রূপাঞ্জন গোস্বামী
হোসে সালভাদোর আলভারেঙ্গা, মধ্য আমেরিকার এক মৎস্যজীবী। স্ত্রী এবং ১৩ বছর বয়সী মেয়ে নিয়ে তার ছিল ছোট্ট সংসার। গুণ ছিল অনেক। বদ্গুণ একটাই, মাঝে মাঝে বেহেড মাতাল হয়ে যেতেন। টিনটিনের বন্ধু ক্যাপ্টেন হ্যাডকের মত।
এল-সালভাদরে জন্মালেও পেশার তাগিদে বাস করতেন মেক্সিকোতে।
২০১২ সালের
১৭ই নভেম্বর, বন্দরের একটি বারে মদ্যপান করতে করতে
৩৭ বছর বয়সী আলভারেঙ্গা, এক অদ্ভুত প্ল্যান করেন। পরের দিন, অর্থাৎ
১৮ নভেম্বর সকাল
১০টায় তিনি প্রশান্ত মহাসাগরে নৌকা ভাসাবেন। সমুদ্রে থাকবেন
১৯ তারিখ বিকেল
৪টে পর্যন্ত। টানা
৩০ ঘন্টা মাছ ধরবেন। একদিন কষ্ট করবেন, সারা সপ্তাহ আরামে কাটাবেন।
[caption id="attachment_99319" align="aligncenter" width="600"]
হোসে সালভাদোর আলভারেঙ্গা[/caption]
যেমন ভাবা তেমন কাজ
পরের দিনই, মেক্সিকোর
কোস্টা আজুল বন্দর থেকে, ২৫ ফুট লম্বা ইঞ্জিনচালিত ডিঙি নৌকায় রওনা দিলেন আলভারেঙ্গা। সঙ্গী হিসেবে নিলেন তাঁদের মাছ ধরার কোম্পানিতে সদ্য আসা বছর বাইশের
এজেকুয়েল কর্ডোবা'কে। বেচারি যেতে চায়নি। কারণ আবহাওয়ার পূর্বাভাস সুবিধের ছিল না। কিন্তু সিনিয়র সহকর্মী আলভারেঙ্গা, কিছুটা জোর করেই কর্ডোবাকে নিয়ে সাগরে ভাসলেন।
[caption id="attachment_99322" align="aligncenter" width="200"]
এজেকুয়েল কর্ডোবা[/caption]
তীর থেকে প্রায়
১৫০ কিলোমিটার দূরে চলে এসে মাছ ধরার প্রস্তুতি নেন আলভারেঙ্গা। নৌকায় ছিল ৪ ফুট লম্বা একটি আইস-বক্স এবং প্রায়
৫০০ কেজি ওজনের জাল ও অন্যান্য সরঞ্জাম। পূর্বাভাস মিলিয়ে দিয়ে আবহাওয়া খারাপ হতে শুরু করল। দুপুর একটা নাগাদ প্রশান্ত মহাসাগর উত্তাল হয়ে উঠল। এসে গেল ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড়। নৌকার ওপর আছড়ে পড়া বিশালাকার ঢেউগুলো দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়ল কর্ডোবা। আলভারেঙ্গাকে ফিরে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করল।
কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে
কিছুক্ষনের মধ্যেই নৌকায় জল উঠতে শুরু করল। নৌকাকে হালকা করতে নৌকায় থাকা মাছ ধরার সমস্ত সরঞ্জাম এবং তখনও পর্যন্ত ধরা সমস্ত মাছ সমুদ্রে ফেলে দিলেন। তীরের দিকে নৌকা নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেন। তীর থেকে তখন তাঁঁরা ছিলেন প্রায় ৬ ঘন্টা দূরে। নৌকায় থাকা রেডিও মারফত আলভারেঙ্গা তাদের অবস্থান জানিয়ে দিলেন তাঁদের কোম্পানির বসকে।

সন্ধ্যা নাগাদ আলভারেঙ্গা বুঝতে পারেন, তাঁরা ঝড়ের মধ্যে পথ হারিয়েছেন। ঘন অন্ধকারে তাঁদের নৌকার মোটরটিও বিকল হয়ে যায়। ঝড়ের দাপট ক্রমশ বেড়ে বাড়ছিল। আলভারেঙ্গা রেডিওর সাহায্যে বসকে বলেন,
- আমরা ভীষণ বিপদে, দয়া করে এখনই আমাদের উদ্ধার করতে এসো।
-চিন্তা করো না। আমরা এখনই আসছি। তোমাদের অবস্থান জানাও। এখন তোমরা কোথায়?
