গৌতম বসু
‘দেবালয়ের প্রায়ান্ধ প্রহরী,
তোমায় আমি নির্বাচিত দেবতাদের মধ্যে গণ্য করি।’
- অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত
কবে, কোথায় যেন চিত্রী মাক্স লিবারমান-এর একটি উক্তি কুড়িয়ে পেয়ে টুকে রেখেছিলাম; তিনি বলছেন, আমি যখন ফ্রান্স হাল্স-এর কাজ দেখি, প্রবল ইচ্ছা হয় আঁকবার, আর, যখন একটা রেম্ব্রান্ট-এর সামনে এসে দাঁড়াই, সব কিছু ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবি। অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত-র কবিতা, ওই দ্বিতীয় চেহারাটি নিয়ে দীর্ঘকাল আমার জীবনেদাঁড়িয়ে রয়েছে । একটা প্রভেদ নিজের ভিতর গজিয়ে উঠেছে মাঝপথে, সেটাও টের পাই ; ডেকে-ডেকে তাঁর লেখা কাউকে শোনাই না আর, কান-ফাটানো কবিতা বেজে চলেছে, কে শুনবে এই ক’টি লাইন:
‘ এখন আমার হাত ছড়ে গেলে শিশির বেরোয়
আর সেই অবকাশে
দূর দূর থেকে আবালবৃদ্ধ এবং বনিতা
আমাকে দেখতে আসে ।
আর তখনই রক্তগঙ্গা বয়ে যায় যত
অভুক্ত ঘাসে ঘাসে,
আর তক্ষুনি পৌরসংস্থা থেকে দমকল
রক্ত নেভাতে আসে ।’
[‘নিসর্গ আজ মানুষের মতো কাঁদে’ / কাব্যগ্রন্থ: ‘নিরীশ্বর পাখিদের উপাসনালয়ে’/ ২০১৩]
কবিতার হওয়া না-হওয়া, বোধের না হলেও, বুদ্ধির এলাকার বাইরের অবস্তু ব’লে মনে হয়, যার সঙ্গে নিরন্তর প্রয়াসের একটা সম্পর্ক থাকলেও, তোলপাড় ক’রে খুঁজে বেড়ালে যাকে পাওয়া অসম্ভব, বাইরের সমস্ত আয়োজন ও উদ্যোগকে যেখানে মুখ থুবড়ে প’ড়ে থাকতে দেখা যায়। নীরবে উপস্থিত হয় কবিতা, নিজেকে সে প্রত্যাহার ক’রে নেয় নীরবেই, গায়ে চিমটি কেটে নিজেকে যিনি জাগিয়ে রাখলেন, ঘুমে ভারি হয়ে-আসা তাঁর দু’চোখের সম্মুখেই কখনও-কখনও কবিতা আবির্ভূত হয়; এই সুবন্দোবস্তের কোনও বিকল্প নেই।

দোতলা বাসের প্রথম সারিতে খোলা জানালার সামনে, পা ছড়িয়ে ব’সে তাঁর কবিতার লাইন উচ্চস্বরে আওড়াতাম আমরা যখন, আমাদের তরুণ বয়সে ─ ‘হাওয়ার ভিতরে কার ক্ষমা ঐ কাজ ক’রে যায়’ ─ তখন, সে-উচ্ছ্বাসে, এক বিস্ময়বালকের রকমসকম বুঝে না-উঠতে পারার বাতাবরণ ছড়িয়ে থাকত। তাঁর কবিতার পাঠক হিসেবে আমি একলা হয়ে গেলাম এর পরে, যখন মধ্যবয়সী অলোকরঞ্জন-এর কবিতার প্রতি সেই টান আমার চারপাশ থেকে হঠাৎ যেন অদৃশ্য হয়ে গেল । গগনবিহারী কবির কঠিন মাটিতে নেমে-আসা কি সহজ ভাবে মেনে নিতে পেরেছিলেন বাঙলা কবিতার সেদিনের পাঠক ?
