
শেষ আপডেট: 30 March 2020 07:07
দানিকেন[/caption]
এরিক ভন দানিকেন বলেছিলেন, দেবতা বলে আমরা এক শ্রেণীর কাল্পনিক অশরীরী মনুষ্য আকৃতির জীবের নাম শুনে থাকি, তাঁরা সকলেই অস্তিত্ববিহীন বা কাল্পনিক জীব নন। বহু দেবতা বাস্তবে যে ছিলেন তার প্রমাণ পাওয়া যায় গ্রীস, মিশর, ব্যাবিলন ও ভারতের মহাকাব্য পুরাণ ও বেদগুলিতে। এই সব পুঁথির নথি ঘেঁটে দেখা যায়,দেবতারা সবাই স্বর্গের অধিবাসী। তাঁরা স্বৰ্গ থেকে পৃথিবীতে নিয়মিত আসা যাওয়া করতেন।
এই দেবতারা আসলে ছিলেন মহাকাশের কোনও অজানা গ্রহবাসী সুসভ্য মানুষ। জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্পকলা এবং সংস্কৃতিতে তাঁরা ছিলেন পৃথিবীবাসী মানুষের চেয়ে বহুগুণে উন্নত। মানুষ আজ মহাকাশযান তৈরী করে মহাকাশযাত্রা শুরু করেছে, প্রস্তুতি নিচ্ছে গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে যাওয়ার। কিন্তু ভিনগ্রহের দেবতারা এ পথে নেমেছিলেন হাজার হাজার বছর আগে। তাঁরাই আবিষ্কার করেছিলেন আমাদের এই পৃথিবী নামক গ্রহটিকে।
[caption id="attachment_201931" align="aligncenter" width="960"]
পৃথিবীর বুকে কয়েক কিলোমিটার জুড়ে থাকা এই ছবি কাদের আঁকা !(স্যাটেলাইট ক্যামেরায় তোলা)[/caption]
তাঁদের মহাকাশযান অবতরণ করেছিল ভূপৃষ্ঠে। ভিনগ্রহবাসী দেবতারা পৃথিবীতে বসবাসও করেছিলেন কিছুদিন। কোনও কোনও দেশে, কোনও এক যুগে। সে যুগের মানুষ তাঁদের অবয়ব, শৌর্য-বীর্য ও জ্ঞান-গরিমা দেখে বিস্ময়ে অভিভূত হয়েছিল। সেদিনে পৃথিবীর মানুষের কাছে তাঁরা পেয়েছিলেন ভক্তি, অর্ঘ্য, নৈবেদ্য এবং দেব, প্রভু, ঈশ্বর ইত্যাদি আখ্যা। যা কলম্বাস পেয়েছিলেন আমেরিকার আদিম অধিবাসীদের কাছ থেকে।
দেবতারা উড়ন্ত রথে (বিমানে) চড়ে যাতায়াত করতেন স্বর্গে ও মর্ত্যে। অর্থাৎ পৃথিবী থেকে তাঁদের নিজ নিজ গ্রহে। ভিনগ্রহের এই অভিযাত্রীদল একবার অভিযান চালিয়ে স্বগৃহে ফিরে যেতেন। কোনও কোনও দল পৃথিবীতে স্থাপন করতেন উপনিবেশ। যাঁরা আস্তানা বা উপনিবেশ স্থাপন করতেন, তাঁরা মানুষদের কোনও দলপতিকে বশ করে তাঁর মারফত স্বমত প্রচার করতেন,মানুষের কল্যাণ কামনায়। তাঁরা তাঁদের একান্ত ভক্তদের অস্ত্ৰ ,বর (আশীৰ্বাদ), রথ (বিমান) দান করতেন। আবার অবাধ্য ব্যক্তিদের অভিশাপ দিতেন। প্রয়োজনে হলে যুদ্ধও করতেন পৃথিবীর মানুষের সঙ্গে বা মানুষদের হয়ে।
[caption id="attachment_201933" align="aligncenter" width="500"]
