত বাংলো’য় সেন্সর বোর্ডের কাঁচি! বাদ গেল ৬৩টি দৃশ্য, ছবির দৈর্ঘ্য কমতেই চিন্তায় অক্ষয়ভোটের ডিউটিতে কড়া নিয়ম! প্রিসাইডিং ও সেক্টর অফিসারদের জন্য একগুচ্ছ নির্দেশিকা কমিশনের'বন্ধু' মোদীকে ফোন ট্রাম্পের! ৪০ মিনিট ধরে হরমুজ প্রণালী নিয়ে কী আলোচনা হল?লোকাল ট্রেনের টিকিটে বিরাট ছাড়! ৫ টাকার টিকিট এখন কত পড়বে? জেনে নিন বিস্তারিত

বিষ্ণুপ্রিয়াকে পুষ্পমালা পরিয়ে, কপালে অলকা তিলক এঁকে দিয়ে মহাপ্রভু চললেন নীলাচলে

নীলাঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় ফাল্গুনী পূর্ণিমার সন্ধ্যা। সেদিন আবার চন্দ্রগ্রহণ। নবদ্বীপে চলছে হরিসংকীর্তন। তার মধ্যেই চারপাশ আলো করে এলো এ কোন শিশু? হামাগুড়ির আগেই সে হেঁটে বেড়ায়। উঠোনের সাপ জড়িয়ে থাকে তার হাতে। পা অলঙ্কারহীন, অথচ সে এলে

বিষ্ণুপ্রিয়াকে পুষ্পমালা পরিয়ে, কপালে অলকা তিলক এঁকে দিয়ে মহাপ্রভু চললেন নীলাচলে

শেষ আপডেট: 20 March 2019 14:38

নীলাঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়

ফাল্গুনী পূর্ণিমার সন্ধ্যা। সেদিন আবার চন্দ্রগ্রহণ। নবদ্বীপে চলছে হরিসংকীর্তন। তার মধ্যেই চারপাশ আলো করে এলো এ কোন শিশু? হামাগুড়ির আগেই সে হেঁটে বেড়ায়। উঠোনের সাপ জড়িয়ে থাকে তার হাতে। পা অলঙ্কারহীন, অথচ সে এলেই ভাসে নূপুরগুঞ্জন। গায়ে যখন গয়না, চোরেরা নিয়ে গিয়েও তাঁকে ফিরিয়ে দিয়ে যায়, অক্ষত। হরিনাম শুনলে তার কান্না থেমে আসে, সেই নামেরই নেশায় সে ডুকরে ওঠে আবার। নামকরণের সময়, সব কিছু ছেড়ে, এই নবজাতক ছুঁয়ে দেয় ভাগবতের পুঁথি। তার আসার আগে নিজের মা জন্ম দিয়েছেন আটটি মৃত মেয়ের। মৃতবৎসার পুত্র বলেই কি ভয়ে ভয়ে স্বজনেরা তার নাম রাখলেন নিমাই? দাদু নাম দিয়েছিলেন বিশ্বম্ভর। সোনার বরণ সেই শিশুর হলো আরো কত যে নাম : গৌরাঙ্গ, গোরা, কখনও গৌরহরি।

তাঁর দৌরাত্ম্যে কাঁপত নবদ্বীপ

পূর্ববঙ্গের শ্রীহট্ট থেকে নবদ্বীপে এসে বাসা বাঁধেন নিমাইয়ের বাবা জগন্নাথ মিশ্র। তাঁর বিয়ে হলো ধর্মপ্রাণা শচীদেবীর সঙ্গে। নিমাই মেধাবী, দামাল, চঞ্চল। গঙ্গার ঘাটে সদলবলে সে উত্যক্ত করে স্নানে আসা অনেককেই। বাদ যায় না মেয়েরাও। স্নান সেরে ওঠা লোকজনের গায়ে জল ছেটাচ্ছে কখনও,  কখনও আবার ঘেঁটে দিচ্ছে তাদের পুজোর উপকরণ, নৈবেদ্য! ঘাটে শিবপুজো দিতে আসা মেয়েদের বলছে, বরলাভে শিব নয়, সে নিজেই হোক আরাধ্য! পুজোর জন্য সাজানো মালা নিজের গলায় পরে বসছে কখনও। পড়শিদের বাড়ি থেকে চুরি করছে খাবার। এইসব দৌরাত্ম্যের নিয়মিত নালিশও আসে বাড়িতে। তাঁকে নিয়ে অস্থির তাঁর মায়ের চোখে জল দেখলেই শুধু যেন মনটা ভিজে আসে নিমাইয়ের।

