
শেষ আপডেট: 23 November 2019 11:44
রয়াল নেভির ক্যাপ্টেন রবার্ট ফ্যালকন স্কট[/caption]
গম্ভীর হয়ে গিয়েছিলেন ক্যাপ্টেন স্কট। তাঁর দক্ষিণ মেরু অভিযানের কথা বিশ্বের সবাই জেনে গেছে। কিন্তু আমুনসেন যে একই উদ্দেশ্যে গোপনে রওনা হয়ে গেছেন তা কাকপক্ষীতেও টের পায়নি। এই ১২ দিনে অনেকটা পথ এগিয়ে গেছেন আমুনসেন।
[caption id="attachment_161552" align="aligncenter" width="900"]
আমুনসেন[/caption]
কিন্তু জাতিতে ব্রিটিশ, ক্যাপ্টেন স্কট পণ করেছিলেন আমুনসেনকে কোনও মতেই দক্ষিণ-মেরুতে তাঁর আগে নরওয়ের পতাকা গাঁথতে দেবেন না। ধূর্ত একজন নরওয়েবাসীর কাছে হেরে যাবে ব্রিটিশরা। না কোনও মতেই নয়। তাই উদ্দামগতিতে সাগরের জল তোলপাড় করে ছুটেছিল ক্যাপ্টেন স্কটের জাহাজ টেরা নোভা।
[caption id="attachment_161514" align="alignnone" width="1024"]
অ্যান্টার্কটিকায় ক্যাপ্টেন স্কটের জাহাজ টেরা নোভা[/caption]
কেপ ইভানস থেকে যাত্রা শুরুর আগে ক্যাপ্টেন স্কটের দল[/caption]
ভাগ্যের পরিহাসে স্কটের সঙ্গে রয়েছেন মাত্র চারজন সদস্য। ঘোড়াগুলি অপরিচিত পরিবেশের অসহনীয় আবহাওয়ায় খাপ খাওয়াতে না পেরে মারা গেছে। বেয়ার্ডমোর হিমবাহ থেকে হাস্কি কুকুরের দলকে নিয়ে ফিরে গেছেন হাল ছেড়ে দেওয়া ১১ সদস্য। হাল ছাড়েননি ক্যাপ্টেন স্কট এবং তাঁর চার বিশ্বস্ত সঙ্গী, লেফটেন্যান্ট হেনরি বোয়ার, ডঃ এডওয়ার্ড উইলসন, ক্যাপ্টেন টাইটাস ওয়াটেস ও অফিসার এডগার ইভানস।
চূড়ান্তভাবে অসহযোগিতা করছিল আবহাওয়া। তাপমাত্রা ছিল মাইনাস ৪৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট। অভিযাত্রীদের সামনে ছিল হাঁটার পক্ষে অসম্ভব ও ভয়ঙ্কর তুষারাচ্ছাদিত মালভূমির শেষ ও কঠিনতম অংশ। কখনও তুষারঝড় ওঠে, তো কখনও বরফে পড়ে ছিটকে আসা সূর্যের প্রখর রশ্মি চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। এরই মধ্যে অভিযাত্রী শুরু করেছিলেন ভৌগলিক দক্ষিণ-মেরুর জিরো-পয়েন্টের দিকে তাঁদের ফাইনাল পুশ।
[caption id="attachment_161520" align="alignnone" width="959"]
দক্ষিণ মেরুর দিকে এগিয়ে চলেছেন ওঁরা পাঁচজন (সেলফি)[/caption]
১৪ ডিসেম্বর ১৯১১, বিকেল তিনটের সময় দক্ষিণ মেরুতে নরওয়ের পতাকা স্থাপন করলেন আমুনসেন .[/caption]
সেই আমুনসেন, যিনি মাঝ সমুদ্রে এসে জাহাজের ক্যাপটেন ও সহ অভিযাত্রীদের জানিয়েছিলেন তিনি দক্ষিণ মেরু জয়ের জন্য বেরিয়েছেন। আমুনসেনের পরিকল্পনা ও কৌশলের কাছে হার মেনে মানসিক দিক থেকে শোচনীয়ভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল ক্যাপ্টেন স্কটের দল।