‘ আর আমার কোনও নিসর্গ নেই, মানুষজন যখন ঘুমিয়ে পড়ে
আপাতমৃত লোকালয়ের মধ্য দিয়ে যেতে-যেতে অনুভব করি অনন্ত নিসর্গের আস্বাদ
যেন দেবদারুর দূতীরা ঢেলে দেয় আমার মুখে অমৃত আঃ
আমার ঘুম পায় আর দুদিকে খাটিয়া পেতে ঘুমিয়ে থাকে কাতারে-
কাতারে নরনারী তাদের মাঝখান দিয়ে হেঁটে যাবার পথটাই আজ
আমার নিসর্গ ’
[কাব্যগ্রন্থ: ‘জবাবদিহির টিলা’ / বিভাব কবিতা / ১৯৮২]
আমার মনে হয়েছে, আমাদের মনোযোগ এখনও জড়িয়ে রয়েছে তাঁর অলৌকিক বাচনভঙ্গিমায় ও শৈলীপ্রয়োগে, এমন কি উপরের উদ্ধৃতিতে ‘কাতারে-কাতারে’–কে নির্ভয়ে দু’টুকরো ক’রে ফেলার মধ্যেও; তাঁর ভিতরের অবিরল ক্ষরণ পর্যন্ত আমরা পৌঁছতে পারি নি । বস্তুত,এটি পুরানো পরিচয় হারিয়ে নতুন পরিচয় তুলে নেওয়ার কোনও চমকপ্রদ রূপান্তর নয়, তাঁর শোকাহত কৌতুকপ্রিয়তায় এক চুল ফাটলও কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না । রাজা ও ডোম অভিন্ন :
‘একদিন রাজা হরিশ্চন্দ্রকেই
কিনে নিল এক ডোম,
নিজেকে খোয়ানো কাকে বলে তার ছবি
দেখেছি সেই প্রথম ।
সেই থেকে আমি হরিশ্চন্দ্র ঘাটে
ব’সে আছি দিনরাত
সেই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি যদি
ঘটে যায় নির্ঘাত ।
...’
[‘রাজর্ষির ছায়া’ (অংশ) কাব্যগ্রন্থ: ‘ওষ্ঠে ভাসে প্রহৃত চুম্বন’ / ২০০৬]
একটা পরিচয়ের মধ্যে কবি তাঁর অন্য পরিচয়টি যদি হারিয়ে ফেলে আসতে পারেন, তবে অন্তর্জীবন ও বহির্বিশ্বের মধ্যবর্তী ব্যবধানও তখনই ভেঙে পড়ে। এই বিরল ক্ষমতার কিছু পূর্বাভাস বিস্ময়বালকের রচনায় পাওয়া গেলেও, প্রস্ফুটিত রূপটি আমরা পাই তাঁর মধ্যবয়সের লেখায়, আবার তাঁর সেই কৌতুকময় পরিবেশনের আড়ালে; তিনি লিখছেন:
‘ মাকে বললাম তুমি রাতারাতি সমস্ত অভ্যাস
বদলিয়ে ফেলো, চশমাটা কেন যেখানে-সেখানে রাখো,
অত অর্চনা করতে যেয়ো না কাক ডাকবারও আগে,
গেলে অন্তত মোজা প’রে যেয়ো, হাতে রেখো দস্তানা,
শেফালির মুখে বারুদ এখন, মৃত্যু দূর্বাঘাসে ।
[‘যুদ্ধ বিষয়ে কয়েকটি ভগ্নাংশ: ৬ ’/ কাব্যগ্রন্থ: ‘আয়না যখন নিশ্বাস নেয়’ / ১৯৯১]
