
শেষ আপডেট: 1 February 2023 09:29
শব্দ ছুঁয়ে ঘুম আর ঘুমের মধ্যে ভেসে চলতে চলতে কখনও পৌঁছে যান রাস্তায়, কখনও গলি পেরিয়ে দরজা ঠেলে বাড়ির ছাদে। দৃশ্যমান জগৎ ও অদৃশ্যমান কল্পজগতে মাঝামাঝি মন কলম বর্ণনা করে চলেন,গদ্য চলনে চলতে চলতে বর্ণিত দৃশ্যাবলী ও ঘটমান ঘটনার নস্টালজিক আবহে পাঠকও হারিয়ে যান নিজস্ব আবেশে।
সমাজের অস্থির সময়ে, ‘সেই একটা সময়/ যখন বাজপাখির প্রকাণ্ড ডানার তলায়/ অন্ধকার যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে/ বিষের পাত্র থেকে কবিতা জোনাকি তুলে এনে/কলকাতার ভূতগ্রস্ত কলোনিতে/ আমরা টিকে গিয়েছিলাম কিছুদিন … ’কত সহজে সমসময়ের প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছেন। অথচ তিনি জানেন, 'একদিন মরে যেতে হবে/ ভালোবাসতে বাসতে ভুলে যাই সব ভ্রম।'
কবিতায় পাঠক শব্দকে নয় তার অনুভূতিপুঞ্জকে পড়েন। কিন্তু সৌভিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গদ্য জুড়ে অনুভূত, কল্পিত ও দৃশ্য জগৎ - যুক্তিবিন্যাস, শৃঙ্খলা, র্যাশনালিটির বাইরে এমন এক গোধূলে যেখানে একই নদীর স্তরে স্তরে বিপরীতমুখী স্রোত। তাই তো কখনো কলকাতা, শান্তিনিকেতন ছাড়িয়ে হেঁটে বেড়ান 'মাদ্রিদের রাস্তায়', দার্জিলিং শিমলার নৈসর্গিক প্রকৃতির ক্যানভাসে, তুলির নিখুঁত আঁচড়ে এঁকেছেন সজীব চিত্র।
মিথ ভেঙে শিব কৃষ্ণ ও বুদ্ধকে হাস্য কৌতুকের মধ্যে দিয়ে অনায়াসে আজকের চরিত্র তুলেছেন। বুদ্ধের সঙ্গে দীর্ঘ কথোপকথনের ছলে ব্যক্ত করেন নিজমনের ভাব। 'ভাগাড় –কাণ্ডের কল্যাণে মুরগি কষা বা কচি পাঁঠার সোনালি ঝোল / ভাইরাসের নাম ‘নিপা’/ সকলে মিলে নীপার আত্মার শান্তি কামনা করি, ও মুক্তি পেলে , আমরা অন্তত শুয়োরটুকু মুখে তুলতে পারি…’ আবার কোথাও বই বিমুখ সমাজের প্রতি হাস্যচ্ছলে সহজ উচ্চারণ, ‘আইনক্স, তিন্ডার, আইফোন এক্স আর ওয়াও মোমো-র মহাজাগতিক বিস্ময়ের বাইরে বেরিয়ে একবার বাড়ির বইয়ের তাক থেকে ধুলো ঝেড়ে বিভূতিভূষণ-শরদিন্দু-সুকুমার রায় নামিয়ে আনলে, এমন ‘কেন কি’ অবস্থা হত না…’
এমন বাস্তব চিত্র গ্রন্থ জুড়ে, তিনি যেন পাঠককে সরাসরি তাঁর কল্প জগতের মুখোমুখি বসিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলে চলেছেন। তাঁর কথা ভাব ভাষায় পাঠকও অতি সহজে পৌঁছে যাচ্ছেন তার কল্পিত জগতে। লেখক-পাঠক ব্যবধান তখন অদৃশ্য। যেখানে লায়োনেল রিচি গেয়ে ওঠেন- "হ্যালো... ইজ ইট মি ইউ আর লুকিং ফর..." পড়তে পড়তে পাঠক মনেও একটি প্রশ্ন অনুরণনিত হয়, ওয়াট আর ইউ লুকিং ফর?
প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত সময় অসাধারণ ভাবে ফুটে ওঠেছে, 'শহরের ফাল্গুনে ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে ডেকে ওঠে প্রাগৈতিহাসিক দাঁড়কাক, কারণ কোকিলেরা মাইগ্রেট করে চলে যাচ্ছে' এখানেই সৌভিক বন্দ্যোপাধ্যায় অন্যান্যদের তুলনায় স্বতন্ত্র। সৌভিক মূলত কবি, তাঁর গদ্যের চলন ও স্বভাবজাত কবিতার অনুগামী। গদ্যে সুর লালিত্যে, ছন্দের দোলায় কোনও কোনও গদ্য যেন নিটোল কবিতা। কবিতার মত গদ্যে ঝংকার তার নিজস্ব স্ট্যাইল, গদ্য ফর্ম হয়েও যেন কবিতার কাছাকাছি,'হাজার লোকের ভিড়ে একজোড়া চোখ যেন চিরচেনা- কবিতা যা গদ্যের অবয়ব।
নগর জীবনের ব্যস্ততা, সম্পর্কের টানাপোড়ের প্রেম- হতাশাজনিত দুঃখ, সবকিছু তুলে ধরেছেন গদ্যে কিন্তু কোথাও উচ্চকিত শকিং শব্দ ব্যবহার করেননি। নস্টালজিক গদ্যে ব্যবহৃত ইংরাজি শব্দ কোথাও বাধা সৃষ্টি না করে বরং লেখনীকে করে তুলেছে 'নিজস্ব' ও 'স্মার্ট'। সৌভিকের নিজস্ব মন, মনন ও ভাবের ঝকঝকে প্রসাধন। যদিও লেখকের কথায়, 'প্রথম গদ্যের বই' কিন্তু 'পোটেয়িক পোজ' এবং এক্সপেরিমেন্টাল গদ্যকবিতার টুকরো কোলাজ বললেও হয়তো ভুল হবে না। আগামী সময় নির্ধারণ করবে সৌভিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা গদ্য ও কবিতার মাঝামাঝি লেখা প্রথম গদ্যবই 'টুকরো লেখা মন কলম'- এর স্ট্যাইল নিয়ে তা, নিঃসন্দেহে অনুমান করা যেতে পারে।