
শেষ আপডেট: 28 October 2019 10:31
যুদ্ধে বিদ্ধস্ত মসুল শহর[/caption]
মসুল দখল করেছিল ইসলামিক স্টেট জঙ্গিরা[/caption]
ইসলামিক স্টেট ১০ জুন দখল করে নিয়েছিল মসুল শহর। আরব দেশগুলি ও আমেরিকা আগে জানলেও, এই প্রথম বিশ্ব জানল এক মানুষের নাম, ওসামা বিন লাদেনের পর যিনি আমেরিকার কাছে আতঙ্ক হয়ে উঠেছিলেন। নামটি ছিল ইব্রাহিম আওয়াদ ইব্রাহিম আলী আল-বদরী আল-সামারাই, কিন্তু বিশ্ব তাঁকে চেনে আবু বকর আল বাগদাদি নামে। যিনি নিজেকে পরিচিত করতে চেয়েছিলেন ইরাকের পশ্চিমাঞ্চল ও সিরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চল নিয়ে গড়ে ওঠা একটি ইসলামিক রাষ্ট্র বা ক্যালিফেটের প্রধান 'খলিফা ইব্রাহিম' হিসেবে।
আরও পড়ুন: জঙ্গি নয়, বাগদাদি নাকি ইসলামী পণ্ডিত! চরম ট্রোল, শিরোনাম বদলাতে বাধ্য হল ওয়াশিংটন পোস্ট
[caption id="attachment_154587" align="aligncenter" width="460"]
মসুলের মসজিদ থেকে ভাষণ দিচ্ছেন বাগদাদি ওরফে খলিফা 'ইব্রাহিম'[/caption]
আবু বকর আল বাগদাদির আহ্বানে উদ্বুদ্ধ হয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে মৌলবাদী যুবকেরা যোগদান করেছিলেন ইসলামিক স্টেট জঙ্গি সংগঠনটিতে। এর ফলে তৈরি হয়েছিল এক ভয়ঙ্কর আতঙ্কবাদী যোদ্ধাবাহিনী। যারা নৃশংসতার নতুন নজির সৃষ্টি করেছিল।
জীবন্ত পুড়িয়ে, বহুতল থেকে চোখ বাঁধা অবস্থায় নীচে ঠেলে ফেলে, খাঁচার ভেতরে ঢুকিয়ে সুইমিং পুলে চুবিয়ে, চৌরাস্তার মোড়ে জীবন্ত ক্রুশবিদ্ধ করে, বালিয়াড়িতে সারিবদ্ধ ভাবে শুইয়ে গুলি করে, মাথা নীচের দিক করে ঝুলিয়ে গলা কেটে বাগদাদির সংগঠনের জঙ্গিরা হত্যা করত বিরোধীদের।
তাদের মধ্যে যারা কাফের, তারা চর ও ইরাকি সেনাদের আরও নৃশংসভাবে হত্যা করত। শুধু হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি ইসলামিক স্টেট। এই সব নারকীয় গণহত্যার উচ্চমানের ভিডিও রেকর্ড করে গণমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে আতঙ্কিত করবার চেষ্টা করত পৃথিবীর মানুষকে। এই সব নারকীয় ঘটনার পিছনে ছিলেন আপাতশান্ত, সৌমদর্শন আবু বকর আল বাগদাদি।
[caption id="attachment_154592" align="aligncenter" width="615"]
খাঁচায় বন্দি করে জলে ডুবিয়ে হত্যা করা হয়েছিল প্রচুর নিরীহ মানুষকে[/caption]
স্কুলের খাতায় আল বাগদাদির কিশোর বয়েসের ছবি[/caption]
বাগদাদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৬ সালে ইসলামিক স্টাডিজে স্নাতক হওয়ার পর, একই বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি ও ডক্টরেট করেন। পড়াশোনার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির কাছেই তোবচি নামে একটি জায়গার মসজিদে শিশু-কিশোরদের ধর্মশিক্ষা দিতে শুরু করেছিলেন।