বাংলা লিরিকের ভিতরে ও বাহিরে একাধিক নতুন চিন্তাসূত্রের প্রবর্তন আমরা দেখি যেখানে তাঁর নামটিই খোয়া গেছে, তিনি রয়ে গেছেন সূক্ষ্মশরীরে। সংক্ষিপ্ত পরিসরে এ-আলোচনায় প্রবেশ ক’রা অসমীচীন হবে, আমরা কেবল দু’টি প্রথার উল্লেখ এখানে করছি; প্রথমত, একই পাঠ্যবস্তুতে দু’রকম ‘টাইপ’ ─ ‘স্মল পাইকা’ এবং ‘বর্জাইস’ ─ সমান্তরাল ভাবে ব্যবহার ক’রে, (আজকের পরিভাষায় যথাক্রমে যা, ১২ নম্বর ও ১০ নম্বর ফন্টের সমতুল্য), তিনি আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন; দ্বিতীয়ত, আজকের তরুণ কবিরা প্রায় ব্যতিক্রমহীন ভাবে তাঁদের কবিতার বই একটি ‘বিভাব’ কবিতা দিয়ে শুরু করেন, এ-তথ্য না জেনেই যে, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, ধারাবাহিক ও আত্মবিশ্বাসী প্রয়োগের দ্বারা বাঙলা কবিতায় এটি প্রতিষ্ঠা করেছেন।
এই লেখাটি মাক্স লিবারমান-এর একটি খেদোক্তি স্মরণ ক’রে শুরু করেছিলাম । তাঁর দুঃখের মূল কোথায় আমি জানি না, অনুমান করতে পারি মাত্র। আমি এইটুকু বুঝি যে, সহজ ভাবে যা লেখনীতে আসে নি, তা প্রকৃত অর্থে আসেই নি, তার একটা বিকৃত ছায়াপাত দেখা গেছে মাত্র । যিনি পারেন, তিনি অক্লেশে এবং বারংবার পারেন, যিনি পারেন না, তাঁর হয়তো চেষ্টার কোনও ত্রুটি নেই, কিন্তু কলমখানা তাঁর বারেবারে ভেঙে যায় । দু’টি ছোট দৃষ্টান্ত বাঙলা কবিতার তরুণতম পাঠকদের জন্য তুলে ধরছি :
‘এই চিন্তা
শেকভের সমাধির মতো
ছোটো
তুলসীতলার চেয়ে
ক্ষুদ্রতর
জননী মেরীর গর্ভগৃহের চেয়েও
ক্ষুদ্র
গৃহগর্ভের চেয়েও
‘চৈতন্যচরিতামৃত’ রচয়িতা যেইখানে রেখেছেন দেহ
আর তার মরবার পরিসর এতই ছোটো যে
যেন তিনি কখনো কিছুই
লেখেননি
লিখলেও
এতই ছোটো যে
তার মতো বৃহৎ কিছুই নেই ’
[‘ শেকভের সমাধির মতো ’/ কাব্যগ্রন্থ: ‘ঝরছে কথা আতসকাঁচে’ / ১৯৮৫]
এবং
‘ততোক্ষণ মাথা ঝুঁকে প’ড়ে থাকো ব্রিটিশ মিউজিয়ামে ─
যদি বই পাওয়া যায়, আর যদি না-ও পাওয়া যায়
চেয়ে দ্যাখো কার্ল মার্ক্স পড়তেন কোন্ প্রান্তে ব’সে,
ইউনেস্কোর উচিত ঐ জায়গাটাকে তীর্থ ব’লে প্রতিপন্ন করা ।
কোনো বই পাওয়া যায়নি ? এসে যায় না, এই চেয়ে দ্যাখো
শুধুই আজকের জন্য প্রদর্শিত হয়েছে এখানে
কীট্সের হাতে লেখা চিঠি :
‘পিসা থেকে এক ভদ্রলোক,শেলি, চিঠি লিখেছেন
ওঁর কাছে যেতে । ‘’
অন্তত এ চিঠিখানি সংরক্ষিত আছে সভ্যতায়
এসো, এই কথা ভেবে আত্মহত্যা মুলতুবি রাখি ।
[‘ চেয়ে দ্যাখো’/ কাব্যগ্রন্থ: ‘ঝরছে কথা আতসকাঁচে’ / ১৯৮৫]
চিত্রঋণ : এলিজাবেথ গ্যুন্টার, ছন্দা বসু