
শেষ আপডেট: 23 February 2019 10:07
অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর আঁকলেন ভারতমাতা[/caption]
নব্যভারতীয় শিল্পবাদের অঙ্গনে, নারী শরীর এক অর্থে হয়ে উঠল, "দেহহীন প্রেম নিকশিত হেম, কাম গন্ধ নাহি তায়"। ক্যানভাসে ফুটে উঠল নারী মূর্তি, তার শরীরের পুরোটাই ঢাকা। শুধু মুখটি খোলা। অথচ, সেই সময়ে ভারতের বেশিরভাগ নারীই ইউরোপীয় মেয়েদের মতো ব্লাউজ, সেমিজ, বডিস, পেটিকোট পড়তে শেখেননি। ফলে শুরু হল ...
...আঙ্গিকে আঙ্গিকে ছায়া যুদ্ধ
১৮৯৬ সালের ৬ জুলাই, ই বি হ্যাভেল কলকাতার গর্ভমেন্ট আর্ট স্কুলের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এবং এদেশের নান্দনিক চিন্তাধারার গতিপথ পাল্টে দেন। বাড়তে থাকা স্বদেশিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলায় চিত্রশিক্ষার মডেল তৈরি করেছিলেন। পাশে ছিলেন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কিন্তু পাশ্চাত্যের চিত্রশিল্পের ধারাগুলির অবলুপ্তি গর্ভমেন্ট আর্ট স্কুলেরই কিছু ছাত্র মেনে নিতে পারেননি। তাঁরা বলেছিলেন পাশ্চাত্যের শিল্পকলা যে উচ্চতায় উঠেছে তার স্পর্শ ছাড়া ভারতে চিত্রচর্চা অর্থহীন। বিক্ষোভের ফলশ্রুতি হিসেবে ১৮৯৭ সালেই কলকাতায় পাল্টা আরেকটি আর্ট স্কুল তৈরি হয়। যার নাম ‘জুবিলি আর্ট অ্যাকাডেমি’। নেতৃত্বে ছিলেন রণদাপ্রসাদ গুপ্ত। এর কিছুদিনের মধ্যেই......
...গচিহাটার মজুমদার বাড়ি ছাড়ল আজন্ম বিদ্রোহী হেম
যখন দুটি মতবাদের মধ্যে ছায়াযুদ্ধ চলছে। ময়মনসিংহের গচিহাটার মজুমদারবাড়ি ছাড়লেন হেমেন্দ্রনাথ। কারণ তাঁর হাত থেকে তুলি কেড়ে নিতে চান পরিবারের গুরুজনরা। কলকাতায় পালিয়ে এসে হেমেন্দ্রনাথ উঠেছিলেন অখিল মিস্ত্রি লেনে, দিদি হৈমলতার বাড়িতে। তাঁর জামাইবাবু রমেশ সোম, বালক হেমেন্দ্রনাথের মধ্যে শিল্পী হওয়ার অসীম আগ্রহ লক্ষ করেছিলেন। তিনি হেমেন্দ্রনাথকে অবনীন্দ্রনাথের গভর্নমেন্ট আর্ট স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছিলেন। সালটা ছিল ১৯১০। কিন্তু দ্রুতই হেমেন্দ্রনাথের মোহভঙ্গ হল। তিনি বুঝলেন গভর্নমেন্ট আর্ট স্কুলে শিল্পের মুখে লাগাম পরিয়ে রাখা আছে। মনের ঘোড়া ক্যানভাসে ইচ্ছেমতো ছোটানোর স্বাধীনতা নেই। প্রিয় বন্ধু অতুল বসুর পরামর্শে তিনি রণদাপ্রসাদ গুপ্তের জুবিলি আর্ট অ্যাকাডেমিতে ভর্তি হলেন। ১৯১১ থেকে ১৯১৫ অবধি তিনি কলকাতার জুবিলি অ্যাকাডেমিতে শিক্ষা গ্রহণ করেন।
[caption id="attachment_82120" align="aligncenter" width="210"]
হেমেন্দ্রনাথ মজুমদার[/caption]
জুবিলি অ্যাকাডেমিতে হেমেন্দ্রনাথ শিখলেন তেলরঙের কাজ। ভারতে জীবন্ত মডেল নিয়ে ন্যুড স্টাডি শুরু হয়নি। তবে জুবিলি অ্যাকাডেমিতে ন্যাচারালিস্ট পদ্ধতিতে আঁকা শেখাতেন শিক্ষকেরা। চিন্তার স্বাধীনতা ছিল। ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে প্রথাগত শিক্ষা শেষ করে, যোগেন্দ্রনাথ শীল, অতুল বসু, যামিনী রায় ও, ভবানীচরণ লাহার সঙ্গে বিডন স্ট্রিটে শুরু করলেন ইন্ডিয়ান অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস। তাঁরা চেয়েছিলেন, ছবি হোক সর্বসাধারণের। শিল্প শুধু ধনীদের আয়ত্বে থাকলে শিল্পের উন্নতি হবে না। কিন্তু, অভিন্নহৃদয় বন্ধু অতুল বোস পাকাপাকিভাবে ইংল্যান্ড চলে গেলেন, ১৯২৪ সালে। অতএব...
