
শেষ আপডেট: 17 March 2024 16:47
অমল সরকার
‘যায় যদি যাক প্রাণ, হীরকের রাজা ভগবান।’
প্রধানমন্ত্রীর মুখে ‘মোদী কী গ্যারান্টি’, ‘মোদী কী গ্যারান্টি’ শুনতে শুনতে ‘হীরক রাজার দেশে’র এই জনপ্রিয় লাইনটি মনে পড়ে যাচ্ছে। ‘অচ্ছে’ কিংবা ‘বুড়ে’ দেশের পরিস্থিতি যাই হোক, মোদীর গ্যারান্টিই যেন ভরসা। ফারাক শুধু, তিনি নিজেই হীরকের রাজার মতো ঢাক পিটিয়ে চলেছেন। বাজনদারেরা তো আছেই। তবে সবচেয়ে মজার হল, সিনেমার ডায়লগ দেওয়ার ভঙ্গিমায় স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বলছেন, ‘ইয়ে মোদী কী গ্যারান্টি হ্যায়।’
কোনও সন্দেহ নেই, ২০২৪-এর নির্বাচনী যুদ্ধে এ যাবত ‘গ্যারান্টি’ শব্দটিই সুপারহিট। সেটা প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর বাজনদারদের কৃতিত্ব। মোদী তাঁর বিরোধীদের বাধ্য করেছেন গ্যারান্টির গ্যাঁড়াকলে ঢুকে পড়তে। তৃণমূলের ব্রিগেডের সভায় ‘দিদির গ্যারান্টি’র কথা শোনা গিয়েছে। বাদ নেই কংগ্রেস, আম আদমি পার্টি, বিজু জনতা দল, ওয়াইএসআর কংগ্রেস, ডিএমকের মতো এবারের ভোটের বাকি বড় প্লেয়ারেরা। কিন্তু বিজেপির মতো ওই সব দল কোনও নেতার নাম করে গ্যারান্টি দিচ্ছে না। দিচ্ছে দল ও সরকারের নামে। অন্যদিকে, বিজেপি দলগতভাবেই মোদীর গ্যারান্টির কথা বলছে। পাল্টা কংগ্রেস বলছে, মোদীর ওয়ার্যান্টি শেষ হয়ে গিয়েছে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে ডিকশন্যারি খুলে ‘গ্যারান্টি’ আর ‘ওয়ার্যান্টি’র ফারাক ঝালিয়ে নিতে হচ্ছে। অক্সফোর্ড ডিকশন্যারি অনুযায়ী গ্যারান্টি হল, ‘একটি আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি।’ অন্যদিকে, ওয়ার্যান্টি হল একটি লিখিত ঘোষণা যাতে কোনও পণ্য বা পরিষেবা নিয়ে সমস্যা হলে সেটি মেরামত বা প্রতিস্থাপনের প্রতিশ্রুতি দেয়। একথায়, গ্যারান্টির কোনও গ্যারান্টি নেই। মোদীর গ্যারান্টির ক্ষেত্রে তা কত বড় সত্যি, কালো টাকা উদ্ধার করে বিলি, বেকারদের চাকরি, কৃষকের আয় দ্বিগুণ করা ইত্যাদি নানাবিধ প্রতিশ্রুতি ভঙ্গেই স্পষ্ট।
মোদী-শাহদের বিজেপি আর বাজপেয়ী-আদবাণীদের দল নেই, এটা নতুন কথা নয়। তবু এতদিন নয় নয় করেও যে মৌলিক ফারাকটুকু অবশিষ্ট ছিল, সেটাও এখন উধাও। ‘পার্টি উইথ এ ডিফারেন্স’—খুব বড় মুখ করে বলতেন অটল বিহারী বাজপেয়ী, লালকৃষ্ণ আদবাণীরা। রাজনীতির ধারাবাহিক পর্যবেক্ষকেরা নিশ্চয়ই মানবেন, বাজপেয়ী, আদবাণীদের সময়ে দলের এই স্লোগান বড় কোনও প্রশ্ন চিহ্নের মুখে পড়েনি। সেই দলে এখন ‘মোদী মানে বিজেপি, বিজেপি মানে মোদী’।
