
হাজি নুরুল ইসলাম
শেষ আপডেট: 3 May 2024 17:19
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ২০১০ সালের ঘটনা। কোনও এক শুক্রবার হবে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সে সময়ে রেলমন্ত্রী। দুপুরে পার্লামেন্টে রেলমন্ত্রীর ঘরে বসে ছিলেন মমতা। তৃণমূলের কয়েকজন সাংসদও ছিলেন সেখানে। পিছনের লবি ধরে এসে একটু পর তাঁর ঘরে ঢোকেন হাজি নুরুল ইসলাম। নুরুল সে সময়ে বসিরহাটের সাংসদ। বয়স তখন বছর পঁয়তাল্লিশ হবে।
মমতা প্রশ্ন করেন, ‘নুরুল, কোথায় ছিলে?’ নুরুল দিদির সামনে গিয়ে বসে হাতে ধরা প্রেসক্রিপশনটা এগিয়ে দেন। বলেন, ‘অ্যানেক্স ভবনে রুটিন চেক আপে গেছিলাম। তারপর মসজিদে নামাজ পড়ে এলাম।’
সংসদের অ্যানেক্স বিল্ডিংয়ে নিয়ম করে ডাক্তাররা বসেন। সাংসদদের দরকার মতো তাঁদের থেকে চেক আপ করিয়ে নেন। এই অ্যানেক্স ভবনের সামনে তথা পুরনো সংসদ ভবনের পাশে একটা মসজিদ রয়েছে। বহু মুসলিম সাংসদ, আমলারা সেখানে শুক্রবার দুপুরে নমাজ পড়তে যান। নুরুলও গেছিলেন।
মমতা প্রেসক্রিপশনটা হাতে নিয়ে একবার চোখ বুলিয়েই বলেন, তোমার কিছুই তো হয়নি নুরুল। সবই তো ঠিক আছে। রুটিন চেক আপেও এত ওষুধ দিল কেন? এসব খেতে হবে না। এই বলে, হাতের সামনে থাকা কাগজে শুধু একটা মাল্টি ভিটামিন খস খস করে লিখে দেন।
নুরুলের ব্যাপারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বরাবর স্নেহশীল। অনেকের মতে, তার একটা কারণ রয়েছে। নুরুল কংগ্রেসি রাজনীতি করতেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূল গঠনের সময়ে নুরুলও তাঁর সঙ্গে বেরিয়ে আসেন। অর্থাৎ দলের প্রথম দিনের সৈনিক।
দশ বছর পর সেই নুরুলকে এবার ফের বসিরহাটে প্রার্থী করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। এবং এমন একটা সময়ে বসিরহাটে নুরুলের কাম ব্যাক হয়েছে, যখন মহকুমার একাংশে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। ‘সন্দেশখালি’ যার নাম।
নুরুল অবশ্য একে কামব্যাক বলতে রাজি নন। বারাসতের জাগুলিয়ায় থাকেন নুরুল। পুকুর পাড়ে ইট-কংক্রিটের সরু রাস্তার পাশে তাঁর বাড়ি। রাস্তার অপর পাড়ে একটা পুকুর। তাতে জল টলটল করছে। রাস্তার পাশে ছোট ঝাঁকড়া আম গাছটায় আম ফলেছে। পঞ্চায়েত এলাকা এবং গ্রামই বলা যায়। সে বাড়ির দাওয়ায় বসে নুরুল বলেন, “ঘর ওয়াপসি কেন বলছেন, বসিরহাটই তো আমার ঘর। আমি ঘরের ছেলে, ঘরেই আছি। হাড়োয়ার বিধায়ক আমি। বসিরহাট সাংগঠনিক জেলার সভাপতি। এখানকার মানুষ, হিন্দু-মুসলমান আমাকে নিজের ছেলের মতো ভালবাসে। আমার জন্য দোয়া করে, আশীর্বাদ দেয়।”
কিন্তু সন্দেশখালির মতো ঘটনা ঘটে গেল যে! তাহলে কি চেনা বসিরহাট এবার অচেনা ঠেকছে? লড়াই আগের চেয়ে কঠিন মনে হচ্ছে?