আলভারেঙ্গা তাঁর বস উইলিকে তাদের অবস্থান জানানোর আগেই রেডিওটির ব্যাটারি শেষ হয়ে যায়। ঘূর্ণিঝড় আর উত্তাল ঢেউ আলভারেঙ্গার ডিঙিকে ক্রমশ মাঝ সমুদ্রের দিকে ঠেলতে থাকে।
[caption id="attachment_99339" align="aligncenter" width="702"]
এই ডিঙিতেই ৪৩৮ দিন প্রশান্ত মহাসাগরে কাটিয়েছেন আল্ভারেঙ্গা[/caption]
ভুল বকতে শুরু করল কর্ডোবা
পাঁচ দিন পর ঝড়ের প্রকোপ কমে আসে। তখন তাঁরা তীর থেকে প্রায়
৪৫০ কিলোমিটার দূরে। সদ্য যুবক কর্ডোবা আতঙ্কিত হয়ে বারবার বলছিল, "
এভাবেই আমরা মারা যাব"। আলভারেঙ্গা কর্ডোবাকে বলতেন, "
নিশ্চিন্তে থাকো, খুব তাড়াতাড়ি আমাদের উদ্ধার করতে টিম মানুষ আসবে"। না, কোনও টিম আসেনি তাদের উদ্ধার করতে।
নৌকায় খাবার নেই, জল নেই, আলো নেই। প্রশান্ত মহাসাগরের দিনের কড়া রোদ আর রাতের হিমশীতল পরিবেশ দুজনের অবস্থা শোচনীয় করে তুলল। কয়েকদিন পর ঈশ্বরের আশীর্বাদ হয়ে নেমেছিল বৃষ্টি। খাওয়ার জন্য পাঁচ গ্যালন বৃষ্টির জল তাঁরা ধরে রাখলেন। আরও কিছুদিন বাঁচতে পারবেন এই আশায়।

দীর্ঘ ১১ দিন পর, তাঁদের খাবার জুটেছিল। আলভারেঙ্গা একটা কচ্ছপ আর একটা টাইগার মাছ ধরতে পেরেছিলেন। মাছ আর কচ্ছপের মাংস কাঁচাই খেয়ে নিচ্ছিলেন আলভারেঙ্গা। কিন্তু কর্ডোবা খেতে পারছিল না। আলভারেঙ্গা তাকে বোঝান এভাবেই বাঁচতে হবে তাদের, এছাড়া আর কোন উপায় নেই।
না খেয়ে খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে কর্ডোবা। জ্বর আসে, বিকারে ভুল বকে সে। তার জন্য কমলা লেবু কিনে আনতে বলে আলভারেঙ্গাকে। কর্ডোবার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে আলভারেঙ্গা বলেন, "
এখন বাজার বন্ধ, বাজার খুললেই কমলালেবু কিনে আনব"। কয়েক মাস কাটে এভাবে। একদিন আলভারেঙ্গা একটি পাখি ধরলেন। নিজেও খেলেন আর কর্ডোবাকে খাওয়ালেন। পাখীটি খাবার পর থেকেই আরও অসুস্থ হয়ে পড়ল কর্ডোবা।
পৃথিবী ছাড়ল কর্ডোবা
আরও দুই মাস কেটে গেল। কর্ডোবা এখন জীবন্ত কঙ্কাল। আলভারেঙ্গা ভাবে তার জন্যেই আজ কর্ডোবা মৃত্যুপথযাত্রী। একদিন ভোরে কর্ডোবা অস্ফুটে বলেছিল,
"বিদায়"। কিছুক্ষণের মধ্যেই আলভারেঙ্গাকে মাঝ সমুদ্রে একা ফেলে, পৃথিবী থেকে বিদায় নিল কর্ডোবা।
একমাত্র সঙ্গী কর্ডোবাকে হারিয়ে আলভারেঙ্গা প্রায় উন্মাদ হয়ে যান। নিজেকে রাতদিন গালাগালি করেন। নিজেকে কর্ডোবার খুনি বলেন। কর্ডোবার নিথর দেহটিকে আগলে রাখেন। কর্ডোবার মৃতদেহের সাথে কথা বলেন।
