
শেষ আপডেট: 19 June 2019 13:16
দেশে ফিরেই রাজকন্যাকে বিয়ে করলেন সুলতানের। আর বিপদে পড়লেন কয়েকশো বাজাউ ও তাদের পরিবার। দেশের ফিরলে জোহরের রাজা কোতল করবেন। প্রাণের ভয়ে তারা আর দেশে ফিরতে পারেনি। স্থলের সঙ্গে তাদের চিরকালের জন্য বিচ্ছেদ হয়ে যায়। সমুদ্রই হয়ে যায় তাদের ঘর। ঘুরতে থাকে বাজাউরা বিভিন্ন উপসাগরে, দেশহীন যাযাবর হয়ে।
সমুদ্রের অগভীর জলে বাজাউদের অস্থায়ী বসতি[/caption]
সমুদ্রের অগভীর এলাকায়, তীর থেকে আধ কিলোমিটার সমুদ্রের ভেতরে বাজাউরা তৈরি করে তাদের অস্থায়ী গ্রাম। বাঁশ ও কাঠ দিয়ে তৈরি করা বাড়িগুলি কয়েক ঘন্টার মধ্যে খুলে ফেলা যায়। বাড়িগুলির নীচ দিয়ে সমুদ্রের ঢেউ বয়ে যায়। ছোট ছোট ডিঙির মত নৌকা করে চলে এ বাড়ি সে বাড়ি যাওয়া আসা। বাড়ি থেকে নেমে আসে মই। ওপরে ওঠার জন্য। জলের ওপরে বানানো হলেও ঘরগুলি কিন্তু পোক্ত। ২০০৪ সালে হওয়া সুনামিতে বাজাউদের কোন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। সুনামি ঠিক তাদের ঘরের নীচ দিয়ে গেছে।
[caption id="attachment_115872" align="aligncenter" width="954"]
ঘরের সামনে বাজাউ মহিলা[/caption]
কেউ কেউ আবার নৌকাতেই থাকে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত। শুনতে অবাক লাগলেও এটা সত্যি, এই উপজাতির অনেক মানুষ আছে যারা মাটিতে কোনওদিন পা রাখেনি। রাখবেই বা কী করে। নিজের দেশ নেই, নাম শুনলেই পুলিশ তাড়া করে।
বাজাউরা নিজেদের বয়স বলতে পারে না। এই যুগেও, সময় কিংবা তারিখ সম্পর্কে তাদের ধারণা নেই। ঠিক যেমন তারা জানে না বিদ্যুৎ কী ও কেন লাগে। সামুদ্রিক মাছের তেলের মশাল আজও তাদের রাতের অন্ধকার কাটায়। সমুদ্র তীরবর্তী কিছু সহৃদয় গ্রাম এদের জ্বালানী কাঠ ও জল ও জামা কাপড় দেয়। বিনিময়ে বাজাউরা দেয় মাছ।
[caption id="attachment_115876" align="aligncenter" width="670"]
বাজাউদের হাউসবোট 'লেপা-লেপা'[/caption]
বাজাউ শিশুরা খেলা করে সমুদ্রের নিচে[/caption]
খুব ভোরে নয় একটু বেলার দিকে সমুদ্রে নামে বাজাউ পুরুষরা। তার আগে ভারী হওয়ার জন্য কোমরে পাথর বেঁধে নেয়। কাঠ ও ফেলে দেওয়া কাচ দিয়ে নিজেদের অপটু হাতে তৈরি করা জলনিরোধক চশমা চোখে পরে নেয়। যা জলের তলায় দেখতে ও চোখকে চাপ থেকে বাঁচাতে সাহায্য করে। সঙ্গে নেন নিজেদের বানানো অদ্ভুতদর্শন একটি কাঠের বন্দুক। যেটা দিয়ে বিদ্যুৎগতিতে তির ছোঁড়া যায় জলের নীচে।