সাতের দশকে অসমের কংগ্রেস নেতা দেবকান্ত বড়ুয়া ‘ইন্দিরা ইজ ইন্ডিয়া, ইন্ডিয়া ইজ ইন্দিরা’ স্লোগান দিয়েছিলেন। তার একটা প্রেক্ষাপট ছিল। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানকে পর্যুদস্ত করা এবং কয়লা খনি, ব্যাঙ্ক ইত্যাদির জাতীয়করণের পর গোটা দেশেই তখন ইন্দিরা ভজনায় মেতেছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরার মুখে কখনও ‘ইয়ে ইন্দিরা কী গ্যারান্টি হ্যায়’ জাতীয় কথা শোনা যায়নি। সামগ্রিক রাজনীতিতেই ‘আমি’, ‘আমার’ শব্দের ব্যবহার তুলনায় কম ছিল।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভূমিকাকে স্মরণে রেখে নেহরু কন্যাকে ‘এশিয়ার মুক্তিসূর্য’ বলা শুরু হয়েছিল। কলকাতায় আকাশবাণী’র সংবাদ বিভাগে একজন প্রডিউসারের কাজ ছিল প্রতিদিন ইন্দিরাকে মহিমান্বিত করে প্রতিবেদন লেখা। গলা কাঁপিয়ে, আবেগ মিশ্রিত কণ্ঠে সেই লেখা পাঠ করে প্রশংসা কুড়োতেন সংবাদপাঠকেরা। শুনে মনে হতো মা দুর্গার মতো ইন্দিরারও দশটি হাত আছে এবং মাটির প্রতিমাকে পুজো দেওয়ার থেকে ওই মহিলাকে একবার দর্শন করা গেলেই জীবনের সব দুঃখকষ্ট থেকে মুক্তি মিলবে। কিন্তু ইন্দিরা নিজে কখনও নরেন্দ্র মোদীর মতো করে নিজের ঢাক পেটাননি।
বরং ’৭১-এর যুদ্ধে আমেরিকার ভারত বিরোধিতা, অসহযোগিতা সত্ত্বেও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ইন্দিরা যেভাবে বিশ্ব জনমত গড়ে তুলেছিলেন কূটনীতিতে তার নজির বিরল। একদিকে ইসলামাবাদকে যুদ্ধে জবাব দিয়ে বাংলাদেশের মুক্তি ত্বরান্বিত করেছিলেন, আর একদিকে, করাচির জেলে আটক মুজিবুর রহমানের প্রাণ রক্ষা করেছিলেন তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্র বানচাল করে দিয়ে। সেই সাফল্য এসেছিল বিশ্ব নেতাদের পাশে নিয়ে পাক নেতাদের উপর চাপ সৃষ্টির ফলে। ইন্দিরার এই কৃতিত্ব, অবদান তুলনায় অনালোচিত থেকে গিয়েছে।
অথচ, তেমন কোনও কৃতিত্ব ছাড়াই, মোদীকে বিজেপি ‘বিশ্বগুরু’, ‘বিশ্বের এক নম্বর নেতা’ বলে বেড়াচ্ছে। ব্যাপারটা অনেকটা চিৎপুরের যাত্রা পাড়ায় প্রধান অভিনেতা-অভিনেত্রী’দের নামের ডগায় ‘নট সূর্য’, ‘নট সম্রাজ্ঞী’ জাতীয় শব্দ জুড়ে দেওয়ার মতো ছেলেমানুষি।
মোদীর ভাষণে বহুদিন ধরেই স্টিরিওটাইপ। প্রথমে গান্ধী পরিবার, তারপর কংগ্রেস, তারপর বাকি দলগুলির পরিবারবাদ এবং বিরোধীদের দুর্নীতিগ্রস্থ বলে আক্রমণ আর সবশেষে এই করেছি, তাই করেছি বলে ঢাক পেটানো—এই স্ক্রিপ্টের বাইরে নতুন কিছু থাকে না। ভোটের মুখে যোগ করেছেন ‘মোদী কী গ্যারান্টি’। তাই হালের ভাষণগুলির উপযুক্ত শিরোনাম হতে পারে, ‘পরিবারবাদ বনাম মোদী কী গ্যারান্টি’।
গত বছর স্বাধীনতা দিবসে লালকেল্লা থেকে ভাষণে প্রধানমন্ত্রী পরিবারবাদকে দেশের গুরুতর বিপদ বলে উল্লেখ করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য মিথ্যে নয়। নেতা-নেত্রীরা কেউ সন্তান তো কেউ ভাই-বোন-ভাইপো-ভাইজি-কে দলীয় এবং সরকারি পদে বসিয়ে দিচ্ছেন। মোদী জানেন, এই ব্যাপারে তাঁকে আক্রমণ করার উপায় নেই। কারণ সরকারিভাবে বিবাহিত হলেও তিনি সংসারী নন। লালুপ্রসাদ তাই মোদীর উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন, ‘আপনি নিঃসন্তান তো আমরা কী করব! আপনি বেছে বেছে সন্তানধারী রাজনীতিকদের নিশানা করেছেন।’ বিহারের নেতাকে জবাব দিতে বিজেপি ‘মোদী পরিবার’ শব্দবন্ধ আমদানি করেছে।
