রূপাঞ্জন গোস্বামী
হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের ৫৬০০ কিমি দক্ষিণ-পশ্চিমে এবং অস্ট্রেলিয়ার ২৪০০ কিমি উত্তর-পূর্বে আছে একসময়ের নরখাদকদের দ্বীপ
টান্না। পৃথিবী থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন এই দ্বীপটি লুকিয়ে রয়েছে ভানুয়াটু দ্বীপমালার গোপন অংশে। প্রশান্ত মহাসাগরে ভাসমান এই দ্বীপটিকে আজও ঘিরে রেখেছে রহস্যের কুয়াশা।
ভানুয়াটু দ্বীপপুঞ্জ এখন স্বাধীন। ডানা ঝাপটে সভ্যতা ঢুকে পড়েছে অনেক আগেই। অলিম্পিকের মার্চ পাস্টে আমরা এই দেশটার নাম চার বছর অন্তর দেখতে পাই। জনসংখ্যা মাত্র ২,৩০,০০০। ১৬০৬ সালে পর্তুগিজ নাবিক ফার্নান্দেজ ডি কুয়েরোজ ভানুয়াটুতে প্রথম পা রাখেন। তারপর ইউরোপীয়রা আবার এই দ্বীপপুঞ্জে ফিরে আসে ১৭৬৮ সালে। সে বছর ২২ মে,লুইস অ্যান্টনি বোগেনভিলে নতুন ভাবে ভানুয়াটুকে খুঁজে পান। দ্বীপপুঞ্জের নাম দেনগ্রেট সাইক্লাডেস।
[caption id="attachment_201572" align="aligncenter" width="670"]

দ্বীপের নাম টান্না[/caption]
১৭৭৪ সালে বিশ্বখ্যাত অভিযাত্রী ক্যাপ্টেন কুক আসেন, ভানুয়াটু দ্বীপপুঞ্জের প্রত্যন্ত একটি দ্বীপের দক্ষিণ-পূর্ব সৈকতে। তাঁর জাহাজের নাম ছিল এইচএম এস রেজোলিউশন, তাই বন্দরটির তিনি নাম দেন পোর্ট রেজোলিউশন। দ্বীপের নাম দেন
টান্না। স্থানীয় কোয়ামেরা ভাষায় যার অর্থ পৃথিবী।
৪০ কিমি লম্বা আর ১৯ কিমি চওড়া এই দ্বীপে রয়েছে ৩৫৫৬ ফুট উঁচু পাহাড় মাউন্ট টুকোসমেরা, সক্রিয় আগ্নেয়গিরি মাউন্ট ইয়াসুর এবং অতিকায় লেক সিউই। পৃথিবী থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন নিঃসঙ্গ এই দ্বীপের পাহাড়ি জঙ্গলে একসময় বাস করতো এক নরখাদক আদিম জনগোষ্ঠী
ইয়াকেল।
[caption id="attachment_201575" align="alignnone" width="1024"]

অষ্টাদশ শতাব্দীর শিল্পীর আঁকায় টান্নার নরখাদকেরা[/caption]
সাবেক নরখাদকদের বর্তমান ঈশ্বর ইংরেজ!
ভানুয়াটুর অন্যান্য দ্বীপের আদিবাসীদের উপর যেভাবে খ্রিস্টানদের প্রভাব পড়েছে, এদের ওপর তার কণামাত্র পড়েনি। নিজেদের প্রাচীন দেবতাদের পাশাপাশি তারা নানান অপদেবতাদের পূজারী। এখনও, ৩৩০০ বছর আগের মতোই আদিম এদের জীবনযাত্রা, খাদ্যাভ্যাস, সংস্কৃতি ও রীতিনীতি। কিন্তু শুনতে অবাক লাগবে, এদের কাছে মাসিহা বা ঈশ্বরের অবতার হলেন রাণী এলিজাবেথের স্বামী, ব্রিটেনের যুবরাজ প্রিন্স ফিলিপ।
টান্না দ্বীপের প্রত্যন্ত অংশে আছে একটি জঙ্গলে ঢাকা গ্রাম ইয়াওহনানেন। সেই গ্রামে না আছে বিদ্যুৎ, না আছে পাকা রাস্তা আর পাকা বাড়ি। পাতায় ছাওয়া আদিবাসীদের কুঁড়ে ঘর, রেনফরেস্টের কর্দমাক্ত রাস্তা। এই শতাব্দীতেও আধুনিক সভ্যতা থেকে মুখ লুকিয়ে বাস করে এই জনজাতি। গ্রামের ইয়াকেল উপজাতিরা এখনও বুশম্যানদের মতো পোশাক পড়ে। মহিলাদের উর্ধাঙ্গ অনাবৃত থাকে। নানগারিয়া পাতা দিয়ে লজ্জা নিবারণ করে তারা। পুরুষরা 'মাল মাল' নামে একটা ক্ষুদ্র বস্ত্রতে লজ্জা ঢাকে।
[caption id="attachment_201576" align="aligncenter" width="1024"]

