
শেষ আপডেট: 17 April 2024 20:14
দ্য ওয়াল ব্যুরো: দেখলে বোঝার উপায় নেই। ঠা ঠা রোদ! অমৃতসরের ধুলোয়, গরমে প্রচারে বেরিয়েছেন তিনি। লোকসভা নির্বাচন কড়া নাড়ছে। স্বাভাবিক দৃশ্য। তিনি এবারে অমৃতসরে বিজেপির প্রার্থী। লড়াইটা সহজ নয়। শেষবার বিজেপির হয়ে অমৃতসরে জিতেছিলেন নভজ্যোৎ সিং সিধু, সেই ২০০৯ সালে। তারপর রাভি, বিতস্তা, শতদ্রু দিয়ে অনেক জল গড়িয়েছে। পাঞ্জাবে বিজেপি জমি হারিয়েছে, হু হু করে উঠেছে আম আদমি পার্টি। তিনি তাও আশাবাদী, তিনি জিতবেন। ঘাম-ধুলো-রোদ উজিয়ে নেমে পড়েছেন ময়দানে।
অথচ, মাত্র মাসচারেক আগেই তাঁর ঠিকানা ছিল সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপারে! সেখানে শীতকালটা ঢেকে থাকে বরফে। বিশ্বের সবচেয়ে মহাশক্তিধর দেশের ভরকেন্দ্র সেখানে। ঠিক হয় আন্দিজ থেকে আল্পস, দানিয়ুব থেকে হোয়াংহো, সারা পৃথিবীর রাজনীতি-অর্থনীতির অঙ্ক। তাঁর দায়িত্ব ছিল সেই জটিল অঙ্ক সামলানো। অমৃতসরের বিজেপির প্রচার মিছিল সেই গ্রহের ধারেপাশেও আসে না।
তিনি তরণজিৎ সিং সাঁধু। গত জানুয়ারি অবধি ছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের রাষ্ট্রদূত। ১৯৮৮ ব্যাচের আইএফএস অফিসার তরণজিৎ এই মুহূর্তে দেশের শীর্ষ কূটনীতিকদের অন্যতম অগ্রগণ্য। প্রায় তিন দশকের বেশি কর্মজীবনে কাজ করেছেন সোভিয়েত ইউনিয়নে, ইউক্রেনে, শ্রীলঙ্কায়। পরে বিশেষ দক্ষতার সঙ্গে সামলেছেন আমেরিকার কর্তাদের। রাষ্ট্রদূত হওয়ার আগেও তিনবার কাজ করেছেন ওয়াশিংটনে। ছিলেন রাষ্ট্রপুঞ্জে ভারতের স্থায়ী মিশনেও।
ওয়াশিংটন ডিসির ম্যাডিসন অ্যাভিনিউয়ের বিখ্যাত ভারতীয় দূতাবাস থেকে এক ধাক্কায় একেবারে অমৃতসরের মেঠো রাজনীতির ময়দানে? মেলানো যায় কোনওভাবে? কাজটা কঠিন, মানছেন তরণজিৎও। এমনিতেই অমৃতসর আসন নিয়ে বিজেপির অভ্যন্তরেই মতবিরোধ আছে। তরণজিতের নাম আলোচনায় আছে, খবর ছড়ানোর পর থেকেই পাঞ্জাব বিজেপির মেজ-সেজ নেতারা ফোঁসফাঁস করছিলেন। টিকিট পাওয়ার উমেদাররা রাস্তায় নেমে পড়েছিলেন। শেষ অবধি অবশ্য পরিস্থিতি সামাল দেওয়া গিয়েছে। তাও ঠারেঠোরে অনেকে তাঁকে 'প্যারাশ্যুটে চড়ে আসা প্রার্থী' বলে খোঁচা দিয়েছেন।
তরণজিৎ অবশ্য গোড়া থেকেই জোর দিয়েছেন তাঁর রাষ্ট্রদূতের অভিজ্ঞতাকেই। 'গত চার বছরে ভারত-মার্কিন সম্পর্কে দারুণ জোর এসেছে। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক থেকে আমরা এখন একে-অপরের সহযোগী। প্রচুর মার্কিন বিনিয়োগ আসছে ভারতে। বিভিন্ন বড় শহর তার সুবিধে পাচ্ছে। আমি মনে করি, অমৃতসরেরও সেটা পাওয়া উচিত। আজ মানুষ আমায় জেতালে আমি নিশ্চয়ই চেষ্টা করব, যাতে অমৃতসর জুড়ে উন্নয়নের জোয়ার আসে', সংবাদসংস্থা এএনআইকে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন সাঁধু।
