
শেষ আপডেট: 3 April 2020 04:27
প্রোকপির বাড়ির পিছনের আছে বরফ জমা মাঠ। মাঠের ভেতর কাঠের ছাউনি। তার ভিতরে থাকা ছাইরঙা ত্রিপলটা তুলে ধরেছিলেন প্রোকপি বিদেশি সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সামনে। ত্রিপলের নীচ থেকে বের করে এনেছিলেন প্লেট আকৃতির অতিকায় একটি হাড়। হাড়টি হাতির পূর্বপুরুষ লোমশ ম্যামথের মেরুদন্ডের একটি অংশ। মুচকি হেসে তিনি সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের বলেছিলেন, “আমার কয়েক জন বন্ধু এগুলি গ্রামের উত্তর দিক থেকে পেয়েছে, তাঁরা এখন এগুলো বিক্রি করতে চান। কিন্তু এটা ম্যামথের দাঁত নয়। তাই এর ক্রেতা নেই।”
আজ সারা বিশ্ব ইয়াকুটিয়াকে চেনে লোমশ ম্যামথের এলাকা হিসেবে। ইয়াকুটিয়ার সর্বত্র,ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ম্যামথের হাড়। আর্কটিক সমুদ্রের পাশেই অবস্থিত ইয়াকুটিয়া সারা বছর ঢেকে থাকে বরফে। ফলে এটি হয়ে উঠেছে প্রাকৃতিক ফ্রিজ। যার মধ্যে প্রাকৃতিকভাবে সংরক্ষিত আছে প্রাগৈতিহাসিক জীবজন্তুদের ফসিল।
[caption id="attachment_203861" align="aligncenter" width="768"]
ম্যামথের শরীরের বিভিন্ন অংশ সাংবাদিকদের দেখাচ্ছেন কোটিপতি প্রোকপি।[/caption]
লোমশ ম্যামথ কী!
ম্যামথ একটি বিলুপ্ত প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী। তার একটি প্রজাতি হলো লোমশ ম্যামথ ( Mammuthus primigenius)।প্লিসটোসিন যুগে লক্ষ লক্ষ রোমশ ম্যামথ সাইবেরিয়া অঞ্চলে ঘুরে বেড়াত। পূর্ব এশিয়ার ম্যামথ অঞ্চলে আজ থেকে প্রায় চার লক্ষ বছর আগে লোমশ ম্যামথ প্রজাতিটি জন্ম নেয়। এরা আকৃতিতে ছিলো অতিকায়। গড়পড়তা পুরুষ ম্যামথ উচ্চতায় ছিল প্রায় ১৫ থেকে ২০ ফুট এবং এদের ওজন ছিল প্রায় ৬ মেট্রিক টন!
শরীরের তুলনায় এদের কান ছোট ছিল, কিন্তু দাঁত ছিল বিরাট। লম্বায় এক একটি দাঁত কুড়ি ফুট পর্যন্ত হতে পারত, একটি দাঁতের ওজন দাঁড়াত ২০০ থেকে ২৫০ কেজি। আজ লোমশ ম্যামথ বিলুপ্ত, কিন্তু তাদের শরীরের বিভিন্ন অংশ লক্ষ লক্ষ বছর ধরে এই ইয়াকুটিয়া অঞ্চলের স্থায়ী বরফের তলায় চাপা পড়ে আছে। যা ইয়াকুটিয়ার মানুষদের হয়ে উঠেছে সোনার খনি।
[caption id="attachment_203863" align="alignnone" width="632"]
লোমশ ম্যামথ।[/caption]
ম্যামথের দাঁতের অবৈধ ব্যবসাতেও চিনের হাত
পৃথিবীতে হাতির দাঁতের সব চেয়ে বড় ক্রেতা চিন। হাতির দাঁতের তৈরি নানান শৌখিন সামগ্রী সারা পৃথিবী জুড়ে বিক্রি করত চিন। কিন্তু ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ড ফান্ড ও বন্যপ্রাণীদের সুরক্ষা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার দাপটে, চিন হাতির দাঁতের শিল্পসামগ্রীর উপরে নিষেধাজ্ঞা জারি করতে বাধ্য হয়েছে। এখন চিনে আইভরি বা হাতির দাঁত আমদানি বা বিক্রি করা যাবে না। কিন্তু এত দিন যাঁরা হাতির দাঁত খোদাইয়ের কাজ ও ব্যবসা করতেন, তাঁদের চলবে কী করে!
