
পুত্র চিরাগ কি পারবেন রামবিলাসের হাজিপুর ধরে রাখতে
শেষ আপডেট: 19 May 2024 18:10
দ্য ওয়াল ব্যুরো: সোমবার পঞ্চম দফায় বিহারে যে আসনগুলিতে ভোট হচ্ছে তার মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় হল হাজিপুর। ১৯৭৭ সালের পর থেকে এই প্রথম সেখানে লড়াইয়ে নেই রামবিলাস পাসোয়ান। ২০২০-র অগস্টে প্রয়াত হয়েছেন তিনি। মৃত্যুকালে ছিলেন নরেন্দ্র মোদী সরকারের ক্রেতা সুরক্ষা এবং সরবরাহ মন্ত্রকের দায়িত্বে।
পাটনার অদূরে গঙ্গার পাড়ে অবস্থিত হাজিপুরের সঙ্গে রামবিলাসের নাম আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে। সাতবার জিতেছেন, হেরেছেন দু’বার। তারমধ্যে একবার লাখ ছয়েকের ব্যবধানে জিতে বিশ্ব রেকর্ড করেন। আরও এক বিরল রেকর্ড হল, বিশ্বনাথপ্রতাপ সিং, এইচডি দেবগৌড়া, আইকে গুজরাল, অটল বিহারী বাজপেয়ী, মনমোহন সিং এবং নরেন্দ্র মোদী—ছয় প্রধানমন্ত্রীর মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন এই হরিজন নেতা। রেলমন্ত্রী থাকাকালে বিহারের রেলের মানচিত্র বদলে দিয়েছিলেন।
রামবিলাসের ছেলে ৪২ বছর বয়সি চিরাগের নির্বাচনী রাজনীতিতে হাতেখড়ি বাবার কাছে। বিদেশে পড়াশুনো করে আসা চিরাগ রামবিলাসের ইচ্ছায় ২০১৯-এর ভোট জামুই কেন্দ্র থেকে সংসদে যান। পুত্রের মতোই ভাই পশুপতি পারসের প্রতিও রামবিলাসের ভালবাসা ছিল অতুলনীয়। ছেলের প্রত্যাশার কথা বিবেচনায় রেখেই ভাইকেও দলে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দিয়েছিলেন।
কিন্তু জীবিতাবস্থাতেই দেখে যান কাকা-ভাইপোর ক্ষমতার লড়াই কেমন তীব্র আকার নিচ্ছে। রামবিলাসের মৃত্যুর পর কালক্ষেপ না করে নিজেকে পার্টি এবং দলের সংসদীয় নেতা ঘোষণা করে বসেন পশুপতি। নরেন্দ্র মোদী তাঁকে রামবিলাসের শূন্যস্থানে মন্ত্রী করে নেন।
কিন্তু হাল ছাড়েননি চিরাগ। লোক জনশক্তি পার্টি (রামবিলাস) নামে নতুন দল গড়েন। ঘটনাচক্রে বিজেপি এবার বিহারে লোক জনশক্তি পার্টির জন্য বরাদ্দ পাঁচটি আসনই চিরাগের গোষ্ঠীকে দিয়েছে। পশুপতি একটি আসনও পাননি। তবু মুখ বুজে এনডিএ-তেই আছেন তিনি। তিনদিন আগে বারাণসীতে নরেন্দ্র মোদীর মনোনয়ন পেশের অনুষ্ঠানে চিরাগের পাশাপাশি পশুপতিও হাজির ছিলেন। এমনকী বিজেপির হয়ে প্রচারও করছেন।
অন্যদিকে, পাঁচটি আসনে দলকে জেতানোর দায় চেপেছে চিরাগের উপর। এই প্রথম বাবা রামবিলাসের পরামর্শ ছাড়া ভোটের ময়দানে অবতীর্ণ হয়েছেন। নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে আরও কঠিন করে তুলেছেন হাজিপুর থেকে প্রার্থী হয়ে। হাজিপুরের রামবিলাসের জনপ্রিয়তা সম্পর্কে একটা সময় বলা হত, ‘উপর মে আসমান, নিচে পাসোয়ান।’ বিহারি রাজনীতির অনেক রথী-মহারথী হাজিপুরে তাঁর কাছে মাথা নোয়াতে বাধ্য হয়েছে।
বাবার স্মৃতি বিজড়িত হাজিপুর ধরে রাখা কিন্তু চিরাগের জন্য মোটেই সহজ নয়। বিজেপির হিন্দুত্বের হাওয়া জাতপাতের অঙ্কে ওলটপালট হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছে না ওয়াকিবহাল মহল। লক্ষণীয় হল, এই কঠিন বাস্তবতার মুখে প্রয়াত পিতার তুলনায় নরেন্দ্র মোদীকে অনেক বেশি করে স্মরণ করছেন চিরাগ। এমনিতেই নিজেকে ‘মোদীর রামভক্ত হনুমান’ বলে থাকেন রামবিলাস পুত্র। হাজিপুর ধরে রাখতে রামবিলাস পুত্র পুরোপুরি বিজেপির উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন।
হাজিপুরে চিরাগের প্রধান প্রতিপক্ষ আরজেডির শিবচন্দ্র রাম। তিনি কুশওয়া সম্প্রদায়ের মানুষ। দুসাদ এবং কুশওয়া সম্প্রদায়ের মানুষ বহিরাগত বলে চিরাগকে বয়কটের ডাক দিয়েছে। সেই সঙ্গে কাকা পারশনাথের বিরোধিতা তো আছেই। যদিও বিজেপি নেতৃত্বের মধ্যস্থতায় কাকার সঙ্গে মৌখিক বোঝাপড়া হয়েছে ভাইপোর। কিন্তু এলাকাবাসীর কথায়, পুত্র চিরাগ নন, ভাই পশুপতিই হাজিপুরের যোগ্য দাবিদার। হাজিপুরের মানুষ রামবিলাসের পাশে চিরাগ নয়, পশুপতিকে দেখেছে। লোক জনশক্তির অন্দরে চিরাগকে নিয়ে ‘বহিরাগত’ ইস্যু খুঁচিয়ে তুলেছেন আরজেডি সুপ্রিমো লালুপ্রসাদের পুত্র তেজস্বী। তিনি ও তাঁর মা রাবড়িদেবী একটা সময় হাজিপুরের অন্তর্গত রাঘোপুর এবং মউয়ের বিধায়ক ছিলেন। ফলে হাজিপুরের ভোট সমীকরণ অজানা নয় তেজস্বীর।
চিরাগের জন্য হাজিপুরে জয় তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। রামবিলাসের কেন্দ্র ধরে রাখতে না পারলে দলে তো বটেই বিজেপির এনডিএ জোটেও গুরুত্ব হারাবেন তিনি। বিজেপি তখন সমর্থনের হাত বাড়িয়ে দিতে পারে রামবিলাসের ভাইয়ের দিকে। বস্তুত সেই অঙ্ক এবং আশাতেই একটি আসনও না পেয়েও এনডিএ-তে আপাতত রয়ে গিয়েছেন পশুপতি পারস।