একটি জীবন্ত প্রায় উন্মাদ মানুষ ও আরেকটি শীর্ণ ও পচতে থাকা মৃতদেহ নিয়ে ভাসতে থাকে ডিঙি। প্রায় একসপ্তাহ পর, কর্ডোবার মৃতদেহ সাগরে ভাসিয়ে দেন আলভারেঙ্গা। চোখ খোলা রেখেই সাগরের অতলে তলিয়ে যায় বছর বাইশের কর্ডোবা।
দূরে দেখা যাচ্ছে এক দ্বীপ
একদিন বিকেলে আলভারেঙ্গা দেখতে পেলেন একটি জাহাজকে। চিৎকার করে সাহায্য চেয়েছিলেন। শেষে প্যান্ট খুলে মাথার ওপর উড়িয়ে ছিলেন। জাহাজের লোকেরা তাঁকে দেখতেও পান। কিন্তু উদ্ধার করার জন্য এগিয়ে আসেননি।
৩০শে জানুয়ারি,
২০১৪ সাল। সমুদ্রে
৪৩৮ দিন কাটিয়ে ফেলেছেন আলভারেঙ্গা। খুব অসুস্থ, চোখের সামনে নিশ্চিত মৃত্যুকে দেখতে পাচ্ছিলেন তিনি। মেক্সিকো থেকে প্রায়
১১৮০০ কিলোমিটার দূরে ভাসছে তাঁর ডিঙি। সকালবেলা সমুদ্রে কিছু নারকেল ভাসতে দেখেন আলভারেঙ্গা। লাফিয়ে উঠে বসেন, অভিজ্ঞ মৎস্যজীবী বুঝতে পারেন কাছাকাছি দ্বীপ আছে। ঘোলাটে চোখে ধরাও পড়ে সেই সবুজ দ্বীপ।
[caption id="attachment_99328" align="aligncenter" width="636"]
উদ্ধারের পর আলভারেঙ্গা[/caption]
সেই মুহূর্তে তাঁর নৌকার চারদিকে গিজগিজ করছিল হাঙ্গরের দল। জলে হাত নামিয়ে জল কাটার উপায় ছিলো না। কিন্তু এবার বাতাস ছিল আলভারেঙ্গার দিকে। অর্ধেক দিন লেগে গেল দ্বীপটির কাছে পৌছাতে। তীর থেকে যখন নৌকা মাত্র ১০ ফুট দূরে, নৌকা থেকে আলভারেঙ্গা ঝাঁপিয়ে পড়েন জলে। মহাসাগরের ঢেউ আলভারেঙ্গাকে নিয়ে যায় তীরে। দ্বীপে পৌঁছানোর পর বালুচরেই বেহুঁশ হয়ে যান আলভারেঙ্গা।
দ্বীপটি ছিল
দক্ষিণ মার্শাল আইল্যান্ড-এর অন্তর্গত
ইবন এটোলে দ্বীপ। নির্জন এই দ্বীপে একা বাস করতে থাকা এক দম্পতি অচেতন আলভারেঙ্গাকে উদ্ধার করেন। তাঁরা খবর পাঠান
মার্শাল আইল্যান্ড-এর রাজধানী
মাজুরো'তে। সেখানে ১১ দিন চিকিৎসার পর সুস্থ হয়ে উঠেন আলভারেঙ্গা। রওনা দেন নিজের দেশ এল সালভাদোরের উদ্দেশ্যে।
[caption id="attachment_99373" align="aligncenter" width="620"]
বাড়ি ফেরা[/caption]
সেখানে আছে তাঁর পরিবার। এবং যাঁরা জানেন, তাঁদের প্রিয়জন চিরতরে হারিয়ে গিয়েছেন প্রশান্ত মহাসাগরে। কিন্তু তাঁরা জানতেন না, ইতিহাসকে স্তম্ভিত করে,
৪৩৮ দিনে প্রায়
১১৮০০ কিলোমিটার সমুদ্রপথে, জীবনের লড়াই লড়তে লড়তে, জিতেই ফিরছেন তাঁদের প্রিয়জন
।
কিন্তু ডাঙাতেও অপেক্ষা করছিল নতুন বিপদ। মৃত কর্ডোবার পরিবার অভিযোগ এনেছিলেন, প্রাণে বাঁচতে আলভারেঙ্গা নাকি কর্ডোবাকে খেয়ে ফেলেছিলেন। অভিযোগ প্রমাণ করা যায়নি। জলের মত, ডাঙার লড়াইও জিতেছিলেন হার না মানা হোসে সালভাদোর আলভারেঙ্গা।