পরের দিন সকাল সাড়ে সাতটায় স্কটের দল বেরিয়ে পড়েছিল। রাতে তাপমাত্রা ছিল মাইনাস ২২ ডিগ্রি। আকাশ মেঘলা হয়ে আসছিল। সারা রাত ঘুমায়নি তারা। পরাজয়ের গ্লানি তাদের গ্রাস করেছিল।
তবুও ক্যাপ্টেন স্কটের দল, আমুনসেনের দলের স্থাপন করা পতাকাটি থেকে বেশ কিছুটা দূরে, ১৮ জানুয়ারি দক্ষিণ মেরুতে স্থাপন করেছিলেন ব্রিটিশ পতাকা ইউনিয়ন জ্যাক। পতাকাটি নিজে হাতে বানিয়ে দিয়েছিলেন ইংল্যান্ডের রাণী স্বয়ং ভিক্টোরিয়া। তাঁকে অসম্মানিত হতে দেবেন না স্কট।
[caption id="attachment_161524" align="aligncenter" width="575"]
দক্ষিণ মেরুতে স্কটের দলের সেলফি। বাম দিক থেকে দাঁড়িয়ে ওয়াটেস,স্কট ও ইভানস। বসে বাম দিক থেকে বোয়ার ও উইলসন[/caption]
ভগ্ন হৃদয়ে দেশে ফেরার পথ ধরেছিল স্কটের টিম। নাকি 'না ফেরার' দেশের পথ ধরেছিল। তুষারাচ্ছাদিত পথ, মাঝে মধ্যেই হাঙ্গরের মতো হাঁ করে আছে বরফ ফাটল। একঘেয়ে, ওঠা আর নামা। বাড়ি ফেরার জন্য প্রায় উন্মাদ হয়ে গিয়েছিলেন স্কটের চার সঙ্গী। এডগার ইভানস একটু অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। তবুও উপায় নেই হাঁটতে হবে। ফিরতে হবে প্রায় ৮০০ মাইল।
লেফটেন্যান্ট হেনরি বোয়ার[/caption]
একঘন্টা চলার পর মনুমেন্ট আকৃতির একটি পাথরের সামনে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন ক্যাপ্টেন স্কট। কারণ ইভানস অনেক পিছিয়ে পড়েছে। লাঞ্চের জন্য তাঁবু ফেলতে বলেছিলেন ক্যাপ্টেন স্কট। এত তাড়াতাড়ি তাঁবু না ফেললেও চলত। ইভানসের জন্যই ক্যাপ্টেন স্কট সময়ের আগেই তাঁবু ফেলতে বলেছিলেন। লাঞ্চ বানানো হল, ইভানসের জন্য রেখে দিয়ে বাকিরা খেয়েও নিলেন। তবুও আসেন না ইভানস।
প্রায় দু'ঘন্টা অপেক্ষার পর স্কট ও বাকি তিনজন ইভানসকে খুঁজতে ফিরে চললেন। অনেকটা দূর গিয়ে পাওয়া গেল এডগার ইভানসকে। হাটুর ওপর ভর দিয়ে বসেছিলেন বরফের ওপর। হাতে দস্তানা ছিল না। হাতের আঙ্গুল গুলিতে ফ্রস্টবাইট হয়ে গিয়েছিল। জামাকাপড় ছিল অবিন্যস্ত।
"কী হয়েছে ইভানস", জিজ্ঞেস করেছিলেন ক্যাপ্টেন স্কট। ঘোলাটে চোখে দলনেতার দিকে তাকিয়ে ইভানস আস্তে আস্তে উত্তর দিয়েছিলেন, "আমি জানি না।" প্রমাদ গুণেছিলেন অভিজ্ঞ অভিযাত্রী স্কট। তাঁর মনে হয়েছিল ইভানস অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন। ইভানসকে দাঁড় করবার চেষ্টা শুরু হয়েছিল। কিন্তু কয়েক পা গিয়ে ইভানস আবার পড়ে গিয়েছিলেন। তাঁর মধ্যে সামান্য জীবনীশক্তিও অবশিষ্ট ছিল না।
[caption id="attachment_161578" align="aligncenter" width="303"]
