Date : 15th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
IPL 2026: টানা চতুর্থ হারে কোণঠাসা কেকেআর, ৩২ রানে ম্যাচ জিতল সিএসকে‘ভূত বাংলো’য় সেন্সর বোর্ডের কাঁচি! বাদ গেল ৬৩টি দৃশ্য, ছবির দৈর্ঘ্য কমতেই চিন্তায় অক্ষয়ভোটের ডিউটিতে কড়া নিয়ম! প্রিসাইডিং ও সেক্টর অফিসারদের জন্য একগুচ্ছ নির্দেশিকা কমিশনের'বন্ধু' মোদীকে ফোন ট্রাম্পের! ৪০ মিনিট ধরে হরমুজ প্রণালী নিয়ে কী আলোচনা হল?লোকাল ট্রেনের টিকিটে বিরাট ছাড়! ৫ টাকার টিকিট এখন কত পড়বে? জেনে নিন বিস্তারিতTB Vaccine: যক্ষ্মা প্রতিরোধে কতটা সফল নতুন টিকা? ট্রায়ালের রিপোর্টে আশার আলোর পাশাপাশি উদ্বেগের সুর বিজ্ঞানীদের'বাঙালি ব্রিটিশদের সামনে মাথা নত করেনি, আর এই বহিরাগতরা আমাদের কী করবে?' বিজেপিকে তোপ অভিষেকেরসাইলেন্ট লাং ডিজিজ: কাশি মানেই কি ক্যানসার? দূষণে ফুঁসছে ফুসফুস, কখন দরকার ট্রান্সপ্লান্ট?'ইগো সরিয়ে রাখুন', নিজেদের মধ্যে মতভেদ সরিয়ে এক হয়ে লড়ার নির্দেশ অভিষেকেরভাইরাল ভিডিও হাতিয়ার করে শাহের তোপ! হুমায়ুনকে ‘দিদির এজেন্ট’ বলে কটাক্ষ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

বুক রিভিউ: স্মৃতি, বিভ্রম আর মৃত্যুময়তা পার করে আশ্চর্য উড়াল ‘উজানযাত্রা’

লেখক অসম্ভব দক্ষতায় নির্মাণ করলেন আশ্চর্য সব মুহূর্ত, অথচ কখনও কখনও ভেসেও গেলেন তাতে।

বুক রিভিউ: স্মৃতি, বিভ্রম আর মৃত্যুময়তা পার করে আশ্চর্য উড়াল ‘উজানযাত্রা’