তাই তাঁরা এখন রাশিয়া থেকে হাতির প্রাগৈতিহাসিক পূর্বপুরুষ লোমশ ম্যামথের দাঁত চোরাপথে আমদানি করে কোটি কোটি ডলারের ব্যবসা করে চলেছেন। ম্যামথের দাঁতের ব্যবসায়িক নাম এখন 'আইস আইভরি', কেউ বলেন 'সাদা সোনা'। ২০১৭ সালে রাশিয়া থেকে প্রায় ৭২ টন ম্যামথের দাঁত রপ্তানি করা হয় বিদেশে। যার ৮০ শতাংশই কেনেন চিনের ব্যবসায়ীরা। সাইবেরিয়ার কাছেই চিনের সীমান্ত থাকায়, রাশিয়া ও চিনের মধ্যে সম্পর্ক ভাল থাকায় চিনের ব্যবসায়ীরা আজকাল সরাসরি ইয়াকুটিয়া চলে আসছেন। লোমশ ম্যামথের দাঁত কিনতে।
[caption id="attachment_203868" align="aligncenter" width="600"]
ম্যামথের দাঁতের সব চেয়ে বড় ক্রেতা চিন।[/caption]
জীবাশ্মবিজ্ঞানীরা মনে করছেন এই অঞ্চলে প্রায় পাঁচ লক্ষ টন ম্যামথের দাঁত চাপা পড়ে আছে। আন্তর্জাতিক বাজারে যার দাম নব্বই লক্ষ কোটি টাকা। সাইবেরিয়ার উত্তরের গ্রামগুলির শিকারি এবং মৎস্যজীবীরা কয়েকশো বছর ধরেই নদী ও সমুদ্রের ধারের বরফ সরে যাওয়া অংশ থেকে ম্যামথের হাড় ও দাঁত কুড়িয়ে আনছেন। কিন্তু, গত এক দশকে 'আইস আইভরি' খোঁজার ক্ষেত্রে নাটকীয় পরিবর্তন এসেছে। ভাগ্য বদলাতে ও রাতারাতি কোটিপতি হতে দলে দলে মানুষ আধুনিক যন্ত্রপাতি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন ম্যামথের দাঁত খুঁজতে। যেমনভাবে সোনার সন্ধানে মানুষ ঝাঁপিয়েছে ব্রাজিলের আমাজনে, হীরের সন্ধানে দক্ষিণ আফ্রিকায়।
ম্যামথের খনি
প্রায় ১২ লক্ষ বর্গমাইল এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই ইয়াকুটিয়া। যা আয়তনে ফ্রান্সের পাঁচ গুণ। বেশির ভাগ জায়গায় যাওয়ার জন্য কোনও রাস্তাই নেই। বরফের মধ্যে দিয়ে হেঁটে হেঁটে পৌঁছতে হয়। ম্যামথের দাঁত সংগ্রহ করা বেশ কঠিন, এর জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কয়েকশো কিলোমিটার দূর থেকে বরফ ঠেলে আনতে হয়। এরপর, গরম জলের জেট দিয়ে বরফের ভেতর সুড়ঙ্গ কেটে ম্যামথদের হাড়ের স্তুপের কাছে পৌঁছনোর চেষ্টা করা হয়। এ ভাবেই বরফের বুকে তৈরি হয়ে যায় ম্যামথের হাড়ের খনি। লোমশ ম্যামথের উন্নত মানের দাঁত বা আইস আইভরি এক কেজি এক হাজার ডলারে বিক্রি হয় চিনের কালোবাজারে। আর চিনকে ম্যামথের দাঁত বেচে ইয়াকুটিয়ার উত্তরের গ্রামবাসীরা প্রায় সকলেই কোটিপতি।
কিন্তু ক্ষতি হচ্ছে পরিবেশের। রাশিয়ার Rossiya 24 চ্যানেলটি গত এক বছর ধরে দেখিয়ে চলেছে একটি ডকুমেন্টরি ফিল্ম। ফিল্মটির নাম ‘আইল্যান্ড অফ স্কেলিটনস’। ফিল্মটিতে বলা হয়েছে, অন্ধ ইয়াকুটিয়া প্রশাসনের প্রত্যক্ষ মদতে কোটিপতি চোরাশিকারিদের (ম্যামথের দাঁত সংগ্রহকারী) অপরাধমূলক ব্যবসা চলছে। এর জন্য মেরু অঞ্চলের স্থায়ী বরফ খোঁড়া হচ্ছে, যা পৃথিবীর পরিবেশের পক্ষে মারাত্মক ক্ষতিকর। এ ছাড়াও ম্যামথের দাঁত সংগ্রহকারীদের দৌরাত্ম্যে ইয়াকুটিয়ার প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলির ভীষণ ক্ষতি হচ্ছে।
[caption id="attachment_203869" align="aligncenter" width="900"]
ম্যামথের খনি।[/caption]
ইয়াকুটিয়ায় ঝাঁপিয়ে পড়েছেন বিজ্ঞানীরাও
শিল্প ও চাষবাসহীন অঞ্চলটিতে 'আইস আইভরি' নিয়ে নতুন ব্যবসা যেমন স্থানীয় মানুষদের অর্থ উপার্জনের মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে, ঠিক সে রকম ভাবেই ইয়াকুটিয়া আজ সারা পৃথিবীর জীবাশ্মবিজ্ঞানীদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে। তুষারযুগে বাস করা, বর্তমানে বিলুপ্ত ম্যামথের বিভিন্ন প্রজাতি ও নতুন কোনও প্রাণী আবিষ্কারের আশায় তাঁরাও তুষার গাঁইতি, ছেনি আর হাতুড়ি নিয়ে নেমে পড়েছেন ইয়াকুটিয়াতে।
ইউকুটিয়া অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সের জীবাশ্মবিদ ভ্যালেরি প্লটনিকভ তাই সম্পুর্ণ বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছেন। তিনি বলেছেন, এই আইস আইভরি নিয়ে কাড়াকাড়ি কিন্তু বিজ্ঞানের পক্ষে শুভ। কারণ এর ফলে বরফের তলা থেকে বিভিন্ন ফসিল উঠে আসছে। তাঁদের মতো জীবাশ্মবিজ্ঞানীদের পক্ষে সেটি অত্যন্ত খুশির খবর। ম্যামথের দাঁতের জন্য বরফ খোঁড়াখুঁড়ির ফলে, গত গ্রীষ্মে এক প্রাগৈতিহাসিক সিংহ ছানার ফসিল পাওয়া গেছে। একসময় সাইবেরিয়াতে সিংহ বাস করত জেনে আলোড়ন শুরু হয়ে গেছে জীববিজ্ঞানী মহলে। বর্তমানে প্লটনিকভ সিংহ ছানার ফসিলটিকে নিয়ে রিসার্চ করছেন।
[caption id="attachment_203871" align="aligncenter" width="720"]