
শেষ আপডেট: 27 July 2019 11:43
পোল্যান্ড দখলের পর তৃপ্ত হিটলার অভিবাদন জানাচ্ছেন নাৎসি বাহিনীকে, পোল্যান্ডের মাটিতে[/caption]
অপারেশন বারবারোসা[/caption]
হাজার হাজার কিলোমিটার হেঁটে চলা একটু আশ্রয়ের জন্য[/caption]
সাইবেরিয়া থেকে তুর্কমেনিস্তানের আশখাবাদ। সেখান থেকে ইরানের মাশহাদ, ইস্পাহান, তেহরান হয়ে শরণার্থীরা এসেছিলেন আফগানিস্তানে। তার পর বর্তমান পাকিস্তানের কোয়েটা, জেহাদাউ, করাচি হয়ে জাহাজে তৎকালীন ভারতের বোম্বে বন্দরে পৌঁছেছিলেন। সংখ্যায় মাত্র ৬৪০ জন। বাকিরা দীর্ঘ যাত্রাপথের ধকলে, ঠান্ডায়, অনাহারে, অপুষ্টিতে, জীবনের রাস্তা থেকে মাঝপথেই বিদায় নিয়েছিলেন।
মহারাজা জামসাহেব দিগ্বিজয় সিংজী রঞ্জিৎ সিংজী জাদেজা[/caption]
নাওয়ানগর স্টেটে পৌঁছে অবাক হয়েছিলেন সব খোয়ানো মানুষগুলি। তাঁদের অভ্যর্থনা করার জন্য দাঁড়িয়েছিলেন স্বয়ং মহারাজা, জামসাহেব দিগ্বিজয় সিংজী রঞ্জিৎ সিংজী জাদেজা। প্রত্যেককে বুকে জড়িয়ে বলেছিলেন, "নিজেদের অনাথ ভাববেন না। আপনারা এখন নাওয়ানগর স্টেটের জনগণ। আমি হলাম বাপু, আপামর নাওয়ানগরবাসীর পিতা। আজ থেকে আমি আপনাদের অভিভাবক।"
সাইবেরিয়ার বন্দি শিবির থেকে স্বর্গে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন রুগ্ন শীর্ণ মানুষগুলি। যাঁদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিলেন নারী ও অনাথ শিশু।
[caption id="attachment_127448" align="aligncenter" width="1200"]
মহারাজার সঙ্গে শরণার্থীরা[/caption]
প্রথম ব্যাচের পোলিশ শরণার্থীরা[/caption]
কিন্তু, এর পরেও পোলিশ শরণার্থীদের স্রোত এসেছিল ভারতের পশ্চিম উপকূলে। জামসাহেবের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন পাতিয়ালা ও বরোদার মহারাজা। এগিয়ে এসেছিল টাটা ও অনান্য ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। সবার সহায়তায় পোলিশ শরণার্থীদের জন্য বালাচাদি, ভালিভাদে (কোলাপুর), বান্দ্রা (মুম্বাই) ও পঞ্চগনিতে আরও শরণার্থী শিবির তৈরি করেছিলেন জামসাহেব।
১৯৪২ থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন প্রায় ২০০০০ পোলিশ শরণার্থী। তার মধ্যে ছিল হাজারেরও বেশি অনাথ শিশু। ১৯৪৫ সালের মে মাসে জার্মানির পতন হয়েছিল। স্বাধীনতা পেয়েছিল পোল্যান্ড। শরণার্থীদের দেশে ফিরতে অনুরোধ করেছিল পোল্যান্ড সরকার।
[caption id="attachment_127465" align="aligncenter" width="958"]
অনাথ পোলিশ বালক বালিকাদের জন্য স্কুল করে দিয়েছিলেন মহারাজা[/caption]
