রূপাঞ্জন গোস্বামী
১৯৬০ সাল নাগাদ আমেরিকার
টেক্সাসের লোয়ার পিকোস গিরিখাত অঞ্চলে প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্য শুরু হয়েছিল। পরবর্তীকালে, সেখানে জলাধার তৈরি করা হলে এলাকাটির বিস্তীর্ণ অঞ্চল জলে ডুবে যায়। কিন্তু প্রত্নতাত্বিকদের জন্য সংরক্ষিত স্থানটি সুরক্ষিত ছিল। কারণ, এই অঞ্চলের পর্বতের গুহায় পাওয়া গেছে প্রাচীনকালের মানুষদের আঁকা গুহাচিত্র থেকে শুরু করে তাদের তৈরি হস্তশিল্প। যার মধ্যে আছে গাছের আঁশ থেকে তৈরি করা চটি ও ঝুড়ি। রঙ করা নুড়ি পাথর, গয়না, আরও কত কি।
[caption id="attachment_101442" align="aligncenter" width="702"]
লোয়ার পিকোস গিরিখাত[/caption]
বিশ্বকে চমকে দিলেন আর্কিওলজিস্ট এলানোর সন্ডারম্যান
টেক্সাসের
A&M University এর আর্কিওলজিস্ট
এলানোর সন্ডারম্যান কিছুদিন আগে
লোয়ার পিকোস গিরিখাত অঞ্চলে গিয়েছিলেন তাঁর গবেষণার কাজে। এই এলাকায় বসবাসকারী প্রাচীন মানুষদের জীবনযাত্রার আরও কিছু নিদর্শন খোঁজার চেষ্টায় ছিলেন তিনি।
যারা গভীর গিরিখাতে বসবাসের জন্য
Conejo Shelter নামক একটা জায়গা ব্যবহার করত। মিস এলানোর, সেই এলাকায় প্রাচীন একটি টয়লেট থেকে খুঁজে পেয়েছিলেন, ফসিল হয়ে যাওয়া মানুষের মল। প্রত্নতাত্বিকদের পরিভাষায় যাকে বলা হয়
corpolites। মলের নমুনাটির বয়স
১৫০০ বছর।
[caption id="attachment_101449" align="aligncenter" width="640"]
লোয়ার পিকোস রক আর্ট[/caption]
Journal of Archaeological Science পত্রিকায় ফসিল হয়ে যাওয়া সেই মলের খন্ডটিকে নিয়ে প্রকাশিত সাম্প্রতিক একটি প্রবন্ধ চমকে দিয়েছে বিশ্বকে। টেক্সাসের গুহা থেকে পাওয়া
১৫০০ বছরের পুরানো মানুষের মলে পাওয়া গেছে বিষধর সাপের বিষদাঁত।
প্রত্নতাত্বিকদের কাছে মানুষের মলের ফসিল কেন দামী!
ফসিল হয়ে যাওয়া মানুষের মল (corpolites) নিয়ে গবেষণা মোটেই সুখকর কাজ নয়। কিন্তু খুবই আকর্ষণীয় কাজ। কারণ, ফসিল হওয়া মল নিয়ে গবেষণা, প্রত্যেক মুহূর্তে আশ্চর্যজনক সত্য ফাঁস করে দেয়। Utah State University -এর Eastern’s Prehistoric Museum এর কিউরেটর এবং মলের ফসিলের বিশেষজ্ঞ টিম রিলে। তিনি বলেছেন, তাঁর মতো প্রত্নতাত্বিকদের কাছে অন্যতম দামি বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার হলো মানুষের মল।
[caption id="attachment_101452" align="aligncenter" width="702"]
লোয়ার পিকোস গিরিখাতে চলছে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান[/caption]
কারণ ফসিল হয়ে যাওয়া মানুষের মল হল দুষ্প্রাপ্য তথ্যের ভান্ডার। যা থেকে জানা যায় এই সময়কার স্থানীয় মানুষের খাদ্যাভ্যাস থেকে সামাজিক অবস্থা এবং জানা যায় সমাজে মানুষটির অবস্থান। জানা যায় সেই সময়ের পরিবেশ, উদ্ভিদ প্রাণী এমনকি আবহাওয়াও।
কী জানা গেছে ১৫০০ বছর পুরানো মলের ফসিল থেকে!