হারালেন দাদা, বাবা, স্ত্রীকে

দাদা বিশ্বরূপকেই যা একটু ভয় পায় নিমাই. আবার দাদার প্রতি টানও ছিল খুব। সেই বিশ্বম্ভর কাউকে না বলে একদিন সন্ন্যাস নিয়ে বাড়ি ছাড়লে যেন আরও বেড়ে গেল নিমাইয়ের দুরন্তপনা। পাছে পড়াশোনা করে ছোটছেলেও ঘরছাড়া হয়-- এই ভয়ে নিমাইয়ের পড়াশোনা বন্ধ করে দিলেন বাবা। নাছোড় নিমাই। তাই আবার তাকে পাঠানো হলো টোলে। বিষ্ণুদাস, সুদর্শন আর গঙ্গাদাস-- এই তিন পণ্ডিতের টোলে পড়াশোনার শেষে নিজেই একটা টোল খুলে বসল সে। দেখতে দেখতে সেই ডানপিটে শিশু হয়ে গেল নবদ্বীপের বিখ্যাত 'নিমাই পণ্ডিত'. তর্কে যাঁকে হারানো মুশকিল, শাস্ত্রের কূট প্রশ্ন -- 'ফাঁকি জিজ্ঞাসা'য়-- যাঁর জুড়ি মেলা ভার। এর মধ্যেই মারা গেলেন বাবা। শচীদেবী ছেলের বিয়ে দিলেন একসময় গঙ্গার ঘাটে নিমাইয়ের জ্বালাতন ভালবেসে সহ্য করা নবদ্বীপের সুব্রাহ্মণ বল্লভাচার্যের মেয়ে লক্ষ্মীর সঙ্গে। সাপের কামড়ে লক্ষ্মী মারা গেলে, ফের মায়ের পছন্দে, তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী হয়ে এলেন বিষ্ণুপ্রিয়া।

পণ্ডিতকে হারালেন বিচারে 

বহু বিদ্বানদের বিচারে হারিয়ে কাশ্মীর প্রদেশের 'দিগ্বিজয়ী' কেশব পণ্ডিত তখন নবদ্বীপে। এবার তিনি মুখোমুখি নিমাইয়ের। নিমাই ভাবলেন, দাম্ভিক পণ্ডিতের দর্প ভেঙে দেওয়া দরকার! গঙ্গার ঘাটে নিমাইকে ঘিরে তাঁর পার্ষদেরা। কেশব পণ্ডিতকে খুবই সম্মান দিয়ে নিমাই বললেন, "হে সরস্বতীর বরপুত্র, গঙ্গার মহিমা বৰ্ণনা করুন।" অনুরোধ শুনে, নিজের একশো শ্লোক অনর্গল আউড়ে গেলেন পণ্ডিত। তিনি থামলে, তারই একটি আবৃত্তি করে নিমাই বললেন, "এবার এর মর্ম ব্যাখ্যা করে ধন্য করুন!"  এতো শ্লোকের ভিতর এই একটি শ্লোক মনে রাখার রহস্যটা কী, অবাক হয়ে জানতে চাইলেন পণ্ডিত। নিমাই বললেন, "যে সরস্বতীর বরে আপনি কবি, তাঁরই কৃপায় আমি শ্রুতিধর!" পণ্ডিত সেই শ্লোকের অর্থ ব্যাখ্যা করলে তাঁর ব্যাকরণ আর অলঙ্কারের খুঁত ধরিয়ে দিলেন নিমাই। তর্কও হলো একপ্রস্থ। শব্দশাস্ত্রে পারদর্শী নিমাইয়ের যুক্তির কাছে শেষ অবধি হার মেনে নবদ্বীপ ছাড়লেন 'সর্বশাস্ত্রজ্ঞ', কেশব পণ্ডিত।