ধর্মগুরু শুধু নয়, খুব ভাল ফুটবল খেলতেন বাগদাদি। গোলকিপার ছাড়া প্রায় সব পজিশনে খেলতে পারতেন। দুরন্ত স্কিল ছিল তাঁর পায়ে। বাগদাদির সঙ্গে মসজিদে থাকতেন ও ফুটবল খেলতেন আবু আলি। তিনি সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, "বাগদাদি যখন এখানে ছিলেন তখন তাঁর বয়স ১৮ বছর। তিনি ছিলেন আমাদের ক্লাবের মেসি।"
প্রতিপক্ষ ফুটবল ক্লাবগুলি ভয় পেতো বাগদাদিকে। অসংখ্য গোল করেছিলেন স্থানীয় ক্লাবগুলির বিরুদ্ধে। নিজের এলাকায় সেলিব্রিটি ফুটবলার ছিলেন বাগদাদি। খুব শান্ত ও নম্র হওয়ার জন্য বন্ধুদের কাছেও জনপ্রিয় ছিলেন তিনি। তাঁরা দলবেঁধে ঘুরতে যেতেন আনবার জেলার বিভিন্ন ট্যুরিস্ট স্পটে। সেখানে তাঁরা পিকনিক করতেন, নদীতে সাঁতার কাটতেন।
[caption id="attachment_154598" align="aligncenter" width="1172"]
বাগদাদি বিভিন্ন রূপে[/caption]
পিএইচডি করার পর বাগদাদি বিয়ে করেন। একবছর পর তাঁর প্রথম সন্তান হয়। ২০০৩ সালে আমেরিকা, ব্রিটেন ও অস্ট্রেলিয়া যখন সাদ্দাম হুসেনকে পদচ্যুত করতে ইরাক আক্রমণ করে, বাগদাদি তখনও পুরোদস্তুর সংসারি।
কিন্তু একটি ঘটনা তাঁর জীবনের ছন্দপতন ঘটিয়েছিল। ২০০৪ সালে মসজিদ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাঁর মতবিরোধ হওয়ার পর তিনি শুধু মসজিদ নয়, তাঁর বাড়ি ও তোবচি এলাকা থেকে বিতাড়িত হন। তাঁর অপরাধ ছিল তিনি মসজিদ কর্তৃপক্ষের কথা অনুযায়ী রাজনৈতিক দল 'ইসলামিক পার্টি'তে যোগদান করতে চাননি।
রক্ষণশীল সালাফি মতবাদে বিশ্বাসী বাগদাদি মনে করতেন রাজনৈতিক দলগুলি ঈশ্বরবিরোধী। বিতাড়িত বাগদাদি দূরের একটি মসজিদে নমাজ পড়াতে শুরু করেছিলেন। তখনও বাগদাদির মধ্যে জিহাদি গতবিধি দেখা যায়নি।
কিন্তু মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার মতে এসবই ছিল ধুরন্ধর আল বাগদাদির আত্মগোপন করে থাকার কৌশল। গুপ্তচর সংস্থা সিআইএ বলছে ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০০ সাল অবধি আফগানিস্তানে জেহাদি প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন বাগদাদি এবং ২০০০ সালে সালাফি জেহাদিদের দলে যোগ দিয়েছিলেন।
ইসলামিক স্টেট সন্ত্রাসবাদী দলটির প্রতিষ্ঠাতা আবু মুসাব আল-জারকাউই। তার খোঁজে হন্যে মার্কিন বাহিনী ২০০৪ সালে একটি মসজিদে তল্লাসি চালানোর সময় সন্দেহের বশে গ্রেফতার করেছিল মসজিদের মৌলবী বাগদাদিকে। সেই প্রথম এবং শেষবারের মত বাগদাদিকে গ্রেফতার করতে পেরেছিল মার্কিন বাহিনী। গ্রেফতারের পর বাগদাদিকে পাঠানো হয় কুখ্যাত ক্যাম্প বুক্কা'তে। সেখানে ১০ মাস কাটান তিনি। পারতপক্ষে জেলের ভেতরে কারও সঙ্গে কথা বলতেন না বাগদাদি। বেশিরভাগ সময়েই ডুবে থাকতেন ধর্মগ্রন্থে।
