
শেষ আপডেট: 3 October 2022 18:31
পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান জেলার চিম্বুক পাহাড়ের পাদদেশে আছে একটি গ্রাম, নাম পোড়া পাড়া। সেই গ্রামে থাকত একটি মিষ্টি ছেলে, নাম তার মেনলে ম্রো (Menle mro)। দিনভর ঘুরে বেড়াত পাহাড়ে পাহাড়ে, ঝরনায় ঝরনায়। ছোট ছোট মাছ ধরে বেড়াত। নয়ত বিপদসঙ্কুল অরণ্যপথে কয়েক কিলোমিটার হেঁটে ঘুরে বেড়াত এ পাড়া ও পাড়ায়। সবসময় অন্যমনস্ক থাকত সে, তার মনে একটুও শান্তি ছিল না।
মুরং জনগোষ্ঠীর ছেলে ছিল মেনলে। মুরং একটি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী। মুরং উপজাতিরা, 'ম্রু' বা 'ম্রো' নামেও পরিচিত। পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান জেলার বিভিন্ন এলাকায় এই ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বাস। তোইন, মঙ্গু, তৈনফা, লুলোইং, উত্তরহানগড়, দক্ষিণ হানগড়, তঙ্কাবতী, হরিণঝুড়ি, টেকের পানছড়ি, রেনিখ্যং, পানতলা, থানখ্যং, সোয়ালক, তিনডো, সিংপা, আলীখং এবং ভারিয়াতালি অঞ্চলে এই জনগোষ্ঠীর মানুষরা আজও বাস করেন।

মেনলে, পাহাড়ের গ্রামে গ্রামে ঘুরে শুনেছিল, এই গ্রামের বাইরে যে বিরাট পৃথিবীটা আছে, তাতে বাস করেন প্রচুর মানুষ। কত ধরণের ধর্ম তাঁদের। খ্রিস্টান, ইসলাম, সনাতন হিন্দু, বৌদ্ধ, আরও কতশত ধর্ম নাকি ছড়িয়ে আছে পৃথিবী জুড়ে। মেনলের মনে একটাই দুঃখ, মুরংদের কোনও ধর্ম নেই, ধর্মের কোনও নাম নেই। অথচ মুরংদের তিনজন দেবতা আছেন। বিশ্বের সৃষ্টিকর্তা ‘তুরাই‘, পাহাড়ের দেবতার ‘সাংতুং‘ এবং নদীর দেবী ‘ওরেং’।
আরও একটা দুঃখ ছিল মেনলের। সেটা হল তার পোড়া পাড়া গ্রামে কোনও স্কুল ছিল না। তাই প্রচন্ড ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও মেনলে পড়াশোনা করতে পারেনি। সে মনের কথা লিখতে পারত না। কারণ মুরং জনগোষ্টীর নিজস্ব ভাষার কোনও বর্ণমালা ছিল না। যখন তার বয়স ১৫ বছর, মেনলের স্বপ্ন হঠাৎই পাখা মেলেছিল। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড, ১৯৮১ সালে বান্দরবানের সুয়ালক ইউনিয়নে স্থাপন করেছিল ‘ম্রো আবাসিক বিদ্যালয়’। খবর পেয়ে মেনলে একাই ছুটে গিয়েছিল, স্কুলে ভর্তি হওয়ার জন্য।
কিন্তু স্কুল কতৃপক্ষ মেনলেকে ফিরিয়ে দিয়েছিল। কারণ, স্কুলের প্রাথমিক বিভাগে পড়ার বয়স মেনলের আর ছিল না। কান্নায় ভেঙে পড়ে, স্কুলের সামনেই অনশন শুরু করেছিল নাছোড়বান্দা মেনলে। কেটে গিয়েছিল এক সপ্তাহ। এই সাত দিন মেনলে কাটিয়েছিল খোলা আকাশের নীচে। এক ফোঁটা জলও সে মুখে তোলেনি। মেনলের জেদের কাছে হার মেনেছিলেন প্রধান শিক্ষক টি এন মং। স্কুলে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েছিল মেনল ম্রো। সেদিনও চোখ ফেটে বেরিয়ে এসেছিল জল, তবে আনন্দে! পড়াশোনায় অত্যন্ত মেধাবী ছিল মেনলে। স্কুলে ভর্তির কয়েক মাসের মধ্যে ডবল প্রমোশন পেয়ে ক্লাস টু, পরের বছরই ক্লাস ফোরে উঠে পড়েছিল মেনলে।