উযানযাত্রা বুক রিভিউ

শেষ আপডেট: 27 January 2025 13:15

শমীক ঘোষ  

উজানযাত্রা 
উজ্জ্বল সিন্হা 
দে’জ পাবলিশিং,  ৪৯৯ টাকা  
স্কুলে যিনি রসায়নের শিক্ষক, খেলার মাঠে তিনিই বাদাম-বিক্রেতা। ধুতি পাঞ্জাবি পরে, ল্যাবরেটরির শিশি বোতল, জার, বয়াম, বার্নার মাঝে যিনি বাস করেন, খেলার দিনে তিনিই বদলে যান আগাগোড়া। জটিল রসায়নিক ইক্যুয়েশনের বদলে তখন তাঁর সঙ্গী ধনেপাতা, আদা আর মশলা দিয়ে বানানো নিজস্ব আচার। গলায় বাদাম ভর্তি ধামা ঝুলিয়ে, খাটো লুঙি আর ফতুয়া পরে তিনিই তখন বাদাম ফিরি করে যান অনায়াস দক্ষতায়।
এমনই উদ্ভট, দ্বন্দ্বে ভরা, আপাত অসম্ভব, মনুষ্যচরিত্রের আশ্চর্য বিরোধাভাসই উজ্জ্বল সিন্হার ‘উজানযাত্রা’ উপন্যাসের স্বকীয় রসায়ন। তার নিজস্ব সিগনেচার। 
এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র বাবু। ছোট্ট মফস্বল শহরের এক বর্ধিষ্ণু জমিদার পরিবারে তার বেড়ে ওঠা। পরিবারের পূর্বপুরুষরা প্রবল অত্যাচারী ছিলেন। অথচ সেই একই পরিবারে, বাবুর ঠাকুমা বীণাপাণি বসু কিংবা মেজজেঠু সূর্যকুমার প্রবল কমিউনিস্ট। আবার বিচিত্র সেই পরিবারেই বাবুর বড় জ্যাঠা চন্দ্র--কালীভক্ত। ছোটবেলা থেকেই অসম্ভব অন্তর্মুখী বাবু। কিন্তু সেই শেষ অবধি জড়িয়ে যায় উগ্র বামপন্থী রাজনীতিতে। বাংলা ছেড়ে চলে যায় বিহারের লাতেহারে। যেখানে চরম দারিদ্রে সামান্য টাকার জন্য মানুষ বন্ধক রাখে নিজেকেই। তারপর মহাজনের ফাঁদে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে হয়ে যায় ভূমিদাস। আবার সেসব ছেড়েছুড়ে ফিরেও আসে বাবু। কম্পিউটার প্রশিক্ষণের ব্যবসা তাকে নিয়ে যায় সূদুর আমেরিকায়।
এমন কাহিনিকে বাংলা উপন্যাসের প্রচলিত গৎ মেনে ঘটনার পর ঘটনা জুড়ে জুড়ে, একরৈখিক বয়ানে লিখে ফেলাই যেত। কিন্তু সেই পথ সযত্নে পরিহার করেন উজ্জ্বল। বরং, সমকালীন আন্তর্জাতিক উপন্যাসের রীতি মেনে তিনি নির্মাণ করেন স্বকীয় এক ফর্ম। আখ্যান তাই আর শুধু আখ্যানেই আটকে থাকে না। বরং একই ঘটনা বা চরিত্রকে দেখা যায় আলাদা আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি – পার্সপেক্টিভ দিয়ে। একজনের স্মৃতি উসকে দেয় অন্য আরেকজনের স্মৃতি। একই ঘটনা আলাদা আলাদা ভাবে বিবৃত হয় বাবু আর তার অ্যান্টিথিসিস কিংবা অল্টারইগো মিলনের আলাদা বয়ানে। পাশাপাশি পরিচ্ছেদে বর্ণিত হতে থাকে ভিন্ন প্রজন্মের আলাদা আলাদা দুই কিশোরের কাহিনী। যারা দু’জনেই মফস্বলের বাড়ি ছেড়ে পড়তে এসেছিল কলকাতায়। আর এই সবকিছুকেই আলাদা মাত্রা দেয় উজ্জ্বলের সরল, সুললিত গদ্য। পাঠককে যা টেনে রাখে চুম্বকের মতো। 
গোয়ার সমুদ্রে ডুবে যেতে যেতে বাবুর তাই মনে পড়ে ছোটবেলার কথা। তার গায়ে হুল ফুটিয়ে ছিল বোলতা। রসায়নের মাস্টারমশাই শিবরামবাবু সেই জায়গাটাই পুড়িয়ে দিয়েছিলেন অ্যাসিড দিয়ে। আর এই ঘটনাই রসায়নের সঙ্গে আজীবন সখ্য তৈরি করে দিয়েছিল বাবুর। যে কারণে হুইস্কির সঙ্গে নুন মেশানোর অদ্ভুতুড়ে ‘ব্লাসফেমি’-ও অভ্যেস করে ফেলেছিল সে। আর তাই, হুইস্কির সঙ্গে নুন চেয়ে প্রত্যাখ্যাত হয়ে নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটনের বারে সে মারামারি করে ফেলে বারটেন্ডারের সঙ্গে। বাবুর মাথার ভেতরে অবিরত চলা এমন আপাত সম্পর্কহীন ঘটনা – তার স্ট্রিম অফ কনশাসনেসই ফিরে ফিরে আসে গোটা উপন্যাস জুড়ে।