বাংলার প্রাক্তন প্রয়াত মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর পুত্র চন্দনের সঙ্গে সিপিএমের বিন্দুমাত্র সম্পর্ক ছিল না। বাবার পার্টির পুরো নামটাও জানতেন কিনা সন্দেহ। তাতে কী! বিরোধীরা অভিযোগ করত, জ্যোতিবাবুর জন্যই চন্দন শিল্পপতি হতে পেরেছেন। অভিযোগের সত্য-মিথ্যা আলোচনায় না গিয়ে বলি, জ্যোতিবাবু অভিযোগটি মানতেন না তাই-ই শুধু নয়, তিনি দল ও সরকারের নিঃসন্তান নেতাদের কাছে অনেকবার আক্ষেপ করেছেন—ছেলেমেয়ে নেই, আপনারা তাই বেঁচে গিয়েছেন। গালমন্দ, দুর্নীতির অভিযোগ শুনতে হয় না।
শনিবার ভোট ঘোষণার প্রাক্কালে প্রধানমন্ত্রী গোটা দেশবাসীকেই তাঁর পরিবার বলে সম্মোধন করে খোলা চিঠি লিখে নাটকীয় পদক্ষেপ করেছেন। অন্যদিকে, বিজেপি যেভাবে মোদী ভজনায় মেতেছে, তাতে রাজনীতিতে স্ত্রী-সঙ্গ বর্জনকারী, নিঃসন্তান নেতাদের অগ্রাধিকার পাওয়ার অলিখিত নিয়ম চালু হওয়ার আশঙ্কা অমুলক বলা যাবে না।
ইন্দিরার পর মোদীর জমানাকেও ‘নির্বাচিত স্বৈরতন্ত্র’ বলা হচ্ছে। কিম জং উন উত্তর কোরিয়াকে বাস্তবে ‘হীরক রাজার দেশ’ করে নিয়েছেন। মোদী ভারতকে উত্তর কোরিয়া করে তুলেছেন, এমন কথা বলার অবস্থা আসেনি। কিন্তু নিজেকে ক্রমশ হীরক রাজা এবং দেশকে অলিখিত রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দিকে ঠেলে দিচ্ছেন তাতে কোনও সন্দেহ নেই। পরিবারবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ব্যক্তিতন্ত্র কায়েমের এমন নজির দ্বিতীয়টি নেই।
গত সপ্তাহে লিখেছিলাম, মোদীর গ্যারান্টি অনেকটা চিনা পণ্যের মতো। ভারতে সে দেশের যে পণ্যগুলি পাওয়া যায় সেগুলির কার্যকারিতার মেয়াদ নিয়ে ঘোরতর সংশয় আছে। এই সচল তো এই অচল। তাৎপর্যপূর্ণ তারপরও সেগুলির বিক্রিতে ভাটা পড়ে না। ২০১৪ থেকে নরেন্দ্র মোদী এ যাবত যত প্রতিশ্রুতি, থুড়ি গ্যারান্টি দিয়েছেন, তার অনেকগুলিই হাওয়া ভর্তি বেলুনের মতো। তবু ভোটের বাজারে মোদীর প্রতিশ্রুতির বেলুনের চাহিদা কমেনি তাঁর জাদুকরি ক্ষমতার জন্য। দুর্ভাগ্য হল নীতি-আদর্শহীন রাজনীতিতে মজে থাকা ভোটারদের মধ্যে এখন জাদুকরি ক্ষমতারই জয়-জয়াকার। বিরোধী শিবিরে মোদীকে টেক্কা দেওয়ার মতো জাদুকর নেই।
‘অনাহারে নাহি খেদ বেশি খেলে বাড়ে মেদ,
ভরপেট নাও খাই, রাজকর দেওয়া চাই
লেখাপড়া করে যেই অনাহারে মরে সেই
জানার কোন শেষ নাই, জানার চেষ্টা বৃথা তাই
বিদ্যালাভে লোকসান- নাই অর্থ, নাই মান
হীরক রাজা বুদ্ধিমান করো সবে তার জয়গান’
হীরক রাজার দেশের সব রূপকই আজ ঘোর বাস্তব মোদীর ভারতে।