কিন্তু স্কুলে লেখাপড়া করতে হত বাংলা বর্ণমালায়। মেনলের মনে আবার এক দুঃখ বাসা বেঁধেছিলন। মুরং'রা আদিম এক নৃ-গোষ্ঠী, এই নৃ-গোষ্ঠীতে আছেন লক্ষ মানুষ। অথচ মুরংদের ছেলেমেয়েকে পড়াশুনা করতে হচ্ছে বাংলা ভাষার বর্ণমালাতে। যে ভাষা মুরংদের মাতৃভাষা নয়। এক আকাশ স্বপ্ন নিয়ে, পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময়, মুরংদের 'ম্রো' ভাষার লিপি তৈরি করতে শুরু করেছিল ১৮ বছরের মেনলে। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করার পর মেনলে বাড়ি ফিরে এসেছিল। আরও পড়ার ইচ্ছে থাকলেও সম্ভব হয়নি। কারণ মাধ্যমিক স্তরের স্কুলটি ছিল প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে। তাছাড়া ১৮ বছরের মেনলেকে যে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি নেওয়া হবে না, এটা মেনলে বুঝে গিয়েছিল।
গ্রামে ফেরার পর, সারা দিন গুহায়, বনে বাদাড়ে ঘুরে বেড়াত। নিজের মনে বিড়বিড় করত। পাহাড়ি লতার রস দিয়ে রঙ তৈরি করে ছবি আঁকত পাথরের ওপরে। তার মনে হয়েছিল, এই পৃথিবী তার নিজের পৃথিবী, এই গ্রাম তার নিজের গ্রাম, এই মুরং উপজাতি তার নিজের উপজাতি, কিন্তু মুরংরা পৃথিবীর সবার চেয়ে কত পিছিয়ে আছে। বিশ্বের কারও কোনও চিন্তা নেই মুরংদের নিয়ে। না আছে শিক্ষা, না আছে ধর্মের নাম, না আছে ধর্মগ্রন্থ, না আছে উপাসনা গৃহ।
পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় তাদের ভাষার বর্ণমালা তৈরি করার কাজে হাত দিয়েছিল মেনলে, একার চেষ্টায় তা সম্পূর্ণ করেছিল ১৯৮৫ সালে। মেনলের তৈরি বর্ণমালায় ছিল ৩১টি বর্ণ এবং নিঁখুতভাবে সেটি বানিয়েছিল পঞ্চম শ্রেণী উত্তীর্ণ মেনলে। যা আজও বিস্ময় জাগায় বিশ্বের ভাষাতত্ত্ববিদদের মনে।

বৃষ্টিভেজা দিনে, গ্রামের বাইরে থাকা বড় মাঠটিতে উপস্থিত হওয়া পাঁচ হাজার মুরং নারী পুরুষের সামনে মেনলে প্রকাশ করেছিলেন তাঁর আবিষ্কৃত‘ক্রামা‘ বা ‘ম্রো’ বর্ণমালা। কয়েক লক্ষ মানুষ নিয়ে গড়া একটি জনজাতি, সেদিন তাঁদের ভাষার নিজস্ব বর্ণমালা পেয়েছিল। যে বর্ণমালার জন্য তাঁদের অপেক্ষা করতে হয়েছিল হাজার হাজার বছর। বিস্ময়ে সেদিন হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন উপস্থিত মুরং নারী পুরুষেরা। এবার কি তাহলে মাতৃভাষাতেই পড়াশুনা শিখতে পারবে তাঁদের সন্তানেরা! মনে জমা হয়েছিল অনেক প্রশ্ন। সব প্রশ্নের জবাব দিয়েছিলেন কুড়ি বছরের মেনলে। বাঁধভাঙা আনন্দে ভেসে গিয়েছিলেন অক্ষরহীন মানুষগুলি। নবীন প্রজন্মের সাফল্যের ইমারতটির প্রথম ইঁট সেদিন নিজের হাতে গেঁথে দিয়ে গিয়েছিলেন ভূমিপুত্র মেনলে। যে ইঁটটি থেকে আগামী হাজার হাজার বছর ধরে বিকিরিত হবে শিক্ষার আলোক।
সেই দিন বিকেলে মেনলে ম্রো, মুরং উপজাতিকে উপহার দিয়েছিলেন এক নতুন ধর্ম। ধর্মের নামও ‘ক্রামা'। আড়াই ঘন্টা ধরে মেনলে উপস্থিত মুরংদের বুঝিয়েছিলেন ‘ক্রামা' ধর্মের রুপরেখা, অনুশাসন ও নীতিবাক্যগুলি। হাজার হাজার মুরং নারী পুরুষ মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনেছিলেন মেনলের বলা কথাগুলি। মেনলে বলা যখন শেষ হয়েছিল, উপস্থিত নারী পুরুষেরা চিৎকার করে কেঁদেছিলেন। যুবক মেনলের পায়ে লুটিয়ে পড়ে বলেছিলেন , ‘মেনলে তুমি মানুষ নও, তুমি ঈশ্বর-পুত্র। তুমি আমাদের দিয়েছ বর্ণমালা। দিয়েছ ধর্ম। আজ থেকে তুমিই আমাদের অবতার, তুমিই আমাদের ঈশ্বর ‘ক্রামাদি’। তুমি স্বর্গের দেবদূত। আমাদের উদ্ধার করতেই তোমাকে পাঠানো হয়েছে।’
