৯৪ বছর বয়সেও থেমে নেই নরেন্দ্র দে সরকারের সৃষ্টির গতি। জলরংয়ের পাশাপাশি সমাজচেতন প্রতিবাদী ছবিতে উজ্জ্বল তাঁর একক প্রদর্শনী।
.jpeg.webp)
নরেন্দ্র চন্দ্র দে সরকার (ছবি- ফেসবুক) গ্রাফিক্স- দিব্যেন্দু দাস (দ্য ওয়াল)
শেষ আপডেট: 6 January 2026 19:19
দ্য ওয়াল ব্যুরো: রোদের আঁচ গায়ে লাগছে না তেমন। হিমেল বাতাসে জাগছে শিহরণ। কাঁপতে কাঁপতে রবিবারের দুপুরে অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসের গ্যালারিতে পা রাখা মাত্র এই শিহরণ বদলে গেল বিস্ময়ে! জাগল পুলক। শুধু শিল্পের ঔৎকর্ষে নয়, শিল্পীর পরিচয়েও। নরেন্দ্র চন্দ্র দে সরকার (Narendra Chandra De Sarkar), বেঙ্গল স্কুল অফ আর্টের (Bengal School of Art) ধারায় দীক্ষিত বর্ষীয়ান শিল্পী, তাঁর সারাজীবনের কাজ নিয়ে প্রদর্শনী চলছে অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসে। রোজ হাজিরা দিচ্ছেন তিনি। একেবারে নিভৃত সাধকের মতো শিল্পচর্চা করা মানুষটি শিল্পরসিকদের সঙ্গে কথা বলছেন, সইয়ের আবদার মেটাচ্ছেন, সেলফি তুলছেন আর তাঁর কাজের সামনে দাঁড়িয়ে দর্শক বুঝে নিচ্ছেন, শিল্পীর বয়স সত্যিই বাড়ে না। শিল্পও অজর, অক্ষয়। যা কালের প্রলেপেও থাকে অমলিন!
প্রদর্শনীর সূচনা, শিল্পীর নিজস্ব আলোয়
১ জানুয়ারি, ২০২৬ কলকাতার ২ নং ক্যাথেড্রাল রোডের অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টস (Academy of Fine Arts) আলোকিত হয়ে ওঠে এই বর্ষীয়ান শিল্পীর উপস্থিতিতে। নর্থ, ওয়েস্ট ও সাউথ গ্যালারিজুড়ে শুরু হয় শ্রী নরেন্দ্র চন্দ্র দে সরকারের শিল্পকলা প্রদর্শনী। সন্ধ্যায় প্রদীপ জ্বালিয়ে উদ্বোধন করেন শিল্পী নিজেই। সঙ্গে ছিলেন আর্ট কলেজের প্রাক্তন অধ্যাপক নিরঞ্জন প্রধান (Niranjan Pradhan), অধ্যাপিকা শুক্তিশুভ্রা প্রধান (Shuktishubhra Pradhan), ললিতকলা অ্যাকাডেমিরর রিজিওনাল সেক্রেটারি রাহাস মোহান্তি (Rahas Mohanty)-সহ অন্যান্যরা।
এই প্রদর্শনীতে একত্রে ধরা পড়েছে শিল্পীর প্রায় সত্তর বছরের নিরবচ্ছিন্ন শিল্পসাধনার ফসল। দীর্ঘ স্ক্রল ড্রয়িং, যেখানে সমাজজীবনের ছবি একের পর এক বয়ে গেছে, আবার জনতার মিছিল নিয়ে তৈরি পেইন্টিং, সব মিলিয়ে এক বিস্তৃত জীবনবোধের দলিল।
সাধক বনাম শিল্পী