এ প্রশ্নের জবাবেও নুরুলের মুখের ছবিতে কোনও হেলদোল দেখা গেল না। বরং কিছুটা নির্লিপ্ত ভাবেই বললেন, “সন্দেশখালির ঘটনা সাজানো, পরিকল্পিত। ওটা নিয়ে কিছু মনে করি না। গতকালই সন্দেশখালিতে গিয়েছিলাম। হাজার হাজার মানুষ। বলল, বাবা তুমিই পারো। আমাদের একটা জলের প্রকল্প করে দেবে? বললাম, নিশ্চয়ই দেব। সন্দেশখালিতে আমরা জিতব।”
নুরুলের কথায়, “এবারের লড়াই তুলনায় সহজ। ২০০৯ সালের লড়াই অনেক কঠিন ছিল, অনেক কঠিন। তখন আমাদের কিছু ছিল না। এখন বসিরহাটে আমাদের সংগঠন মজবুত, শক্তিশালী। এবার ২ লক্ষের বেশি ভোটে জিতে দিদিকে বসিরহাট দেব।”
নুরুল যে কঠিন লড়াইয়ের কথা বলছেন, সেটা ২০০৯ সালের ভোটের কথা। তার আগে টানা আটটি লোকসভা ভোটে বসিরহাটে লাগাতার জিতেছে সিপিআই। সিপিআইয়ের রাশভারী নেতা ইন্দ্রজিৎ গুপ্ত ছিলেন বসিরহাটের দু’বারের সাংসদ। তাঁর পর দু’বার জিতেছেন মনোরঞ্জন শূর, আর ৯৬ সাল থেকে পর পর চার বার জিতেছিলেন অজয় চক্রবর্তী। বসিরহাট ও সিপিআই প্রায় সমার্থক হয়ে গেছিল।
এহেন বসিরহাটে বামেদের মোকাবিলা করতে দলের তরুণ সংখ্যালঘু মুখ হাজি নুরুল ইসলামকে প্রার্থী করেছিলেন পোড় খাওয়া মমতা। বসিরহাটে কংগ্রেসি ঘরানার একেবারে পুরনো সমীকরণে নুরুলকে বেছে নিয়েছিলেন তিনি। যে সমীকরণে বসিরহাটে ছয় ও সাতের দশকে জিতেছিলেন কংগ্রেসের হুমায়ুন কবীর ও সর্দার আমজাদ আলি। নুরুল সেবার জিতেছিলেন ৬০ হাজার ভোটে।
রবিবাসরীয় সকালে তাঁর দাওয়ায় বসে নুরুল বলেন, “কত সংখ্যাটা বললাম লিখে রাখুন, ২ লক্ষেরও বেশি জোটে জিতবে তৃণমূল।”
কিন্তু রেখা পাত্র যে বলছেন, বসিরহাটে তৃণমূলকে এবার হারিয়ে ছাড়বেন। প্রতিপক্ষের ব্যাপারে এ প্রশ্নেও নুরুলের উত্তাপ নেই। বরং নরম গলায় জবাব দিলেন, “রেখা পাত্র ঘরোয়া মেয়ে। উনি নতুন রাজনীতিতে এসেছেন। বসিরহাটকে আমার মতো কেউ চেনে না। হাতের তালুর মতো চিনি।”
নুরুল বলে চলেন—“আমি যেমন বসিরহাটকে চিনি, বসিরহাটও আমাকে চেনে। কোথায় পানীয় জলের দরকার, কোথায় কবরস্থান দরকার, কোথায় গ্রামের মধ্যে রাস্তা মেরামত করতে হবে, সবটাই আমার জানা। সাংসদ থাকার সময়ে পানীয় জলের সমস্যা মেটানোর চেষ্টা করেছি। টাকিতে একটা জল প্রকল্প করেছি। বসিরহাট হাসপাতালের সংস্কার করে জেলা হাসপাতালে পরিণত করেছি। কবরস্থান করেছি। শ্মশান করেছি। আর দিদি প্রশাসনিক বিকেন্দ্রিকরণের মাধ্যমে বসিরহাট এলাকার উন্নয়ন করেছেন। পুলিশি ব্যবস্থা অনেক উন্নত হয়েছে। বাম জমানায় স্টেট হাইওয়ের যা দুর্দশা ছিল এখন অতীত। বসিরহাটের মায়েরা লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের ভাতা পান, মেয়েরা কন্যাশ্রী পান, সবুজ সাথী সাইকেল পায় ছাত্রছাত্রীরা...।”