[caption id="attachment_154604" align="aligncenter" width="450"]
জেলবন্দি বাগদাদি[/caption]
সেই জেলে ছিলেন আলকায়দা জঙ্গি গোষ্ঠীর কয়েকজন শীর্ষস্তরের নেতা। তাঁদের সঙ্গে সাংকেতিক ভাষায় নিয়মিত কথা হত বাগদাদির। জেল থেকে বেরিয়ে আল-কায়দায় যোগ দেন। কিন্তু কিছুদিন পরে সেখান থেকে বেরিয়ে এসে সমমনস্ক জঙ্গি দলগুলিকে একত্রিত করেন ইসলামিক স্টেট নামের ভয়ঙ্কর আতঙ্কবাদী সংগঠনটি। সবাইকে একজোট রাখার অসাধারণ ক্ষমতা, ধর্মীয় পাণ্ডিত্য ও জ্বালাময়ী ভাষণের জন্য তিনি হয়ে যান ইসলামিক স্টেটের আমির।
বাগদাদি কল্পিত ইসলামিক স্টেট[/caption]
দখল করেছিল ইরাকের কয়েক হাজার তেলের খনি ও বিভিন্ন সরকারি ব্যাঙ্ক। একই সঙ্গে ইউরোপে পাচার করতে শুরু করেছিল ইরাকের বিভিন্ন প্রাচীন ও ঐতিহাসিক নিদর্শন। ফলে কয়েক মাসের মধ্যে ইসলামিক স্টেট হয়ে ওঠে পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী আতঙ্কবাদী সংগঠন। ইসলামিক স্টেট যোদ্ধাদের বিশাল অঙ্কের মাইনে দেওয়া ও গোপন পথে অস্ত্র কেনা শুরু করেন বাগদাদি। লক্ষ্য বিশ্বজোড়া খিলাফত তৈরি করা। শরিয়তই হবে সেই খিলাফতের একমাত্র চালিকাশক্তি।
আমেরিকা ওসামা বিন লাদেনের ছায়া দেখেছিল আল বাগদাদির মধ্যে। সঙ্গীদের নিয়ে শুরু করেছিল ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে অভিযান। বাগদাদির মাথার দাম নির্ধারণ করেছিল ২৫ মিলিয়ন বা আড়াই কোটি মার্কিন ডলার। কিন্তু ২০১৪ থেকে ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর পর্যন্ত অধরাই রয়ে ছিলেন ইসলামিক স্টেট প্রধান।
যদিও এই সময়কালের মধ্যে প্রায় শতাধিকবার তাঁর মৃত্যু সংবাদ পাওয়া গিয়েছিল প্রচার মাধ্যমে। কিন্তু সবকটি মিথ্যে বলে প্রমাণিত হয়েছিল। ২০১৭ সালের ২৮ মে রাশিয়া দাবী করেছিল, সিরিয়ার রাক্কা শহরের বাইরে এক কনভয় বিমান হানা ঘটিয়ে মেরে ফেলেছে বিশ্বত্রাস আবু বকর আল-বাগদাদিকে। আমেরিকা কিন্তু সেদিন চুপ ছিল।
আরও পড়ুন: অপারেশন বাগদাদি: বাচ্চাদের কান্না, কুকুরের চিৎকার, তারপরেই বিস্ফোরণ, উড়ে গেলেন আইএস প্রধান
এই সেই জায়গা, এখানেই মাটির নীচে থাকা সুড়ঙ্গে বিস্ফোরণ ঘটান বাগদাদি[/caption]
আচমকাই সুড়ঙ্গের ভেতর থেকে ভেসে এসেছিল একটি বিশাল বিস্ফোরণের শব্দ। সুড়ঙ্গের ভেতর আত্মঘাতী জ্যাকেটের বোতাম টিপে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নিজেকে উড়িয়ে দিয়েছেন আইএস প্রধান আল-বাগদাদি। যেরকম নির্মমভাবে কষ্ট দিয়ে মেরেছিলেন নিরপরাধ কয়েক লক্ষ মানুষকে, সেরকমই নির্মম মৃত্যু যে তাঁর কপালেও লেখা ছিল সম্ভবত সেটা জানতেন ইব্রাহিম আওয়াদ ইব্রাহিম আলী আল-বদরী আল-সামারাই ওরফে আবু বকর আল-বাগদাদি।