এরপর, ৫ এপ্রিল থেকে ১৪ আগস্ট পর্যন্ত মেনলে, ‘ক্রামা’ ধর্মের অনুশাসন, নীতিবাক্য প্রচার করেছিলেন বান্দরবানের পাড়ায় পাড়ায়। মুরং জনগোষ্ঠীর বহু মানুষ তাঁর ধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন। কিন্তু ওই বছরই ১৫ আগস্ট ভোরে তাঁকে আর পোড়াপাড়া গ্রামে খুঁজে পাওয়া যায়নি। আশেপাশের জঙ্গল ও পাহাড়গুলির বুক তোলপাড় করে, আশপাশের এলাকায় অরণ্য তন্ন তন্ন করে খুঁজেও পাওয়া যায়নি মেনলে ম্রো'কে। মুরংদের অন্ধকার জীবনে প্রভাত সুর্যের মতো আলো ফেলে হারিয়ে গিয়েছিলেন ‘ক্রামা‘ ধর্মের প্রবর্তক মেনলে ম্রো।
আজও তাঁদের 'ক্রামাদি' মেনলে ম্রো'কে খুঁজে চলেছেন মুরংরা। খুঁজে চলেছেন সেই ১৯৮৬ সাল থেকে। মুরংদের মধ্যে যাঁরা আজ বয়েসে প্রবীণ, তাঁরা কপালে হাত ঠেকিয়ে আজও বলেন, মেনলেকে স্বর্গে নিয়ে গিয়েছেন দেবতারা, সোনার রথে চড়িয়ে। কেউ কেউ দাবী করেন, মেনলে হিমালয়ে গিয়েছেন তপস্যা করতে। যাবার সময় নাকি মেনলে বলে গিয়েছিলেন, "আমি তপস্যা করতে যাচ্ছি। আবার ফিরে আসব। চিন্তা কোরো না "
মেনলের হারিয়ে যাওয়ার পর কেটে গেছে ৩৪ বছর । ক্রামাদি 'মেনলে ম্রো' প্রবর্তিত ধর্মমত 'ক্রামা' এবং আবিষ্কৃত বর্ণমালা 'ক্রামা' বা 'ম্রো' আজ স্বীকৃতি পেয়েছে। তাঁর বাণী রিইয়ুং-খ্তি (নীতিকথা) নামে একটি বইয়ে সংকলিত হয়েছে। প্রায় ২০০ পৃষ্ঠার বইটি বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে। মেনলে প্রবর্তিত ‘ক্রামা বা ম্রো বর্ণমালার কম্পিউটার হরফ তৈরি হয়েছে। তাঁর আবিষ্কার করা বর্ণমালায় আজ পাঠ্যপুস্তক পর্যন্ত ছাপা হচ্ছে। বর্তমানে মুরংদের মধ্যে মেনলে ম্রো আবিষ্কৃত 'ম্রো' বর্ণমালায় সাক্ষরতার হার ৭০%।
কেউ জানে না ক্রামাদি কোথায়। আদৌ তিনি জীবিত আছেন কি না। কিন্তু তাঁর তো পৃথিবী ছাড়ার বয়স হয়নি, তাঁর বয়েস এখন মাত্র চুয়ান্ন। তাই মুরং উপজাতির মানুষেরা আজও তাঁর পথ চেয়ে বসে আছেন। তাঁরা বিশ্বাস করেন, একদিন সাদা ঘোড়ায় চেপে পূর্ব দিক থেকে ফিরে আসবেন তাঁদের ঈশ্বর ‘ক্রামাদি’। রোজ সকালে পূর্বদিকে তাকিয়ে ‘ক্রামা‘ ধর্মের উপাসকরা বলেন, "আমাদের জন্য সুসংবাদ নিয়ে ওই যে তিনি আসছেন।"
বিশ্বের ৯৯.৯৯ % মানুষ ক্রামাদি মেনলে ম্রো-এর নামই শোনেননি। কিন্তু সারা বিশ্বে তিনি ছাড়া আর আর কেউ নেই, যিনি একটি জাতিকে একই সঙ্গে ধর্ম এবং বর্ণমালা উপহার দিয়েছেন। তাই তো তাঁকে ভোলেননি মুরং উপজাতি, ভোলেননি ‘ক্রামা’ ধর্মের অনুগামীরা। ভোলেনি হাজার হাজার স্কুলপড়ুয়া মুরং শিশু। তবুও মনে প্রশ্ন জাগে, প্রিয় গ্রাম আর প্রিয় মানুষদের ছেড়ে মাত্র ২০ বছর বয়সে কেন হারিয়ে গিয়েছিলেন মেনলে! বান্দরবানের আকাশে ওঠা পুবের সূর্য উল্টে আমাকেই জিজ্ঞেস করেছিল, "ভগবান বুদ্ধ এবং শ্রীচৈতন্য ঘর ছেড়েছিলেন,কীসের টানে! উত্তর দিতে পারিনি।
সূত্র- মুরং লোকগাথা