আর সেই সঙ্গে ঘুরে ঘুরে আসে এক আশ্চর্য মৃত্যুচেতনা। তা যেমন বাবুর, তেমনই তার ঠাকুমা বীণাপাণির। বাবুর পরিবারের পুরুষদের অল্প বয়সে মরে যাওয়া – অত্যাচারী পূর্বপুরুষদের অভিশাপের মিথ  ঘুরে ফিরে আসে বীণাপাণির চেতনায়। আবার বামপন্থী চেতনার মতো সেই একই মিথ জারিত হয় বাবুর ভেতরেও। হলিউডের অভিনেতা অ্যান্থনি হপকিন্সের মতো দেখতে যমকেই সে যেন প্রত্যক্ষ করে পুকুরের পাড়ে।
আবার মৃত্যুকে ছাপিয়ে বেচে থাকার চূড়ান্ত আকুতিই যেন প্রতিভাত হয় বাবুর অল্টারইগো মিলনের মধ্যে দিয়ে। সদ্য ট্রেনে কাটা পড়া চোলাই-বিক্রেতা বন্ধুর মৃত্যুর কথা জানতে পারার পর যখন হঠাৎই সে মিলিত হয় সেই বন্ধুরই বস্তিবাসী দিদির সঙ্গে।
এমন আশ্চর্য সব মুহূর্ত, দৃশ্য বারবার নির্মাণ করেন উজ্জ্বল। অনায়াস দক্ষতায়। প্রায় সিনেমার মতো। যেমন তালা না দেওয়া আলমারির ভেতরে রাখা টাকার বান্ডিল থেকে একটা নোট হারিয়ে গেছে বলে চরম অবিমৃশ্যকারিতায় একটার পর একটা নোট জ্বলন্ত মোমবাতির শিখায় ধরে পুড়িয়ে দেন কমিউনিস্ট সূর্যকুমার। কিংবা বাড়ির পাতকুয়োর মধ্যে থেকে আত্মঘাতী সূর্যকুমারের লাশ দড়ি দিয়ে টেনে তোলা দেখতে পায় ছোট্ট বাবু। দড়ির টানে টানে ঘুরে ঘুরে যায় ভেজা লাশটা। একবার দেখা যায় সূর্কুমারের পিঠ। পরমুহূর্তেই তার মৃত মুখ। আবার দড়ির টানে টানে মাঝে মাঝে লাশের ওঠা থমকে গেলে মনে হয় যেন তিনি দু’দণ্ড দাঁড়িয়ে শ্বাস নিচ্ছেন।
একই ভাবে, সূর্যকুমারের মৃত্যুর পর, বাবুর মৃত্যুর সঙ্গে প্রথমবার পরিচিত হওয়ার মানসিক অবস্থার  কথা বলতে বলতেই লেখক যখন পরবর্তী অনুচ্ছেদেই পার্সপেক্টিভ বদলে মুহূর্তে পুত্র হারানো বীণাপাণির মনোজগতে ঢুকে যান তখনও তার মুনশিয়ানা মুগ্ধ করে। 
এই উপন্যাসেরই এক চরিত্র বিশুদা – বিশ্বপ্রসন্ন। যিনি কার্টগ্রাফারের মতোই একটা ম্যাপ বানিয়ে যান আপন মনে। যে ম্যাপ আসলে তাঁর কল্পনায় তৈরি হওয়া একটা দেশের – যার নদীনালা, পাহাড়পর্বত সবই আসলে তার নিজের নির্মাণ। এই বিশুদাই যেন স্পষ্ট বুঝতে পারে বাবুর মনের গতিপ্রকৃতি। তার ভাবনাগুলো। তার কথার ফাঁকেই বোঝা যায় মিলন আর বাবু আসলে সম্পূর্ণ আলাদা প্রকৃতির কিন্তু একই মানুষের অভিন্ন দুই রূপ। আবার যে বাবুকে বোঝায় জীবনের পার্সপেকটিভ বদলে ফেলা যায় ইচ্ছেমতো, ঠেলে পাঠিয়ে দেয় লাতেহারে পার্টির কাজে। এই বিশ্বপ্রসন্ন যেন এই উপন্যাসের ভেতর লেখকেরই গুঁজে দেওয়া নিজেকে।  কারণ, বিশ্বপ্রসন্নের কাল্পনিক মানচিত্রের মতোই লেখকও যে এই উপন্যাসের মধ্যে নির্মাণ করছেন তার নিজস্ব আখ্যানের জগৎ। তার চরিত্রদের মনের গতিবিধি।
বীণাপাণি, সূর্যকুমারের মতো এত আশ্চর্য সব চরিত্র নির্মাণ করেন লেখক। আবার একই সঙ্গে কোনও কোনও চরিত্রকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে যান তিনি। বাবুর নিজস্ব মনোজগতে তার মায়ের ভূমিকা এত নগণ্য যে অবাক হতে হয়। তার বাবার চরিত্রটিও প্রায় অনুপস্থিত। একই ভাবে লেখক যেন ন্যায় করেন না বাবুর প্রেমিকা স্নিগ্ধার সঙ্গেও। উপন্যাস পড়তে পড়তে বারবার মনে হয় যেন আরও একটু বেশি জায়গা দাবি করেছিল স্নিগ্ধা। তার মনের চিলেকোঠা, উঠোন-বারন্দা সবই যেন আরও স্পষ্ট হলে ভালো হত। 
একই সঙ্গে মনে হয়, লেখক এমন আশ্চর্য একটা ফর্ম নিলেন। অসম্ভব দক্ষতায় নির্মাণ করলেন আশ্চর্য সব মুহূর্ত, অথচ কখনও কখনও ভেসেও গেলেন তাতে। বরং উপন্যাসের ফর্ম এত কঠিন বলেই বোধহয় আরও বেশি পরিকল্পনার প্রয়োজন ছিল। কোথাও কোথাও একটু এডিটিং বোধহয় উপন্যাসটার উচ্চতা আরও বাড়িয়ে দিত। 
তবে সে সব না হলেও, এই উপন্যাস খাটো হয় না একটুও। বরং এর অত্যাশ্চর্য ফর্ম, মানুষের মনের ভেতর অবিরত ডুবসাঁতার, আমাদের সমকাল, সাম্প্রতিক অতীতকে ছুঁয়ে থাকা থমকে দেয় পাঠকে। আবিষ্ট করে রাখে বহুক্ষণ।

```