
জ্যোতি বসু, তাপস রায় । ফাইল চিত্র
শেষ আপডেট: 30 March 2024 22:48
দ্য ওয়াল ব্যুরো: উত্তর চব্বিশ পরগনার দুই মন্ত্রী চেয়েছিলেন, বরাহনগর উপ নির্বাচনে জেলার থেকেই কাউকে প্রার্থী করা হোক। সূত্রের দাবি, ওই দুই মন্ত্রী তথা পার্থ ভৌমিক ও সুজিত বসু বরাহনগর পুরসভার বর্তমান ভাইস চেয়ারম্যানের নাম প্রস্তাব করেছিলেন। কিন্তু শেষমেশ বরাহনগর বিধানসভার উপ নির্বাচনে অভিনেত্রী সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায়কে প্রার্থী করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায়কে অবশ্য এখন শুধু অভিনেত্রী বললে ভুলই হবে। কারণ, ২০২১ সাল থেকে তৃণমূলের রাজ্য সম্পাদক তিনি। রাজনৈতিক ভাবেও কমবেশি সক্রিয় ছিলেন। কিন্তু এহেন সায়ন্তিকা প্রার্থী হওয়ার পর দলের মধ্যে থেকেই একাংশ সন্দিহান সায়ন্তিকা জিততে পারবেন তো?
বরাহনগরে টানা তিন বারের বিধায়ক ছিলেন তাপস রায়। উত্তর কলকাতার এই দাপুটে নেতা ছিলেন স্বাধীনোত্তর সময়ে বরাহনগরের প্রথম কোনও অ-বাম বিধায়ক। এদিন সায়ন্তিকার নাম ঘোষণার পর তাপস রায় বলেন, “বরাহনগরের মানুষ খুবই রাজনীতি সচেতন। এই আসনে টানা চোদ্দবার জিতেছিলেন বামেরা। তার পর তিন বার আমি জিতেছি।” তাপস রায়ের কথায়, “আশা করেছিলাম কোনও রাজনৈতিক ব্যক্তিকে প্রার্থী করবে তৃণমূল। আমার আশা অবশ্য এখানে অপ্রাসঙ্গিক এবং এখন কোনও মূল্য নেই। এটুকু বলতে পারি বরাহনগরবাসী তৃণমূলের এইরকম অরাজনৈতিক প্রার্থী দেখে হতাশ হবেন।”
স্বাধীনতার পর প্রথম নির্বাচন থেকে টানা ৬ বার বরাহনগর বিধানসভায় জিতেছিলেন জ্যোতি বসু। প্রথমে অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী হিসাবে, পরে সিপিএম প্রার্থী হিসাবে। পরে বামফ্রন্টের শরিক দলগুলিকে ওই আসন ছেড়ে দিয়েছিল সিপিএম। ৭২ সালের নির্বাচনে বরানগর আসনে জিতেছিলেন সিপিআইয়ের শিবপদ ভট্টাচার্য। তার পর ৭৭ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত একটানা ৩৪ বছর এই আসন ছিল আরএসপি-র দখলে।
বরানগরের বিধায়ক পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে তাপস রায় বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন। উত্তর কলকাতা লোকসভা আসনে বিজেপির প্রার্থী তিনি। তাঁর সঙ্গে আলোচনা করেই বরাহনগরে সজল ঘোষকে প্রার্থী করেছেন শুভেন্দু অধিকারীরা। ফলে সংশয় নেই তাপসবাবু এখন সজলকে জেতানোর চেষ্টা করবেন বরাহনগরে।
কিন্তু পর্যবেক্ষকদের মতে, তার মানে এই নয় এখন থেকেই বলে দেওয়া যাবে যে অ্যাডভান্টেজ সজল ঘোষ। কারণ, বরাহনগরে তাপস রায় তথা তৃণমূল ২০১১ সালে জিতেছিল ৩৬ হাজার ভোটের ব্যবধানে। সেবার বাম প্রার্থী সুকুমার ঘোষ পেয়েছিলেন ৫৩ হাজার ভোট। ২০১৬ সালে বাম-কংগ্রেস জোট হতেই সেখানে আরএসপি প্রার্থীর ভোট বেড়ে যায়। তিনি ৬০ হাজার ভোট পেয়েছিলেন। এবং এই ভোটে তাপস রায়ের ব্যবধান কমে হয় ১৬ হাজার। আবার একুশের বিধানসভা ভোটে তাপস রায় ৩৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে জেতেন। এবং দেখা যায়, একুশের ভোটে সেখানে বামেরা প্রার্থী দেননি। বামেদের সমর্থিত কংগ্রেস প্রার্থী পেয়েছিলেন ২০ হাজার ভোট আর বিজেপির প্রার্থী পার্নো মিত্র পেয়েছিলেন ৫০ হাজার ভোট। এই পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট যে বামেদের একটা বড় অংশের ভোট বিজেপির দিকে চলে যায়।
ভোট হওয়ার আগেই কোনও আসনের ফলাফল বলে দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ কেউই শ্রীভৃগু নন। তবে পূর্ব পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, বরাহনগরে ট্রাডিশনাল বামেদের ভোট কোন দিকে যায় তার উপর অনেক কিছুই নির্ভর করছে।
সায়ন্তিকার মূল শক্তি ও অ্যাডভান্টেজ হতে পারে তৃণমূলের স্থানীয় সংগঠন। কারণ বরাহনগরে সাংগঠনিক ভাবে তৃণমূল যতটা শক্তিশালী বিজেপি ততটা নয়। তাপস রায় নিজে দল ছাড়লেও সেখানে তৃণমূলে ভাঙন ধরাতে পারেননি। তা ছাড়া তাপস রায় সায়ন্তিকা সম্পর্কে যে যুক্তি দিয়েছেন, তাও যে পুরোপুরি খাটছে তা নয়। ভুলে গেলে চলবে না একুশের ভোটে বিজেপির প্রার্থী ছিলেন এক অভিনেত্রী। তিনি পার্নো মিত্র। এবং পার্নো ৫০ হাজার ভোট পেয়েছিলেন। তবে এটুকু বলা যায়, বরানগরের এবারের ভোট হবে জমজমাট। তৃণমূল যেমন জেতার চেষ্টা করবে, তেমনই বরাহনগরে জিততে চেষ্টার কসুর রাখবেন না স্বভাবগত ভাবে লড়াকু ও পুরোদস্তুর রাজনীতিক সজল ঘোষ। আর তাঁকে জেতাতে সবরকমভাবে পাশে থাকবেন তাপস রায় ও শুভেন্দু অধিকারী।