সরল ইয়াকেল উপজাতি[/caption]
পৃথিবীর এক প্রত্যন্ত ভূ-ভাগে থাকা, প্রায় বিচ্ছিন্ন এক জনগোষ্ঠীর এই গ্রামে প্রিন্স ফিলিপের মন্দির আছে। সেই মন্দিরে থাকা প্রিন্সের ছবিতে জড়ানো আছে ব্রিটিশ পতাকা ইউনিয়ন জ্যাক। ইয়াওহনানেন গ্রামের আদিবাসীরা আজও বিশ্বাস করে তাদের মাসিহা বা ঈশ্বর ফিলিপ আবার তাদের কাছে আসবেন এবং তাদের সঙ্গেই চিরকালের জন্য রয়ে যাবেন। ১৯৭৪ সাল থেকে এই স্বপ্ন তারা দেখে আসছে।
কী ভাবে ঈশ্বর হলেন প্রিন্স ফিলিপ!
একসময়ের নরখাদকরা আজ বিনয়ী কিন্তু রক্ষণশীল। পলিনেশিয় ইয়াকেল উপজাতির একজন স্বঘোষিত অবতার ছিলেন ফ্রেড নাসসি। তিনি নাকি যা ভবিষ্যৎবাণী করতেন অক্ষরে অক্ষরে সেগুলি মিলে যেত। তিনি বলেছিলেন, মাউন্ট টুকোসমেরার ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরি জেগে উঠবে। ফলে অতিকায় সিউয়ি লেক শুকিয়ে যাবে। সাত বছর সাইক্লোন হবে না, পাহাড়দের আত্মা কেরাপেরামুন, একজন শ্বেতকায় পুরুষের বেশে সাদা পোশাক পরে বিশাল নৌকায় পশ্চিমের দেশ থেকে আসবেন। তাঁর কথার অনেক কিছুই নাকি মিলে গিয়েছিল।
[caption id="attachment_201578" align="aligncenter" width="968"]

প্রিন্স ফিলিপের মন্দির[/caption]
সালটা ছিল ১৯৭৪
ভানুয়াটুর পোর্ট ভিলার বন্দরে নোঙর করেছিল ইংল্যান্ডের রাণী এলিজাবেথের বিশাল প্রমোদতরী ব্রিটানিয়া। উপজাতি যোদ্ধাদের ক্যানো চড়ে, টান্না থেকে একশো কিলোমিটার সমুদ্র পাড়ি দিয়ে, ইংল্যান্ডের রাণীকে অভ্যর্থনা জানাতে গিয়েছিল ইয়াকেল আদিবাসীদের প্রধান জ্যাক নাইভা।
জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়েছিলেন সাদা পোশাকের প্রিন্স ফিলিপ। আদিবাসী নেতা নাইভা নৌকা থেকেই চিৎকার করে উঠেছিলেন, “ওই যে তিনি, আমি দেখেছি তাঁকে সাদা পোশাকে। আমি ঠিক চিনতে পেরেছি। তিনিই আমাদের পূর্বপুরুষ প্রেরিত মাসিহা। অবতার ফ্রেডের কথা সত্যি হয়েছে।”
[caption id="attachment_201583" align="aligncenter" width="620"]