Conejo Shelter থেকে এলানোরের আবিষ্কার করা
coprolite বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, যার মল, সেই মানুষটি খেত yucca গাছের ফুল। সেই ফুলের রেনু মিলেছে তার মলে। মিলেছে flowers। তরবারির মত পাতা যুক্ত এই উদ্ভিদ খেত সে। তার রেনু মিলেছে মলে। মিলেছে চামড়া না ছাড়িয়ে, রান্না না করে খাওয়া ছোট স্তন্যপায়ীর হাড় এবং লোম। এর থেকে অনুমান, সেই সময়ে
লোয়ার পিকোস গিরিখাত অঞ্চলের মানুষরা খরগোশ, কাঠবেড়ালি, কুকুর, সজারু, বিভার, গিনিপিগ কাঁচাই খেয়ে নিত সম্ভবত।
মল থেকে পাওয়া সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর আবিষ্কারটি হল বিষধর সাপের দাঁত। এ ছাড়াও মলে পাওয়া গেছে বিষধর সাপের খুলি এবং হাড়। ঘটনাটি চাঞ্চল্যকর, কারণ সেই অঞ্চলে পাওয়া অন্যান্য মলের ফসিলে বিষধর সাপের দাঁত মেলেনি। সাপের দাঁতটি পরীক্ষা করে জানা গেছে সাপটি অত্যন্ত বিষধর
Viperidae শ্রেণীর।
[caption id="attachment_101454" align="aligncenter" width="702"]
ইনসেটে মলের ফসিল, যার ভেতরে পাওয়া গেছে ডায়মন্ডব্যাক র্যাটলস্নেকের আস্ত কঙ্কাল[/caption]
সম্ভবত মানুষটি
Western diamondback rattlesnake নয়তো copperhead সাপ আস্ত খেয়েছিল। এই দুই ধরণের বিষধর সাপই ওই অঞ্চলে পাওয়া যায়। যে সাপের এক ছোবলে মানুষ কয়েক মিনিটে মারা যায়, সে সাপ আস্ত গিলে খেয়েও মানুষটি মারা না গিয়ে সুস্থ্য অবস্থায় মলত্যাগ করেছিল। এতেই চোখ কপালে উঠেছে জীববিজ্ঞানী ও প্রত্নতাত্ত্বিকদের।
কেন বিষধর সাপ আস্ত খেত মানুষটি!
খাদ্যের অভাবের জন্য পৃথিবীর অনেক জায়গার মানুষ হাজার হাজার বছর ধরে সাপ খেয়ে আসছে। পুড়িয়ে বা রান্না করে। মাথা, হাড়, বিষদাঁত বাদ দিয়ে।
লোয়ার পিকোস গিরিখাত অঞ্চলে পাওয়া অনান্য কিছু মানুষের মলের ফসিল থেকেও সাপের দেহাবশেষ পাওয়া গেছে। কিন্তু সেগুলো বিষাক্ত সাপের দেহাংশ নয়। তাহলে কি
১৫০০ বছর আগে ওই এলাকায় একজন মানুষই বিষাক্ত সাপ খেত। কে সে, কেনই বা খেত বিষধর সাপ?