...একলা চলরে
হেমেন্দ্রনাথ হয়ে উঠলেন পেশাদার চিত্রকর হেমেন মজুমদার। গতানুগতিকতার স্রোতের বিরুদ্ধে ভাসা এক বোহেমিয়ান চিত্রকর। রক্ষণশীল চিত্রকরদের নীতিশাস্ত্র মেনে আকঁবে না তিনি। তিনি আঁকবেন তাঁর মর্জিমাফিক। তুলিতে মাখিয়ে নিলেন তেলরঙ। আঁচড় পড়ল বড় ক্যানভাসে। না, ক্যানভাসে ফুটে ওঠেনি কোনও নিসর্গচিত্র বা দেবদবী। ফুটে উঠল অর্ধনগ্ন নারী। যা ছিল, সেই সময়ের কলকাতায়, অবনীন্দ্রনাথের চিন্তাধারার প্রতি সরাসরি বিদ্রোহ ঘোষণা।
[caption id="attachment_82122" align="aligncenter" width="236"]
ক্যানভাসে বিপ্লব আনলেন হেমেন মজুমদার[/caption]
হেমেন মজুমদারের ছবিতে ছিল নগ্নতার কাব্যময়তা। কিন্তু তাঁর ছবির একজন মহিলাও বালিকা কিশোরী বা সদ্যযৌবনা নন। তাঁরা সবাই পরিণত বয়স্কা, সম্ভবত বিবাহিতা। তাঁর প্রিয় বিষয় ছিলেন গ্রাম্য মধ্যবিত্ত ও সম্ভ্রান্ত বাঙালি পরিবারের স্বাস্থ্যবতী বিবাহিতা নারীরা। তাঁদের সাংসারিক জীবনে বেশভূষার অসতর্ক মুহূর্তগুলি ফুটে উঠত তাঁর ছবিতে। ফুটে উঠত...
...বিবাহিতা নারীর শরীরের পশ্চাদদৃশ্য
স্বাস্থ্যবতী বিবাহিতা রমণীর শরীরের পিছন দিকটাই ছিল হেমেন মজুমদারের পছন্দের বিষয়। এর ফলে ছবিগুলি দর্শকের ইন্দ্রিয়কে প্রভাবিত করতো। প্রভাবিত করত নারীটির মাংসল যৌবন, পেশীর ও হাড়ের গঠন। The Wounded Vanity, Blue Sari, Harmony, A young woman with a water jar প্রভৃতি ছবিগুলিই এর অকাট্য প্রমাণ। হেমেন মজুমদারের আঁকা ছবিগুলি নগ্ন নারীর ছবির চেয়েও বেশি বিখ্যাত হয়ে ছিলো। নগ্ন নারীকে দেখে যতটা কামোত্তেজনা জাগে, আলো-আঁধারের আলিঙ্গনে, পাতলা ভিজে শাড়িতে কোনও মতে শরীর ঢাকা নারী অনেক বেশি উত্তেজক।
[caption id="attachment_82135" align="aligncenter" width="696"]
'পল্লীপ্রাণ'[/caption]
এই চিরসত্যটা ধরে ফেলেছিলেন হেমেন মজুমদার। না, ব্যবসায়িক ভাবনা তাঁর মাথায় ছিল না। ছিল তৎকালীন নব্যভারতীয় শিল্পবাদের প্রতি এক বিদ্রোহ। এক প্রথাভাঙা, নির্বাক আন্দোলন। monsoon ছবিটিতে আমরা দেখেছি, নদীর ঘাটে বসে এক যুবতীকে পা পরিষ্কার করতে। আকাশে বর্ষার মেঘ। ভিজে কাপড়ের ভেতর দিয়ে যুবতীর মাংসল পিঠ ও নিতম্বের কিছু অংশ দেখা যাচ্ছে। After bath নামের ছবিটিতে এক যুবতী স্নান সেরে নদী থেকে জল নিয়ে উঠে আসছেন। তাঁর বাম স্তন সাদা শাড়ির ভেতর দিয়ে পরিস্কার বোঝা যাচ্ছে, কিন্তু স্তনবৃন্ত অদৃশ্য। এবং সেই জন্যই দর্শক তাঁর ছবি ফিরে ফিরে দেখতে বাধ্য হন। যদিও দর্শক জানেন এই রহস্য কোনও দিনই উন্মোচিত হবে না। কল্পনায় ডুবে যান দর্শক।
[caption id="attachment_82124" align="aligncenter" width="350"]
এক প্রথাভাঙা, নির্বাক আন্দোলন[/caption]