নরেন্দ্র চন্দ্র দে সরকার ১৯৫২ থেকে ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন কলকাতার সরকারি আর্ট কলেজে (Government College of Art & Craft)। পরে ১৯৮৫ থেকে ১৯৯৫, এক দশক ভারতীয় শৈলী (Indian Style) বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে কাজ করেছেন। ছাত্রছাত্রী থেকে সহকর্মী, সবার কাছেই তিনি ‘নরেন দে’ বা ‘নরেনদা’। কিন্তু এই পরিচয়ের আড়ালেও তাঁর একটি পরিচয় আছে। লোক দেখানোর বাজারে, তিনি নির্জনপুরের সাধক, যাঁর ধ্যানজ্ঞান শুধুই শিল্পসাধনা।
সারা জীবন তিনি ছবি এঁকেই কাটিয়েছেন। জগৎকে দেখেছেন মননের দর্পণে, নিভৃত সাধনায় খুঁজেছেন বাস্তবকে, সুন্দরকে। সেসব ধরতে গিয়ে কখনও আক্ষেপও করেছেন, “আর্টের সাধনা তো করছি, সুন্দরের মাধুরী ধরা দিল কই?” কিন্তু এই না-পাওয়াই তাঁকে আরও গভীরে টেনে নিয়ে গেছে। নিভৃতে, নীরবে, আরও আত্মমগ্ন হয়ে চলেছে তাঁর সাধনা।
ছবির ভেতরে সমাজ, মানুষের ভিড়
এই প্রদর্শনীতে ঢুকলেই চোখে পড়বে তাঁর স্ক্রল পেইন্টিং (Scroll Painting)। এখানে কোনও রোম্যান্টিক ল্যান্ডস্কেপ নেই। আছে মেহনতি মানুষের মিছিল, বাংলার সামাজিক ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের দীর্ঘ বর্ণনা। একটানা স্ক্রলের উপর দিয়ে বয়ে গেছে গ্রামবাংলার জীবন—জেলে, তুলো ধুনতে আসা বৃদ্ধ, পল্লীজীবনের গম্ভীরা নৃত্য (Gambhira Dance), পাঠশালায় পঠনপাঠনরত ছাত্রছাত্রীরা, সাধারণ কোনও মেঘলা দুপুর বা বিকেলে মা-ছেলের একাকীযাপন।
প্রত্যেকটি ছবি সামনে থেকে দেখলে বোঝা যাবে, শিল্পী শুধু দৃশ্য আঁকেননি, সময়কে ধরে রেখেছেন। তাঁর সঙ্গে কথা বলেও সেটাই মনে হল। তিনি জানালেন, সময়কে এভাবেই তো ধরে রাখা যায়। 'আর মেহনতি মানুষের কথা, আমার-আপনার কথা বলেন কতজন! এই যে এলেন, নিজেদের আশপাশের কাউকেই যেন ছবিতে দেখলেন, এটাই প্রাপ্তি,' বললেন তিনি।
ঠিকই তো একটু আগেই রবীন্দ্রসদনের গা ঘেঁষে বা তারও আগে ভবানীপুরের ফুটপাতে কনকনে শীতের কত দৃশ্যই না চোখে পড়ল। বিড়বিড় করতে করতে ভাবছিলাম, ইশ... আমাদের মাথায় ছাদ আছে এটাই অনেক। কত দাবি আমাদের সত্যি! সেই দৃশ্যই তো দেখলাম নরেন বাবুর কাজে। ঠিক সেটাই। এমন আজকাল কোথায় হয়। প্রদর্শনীতে আসা লোকজন বলাবলি করছিলেন, 'পাশ্চাত্য শিল্পকলা সকলের বোঝার নয়, মারপ্যাঁচ ঠিক বোধগম্য হয় না। কিন্তু এটা, ওই যে বলাকা উড়ে যাচ্ছে... কী সুন্দর। দেখেই চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছে।'
একটাই প্রশ্ন কেন ৯০ পেরিয়েও তাঁর কাজ আট থেকে আশি সকলের মন ছুঁয়ে যাচ্ছে?