দীক্ষা নিয়েই বদলে গেলেন

গয়ায় বাবার পিণ্ড দিতে গিয়েই ভাবাবেগে হৃদয় ভেসে গেল নিমাইয়ের। সেখানেই শ্রীভগবানের পাদপদ্ম দর্শন করে ভাবে বিভোর নিমাই। তাঁর তন্ময় দৃষ্টি স্থির। দুই চোখে অবারিত জলের ধারা! অবাক সকলেই তাঁকে দেখে। একেবারে যেন দৈবযোগে সেখানে এলেন শ্রীপাদ ঈশ্বরপুরী। উদ্ধত, চঞ্চল তরুণ--যে নিমাইকে আগে একবার তিনি দেখেছিলেন নবদ্বীপে, তাঁর নাকি এই পরিবর্তন! বিস্মিত ঈশ্বরপুরীর কাছে সেবারই দীক্ষা নিলেন গৌরাঙ্গ। এরপরই যেন তাঁর বদলে যাওয়া শুরু। ফিরে এসে আর ছাত্র পড়ানোয় মন বসে না তাঁর। সারাদিন মুখে কৃষ্ণনাম। নির্জনে বসে থাকেন। প্রেমে বিহ্বল হয়ে ধুলোয় গড়াগড়ি যান। ওদিকে 'নিমাইপণ্ডিত'কে  ঘিরে আগুনের মতো বাড়ছে অনুরাগীদের ভীড়। গৌরাঙ্গের কৃষ্ণপ্রেমের ভাবাবেশ দেখে উদ্বেগে উতলা মা শচীদেবী আর স্ত্রী বিষ্ণুপ্রিয়া। কৃষ্ণ বিনা অন্য কিছু আর মুখে আসে না তাঁর। তাই টোল বন্ধ করে ছাত্রদের অন্য গুরুর কাছে পাঠিয়ে দিলেন গৌরাঙ্গ। ধর্ম-বর্ণ-উঁচু-নীচুর বাছ-বিচার না করে, ভক্তি আর প্রেমের সাগরে ঢেউ তুলে দিলেন তিনি।

উল্টে দিলেন কাজীর বিচার

কীর্তনের দল নিয়ে নবদ্বীপ তোলপাড় করে বেড়াচ্ছেন গৌরাঙ্গ। তাঁর সঙ্গে যোগ দিয়েছেন অদ্বৈতাচার্য, নিত্যানন্দ আর হরিদাস। গৌরাঙ্গের ভিতর অনুরাগীরা দেখছেন অলৌকিক সব প্রকাশ। তাঁকে ভগবানের অবতারও ভাবছেন অনেকেই। কিন্তু নিন্দুক আর কুচক্রীদেরও অভাব নেই। গৌরাঙ্গের বিরুদ্ধে বৈষ্ণববিরোধী হিন্দুদের অভিযোগে নগরে সংকীর্তন বন্ধের নির্দেশ দিয়ে বসলেন কাজী। এক বাড়িতে ঢুকে খোল করতাল ভেঙে দিয়ে কীর্তন বন্ধ করেও এলেন নিজে। এই অন্যায় নির্দেশে থামলেন না গৌরাঙ্গ। জোর গলায় বললেন, "নগরে নগরে আজি করিব কীর্তন.../ দেখি কোন কাজী আসি মোর মানা করে"। কাজীর বিধান অমান্য করে কীর্তনের তিন বিশাল দল নিয়ে নগর পরিক্রমার শেষে গৌরাঙ্গ হাজির একেবারে কাজীর বাড়ির দরজায়। মৃদঙ্গ, করতাল, হরিধ্বনিতে মুখরিত চারপাশে তখন লোকারণ্য। আতঙ্কে কাজী লুকিয়েছেন বাড়ির ভিতর। গৌরাঙ্গের ডাকে একসময় তিনিই বেরিয়ে এলে গৌরাঙ্গ বুকে টেনে নিলেন তাঁকে। বিক্ষুব্ধ কৃষ্ণভক্তের প্রেমমূর্তি দেখে ভাবান্তর হলো কাজীর। 'ভাগ্নে' বলে তিনিই বরণ করে নিলেন নিমাইক। কাজীর নিষেধাজ্ঞা উঠে তো গেলই, তিনি নিজে হয়ে গেলেন গৌরাঙ্গের একান্ত অনুরাগী কৃষ্ণভক্ত।