সে কালের গ্রাম-বাংলায় বউ-ঝি'রা পুকুরে নদীতে স্নান সেরে ভিজে কাপড় জড়িয়েই ঘরে ফিরে যেতেন। তাদের দিকে তাকিয়ে দেখতেন জমিদারের লম্পট নায়েব বা গ্রামের মোড়ল। এমন দৃশ্যের কথা আমরা গ্রাম বাংলা নিয়ে লেখা গল্প ও উপন্যাসে পড়েছি। সাহিত্যিকদের নজর এদিকে পড়লেও চিত্রশিল্পীদের নজর সেভাবে তখনও গ্রাম্য যৌবনের দিকে পড়েনি। এই বিষয় নিয়ে ছবি আঁকার কথা কেউ ভাবেননি।ঊনবিংশ শতাব্দীর বিখ্যাত চিত্রকর রবি ভার্মার ভাই রাজা ভার্মা প্রথম এই বিষয় নিয়ে আঁকেন। বামাপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়ও একই বিষয় নিয়ে আঁকেন। কিন্তু তাঁরা রক্ষণশীলদের দাপটে প্রচার পাননি। তাই হেমেন মজুমদারের অঙ্কনশৈলী একই ধারার হয়েও নিজস্ব ধারার সূত্রপাত ঘটালো।
[caption id="attachment_82126" align="aligncenter" width="379"]
বাঙালি রমণীর লুকিয়ে রাখা সম্পদে, অবৈধ অথচ সাহসী উঁকি[/caption]
পল্লিপ্রাণ, স্নানান্তে, সিক্তবসনা, সজ্জা সমাপন, পরিত্যক্তা, তন্ময় ,স্মৃতি, মানসকমল, পরিণাম, অনন্তের সুর, সাকী, কমল না কন্টক নামের ছবি গুলি সারা বিশ্বে আজ সমাদৃত। হেমেন মজুমদারের একটি ছবিতে দেখতে পাই , সিল্কের শাড়ি পরা এক রমণীকে। কানে দামী দুল, হাতে বাজুবন্ধ। বসে আছেন তাঁর স্বপ্নের জগতে। ছবিটি আঁকা হয়েছে গোলাপকে পটভূমিতে রেখে। ভালোবাসার সুখ ও কাঁটাকে তুলে ধরা হয়েছে ছবিতে গোলাপটি এনে। অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসে ১৯৩৬ সালে এবং ১৯৫২ সালে ক্যালিফোর্নিয়াতে an exhibition of Portraits of Great Beauties of the World প্রদর্শনীতে ছবিটি দর্শকদের মোহিত করে। তবে একটি বিষয়ে তিনি ছিলেন অনন্য। সেই যুগে তিনিই প্রথম...
মানসপ্রতিমা[/caption]
এ ভাবেই তৈরি হয়েছিল হেমেন্দ্রনাথ মজুমদার-এর আঁকা বিখ্যাত ছবি তন্ময়। আধুনিক যুগের ফোটোশপও পদ্ধতিও লজ্জা পাবে হেমেন মজুমদারের মুন্সিয়ানায়। একই কৌশল ব্যবহার করে পরেও বহু ছবি এঁকেছেন তিনি। কোনও বিষয়কে ক্যানভাসে ধরার জন্য, রেফারেন্স হিসাবে তিনি তাঁর ক্যামেরায় তোলা ছবি এবং মডেলকে সামনে রেখে করা ‘লাইভ ড্রয়িং’এর সাহায্য নিতেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাঁর মডেল ছিলেন তাঁর স্ত্রী সুধারাণী। কিন্তু ছবিতে তাঁকে চেনা যেত না। কারণ মুখটি পালটে দিতেন। প্রথা ভেঙেছিলেন বলে হয়ত...
'দিল্লি কা লাড্ডু'[/caption]
যাঁর দর্শন ছিল voyeuristic eroticism। হেমেন মজুমদারের আঁকা ছবিতে মজে গেলেন বিভিন্ন ভারতীয় স্টেটের রাজন্যবর্গ। কাশ্মীর, পাতিয়ালা, ঢোলকপুর, ময়ূরভঞ্জ-সহ ভারতের অগণিত রাজদরবারের রাজচিত্রকর হয়ে একের পর এক কালজয়ী ছবি এঁকে চললেন হেমেন মজুমদার। রাজদরবার থেকে উপার্জনের টাকায় কলকাতায় বানিয়েছিলেন নিজস্ব স্টুডিও। যদিও শেষ জীবন কাটে তাঁর শৈশবের গচিহাটাতেই। ২২ জুলাই ১৯৪৮ সালে প্রয়াত হয়েছিলেন ভারতের ভ্যান গগ। কিন্তু মৃত্যুর সত্তর বছর পরেও...
...হেমেন মজুমদারকে ভোলা সম্ভব হয়নি