
শেষ আপডেট: 3 March 2019 07:49
লিউনা হক (সাংবাদিক, ঢাকা)
নকশি কাঁথা[/caption]
নকশি পিঠা: বাংলাদেশের লোক-কারুশিল্পে নকশি পিঠার ঐতিহ্যও অনেক দিনের। পিঠার গায়ে নকশা এঁকে অথবা ছাঁচে ফেলে পিঠাকে চিত্রিত করে তৈরি করা হয় নকশি পিঠা। নকশায় তোলা হয় দৈনন্দিন জীবনের রকমারি চিত্র। এসব নকশি পিঠা একান্তভাবেই নারীমনের সৃজনশীলতার ফসল। যেমন, চিরল পাতা, সজনেপাতা, কাজলপাতা, জামাইমুখ, কন্যামুখ, পাকন, বিবিখানা প্রভৃতি।
[caption id="attachment_84149" align="aligncenter" width="800"]
নকশি পিঠা[/caption]
পলো: মাছ ধরার একটি সাবেক যন্ত্র হল পলো। পলোর আকার হয় নানা ধরনের। গৃহিণী বাড়ির উঠোনে মরিচ, নয়তো কাঁচা মাছ কেটে শুকোতে দিয়েছেন, কিন্তু আশঙ্কা আছে কাকের দল এসে ছোঁ মেরে নিয়ে যাওয়ার। তাই গৃহিণীরা বড় আকারের পেটমোটা টাইপের পলো দিয়ে আগলে রাখতেন শুকাতে দেওয়া মরিচ বা কাঁচা মাছ। গ্রামের প্রতিটি বাড়ির উঠোনে দু-একটি পলো থাকবেই। গৃহিণীদের দরকারি এক সামগ্রী বাঁশের তৈরি এই পলো।
[caption id="attachment_84161" align="aligncenter" width="500"]
পলো[/caption]
নকশি শিকা: বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী লোক ও কারুশিল্প স্বতন্ত্র ও আপন মহিমায় সমুজ্জ্বল শিকাশিল্প। ঘরের আড়া বা সিলিং-এ শিকা বেঁধে তাতে খাদ্যদ্রব্যসহ সংসারের নানা জিনিস ঝুলিয়ে রাখা হয়। পাট হচ্ছে শিকা তৈরির প্রধান উপকরণ। তবে নকশি শিকা তৈরিতে কঞ্চি সুতলি, ঝিনুক, কড়ি, শঙ্খ, কাপড়, পোড়ামাটির বল ইত্যাদিও ব্যবহৃত হয়। গ্রামীণ মহিলাদের তৈরি নকশি শিকা'র অসংখ্য আঞ্চলিক নাম রয়েছে, যেমন- উল্টাবেড়ী, ফুলটুংগী, রসুন দানা, আংটিবেড়, ফুলমালা, ডালিম বেড়, ফুলচাং, গানজা ইত্যাদি।
[caption id="attachment_84159" align="aligncenter" width="800"]
রঙীন হয়ে ওঠার আগে, সদ্য বোনা শিকা[/caption]
নকশি পাখা : তালপাতা, সুপারি গাছের পাতা ও খোল, সুতা, পুরনো কাপড়, বাঁশের বেতি, নারিকেল পাতা, চুলের ফিতা, পাখির পালক ইত্যাদি অতিসাধারণ ও সহজলভ্য উপকরণ দিয়ে পাখা তৈরি করা হয়।তা নগরজীবনের অসহনীয় লোডশেডিংয়ের সময়ও ব্যবহার করা হয়। এসব নকশি পাখার রয়েছে বিভিন্ন নাম- যেমন বাঘাবন্দী, শঙ্খলতা, কাঞ্চনমালা, সজনেফুল ইত্যাদি।
[caption id="attachment_84155" align="aligncenter" width="702"]
নকশি পাখা[/caption]
লোকচিত্র : লোকচিত্র, বাংলাদেশের লোক ও কারু শিল্পের এক বর্ণাঢ্য ও ঐতিহ্যবাহী ভুবন। নানা সৃষ্টিতে রূপ লাভ করেছে সৃজনশীল চিত্রশিল্প। আবহমানকালের লোক সমাজের দৈনন্দিন জীবন, ধর্ম বিশ্বাস, লৌকিক আচার-আচরণ ধারণ করে আসছে এ দেশের এক অমূল্য সম্পদ চিত্রিত হাঁড়ি। অঞ্চলভেদে এসব চিত্রিত হাঁড়ির রয়েছে বিভিন্ন নাম। রাজশাহীর শখের হাঁড়ি-এর গায়ে আঁকা আছে বাংলাদেশের আবহমানকালের ঐতিহ্য।
[caption id="attachment_84153" align="aligncenter" width="800"]
লোকচিত্র[/caption]
বর্তমানে ভিনদেশী সংস্কৃতি সমাজে প্রবেশ করে আমাদের চিরাচরিত ও নিজস্ব ঐতিহ্যকে গ্রাস করেছে। বাঙালির মন ও মনন থেকে ক্রমশ দূরে চলে যাচ্ছে বাংলার চিরায়ত ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। তাই এই দুর্বলতাকে পাশ কাটিয়ে আমাদের সংস্কৃতিকে আমাদেরই লালন করতে হবে। তা না হলে হয়তো আমাদের নতুন প্রজন্ম, এই ঐতিহ্য থেকে একবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। সত্যি কথা বলতে গেলে আমাদের বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যর প্রতীকগুলির কথা আজ যেন রূপকথার গল্পের মতো করে শোনাতে হয় আমাদের নতুন প্রজন্মকে। আগামী প্রজন্মের কাছে হয়তো এটা স্বপ্নের মত মনে হবে। তখন ইতিহাসের পাতায় পড়া ছাড়া বাস্তবে এই সব জিনিসগুলি খুঁজে পাওয়া যাবে না। হয়তো কোনও যাদুঘরের কোণে ঠাঁই নেবে প্রাচীনের সন্ধানে পথে নামা কোনও দলছুট বাঙালির স্মৃতি রোমন্থনের জন্য।