মাতালকে দেখালেন পথ

শহরের ত্রাস দুই মাতাল -- জগাই আর মাধাই। গুন্ডামি, জুলুম, অনাচারের যেন শেষ নেই তাদের। কৃষ্ণনামের মাহাত্ম্য প্রচার করে বহু দুরাত্মাকে উদ্ধার করা হরিদাস আর নিত্যানন্দ ভাবলেন প্রেমের পথেই সিধে করবেন এই দুই মাতালকেও। সাবধান করলেন অনেকেই!  'অবধূত' নিত্যানন্দ তাকে 'শোধরাতে' গেলে, ভাঙা কলসীর কানা তাঁর কপালে ছুঁড়ে মারল মাধাই। রক্তে ভিজেও মুখে কৃষ্ণনাম আর হাসি নিত্যানন্দের। এসে পড়লেন গৌরাঙ্গও। দুই মাতালকে তিনি শাস্তি দিতে গেলে নিত্যানন্দ বললেন, মাধাইয়ের হাত থেকে শেষ অবধি তাঁকে বাঁচিয়েছে জগাই। শুনে নরম হলেন গৌরাঙ্গ। তাঁর আশীর্বাদ পেয়ে আপ্লুত জগাই মূর্ছা গেলে গৌরাঙ্গ কোলে তুলে নিলেন তাকে। আর জ্ঞান ফিরল যখন, তার মুখে শুধুই কৃষ্ণনাম! সতীর্থের এই পরিবর্তন দেখে, গৌরাঙ্গের আদেশে নিত্যানন্দের পা জড়িয়ে ক্ষমা চাইল মাধাই। দুই মাতালকে বাড়ি নিয়ে গিয়ে গৌরাঙ্গ মেতে গেলেন তুমুল সংকীর্তনে। গৌরাঙ্গের প্রেম মাহাত্ম্যে জগাই-মাধাই হয়ে গেল নবদ্বীপের সেরা দুই পরম-সাধু বৈষ্ণব।

নিশুত রাতে গৃহত্যাগী

নিমাইয়ের রূপে পাগল মেয়েরা। আদরে তারাই লুটিয়ে পড়ে তাঁর পায়ে। অথচ নিরুত্তাপ নিমাই। 'চৈতন্যভাগবতে' বৃন্দাবন দাস লিখলেন: "নারীগণ দেখি বলে এই বা মদন./ স্ত্রীলোকে পাউক জন্মে জন্মে হেন ধন"। বৃদ্ধরা এসে প্রণাম করে যান গৌরাঙ্গকে, পণ্ডিতেরা তাঁকে দেন বৃহস্পতির সম্মান। "যবনেও প্রভু দেখি করে বড় প্রীত/ সর্বভূত-কৃপালতা প্রভুর চরিত"...ভগবানের প্রেমে বিভোর গৌরাঙ্গ বাহ্যজ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েন প্রায়শই! নিন্দুকেরা বলে তাঁর নাকি মূর্ছারোগ, না হয় বায়ুব্যাধির বিকার! তাঁর ইচ্ছে --বিশ্বাসী, অবিশ্বাসী সকলের হৃদয়ে বুনে দেবেন ভক্তির বীজ। অথচ সংসারের 'নিমাই পণ্ডিত' হয়ে থাকাটাই যেন কাল গৌরাঙ্গের!  এবার ঘর ছাড়বেন ঠিক করে শেষ অবধি মা আর স্ত্রীয়ের অনুমতিও আদায় করে নিলেন তিনি ! মায়ের বুক যদিও উঠল ধড়াস করে, যেন সরে গেল স্ত্রী বিষ্ণুপ্রিয়ার পায়ের নীচের মাটি! যাবেন যাবেন করেও পিছুটানে গৌরাঙ্গ থেকে গেলেন আরও কয়েকটা দিন. তারপর মায়ের হাতের রান্না চেয়ে খেলেন একদিন। রাত্রি দ্বিপ্রহর. নিজে হাতে গৌরাঙ্গ যত্নে সাজিয়ে দিলেন স্ত্রীকে, পরালেন পুষ্পমালা, কপালে, গলায় এঁকে দিলেন অলকা-তিলকা। বহুদিন পর বিষ্ণুপ্রিয়া যেন আবার এত নিবিড়ভাবে পেলেন তাঁর স্বামীকে! রাত্রি তৃতীয় প্রহর। নিজের বুকের উপর থেকে আলতো মায়ায় ঘুমন্ত প্রিয়ার হাত সরিয়ে দিয়ে শেষ বারের জন্য স্বামী দেখলেন তাঁর স্ত্রীর মুখ। তারপর নি:শব্দে বেরিয়ে গেলেন দরজা খুলে তাঁর বাকি জীবনের সন্ন্যাসপথে। উঠোনে পড়ে রইল গৌরাঙ্গের ছায়া, আর মায়ের জন্য রেখে যাওয়া তাঁর প্রণাম।