একই এলাকার পাওয়া বিভিন্ন গুহাচিত্রে দেখতে পাওয়া গেছে সাপের ওঝাদের।
লোয়ার পিকোস রক আর্টের একজন বিশেষজ্ঞ ক্যারোলিন বয়েড জানিয়েছেন, ওঝারা সমাজের অনান্য মানুষদের চেয়ে নিজেদের অবস্থান উঁচু করে দেখাতে ক্যাকটাস ও ভয়ঙ্কর সব খাবার খেত। এই মল হয়ত সেরকমই কোনও ওঝার।
আর্কিওলজিস্ট এলানোর সন্ডারম্যানের অনুমান, ১৫০০ বছর আগেকার সেই ওঝা বিষধর সাপ খেত, ধর্মীয় রীতিনীতি বা ঝাড়ফুঁকের অঙ্গ হিসেবে।
কল্পনাতে ফিরে চলুন ১৫০০ বছর আগে
টেক্সাসের রুক্ষ
লোয়ার পিকোস গিরিখাতের অন্দরমহল। রাতের অন্ধকারে সীতার অগ্নিপরীক্ষার মত চলছে ওঝার দেবত্ব পরীক্ষা। আকাশে অর্ধেক চাঁদ। পেঁচা ও বাদুড়েরা ড্রামের আওয়াজের প্রতি গভীর অসন্তোষ প্রকাশ করে ডানা ঝাপটিয়ে উড়ছে আকাশে। মাটিতে জ্বলছে পশুর চর্বি আর গাছের আঁশ দিয়ে বানানো মশাল। কয়েকশো অর্ধনগ্ন নারী পুরুষ, বৃত্তাকারে একজন মানুষকে ঘিরে নেচে চলেছে ক্লান্তিহীন ভাবে।

মানুষটি সেই সমাজের সর্বশক্তিমান ওঝা। ওদের সমাজে ঈশ্বরের পরেই যার স্থান। নাচের মাঝে, ওঝা ঝুড়ি থেকে বের করে আনে ছোট্ট একটি
র্যাটল স্নেক। বিষধর সাপটিকে দেখে সভয়ে সরে যায় নৃত্যরত নারী পুরুষ। তারা জানে এই সাপের এক ছোবলে মৃত্যু অনিবার্য। দ্রুত তালে বাজতে থাকে ড্রাম। সারা গায়ে সাদা কালো ছোপ ছোপ রঙ মাখা, সাপ সাজা ওঝা, বিষধর সাপটা ধরে একটু একটু করে গিলতে শুরু করেন। এ বার তিনি শুরু করেন তাঁর তান্ডব নৃত্য। ওঝা বুঝতে পারলেন, পাকস্থলীতে গিয়ে ছোবল মেরেছে সাপটা। তীব্র যন্ত্রণা শুরু হয়েছে। আর বেশী সময় হাতে নেই।
কারণ, ওঝার দেহের ভেতরে, শিরা ধমনীর রক্তে নাচতে শুরু করেছে সাপের বিষ। বিষাক্ত ঘাম গড়িয়ে পড়তে থাকে ওঝার শরীর থেকে। বিষক্রিয়ায় চোখ লাল, নাক মুখ দিয়ে ফেনা ঝরছে। নাচতে নাচতে অবসন্ন হয়ে পড়ে ওঝা। মাঠ ছেড়ে পাহাড়ের দৈব গুহার দিকে উঠতে থাকে সে। নারী পুরুষেরা তাদের ডেরায় ফিরে যায়।

রাতের আকাশে জেগে থাকে তারারা। দৈব গুহায় পৌঁছাবার জন্য হামাগুড়ি দেয় ক্রমশ ঝিমিয়ে পড়া ওঝা। জড়িবুটির পাচন গলায় ঢালে ওঝা। গত বছরের বিষাক্ত সাপটাকেও হজম করিয়েছিল এই পাচন। পরদিন নিজের মলে সাপের দেহাংশ সবাইকে সগর্বে দেখিয়েছিল সে। মন্ত্রমুগ্ধ হয়েছিল উপজাতির মানুষেরা। তাকেই ঈশ্বরের প্রতিনিধি হিসেবে মেনে নিয়েছিল।
জ্ঞান হারাতে বসা ওঝা জানে, যদি আগামীকালের সূর্যোদয় দেখতে পায়, তাহলে আরও এক বসন্তের জন্য ঈশ্বরের প্রতিনিধি হওয়া নিশ্চিত। আরও একবছর ধরে ঝাড়ফুঁকের বুজরুকি দেখিয়ে অঢেল সম্পদ ও নারী ভোগের সুযোগ। তাই সে মরণ খেলায় শেষ চালটা দিয়ে ফেলেছে।
কিন্তু কিস্তিমাতের চাল কে দেবে, জীবন না মৃত্যু! সেই প্রশ্নের উত্তর ওঝা জানে না, কারণ উত্তর দেবে পরের দিনের সূর্য।