
শেষ আপডেট: 2 November 2019 09:32
এই সেই 'ব্ল্যাক অর্লভ' বা 'ব্রহ্মার চোখ' হিরে[/caption]
মন্দিরে বিরাজমান ব্রহ্মামূর্তিটির চতুর্মুখের মধ্যে একটি মুখে দু' চোখের জায়গায় বসানো ছিল দুটি চকচকে কালো পাথর। মূর্তিটি কত শতাব্দী প্রাচীন তার কোনও ধারণা ছিলনা মন্দিরের সন্ন্যাসীদের। কিন্তু মূর্তির চোখদুটির দাম যে আকাশ ছোঁয়া, তা সম্ভবত আন্দাজ করতে পেরেছিলেন এক জেসুইট পাদ্রি। অনান্য জেসুইট সম্প্রদায়ের পাদ্রিদের সঙ্গে দক্ষিণ ভারতে খ্রিস্টান ধর্ম প্রচার করতে এসেছিলেন তিনি।
এর পর, একদিন রাতের আঁধারে মন্দির থেকে চুরি হয়ে গিয়েছিল ব্রহ্মা মূর্তির একটি চোখ। উজ্বল কৃষ্ণকালো পাথরের একটি চোখ। যা ছিল বিশুদ্ধ কালো হিরে। জেসুইট পাদ্রি নিজেই চোখটি চুরি করেছিলেন, নাকি মন্দিরের কোনও পুরোহিত, নাকি উভয়পক্ষের যোগসাজসে ব্রহ্মার চোখটি মন্দিরের বাইরে এসেছিল, তা কখনও জানা যায়নি।
কিন্তু জনশ্রুতি বলছে সেই রাতেই কালো হিরেটির গায়ে জড়িয়ে গিয়েছিল গিয়েছিল ব্রহ্মার অভিশাপ। অভিশপ্ত হয়ে গিয়েছিল ১৯৫ ক্যারেটের দুর্মূল্য ও দুষ্প্রাপ্য কালো হিরেটি। কয়েক দিনের মধ্যে ভারত থেকে কালো হিরে Eyes of Brahma কোনও অজানা পথে পাচার হয়ে যায় বিদেশে। সেইসঙ্গে অভিশাপের মেঘ ছড়িয়ে পড়ে রাশিয়া, ফ্রান্স, ইতালি, ইংল্যান্ড, আমেরিকা, না জানি আরও কত দেশের আকাশে।
১৯১৭ সালের বলশেভিক বিপ্লবের সময় রাশিয়ার রাজপরিবারের অনেক সদস্য প্রাণ বাঁচাতে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েন। সেরকমই একজন ছিলেন রাজকন্যা লিওনিলা ভিক্টরভনা বারিয়াটিনস্কি। তিনি বিয়ে করেছিলেন রয়াল নেভির অফিসার প্রিন্স অ্যান্ড্রে গিলস্টোনকে। তাঁর কাছে Eyes of Brahma নামের কালো হিরেটি আসে।
হিরেটি পাওয়ার পর কেমন যেন পালটে গিয়েছিলেন রাজকন্যা লিওনিলা। মুখের হাসি একেবারে মুছে গিয়েছিল। কয়েক মাসের মধ্যে অজ্ঞাত কারণে তিনি হিরেটি দিয়ে দিয়েছিলেন রাশিয়ার আর এক রাজকন্যা নাদিয়া ভাইজিন অর্লভকে। রাজকন্যা লিওনিলা চেয়েছিলেন হিরেটি বংশের ভেতরেই থাকুক। হিরেটি নাদিয়াকে দিয়ে দেওয়ার এক মাসের মধ্যে প্রাসাদ থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন রাজকন্যা লিওনিলা।
অপর রাজকন্যা নাদিয়া ভাইজিন অর্লভও দেশ ছেড়ে রোমে চলে গিয়েছিলেন। সেই সময় প্রিন্সেস নাদিয়া ছিলেন এক রাশিয়ান জহুরীর স্ত্রী। হিরেটি তাঁর কাছে আসার পর নাদিয়াও কেমন পালটে গিয়েছিলেন, সারাক্ষণ নিজেকে ঘরে বন্দী রাখতেন।কারও সঙ্গে কথা বলতেন না। হিরেটির দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতেন সবসময়।
রাজকন্যা লিওনিলা আত্মহত্যা করার এক মাসের মধ্যে, ১৯৪৭ সালের ২ ডিসেম্বর, রোমের একটি প্রাসাদের ছাদ থেকে ঝাঁপ মেরে আত্মহত্যা করেন প্রিন্সেস নাদিয়াও। তারপরই Eyes of Brahma নামের 'অভিশপ্ত' কালো হিরেটির নাম হয়ে যায় Black Orlov। রাজকন্যা নাদিয়া অর্লভের নামেই নামকরণ হয় হিরেটির।
[caption id="attachment_156022" align="aligncenter" width="380"]
নাদিয়া ভাইজিন অর্লভ[/caption]
হিরের হার থেকে ঝুলছে ব্ল্যাক অর্লভ হীরকখচিত লকেট[/caption]
২০০৪ সালে বিখ্যাত জহুরী ডেনিস পেটিমেজেস বলেছিলেন, তিনি নিশ্চিত হিরেটির সঙ্গে আর অভিশাপ জড়িয়ে নেই। তাই ২০০৬ সালে 'অস্কার' পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে অভিনেত্রী ফেলিসিটি হফম্যান ব্ল্যাক অর্লভ হীরকখচিত নেকলেসটি সর্বপ্রথম জনসমক্ষে পরেছিলেন। তবে বেশিক্ষণ পরে থাকেননি। তার কারণটাও কাউকে বলেননি।
কিছু গবেষক বলেছেন ভারতে কালো হিরে পাওয়া যায় না, তাই এই হিরে ভারতের নয়। বিপক্ষের গবেষকরা বলছেন হাজার বছর ধরে এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে রত্ন কেনাবেচার ব্যবসা করে আসছেন ভারতীয় ব্যবসায়ীরা। তাঁদের হাত ধরেই হয়ত কালো হিরে ভারতের মন্দিরে এসেছিল।
কিছু গবেষক প্রশ্ন তুলেছিলেন, এমন তিনজন আত্মহত্যা করলেন যাঁদের তিনজনের কাছেই এই হিরেটি ছিলো, এটা কি নিছকই কাকতালীয় ? তাছাড়া ১৯৫ ক্যারেটের হিরেটি হঠাৎ কাটবার প্রয়োজনীতাই বা পড়ল কেন, না কাটলে তো আরও অনেক বেশি দাম পাওয়া যেত।
ব্ল্যাক অর্লভ রহস্যের সমাধান হয়নি, তাই আজও চলছে বিতর্ক ও গবেষণা। অন্যদিকে কখনও গোপনে কখনও জনসমক্ষে মালিক থেকে মালিকের হাতে ঘরে ঘুরে বেড়াচ্ছে ব্ল্যাক অর্লভ। তবে বিজ্ঞানের যুগে দাঁড়িয়ে জনশ্রুতিটিকে কল্পিত ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানসিকতার ফসল বলে মনে হয়। কিন্তু এটাও মনে হয়, হীরকখণ্ডটি তার উৎস থেকে বিশ্ব ভ্রমণের পথে বেরিয়ে কিছু মর্মান্তিক ঘটনার সাক্ষী হয়েছিল, হয়তো সেই সব ঘটনাই ব্ল্যাক অর্লভ হিরেটিকে অশুভ ও অভিশপ্ত করে তুলেছিল। জন্ম দিয়েছিল এই ভয়ঙ্কর জনশ্রুতির।