ত্যাগীকে ফেরালেন ঘরে

মাথা মুড়িয়ে কাটোয়ার কেশব ভারতীর কাছে দীক্ষা নিয়ে গৌরাঙ্গ হলেন শ্রীচৈতন্য। একদিন ভিক্ষান্তে এক ঘর-ত্যাগী তরুণ সেবকের কাছে মহাপ্রভু চাইলেন মুখশুদ্ধি। সেবক গোবিন্দ ঘোষ গ্রাম থেকে ভিক্ষা করে নিয়ে এলেন একটি হরিতকী। অর্ধেক দিলেন মহাপ্রভুকে, বাকি অর্ধেক বেঁধে রাখলেন আঁচলে। পরদিন আবার মুখশুদ্ধি চাইতেই অর্ধেক হরিতকী গুরুকে এগিয়ে দিলেন গোবিন্দ। "এত দ্রুত হরিতকী এলো কোথা থেকে?"  জানতে চাইলে মহাপ্রভুকে গোবিন্দ বললেন, গত দিনের ভিক্ষা তিনি আঁচলে বেঁধে রেখেছিলেন। মহাপ্রভু ভর্ৎসনা করলেন সেবককে। বললেন, তাঁর ত্যাগের সময় আসেনি, কেননা আত্মরক্ষার তাগিদে সঞ্চয়ের প্রবণতা রয়েছে। কেঁদে প্রভুর শ্রীচরণে তখন গোবিন্দ। তাঁকে শান্ত করে মহাপ্রভু বোঝালেন, নিজেকে সংস্কার করার একটা নির্দিষ্ট সময় থাকে। বোঝালেন, আপাতত গার্হস্থাশ্রমই তাঁর শ্রেয়।

