
রাজমাতা অমৃতা রায় - ফাইল চিত্র
শেষ আপডেট: 29 April 2024 16:51
মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র নদিয়ার রাজ সিংহাসনে বসেছিলেন অষ্টাদশ শতকের গোড়ায়। তাঁর জীবদ্দশাতেই রাজস্ব বাকি পড়ায় জমিদারি নিলাম হতে শুরু করেছিল। রাজ পরিবার জৌলুস হারিয়ে ফেলে স্বাধীনতার অনেক আগেই। এহেন রাজপরিবারের বউ অমৃতা রায়কে বিজেপি এবার কৃষ্ণনগরে লোকসভা আসনে প্রার্থী করেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আবার তাঁকে বুধবার ফোন করেছেন। তার পর থেকে তাঁকে রাজমাতা আখ্যা দিয়ে লেখালেখি ও প্রচার হচ্ছে বিস্তর।
মুর্শিদাবাদের নবাব সিরাজদৌল্লার সঙ্গে কৃষ্ণচন্দ্র বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন বলে এমনিতেই একটা বিতর্ক তৈরির চেষ্টা চলছে। তারই মধ্যে কেউ কেউ আবার মৌলিক প্রশ্ন তুলেছেন, অমৃতা রায়কে রাজমাতা বলা হবে কেন? তাঁর স্বামী তথা রাজা তো জীবিত। তিনি রানি হতে পারেন, রাজামাতা বলা কি ঠিক হবে?
বৃহস্পতিবার সকালে স্নানটান সেরে রানিমা সবে বাড়ি থেকে বেরোচ্ছেন। গাড়িতে উঠতে যাবেন, এমন সময়ে দ্য ওয়ালের ফোন পেয়ে বলেন, "আমি অমৃতা। একজন মানুষ হিসেবেই মানুষের ভিড়ে, তাঁদের সুখে-দুঃখে মিশে থাকতে চাইছি। তবে এখানকার মানুষ অনেকে আমাকে রানিমা হিসেবে চেনে। ভালবাসে।" রাজমাতা ও রানিমার সংজ্ঞা নিয়ে একাংশের তাত্ত্বিক কৌতূহলের ব্যাপারে অমৃতা হেসে বলেন, “রাজা থাকতেও কেন আমাকে কেউ কেউ রাজমাতা বলছেন, তা তো ভেবে দেখিনি”।
রানিমার প্রচারে তাড়া রয়েছে। রাজমাতা ও রানিমা—বিতর্কের মধ্যে ঢোকার তাঁর খুব একটা ইচ্ছাও নেই। তবে প্রশ্ন যখন একবার উঠেছে, তখন কৌতূহল নিরসনও জরুরি।
ইতিহাস ও পুরাণের বিশেষজ্ঞ ডঃ নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি সেই উত্তরটাই স্পষ্ট করলেন। তাঁর কথায়, "রাজবধূ তো প্রজাদের কাছে বরাবরই রানিমা অর্থাৎ রাজমাতা। প্রজা মানেই সন্তান। রানি তাঁদের কাছে মা। তাই রাজা বেঁচে থাকা না থাকার সঙ্গে এই সম্পর্কের কোনও যোগ নেই”। নৃসিংহপ্রসাদের কথায়, “রাজ পরিবারের যে কোনও বধূই প্রজাদের কাছে মা। রাজমাতাই তাঁর একমাত্র পরিচিতি। সব সন্তানের কাছে তাঁদের মা তো মাই। ভারতের ইতিহাস ও পুরাণ এভাবেই দেখে রাজ পরিবারের কোনও বধূকে”।
হুগলির চন্দননগরের মেয়ে অমৃতা রায়ের লেখাপড়া কলকাতায়। দাদু, বাবা সকলেই ছিলেন বিচারপতি। কর্মসূত্রে কলকাতার বালিগঞ্জে চলে এসেছিলেন তাঁরা। তাঁর বাবা কিশোর মুখোপাধ্যায় ছিলেন খুবই নামী বিচারপতি। অমৃতার দাবি, সংবিধান লেখার সময় পরামর্শ নেওয়া হয়েছিল তাঁর দাদু সুধাংশুশেখর মুখোপাধ্যায়ের।
ছোট থেকে ফ্যাশন সচেতন অমৃতা রায় তাঁর বরাবরের অ্যাম্বিশন ছিল পোশাক তৈরি করে খ্যাতি অর্জন করতে। প্রথাগত শিক্ষা ছাড়াই এ পথে সাফল্যও পেয়েছেন। অমৃতা’জ ড্রেসে নিজেদের সাজিয়ে তৃপ্ত হয়েছেন, এমন অনুরাগীর সংখ্যা নেহাত কম নয়। নানাসময়ে ডেকর কনসালট্যান্টও ছিলেন তিনি।
অমৃতার আরেকটি শখ রান্না করা। স্বামীর চাকরি সূত্রে দীর্ঘদিন বিদেশে ছিলেন। দেশ-বিদেশের রান্না নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা চালাতেন হামেশাই। বিদেশি মশলার মিশেলে দেশি রান্নার স্বাদে বাড়তি মাত্রা যোগ করা তাঁর প্রিয় একটি বিষয়। আবার উল্টোটাতেও সমান পটু। নিজস্ব সেই ভালবাসার জগত থেকেই এবার রাজনীতির দুনিয়ায় আসা। তাঁর কথায়, "মানুষকেও খুব ভালবাসি। তাঁদের সঙ্গে মিশে থাকতে চাই। তাঁদের জন্য কিছু করতে চাই। সবার আশীর্বাদ পেলে সেই কাজটাই সহজ হবে আরও। রাজমাতা নাকি রানিমা তাতে কি যায় আসে। আমার বড় পরিচয় হল, আমি এখন নরেন্দ্র মোদীর পরিবার।"
এতদিন কৃষ্ণনগরের মানুষ অমৃতার সাহচর্য পেতেন রাজবাড়ির উৎসব প্রাঙ্গণে। বিজয়ার সিঁদূর খেলায়, হোলির আবিরে। মর্যাদায়-সম্ভ্রমে সমৃদ্ধ রানিমার সেই সাহচর্য অলীক অনুভূতি এনে দিত অনেককেই। রাজপ্রাসাদের সেই আভিজাত্যের দূরত্ব ঘুচিয়ে এবার জনপথে রানিমা। বলা ভাল, রাজনীতিতে রাজমাতা।