রূপাঞ্জন গোস্বামী
প্রাণীটির নাম হল
সি হর্স বা
হিপোক্যাম্পাস। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ও নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের অগভীর সমুদ্রে এই প্রাণীটিকে দেখতে পাওয়া যায়।
Hippocampus শব্দটা এসেছে গ্রীক শব্দ
hippokampos থেকে।
hippos মানে
horse আর
kampos মানে
sea monster।
সি হর্সের মুখ আর গ্রীবা ঘোড়ার মতো। কাঁটা দেওয়া বর্মের মতো ধড়। মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর ভঙ্গিমা। আঁকড়ে ধরার ক্ষমতাযুক্ত বাঁকানো লেজ। দেখলেই মনে সমীহ জাগে। কিন্তু একে সমুদ্র-ঘোড়া বা সিন্ধুঘোটক বলা যাবে না। কারণ, আগে থেকেই সে নাম নিয়ে বসে আছে
Walrus। তাই
সি হর্সকে ঘোড়া-মাছ বলতে পারেন ইচ্ছা করলে।
[caption id="attachment_105113" align="aligncenter" width="702"]
সি হর্স[/caption]
মাছের সঙ্গে মিল না থাকলেও সি হর্স একটি সামুদ্রিক মাছ
সি হর্স হল Actinopterygii পরিবারভুক্ত একটি মেরুদণ্ডী প্রাণী। মাছ বলা হয়, কারণ এরা কানকোর মাধ্যমে শ্বাসকার্য চালায়। এদের চারটি পাখনা আছে। লম্বা লেজের পিছনদিকে একটি। পেটের ঠিক নীচে একটি, অন্য দু'টি চোয়ালের দুই পাশে।
সি হর্স প্রতি সেকেন্ডে ৫০ বার পাখনাগুলি নাড়তে পারে। পাখনা থাকলেও
সি হর্স অন্যান্য মাছের মতো দ্রুত চলাচল করতে পারে না। দেহের গঠনের কারণে।
সি হর্স অস্থিযুক্ত মাছ, কিন্তু এদের দেহে আঁশ নেই। তার বদলে দেহকে ঘিরে চামড়ার আবরণে ঢাকা হাড়ের শক্ত রিং আছে। প্রতি প্রজাতির
সি হর্সে রিং এর সংখ্যা আলাদা। পৃথিবীতে প্রায় ৪৭ প্রজাতির
সি হর্স পাওয়া যায়। সবচেয়ে বড় প্রজাতির
সি হর্স Hippocampus abdominalis, এক ফুটের মতো লম্বা হয়। সবচেয়ে ছোট
সি হর্স Hippocampus satomiae, আধ ইঞ্চি লম্বা। প্রাকৃতিক পরিবেশে
সি হর্স ১ থেকে ৫ বছর পর্যন্ত বাঁচে।
[caption id="attachment_105115" align="aligncenter" width="1000"]
এক ফুট লম্বা Hippocampus abdominalis[/caption]
কিছু অবাক করা তথ্য
●
সি হর্সরা শব্দ করতে পারে। বাচ্চা বেলায় আমরা যেভাবে ঠোঁট উল্টে স্কুটার বা মোটর সাইকেলের আওয়াজ করি,
সি হর্সরাও জলের তলায় সেরকম আওয়াজ করে। খাওয়ার ও প্রেমের সময়।
●
সি হর্স হলো একমাত্র প্রজাতির মাছ যারা লেজ দিয়ে কোনও কিছু আঁকড়ে ধরতে পারে।
●
সি হর্সরা গিরগিটির মতো রঙ পালটায়। আত্মরক্ষার সময় বা সঙ্গিনীকে ইমপ্রেস করতে।
●
সি হর্সের দেহে পাকস্থলী নেই। যেহেতু তাদের পাকস্থলী নেই, তাই খাবার খুব দ্রুত হজম হয়ে কোষে পৌঁছে যায়। ফলে
সি হর্সদের ঘন ঘন খেতে হয়। অতি ক্ষুদ্র চিংড়ি এদের প্রিয় খাবার।
[caption id="attachment_105118" align="aligncenter" width="600"]
পুর্বরাগের আগে অপলকে চেয়ে থাকা[/caption]
প্রজনন ঋতু পুরুষ সি হর্স কাটায় এক প্রেমিকাকে নিয়েই
এমনিতে এরা একটু ভীতু। সারাক্ষণ ভয়ে ভয়ে থাকে। এই বুঝি কেউ খেয়ে ফেলল। ভালো সাঁতারও কাটতে পারে না। ফলে সঙ্গী বা সঙ্গিনী খোঁজা কঠিন। তাই এক পার্টনারের প্রতি বিশ্বস্ত থাকে। প্রজনন ঋতুতে তাই অনেক বেশি শাবকের জন্ম দিতে পারে। প্রত্যেকদিন তারা একে অপরকে নিয়ম করে সোহাগ জানায়। আদর করে, নাচ দেখিয়ে, রঙ পরিবর্তন করে। সারাদিনের জন্য আলাদা হয়ে যাওয়ার আগে তারা একসঙ্গে একটু ঘুরেও নেয়। গালে গাল লাগিয়ে।
[caption id="attachment_105126" align="aligncenter" width="605"]
লেজে লেজ পাকিয়ে শুরু হল প্রেম[/caption]
রীতিমত প্রেমপর্ব চলে সঙ্গমের আগে
মিলনের আগে
সি হর্স দম্পতি বেশ কয়েকদিন ধরে প্রেমপর্ব চালায়। বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন, এই প্রাক-সঙ্গমপর্বে পুরুষ ও স্ত্রী