পরের প্রশ্ন করার আগে নুরুল পাল্টা প্রশ্ন করে বলেন, “রেখা পাত্রকে জিজ্ঞেস করে লাভ নেই। উনি নতুন এসেছেন। বরং বিজেপি জবাব দিক বসিরহাটের গরিব মানুষের একশ দিনের টাকা কেন আটকে দেওয়া হল, কেন পর পর বর্ষায় ছাদ ভিজে জল চুঁইয়ে পড়লেও এখানকার গরিব মানুষ আবাসের টাকা পাচ্ছেন না…। সেগুলো বলুক।”
এর পরেও ঘুরে ফিরে সেই সন্দেশখালির কথা ওঠে। শেখ শাহজাহানের কথা ওঠে। তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, রেখা পাত্র নাকি বাম প্রার্থী নিরাপদ সর্দার, কাকে প্রতিপক্ষ বলে মনে করছেন তিনি। নুরুল জবাবে বলেন, “যা ঘটার তা ঘটে গেছে। আইন মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আইন আইনের পথে চলবে।” তাঁর কথায়, “ বসিরহাটে রেখা পাত্র বা নিরাপদ সর্দারের কোনও গ্রহণযোগ্যতা আর নেই। তাই ওঁদের আমল দিতে চাই না। আমরা মানুষের ভোটে জিতব।”
নুরুলের কাছে এও জানতে চাওয়া হয়, এক সময়ে তাঁর সতীর্থ শুভেন্দু অধিকারী ভোটের আগে বসিরহাট, সন্দেশখালিতে ঘাঁটি গাড়বেন বলছেন। উত্তরে নুরুল বলেন, “আমি ব্যক্তি আক্রমণে বিশ্বাস করি না। কারও সমালোচনা করি না। সে আমার সমস্যা বলতে পারেন। উনি বিরোধী দলনেতা। উনি ওনার রাজনীতি করবেন। আমি আমার। বসিরহাটের মানুষ আমার সঙ্গে আছে। দিদির সঙ্গে আছে।”
জাগুলিয়ায় তাঁর বাড়ির দাওয়ায় বসে নুরুল যখন এসব কথা বলছেন, তখন বাইরে উঠোনে মেলা ভিড়। স্থানীয় কোনও পঞ্চায়েতের কর্মীরা এসেছেন। নুসরত সাংসদ থাকাকালীন এঁদের সঙ্গেও একটা বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়েছিল বলে অভিযোগ। নুরুল তাঁদের দিকে ইশারা করে বলেন, “ব্রিগেডের মঞ্চ থেকে যেদিন আমার নাম ঘোষণা হল, সেদিন থেকে এই উৎসাহ, উদ্দীপনা ছাপিয়ে যাচ্ছে।”
হাড়োয়ার বর্তমান এই বিধায়ককে সংখ্যালঘু ভোট নিয়ে প্রশ্ন করা হয়। জানতে চাওয়া হয়, সংখ্যালঘু ভোটই আপনার সবচেয়ে বড় ভরসার? নুরুল বলেন, “তা কেন? আমি সংখ্যালঘু-সংখ্যাগুরু ভেদাভেদ করি না। সেদিন হিঙ্গলগঞ্জে গেছিলাম। এক ভদ্রমহিলা এসে আমাকে ফুল দিলেন। আশীর্বাদ করে কেঁদে ফেললেন। আমিও কেঁদে ফেললাম। এই চাওয়া, পাওয়া এই ভালবাসা এতেই আমরা জিতে যাব।”
হাজি নুরুল ইসলামের সঙ্গে যখন সাক্ষাৎকার শেষ হল, তখন বেলা সাড়ে ১২টা বাজে। বাইরে রোদের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। যেন আগুনের হল্কা বইছে। নুরুল তারই মধ্যে বেরিয়ে গেলেন হাড়োয়ার উদ্দেশে। সেখান থেকে বিকেলে সন্দেশখালি যাওয়ার কথা। বসিরহাট লোকসভায় কাম ব্যাকের জন্য ছুটছেন নুরুল।