এরপর বাজাউরা এক বুক শ্বাস নিয়ে খাদ্যের সন্ধানে নেমে যায় সমুদ্রের ২৩০ ফুট নীচে। অবিশ্বাস্য ভাবে এরা জলের নীচে শ্বাস ধরে থাকতে পারে প্রায় ১০ থেকে ১৩ মিনিট। যা বিশ্বের আর কোনও উপজাতির মানুষরা পারে না। জলের নীচে শিকার করে তাদের প্রধান খাদ্য বিভিন্ন মাছ, স্টিং রে, স্কুইড, অক্টোপাস। উঠে আসার সময় শরীরে বাঁধা ওজন খুলে ফেলে শরীরকে হালকা করে নেয়।
[caption id="attachment_115882" align="aligncenter" width="920"]
সমুদ্রের ২০০ ফুট নিচে চলছে শিকার[/caption]
জলের তলায় খালি হাতে হাঙর ধরা, এটাও একটা খেলা[/caption]
মানুষের প্লীহা হল অক্সিজেন যুক্ত লোহিত রক্তকণিকার ভাঁড়ার ঘর। ডুবন্ত বাজাউদের প্লীহা ক্রমাগত সংকুচিত হয়ে এই আপৎকালীন পরিস্থিতিতে রক্তের স্রোতে অক্সিজেন যুক্ত লোহিত রক্তকণিকার যোগান বাড়িয়ে দেয়।
অক্টোপাস শিকার[/caption]
DNA বিশ্লেষণেও একই জিনিস দেখা গেছে। বাজাউদের জিনে আকস্মিক পরিবর্তন বা মিউটেশন দেখা গেছে। এবং এমন একটি জিনে এই পরিবর্তন হয়েছে যেটি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে। সেই জিনটি আপৎকালীন প্রয়োজন অনুসারে রক্তস্রোতকে পাঠিয়ে দেয় সেই অঙ্গগুলিতে, যেখানে সব চেয়ে বেশি অক্সিজেন দরকার। যে অঙ্গগুলিতে অক্সিজেন কিছুক্ষণ না গেলে ততটা ক্ষতি হবে না, সে দিকে রক্তস্রোত কমে যায়।
পরিবর্তন দেখা গেছে বাজাউদের আরেকটি জিনে। যেটি carbonic anhydrase নামে একটি এনজাইম (enzyme) তৈরি করে। যে এনজাইমটি রক্তস্রোতে খুবই ধীরে কার্বন-ডাই অক্সাইড পাঠায়। ফলে এই পরিবর্তনটিও বাজাউদের শ্বাস ধরে রাখতে সাহায্য করে। প্লীহা সংলগ্ন পেশীর সংকোচন ঘটায় যে জিন তারও পরিবর্তন হয়েছে। যে জিনটি প্লীহার সংকোচন ঘটিয়ে রক্তে অক্সিজেন মাত্রা বাড়াতে সাহায্য করে।
[caption id="attachment_115928" align="aligncenter" width="702"]
রোজ চলে বাঁচার লড়াই[/caption]
পরীক্ষার সমস্ত ফলাফল বিশ্লেষণ করে গবেষকরা সিদ্ধান্তে আসেন। সামুদ্রিক পরিবেশে টিকে থাকার জন্য, শত শত বছর ধরে খাদ্য সংগ্রহের জন্য সমুদ্রের গভীরে যাওয়ার অভ্যাস, বাজাউদের বিভিন্ন অঙ্গ ও শ্বসনতন্ত্র এবং রক্ত সংবহনতন্ত্রে স্থায়ী পরিবর্তন ঘটিয়েছে। তাই বুঝি বাজাউরা সমুদ্রের জলে মাছের মতই সাবলীল। অন্যদিকে ডাঙার খাবারে অভ্যস্ত হওয়ায় মোরো উপজাতির ডুব দেওয়ার ক্ষমতা নেই।
[caption id="attachment_115929" align="aligncenter" width="800"]
জন্ম আছে মৃত্যু আছে; নেই দেশ, নেই ভবিষ্যৎ[/caption]