ভারতীয় ঐতিহ্যের গভীরে ডুব
দেশীয় আদর্শ ও ভাবকে ছবিতে আনার জন্য নরেন্দ্র চন্দ্র দে সরকার বারবার গিয়েছেন ভারতীয় জাদুঘর (Indian Museum)। সেখানে মৌর্য (Maurya), শুঙ্গ (Shunga), কুশান (Kushan), গুপ্ত (Gupta) ও পরবর্তী যুগের ভাস্কর্য তিনি গভীর মনোযোগে দেখেছেন। বিশেষ করে গান্ধার (Gandhara) ও মথুরা (Mathura) শৈলীর বুদ্ধমূর্তি তাঁকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করেছে।
বুদ্ধের ডিম্বাকৃতি মুখায়বে যে প্রাণস্পন্দন, তার ধ্বনি যেন আনন্দময় ছন্দে শিল্পীর অন্তরে নৃত্য করে। বোধিবৃক্ষের ভাস্কর্য, যক্ষিণী মূর্তি, মহিষাসুরমর্দিনী, অনন্ত শয়ানে বিষ্ণু, গণেশ ও গণেশজননী, এই সব ভারতীয় ভাস্কর্যের অন্তঃভাব তাঁর অনেক ছবিতে প্রতিধ্বনিত হয়েছে।
ভারতীয় রূপভাবকে গভীরভাবে অনুভব করতে তিনি ঘুরে বেরিয়েছেন মহাবলিপুরম (Mahabalipuram), পন্ডিচেরি আশ্রম (Pondicherry Ashram), মহীশূর রাজবাড়ি (Mysore Palace), আগ্রা-মথুরা-বৃন্দাবন (Agra–Mathura–Vrindavan), দিল্লি থেকে হরিদ্বার (Delhi–Haridwar)। স্থাপত্য, ভাস্কর্য আর মানুষের ধর্মীয় আবেগে স্নাত হয়েছেন।
তবু তাঁর বেশির ভাগ ছবি তৈরি হয়েছে বাস্তব জীবনের উপর ভিত্তি করে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, রামায়ণ (Ramayana), মহাভারত (Mahabharata) কিংবা পুরাণের দেবদেবী, সবই তাঁর ছবিতে এসেছে এমনভাবে, যেন সেগুলোও সামাজিক চালচিত্রেরই অংশ। এপ্রসঙ্গেও তিনি বলছিলেন, 'ঠাকুরের ছবি তো সকলেই আঁকেন। এই ছবিগুলো ঠিক তেমন নয়।'
শিল্প মানেই আনন্দ
নরেন্দ্র চন্দ্র দে সরকার শিল্পের মাঝে আনন্দ খুঁজে নিয়েছেন। এই আনন্দ ভোগের নয়, কামনার নয়, এ হল চিৎশক্তির আনন্দ। শিল্পের গভীরে স্থিত থেকে রূপসাগরে ডুব দিয়ে যে নান্দনিক উত্তরণ ঘটে, তাকেই তিনি রূপ দিয়েছেন।
এখানেই তাঁর শিল্পবোধে শোনা যায় উপনিষদের সেই ধ্বনি, ‘আনন্দরূপম্ অমৃতং যদ্বিভাতি’। খণ্ড খণ্ড রূপের মধ্যেই তিনি দেখতে পান সমগ্র সুন্দরের রূপ। সীমার মধ্যে অসীমের সুর যেন দোলায়িত হয়।
শত ঝড়ঝঞ্ঝাতেও অটল শিল্পবোধ
জীবনের নানা ঝড়ঝঞ্ঝা এলেও তাঁর জীবনবোধ কখনও মরচে ধরেনি। শিল্পের মধ্যেই নিয়ত আত্মমগ্ন থেকেছেন। প্রতিদিনের শিল্পচর্চা তাঁকে আত্মপ্রত্যয়ী করে তুলেছে। তাঁর শিল্পের আনন্দানুভূতি ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে দীর্ঘ সাধনায়—তিল তিল করে।
এই প্রদর্শনীতে যে কাজগুলি দেখা যাচ্ছে, তার বেশির ভাগই টেম্পারা (Tempera) মাধ্যমে করা। বিভিন্ন সময়ের, বিভিন্ন মাপের, নানা রূপের কাজ-সব মিলিয়ে এক বিশাল শিল্পযাত্রার দলিল।
বেঙ্গল স্কুলের উত্তরাধিকার
নরেন্দ্র চন্দ্র দে সরকার বেঙ্গল স্কুল অব আর্ট (Bengal School of Art)-এর ধারার এক গুরুত্বপূর্ণ উত্তরসূরি। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর (Abanindranath Tagore) নেতৃত্বে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল—পাশ্চাত্য অ্যাকাডেমিক আর্টের বিরোধিতা করে ভারতীয় আধুনিক শিল্পভাষা গড়ে তোলার প্রয়াস, তার রেশ তাঁর শিল্পে স্পষ্ট।
মুঘল ও রাজপুত চিত্রশৈলী, অজন্তা (Ajanta) চিত্রভিত্তিক রূপভাব, জাপানি ওয়াশ টেকনিক (Japanese Wash Technique)-এর প্রভাব, সব মিলিয়ে যে স্বদেশি চেতনা তৈরি হয়েছিল, নরেন দে সেই ধারাকে নিজের মতো করে বহন করেছেন।
শিল্পীর আত্মদর্শন ও আত্মসংস্কৃতির যে স্বরূপ তাঁর ছবিতে ধরা পড়েছে, তা দর্শকের চেতনাকে জাগিয়ে দেবে সহজেই। রূপের ভেতর দিয়ে যে অখণ্ড দিব্য আনন্দ প্রকাশ পেয়েছে, সেটাই এই প্রদর্শনীর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
তথ্য সূত্র- সোশ্যাল মিডিয়া