১৯৭৪, ভানুয়াটুতে প্রিন্স ফিলিপ ( এলিজাবেথের বাম দিকে)[/caption]
প্রিন্স ফিলিপ ভানুয়াটুর বিভিন্ন দ্বীপের গোষ্ঠীপতিদের সঙ্গে উপহার বিনিময় করেছিলেন। এবং তাঁর সই করা একটা ছবি দিয়েছিলেন। তখনই শুনেছিলেন ফ্রেড নাসসি-এর ভবিষ্যৎবাণী। তিনি আদিবাসীদের ভুল ভাঙাননি বরং ২০০৭ সালে পাঁচ জন টান্নার আদিবাসীকে ব্রিটেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তাদের সঙ্গে গোপনে বাকিংহাম প্যালেসে দেখাও করেছিলেন, তাঁদের ঈশ্বর ফিলিপ।
ফ্রেড নাসসি-এর শেষ ভবিষ্যৎবাণী
মৃত্যুর বহু আগে নাকি ফ্রেড নাসসি আর একটি ভবিষ্যৎবাণী করে গিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন ২০১৬ সালে সারা পৃথিবীর মুখ ঘুরবে টান্নার দিকে। তাঁদের মাসিহা নিজেই আসবেন টান্নাতে। ২০১৫ সালের মে মাসে, ভানুয়াটুর টান্না দ্বীপ তছনছ হয়ে যায় পাম নামের এক ভয়ংকর স্লাইকোনে। পামের ঝাপটায় উত্তাল হয় সমুদ্র, ভেঙে পড়ে বিশাল বিশাল গাছ। অনেক আদিবাসী মারা গিয়েছিলেন।
নিউজিল্যান্ডের
TEAR FUND নামের এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার এক সমাজসেবী, অ্যান্ড্রু ফিনলে ত্রাণ নিয়ে গিয়েছিলেন টান্না দ্বীপে।
তিনি পরে সংবাদ মাধ্যমকে বলেছিলেন, ” আমি একজন বৃদ্ধ মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি, সেই মানুষটি আশাবাদী, অবতার ফ্রেডের কথা সত্যি করে যুবরাজ ফিলিপ পরের বছরেই টান্না দ্বীপে আসবেন। সাইক্লোন হচ্ছে দেবতা ফিলিপের দ্বীপে আসার পূর্বাভাস। আমাদের সবাইকে প্রস্তুত হতে বলে গেল সাইক্লোন”। অবতার ফ্রেডের বাণী মেলেনি।
দ্বীপে আসেননি ইয়াকেল আদিবাসীদের পূর্বপুরুষদের পাঠানো মাসিহা প্রিন্স ফিলিপ। তাঁর বয়স তখন ৯৫ (বর্তমানে ৯৮)। বাকিংহাম প্যালেস থেকে ১০,০০০ মাইল দূরে ইয়াওহনানেন গ্রামে যাওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব কিনা জানি না, কিন্তু ইয়াকেলরা মানে অবতার ফ্রেডের বাণী মিথ্যা হতে পারে না। তাই সরলমনা ইয়াকেল গ্রাম ইয়াওহনানেন, আজও পথ চেয়ে বসে আছেন তাঁদের শ্বেতকায় মাসিহার প্রতীক্ষায়।
[caption id="attachment_201594" align="aligncenter" width="650"]

টান্না দ্বীপে প্রিন্স ফিলিপ উৎসব[/caption]
দাবার চালে জিতল কে!
প্রশ্ন একটাই, প্রিন্স ফিলিপ সরল আদিবাসীদের মাসিহা সাজলেন কেন? কেন তিনি তাদের ভুল ভাঙালেন না? আসলে ১৯৭৪ সালের অনেক আগেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ব্রিটিশ সূর্য ডুবে গিয়েছিল। ভানুয়াটুও হাত থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে দেখে এই দেশ স্বাধীন হওয়ার ভাগেই দাবার চালটা দিয়ে রাখলেন যুবরাজ। প্রিন্স ফিলিপ চেয়েছিলেন, পৃথিবীর এই বিচ্ছিন্ন উপজাতির লোকগাথায় আর মাটির মন্দিরে অন্তত সুরক্ষিত থাকুক ইংরেজদের প্রভুত্ব।
ইংরাজ যুবরাজকে ঈশ্বর হিসেবে আরাধনা করা নিয়ে হাসাহাসি আজও চলে বিশ্বজুড়ে। ইতিহাসবিদেরা বলছেন, এই উপজাতি প্রথম বিশ্বের আগ্রাসনের মুখে বার বার পড়েছিল সেই ক্যাপটেন কুকের সময় থেকে। অন্যান্য সব দ্বীপ বাধ্য হয়ে খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহণ করেছিল। কিন্তু টান্না দ্বীপের আদিবাসীরা প্রিন্স ফিলিপকে নিজেদের ঈশ্বরের সঙ্গে জুড়ে নিয়ে নিজেদের ধর্ম, সমাজ, সংস্কৃতিকে সুকৌশলে বাঁচিয়ে নিয়েছিল। তারা দাবায় কিস্তির চালটা দিয়ে রেখেছিল, প্রিন্স ফিলিপের চাল দেওয়ার আগেই। ইংরেজরা সেটা বুঝতেই পারেনি।