নীলাচলেও ফেলে দিলেন সাড়া

বৃন্দাবনে যাবেন ভেবেও মায়ের পরামর্শে সন্ন্যাস নিয়ে মহাপ্রভু এলেন উড়িষ্যার নীলাচলে। চারপাশে যুদ্ধের হাওয়া। হোসেন শাহের সুলতানি শাসন গিলে খেতে চায় উড়িষ্যার হিন্দু রাজত্ব। প্রথম দর্শনে জগন্নাথ মন্দিরের গর্ভগৃহে ভগবানকে ছুঁয়েই মূর্ছা গেলেন মহাপ্রভু। আতঙ্কে তারপর থেকে তাঁকে দর্শন করতেন গরুড়স্তম্ভের কাছ থেকেই। মহাপ্রভুর মায়ায় প্রতিদিন বেড়ে উঠছে তাঁর ভক্তের সংখ্যা, যার মধ্যে আছেন উড়িষ্যার দুর্দান্ত ক্ষমতাবানেরাও। দক্ষিণাত্য ভ্রমণ শেষে রাজা প্রতাপরুদ্রের ইচ্ছেয় মহাপ্রভুর বাসা হল কাশীমিত্রের 'টোটা'। অথচ বহু অনুরোধেও তিনি দেখতে নারাজ অনুরাগী রাজা প্রতাপরুদ্রের মুখ! বলেন, সন্ন্যাসীর কাছে নারী আর রাজদর্শন দুইই নাকি বিষতুল্য! সুহৃদদের পরামর্শে তাই অন্য পথ নিলেন প্রতাপ। রথযাত্রার শেষে প্রতিবারের মতোই গুন্ডিচা মন্দিরের পাশে ফুলের বাগানে প্রেমাবিষ্ট হয়ে পড়লেন মহাপ্রভু। ঠিক তখনই বৈষ্ণবের বেশে মহাপ্রভুর পায়ে নিজেকে সঁপে দিলেন রাজা প্রতাপরুদ্র। পেলেনও প্রভুর কৃপা। ক্রমে মহাপ্রভু হয়ে হয়ে উঠলেন উড়িষ্যা অধিপতি 'প্রতাপ রুদ্র- সংত্রাতা'। ঈর্ষা এবং আশঙ্কায় চটলেন অনেকেই। দিন যায়, মহাপ্রভু হয়ে পড়েন আরও মগ্ন কৃষ্ণপ্রেমিক। তাঁকে ঘিরে থাকে তাঁর বিশ্বস্ত সেবকেরা। রথ যাত্রার সময় প্রতি বছর বাংলা থেকে তাঁর টানে এসে নীলাচলে চার মাস কাটিয়ে যান অগণিত ভক্ত। একবার বৃন্দাবন যাবার পথে, রামকেলি গ্রামে গিয়ে গৌড় অধিপতি হোসেন শাহের দুই বিশ্বস্ত, অতৃপ্ত হিন্দু মন্ত্রী রূপ আর সনাতনকে গোপনে নিজের শিষ্যত্ব দিয়ে ফিরে এলেন মহাপ্রভু। জোর কমে গেল হোসেন শাহের। সন্ন্যাসের পর নানা তীর্থে ঘুরলেও, প্রায় চব্বিশ বছর নীলাচলই হয়ে গেল মহাপ্রভুর মূল ঠিকানা।

বাঁধলেন ভক্তের মাপকাঠি

কৃষ্ণদাস কবিদাসের 'শ্ৰীশ্ৰীচৈতন্যচরিতামৃত'-এ মহাপ্রভু রচিত শিক্ষাষ্টক শ্লোকগুলোয় স্পষ্ট কৃষ্ণনাম সংকীর্তনের মহিমা। সেখানে বললেন, যে কোনও নামেই ডাকা যেতে পারে তাঁকে। বললেন, কৃষ্ণনাম রুখে দেয় মনের দীনতা, সংসারের আগুন, সকল অনর্থ, অমঙ্গল। যা শুনলেও হয় কৃষ্ণপ্রেম এবং অপার আনন্দের উদয়। মহাপ্রভুর কথায়, ঘাসের চেয়েও নীচু, গাছের মতো সহিষ্ণু, নিরভিমান হয়েও অভিমানীকে আশ্রয় দেওয়া যে কেউই হতে পারেন হরির নামকীর্তনের যোগ্য।

মৃত্যুর ছায়া

বয়সে তাঁর চেয়ে ঢের বড়, মহাপ্রভুর অনুরক্ত সহচর হরিদাস চেয়ে বসলেন মহাপ্রভুর আগেই তড়িঘড়ি নিজের স্বেচ্ছামৃত্যু। বললেন, নিজের জীবন থাকতে মহাপ্রভুর লীলাসম্বরণ দেখতে চান না তিনি. তাঁর অনুরোধ: "সেই লীলা প্রভু মোরে কভু না দেখাবা/ আপনার আগে মোর শরীর পোড়াবা." কিন্তু পঞ্চাশও না-ছোঁওয়া মহাপ্রভুর মৃত্যুর আশঙ্কায় কেনই বা হঠাৎ অত উতলা হলেন  হরিদাস? চোখের সামনে তাঁকে চলে যেতেও দিলেন মহাপ্রভু!

'গুঞ্জাবাড়ীর মধ্যে প্রভুর হৈল অদর্শন..'