পেটি অফিসার এডগার ইভানস[/caption]
ওয়েটেসকে ইভানসের সঙ্গে রেখে উইলসন, বোয়ার ও স্কট গিয়েছিলেন ইভানসকে বয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য স্লেজ আনতে। স্কটেরা যখন স্লেজ নিয়ে ফিরে এসেছিলেন ইভানস তখন অচৈতন্য। স্লেজে করে ইভানসকে আনা হয়েছিল তাঁবুতে।বরফ গলিয়ে গরম জল করে, কফি, ব্র্যান্ডি খাইয়ে, ইঞ্জেকশন দিয়ে ইভানসকে বাঁচাবার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন ডঃ এডওয়ার্ড উইলসন।
[caption id="attachment_161571" align="alignnone" width="1103"]
ডঃ উইলসন[/caption]
বিফল হয়েছিল সব প্রচেষ্টা। রাত ১২.৩০ মিনিটে অভিযান ছেড়ে চিরকালের জন্য চলে গিয়েছিলেন ইভানস। ভোরবেলায় তুষার সমাধিতে ইভানসকে শুইয়ে দিয়ে এগিয়ে চলেছিলেন বাকি চারজন। স্কট ডাইরিতে লিখেছিলেন, "আগামী দিনগুলি সুখের হবে বলে মনে হচ্ছে না।"
ক্যাপ্টেন লরেন্স টাইটাস ওয়াটেস[/caption]
স্কট সেই রাতে তাঁর ডাইরিতে লিখেছিলেন,ওয়াটেস সেই রাতে তাঁর মায়ের কথা বলছিলেন। ওয়াটেস বলেছিলেন তাঁর বীরত্বপূর্ণ মৃত্যুর কথা জেনে তাঁর রেজিমেন্ট হয়ত গর্ব অনুভব করবে। প্রলাপ বকতে বকতে সেই রাতে অচেতন হয়ে গিয়েছিলেন ওয়াটেস। স্কটরা ভেবেছিলেন এটাই ওয়াটেসের শেষ ঘুম হতে চলেছে।
কিন্তু সবাইকে অবাক করে ওয়াটেস উঠে পড়েছিলেন ১৬ মার্চ সকালে। বাইরে তখন মারাত্মক তুষার ঝড় চলছিল। ওয়াটেস স্কটকে বলেছিলেন, "কিছুক্ষণের জন্য বাইরে যাচ্ছি আমি।"
তাঁবুতে আর ফিরে আসেননি ওয়াটেস। দলের বোঝা হতে চাননি এই সুদক্ষ অভিযাত্রী। তাই তুষার ঝড়ের সুযোগ নিয়ে অ্যান্টার্কটিকার তুষার সমুদ্রে চিরকালের জন্য স্বেচ্ছায় হারিয়ে গিয়েছিলেন ক্যাপ্টেন টাইটাস ওয়াটেস।
[caption id="attachment_161559" align="alignnone" width="800"]
এভাবেই হয়ত তুষার ঝড়ের ভেতর স্বেচ্ছায় হারিয়ে গিয়েছিলেন ওয়াটেস (আঁকা)[/caption]
ক্যাপ্টেন স্কটের সেই ঐতিহাসিক ডাইরি[/caption]
বরফ জমা সেই তাঁবু, যার ভেতরে ছিল হেনরি বোয়ার, এডওয়ার্ড উইলসন ও ক্যাপ্টেন স্কটের দেহ[/caption]
বিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন তিনজনের মধ্যে সব শেষে মারা গিয়েছিলেন ক্যাপ্টেন স্কট। দুই সঙ্গী চলে যাওয়ার পর, মৃত্যুকে এগিয়ে আনার জন্যেই কি তিনি স্লিপিং ব্যাগের চেন ও কোটের বোতাম খুলে দিয়েছিলেন?
ক্যাপ্টেন স্কটের একটা হাত রাখা ছিল ডঃ এডওয়ার্ড উইলসনের দেহের ওপর। উইলসনের মৃত্যু মুহূর্তে তাঁর গায়ে ভরসার হাত রেখেছিলেন প্রবাদপ্রতিম অভিযাত্রী ক্যাপ্টেন স্কট, নিজের মৃত্যুর পদধ্বনি শুনতে শুনতে।