দানিকেন ব্যস্ত তাঁর গবেষণায়।[/caption]
দানিকেনের বক্তব্য, পৃথিবীজুড়ে বিভিন্ন ধর্মের সঙ্গে যুক্তিবাদীদের ধুন্ধুমার বাকযুদ্ধ লাগিয়ে দিয়েছিল। সেই বাকযুদ্ধ থেকে ভারতীয় যুক্তিবাদীদের আঁতুড়ঘর বাংলাও বাদ পড়েনি। ভিনগ্রহের প্রাণী বা এলিয়েনরাই দেবতা কিনা সেটা নিয়ে দীর্ঘ দিন লড়ে গেছে বাঙালি, কফি হাউস থেকে বারদুয়ারী কিংবা গড়ের মাঠ থেকে পাড়ার মাচায়।
বাংলা সাহিত্যেও সেই সময় জম্পেশ একটা এলিয়েন-ঝড় উঠেছিল। সত্যজিৎ রায়, নারায়ণ সান্যাল অদ্রীশ বর্ধনের মতো কল্পবিজ্ঞানের লেখক থেকে শুরু করে সৈয়দ মুজতবা সিরাজ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের মত সাহিত্যিকদের কলমেও উঠে এসেছিল কল্পিত এলিয়েনের দল।
এরিক ভন দানিকেনকে বাঙালির ঘরে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন অনুবাদক অজিত দত্ত। অজিত দত্তের সহজ সরল অনুবাদে ভর করে এরিক ফন দানিকেনের তত্ত্ব,বাঙালিদের মধ্যে অল্পদিনেই আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। দানিকেনের জনপ্রিয় বইগুলির মধ্যে 'দেবতা কি গ্রহান্তরের মানুষ', বীজ ও মহাবিশ্ব, নক্ষত্রলোকে প্রত্যাবর্তন,দেবতার গোধূলিবেলা, আবির্ভাব, আমার পৃথিবী, প্রমাণ, দেবতার চাতুর্য নামের বইগুলি উল্লেখযোগ্য।
দানিকেনের বই, যত দ্রুত বাংলায় অনুদিত হয়েছে, ঠিক ততটাই দ্রুততার সঙ্গে বিক্রি হয়ে যেত। দানিকেনের বিভিন্ন বই পৃথিবীর ৩২ টি ভাষায় অনুদিত হয়েছে এবং পৃথিবীব্যাপী প্রায় সাত কোটি কপি বিক্রি হয়েছে। তাঁর বই নিয়ে দুটি বিখ্যাত সিনেমাও তৈরী হয়েছিল, চ্যারিয়ট্স অফ দ্য গড্স এবং মেসেজ অফ দ্য গড্স।
এরিক ফন দানিকেন তাঁর “চ্যারিয়টস অফ গডস?” বইয়ে দাবী করেছিলেন, ভারতের কুতুব মিনারের পাশে প্রাচীন কালের
যে লৌহস্তম্ভটি রয়েছে। তা মানুষের তৈরী নয়। কারণ, এতে জং ধরে না। দানিকেন বলছেন ,এটি ভিন গ্রহের প্রাণী বা দেবতাদের সৃষ্টি। দানিকেনের এই সব তত্ত্ব অবশ্য মানতে রাজি হননি বিজ্ঞানীরা। পৃথিবীর বাইরে থেকে আসা দেবতাদের আসার এই কথা, গালগল্প বলে উড়িয়ে দিয়ে বইও লেখা হয়েছে অনেক। কিন্তু তাঁর জনপ্রিয়তার ধারে কাছেও দাঁড়াতে পারেনি সে সব বই। আর দানিকেন নিজে কী বলেছেন! কিছুদিন আগেই এক ডকুমেন্টারিতে তিনি বলেছেন, আসলে মানুষের তৈরি করা বিজ্ঞান এখনও দানিকেনের তত্ত্ব বোঝার মতো জায়গাতেই পৌঁছায়নি। যুক্তির লড়াই তাই আজও চলছে সেয়ানে সেয়ানে।