অনেকে ফিরেছিলেন, অনেকে ইংল্যান্ড, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও অনান্য কমনওয়েলথ রাষ্ট্রগুলিতে চলে গিয়েছিলেন। সে ব্যবস্থাও করেছিলেন জামসাহেব। শরণার্থীরা ভারত ছেড়ে যাওয়ার সময় স্টেশনে তাঁদের বিদায় জানাতে এসেছিলেন। সেদিন অঝোরে কেঁদেছিলেন শরণার্থীরা। জামসাহেবের চোখেও সেদিন ছিল জল।
পোল্যান্ডে মহারাজা স্কোয়ার[/caption]
পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশ'তে আছে একটি স্কুল। বাইরে থেকে আর পাঁচটি পোলিশ স্কুলের মত মনে হলেও, ভেতরে ঢুকে অবাক হয়ে যান অতিথিরা। একটুকরো ভারত যেন উঠে এসেছে পোল্যান্ডে। দেওয়ালে দেওয়ালে ঝুলছে অসাধারণ সব পেন্টিং। তাজ মহল, হোলি খেলার দৃশ্য, বেনারসের গঙ্গার ঘাট থেকে শুরু করে ভারতীয় গ্রাম্য জীবনের ছবি। স্কুলের সর্বত্র ছড়িয়ে আছে ভারত থেকে সংগ্রহ করা বিভিন্ন দেব দেবীর মূর্তি, ভাস্কর্য ও হস্তশিল্প।
[caption id="attachment_127468" align="aligncenter" width="660"]
জামসাহেব এই স্কুলের প্রধান পৃষ্ঠপোষক[/caption]
সর্বপরি স্কুলটির সঙ্গে জড়িয়ে আছেন জামসাহেব দিগ্বিজয় সিংজী রঞ্জিৎ সিংজী জাদেজা। স্কুলের গেটের পাশে টাঙানো স্কুলের নামের ওপরে তাঁর নামের বোর্ড টাঙানো আছে। কারণ তিনিই স্কুলটির প্রধান পৃষ্ঠপোষক।
১৯৯৯ সালের জুন মাসে স্কুলের ছাত্র, শিক্ষক ও অভিভাবকরা সর্বসম্মতিক্রমে চিরকালের জন্য জামসাহেবকে স্কুলের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ঘোষণা করেছিলেন। যে জামসাহেব প্রয়াত হয়েছিলেন ১৯৬৬ সালে।
১৯৯৩ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত ভারতে পোল্যান্ডের অ্যাম্বাসাডর ছিলেন Maria Krzyszt। তিনি দেশে ফিরে পোলিশ শরণার্থীদের প্রতি জামসাহেবের ভালোবাসাকে অমর করে রাখতে মহারাজার স্মৃতিতে এই স্কুলটি তৈরি করেন। তিনি চান যুগযুগ ধরে স্কুলের ছাত্র ছাত্রীরা এই ঐতিহাসিক ঘটনাটিকে বাঁচিয়ে রাখুক।
[caption id="attachment_127479" align="aligncenter" width="759"]
পোল্যান্ড থেকে জামনগরে তাঁর বাপুর কাছে এসেছিলেন তখনকার অনাথ শিশু, ৭৬ বছর পরে[/caption]
স্কুলটি আজ বিনা অর্থে চেচনিয়া, ভিয়েতনাম, শ্রীলঙ্কা , তিব্বত ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের শরণার্থী বালক বালিকাদের শিক্ষাদান করে থাকে। যে মানবিকতার বীজ বপন করেছিলেন জামসাহেব, তা আজ মহীরুহ হয়ে ডালপালা মেলছে বিশ্বজুড়ে।
ভারতই বিশ্বকে বসুধৈব কুটুম্বকম-এর কথা শিখিয়েছে। হাজার হাজার বছর ধরে ভারতই সমগ্র মানবজাতিকে এক অখণ্ড পরিবার হিসেবে ভেবে এসেছে। তা বুঝি আরও একবার প্রমাণ করে দিয়ে গেছিলেন জামসাহেব দিগ্বিজয় সিংজী রঞ্জিৎ সিংজী জাদেজা।