বিশ্বের প্রাচীনতম ও বৃহত্তম গণতন্ত্রের সেতুবন্ধন। সেখান থেকে বিজেপির জটিল ভোটের অঙ্ক মেলানো। কঠিন লাগছে না? মানেন না তরণজিৎ। 'আমি তো পাবলিক সার্ভেন্ট ছিলাম। সেটাও জনপরিষেবারই অংশ', ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস সংবাদপত্রকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন তিনি, 'অমৃতসরের সাধারণ মানুষ উন্নয়ন চাইছেন। আমি সেইটুকুই মেটাতে চাই। আমার অভিজ্ঞতা এই কাজে আমি লাগাতে পারব।'
জন্ম অমৃতসরে হলেও তরণজিতের পড়াশোনা দিল্লিতে। প্রথমে সেন্ট স্টিফেন্স, পরে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে। পরে সাউথ ব্লকে যোগ দেওয়ার পর তো দুনিয়ার নানা প্রান্তে ছুটে বেড়াতে হয়েছে তাঁকে। এতদিন পর আবার থিতু হয়েছেন অমৃতসরে।
বিজেপি নেতৃত্ব জানেন, তরণজিতকে জিতিয়ে আনা সহজ নয়। এর আগে অরুণ জেটলি ও হরদীপ পুরিকে অমৃতসরে দাঁড় করিয়েছিল বিজেপি। হরদীপ পুরিও কূটনীতিক ছিলেন। কিন্তু দু'জনেই, এমনকি জেটলির মত পোড়খাওয়া নেতাও হেরেছেন। এবারেও তরণজিতের প্রতিদ্বন্দ্বী আম আদমি পার্টির কুলদীপ সিং ঢালিওয়াল। তিনি বেশ সৌহার্দ্যের মেজাজেই আছেন। আম আদমি দলের কাছেও অঙ্ক জটিল। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিরাট অঙ্কে জিতেছিলেন কংগ্রেসের গুরজিৎ সিং ঔজলা। ঢালিওয়াল দাঁড়াতেই পারেননি। ঔজলার সাড়ে চার লক্ষ ভোটের পাশে ঢালিওয়াল পেয়েছিলেন কুড়ি হাজার মত ভোট। পরে অবশ্য অজনালা থেকে বিধায়ক হ'ন ঢালিওয়াল। এখন তিনি আপ-শাসিত পঞ্জাব সরকারের ক্যাবিনেট মন্ত্রী।
জিততে গেলে অতএব তরণজিতকে অনেক কিছুই ভাবতে হবে। বিজেপিও ওই আশাতেই আছে, তরণজিতের মত নামী রাষ্ট্রদূতকে দিয়ে যদি বাজিমাত করা যায়। নবাগত, ফলে হারলেও বিশেষ সমস্যা হবে না। তবে তরণজিতকে নিয়ে আশায় আছেন সাউথ ব্লকে ও ম্যাডিসন অ্যাভিনিউতে তাঁর সিনিয়র, বর্তমান বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। খুবই আন্তরিকভাবে দলে অভ্যর্থনা করেছেন তিনি।
এর আগে অবশ্য একাধিক কূটনীতিবিদ রাজনীতিতে এসেছেন। সে ইতিহাসও বেশ লম্বা। সেই ১৯৯১ সালে রাষ্ট্রপুঞ্জে ভারতের দায়িত্ব ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন ব্রজেশ মিশ্র। পরে ১৯৫১ ব্যাচের এই আইএফএস অফিসারকে নিজের প্রধান সচিব করেন অটলবিহারী বাজপেয়ী। এনডিএ সরকারে প্রভূত ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন ব্রজেশ। কূটনীতিক থেকে বিদেশমন্ত্রী হয়েছেন কুঁওয়ার নটবর সিংহ। কংগ্রেসের মণিশঙ্কর আইয়ারও এই তালিকায় আছেন। ১৯৭৬ ব্যাচের আইএফএস অফিসার পবন কুমার বর্মা পরে যোগ দেন বিহারের জেডি(ইউ)-তে। এই তালিকায় অতি অবশ্যই সবচেয়ে বড় নাম নিঃসন্দেহে সুব্রহ্মণ্যম জয়শঙ্কর।
তবে এই লড়াইতে আপাতত তরণজিৎ পাশে পাচ্ছেন না তাঁর স্ত্রীকে। এমন নয় যে মতবিরোধ আছে। বা সমর্থন নেই। বরং সেসব থাকলেও তাঁকে পাশে পাওয়ার উপায় নেই। তিনি সাত সমুদ্র না হ'লেও, বলা যায় পাঁচ সমুদ্র দূরে রয়েছেন। তিনি এই মুহূর্তে দ্য হেগ শহরে, নেদারল্যান্ডসে ভারতের রাষ্ট্রদূত রিনাত সাঁধু।