সি হর্সের শুক্রানু ও ডিম্বাণু সুপুষ্ট হয়। এই সময় তাদের দেহের রঙ ঘন ঘন পরিবর্তিত হয়। একে অপরের লেজ আঁকড়ে জলে পাশাপাশি সাঁতার কাটতে থাকে। যেন প্রেমিক প্রেমিকা হাত ধরে সান্ধ্যভ্রমণে বেরিয়েছে।
কখনও জলের নিচের একই ঘাসকে দুজনে আঁকড়ে ধরে পরস্পরকে আদর করতে থাকে নাচের ভঙ্গিমায়। এই নাচের নাম
predawn dance বা
true courtship dance। মিলনের আগেই এই প্রেমপর্ব চলে প্রায় আট ঘন্টা। এই সময় পুরুষ
সি হর্স পেটের থলির
(brood pouch) ভেতরে জল পাম্প করে থলি পরিষ্কার করে নেয়। গর্ভধারণ করতে হবে যে।
[caption id="attachment_105134" align="aligncenter" width="720"]
প্রেম পরিণতি পেল মিলনে[/caption]
তারপর আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ
সি হর্স দম্পতি দুজন একই ঘাসকে আঁকড়ে নিজেদের নোঙর করে। তারপর একে অপরকে পেঁচিয়ে শুরু হয় সঙ্গম। উভয়ের শরীরে কম্পন দেখা দেয়। স্ত্রীটি তার
ovipositor নালি পুরুষের থলির
(brood pouch) মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়। মাত্র ৬ সেকেন্ডের মধ্যে স্ত্রী
সি হর্স তার পুরো ডিম্বাণু ঢেলে দেয় পুরুষের থলির মধ্যে।
থলির ভেতর আছে সমুদ্রের জল। পুরুষটি এবার সেই জলের ভেতর শুক্রাণু ছেড়ে দেয়। শুক্রাণুর সঙ্গে ডিম্বাণুর মিলন হয়। তৈরি হয় ভ্রূণ। স্ত্রী
সি হর্সের শরীর স্লিম হয় পুরুষ সি হর্সের পেট ফুলতে থাকে। ভাবছেন কাজ শেষ, এবার স্ত্রী
সি হর্স কদিন মনের সুখে ফুর্তি করবে খেয়ে ও ঘুরে।
না, সঙ্গীকে ছেড়ে দূরে যায় না স্ত্রী
সি হর্স। পরকীয়াতেও মাতে না। বরং অপেক্ষা করে কখন তার পুরুষ সঙ্গী সন্তান প্রসব করবে। আবার প্রেম ফিরবে দুজনের জীবনে। একবার মিলনে আবদ্ধ হলে এরা কখনই একে অন্যকে ছেড়ে যায় না।
[caption id="attachment_105145" align="aligncenter" width="702"]
গর্ভধারণ করে প্রসবের অপেক্ষায় পুরুষ সি হর্স[/caption]
পুরুষের গর্ভধারণ
পুরুষ
সি হর্স, প্রজাতি ভেদে
৯ থেকে
৪৫ দিন গর্ভধারণ করে। পুরুষটি গর্ভধারণ কালে
৩৩% বেশি অক্সিজেন নেয়। বেশি খাবার খায়। পুরুষটির গর্ভধারণকালে স্ত্রী
সি হর্স প্রতিদিন সকালে একবার করে পুরুষ সঙ্গীকে দেখতে আসে। আদর করে, খাবার খুঁজে দেয়।
ডিমগুলো থলিতে নিয়ে পুরুষ
সি হর্স খুব সাবধানে চলাফেরা করে। কোনও জলজ উদ্ভিদ বা পাথরের উপর বসে কাটিয়ে দেয় দিন ও রাতের বেশিরভাগ সময়। থলির ভেতর বাড়তে থাকা বাচ্চাগুলোর যাতে কোনো কষ্ট না হয়। পুরুষের শরীর থেকেই প্রয়োজনীয় পুষ্টি আর অক্সিজেনই নিয়ে বাড়তে থাকে
সি হর্সের ছানাপোনারা। বাবা
সি হর্সের পেট ক্রমশ বড় হতে শুরু করে।
[caption id="attachment_105147" align="aligncenter" width="934"]
মুক্তি.....মুক্তি....মুক্তি[/caption]
বাচ্চাগুলি প্রসবের উপযোগী হয়ে গেলে, পুরুষ
সি হর্স, প্রজাতিভেদে ১০০ থেকে ১০০০টি বাচ্চা প্রসব করে। বাচ্চাদের নিরাপত্তার স্বার্থে পুরুষ
সি হর্স প্রসব করে রাতের অন্ধকারে। তবুও প্রসব করা বাচ্চাদের মধ্যে মাত্র ০-০.৫% বাচ্চা পূর্ণবয়স্ক হতে পারে। খাদক প্রাণী, জলের স্রোত, উষ্ণতা বাকি বাচ্চাদের আয়ু কেড়ে নেয়।
শাবকদের জলে ছেড়ে দিয়ে পুরুষটি যখন একটু হাঁফ ছাড়বার কথা ভাবে, তখনই লেজ দোলাতে দোলাতে গদ্গদ ভঙ্গিতে এগিয়ে আসে ঘাসের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সঙ্গিনী। পুরুষটি হয়ত মনে মনে বলে
আবার? কিন্তু যেহেতু বাধ্য স্বামী, তাই কপালের দুঃখ এড়াতে আবার নতুন করে শুরু করতে হয়
সোহাগ পর্ব। কারণ পুরুষটি জানে,
প্রেম বড় মধুর, কভু কাছে কভু সুদূর।