নিজেকে তখন প্রায়ই শ্রীরাধা ভাবেন মহাপ্রভু। শ্রীকৃষ্ণ যেন ছেড়ে গিয়েছেন তাঁকে। কৃষ্ণবিরহে কাতর মহাপ্রভু থাকেন সমাধিমগ্ন। সঙ্গী রায় রামানন্দ, স্বরূপ গোস্বামীর কাছে নিজের শয়নকক্ষ, টোটার গম্ভীরায়, সেই দুঃখই উজাড় করে দেন কখনও! কখনও হাসেন, কখনও তাঁর দু চোখ বেয়ে আগল-ভাঙা জলের ধারা! এই 'দিব্যোন্মাদ' ভাব প্রবলতর হয় দিনে দিনে! তেমনই একদিন. চটক-পর্বত দেখে মহাপ্রভু ভাবলেন বুঝি বৃন্দাবনের গোবর্ধন গিরি, স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ বিরাজ করছেন সেখানে! আবার যমুনা ভেবে কখনও ঝাঁপ দিলেন সমুদ্রে। ভেসে গিয়ে এক জেলের জালে নাকি ফিরে আসে তাঁর নিথর দেহ। 'চৈতন্যমঙ্গল'-এ জয়ানন্দ শোনালেন এক ফাল্গুনী চতুর্দশীর কথা! লিখলেন, রথের শোভাযাত্রায় নাচতে নাচতে 'ইটাল বাজিল প্রভু পাএ আচম্বিতে'। পায়ে সেই ইঁটের আঘাতেই 'চরণে বেদনা বড় ষষ্ঠীর দিবসে'। সেই নিয়েই এক টোটায় গিয়ে শুলেন মহাপ্রভু। তারপর 'মায়া শরীর তথা রহিল পড়ি/ চৈতন্য বৈকুণ্ঠ গেলা জম্বুদ্বীপ ছাড়ি.'

লোচনদাসের 'চৈতন্যমঙ্গল'-এ যদিও কথা-কেড়ে নেওয়া এক রহস্য! আসাঢ় মাসের সপ্তমী তিথির বেলা তৃতীয় প্রহর। সপার্ষদ মন্দিরে গিয়েও গুন্ডিচাবাড়ীর গর্ভগৃহে অতর্কিতে একা ঢুকে পড়লেন মহাপ্রভু। বাকিদের বাইরে রেখে হঠাৎই বন্ধ হলো গর্ভগৃহের দরজা। ফিরলেন না আর। অপেক্ষায় কাতর, উদ্বিগ্ন ভক্তদের একসময় পরিছা জানিয়ে গেলেন, জগন্নাথে বিলীন তাঁদের মহাপ্রভু!

রাতের অন্ধকারে চুপিসাড়ে নিমাই ঘর ছেড়েছিলেন যেদিন, ছেলের নাম ধরে ডাকা, ঘুম-হারা মায়ের আর্তনাদে সেদিন সাড়া দিয়েছিল শুধু প্রতিধ্বনি। চব্বিশ বসন্ত পর, নীলাচলে যেন আবার ফিরে এলো সেই হাহাকার :  নিমাই "নাই--নাই--নাই"!

ঋণ: চৈতন্যদেব (সুখময় মুখোপাধ্যায়), শ্রীগৌরাঙ্গ (প্রফুল্লকুমার সরকার), কৃষ্ণদাস বিরচিত শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত (সুকুমার সেন, তারাপদ রায় সম্পাদিত), বৃন্দাবনদাস বিরচিত চৈতন্যভাগবত (সুকুমার সেন সম্পাদিত), জয়ানন্দ বিরচিত চৈতন্যমঙ্গল (সুখময় মুখোপাধ্যায়, সুমঙ্গল রানা সম্পাদিত), চৈতন্যের শেষ প্রহর (তুহিন মুখোপাধ্যায়), শ্রীশ্রী চৈতন্যদেব (স্বামী সারদেশানন্দ), ইতিহাসের শ্রীচৈতন্য (অমূল্যচন্দ্র সেন).

ছবি সৌজন্য : গৌড়ীয় মিশন

```