
শেষ আপডেট: 23 April 2024 13:44
ফেক নিউজের কারণে ‘ভুয়ো’ শব্দটির ব্যবহার আজকাল বেড়ে গিয়েছে। ‘সব ভুয়ো খবর,’ ‘ভুয়ো খবরের ঠেলায় প্রাণ ওষ্ঠাগত’, ‘ভুয়ো খবর ছড়ালে কড়া শাস্তি’, জাতীয় কথা, বিজ্ঞপ্তি প্রায়ই চোখে পড়ে।
এছাড়া, জাল নোটকেও কেউ কেউ ভুয়ো নোট বলে থাকেন। তাছাড়া ‘ভুয়ো প্রেম,’ ‘ভুয়ো অপহরণ’, ‘ভুয়ো লেনদেন’—এই সব কথাও প্রায়ই কানে আসে। শেষের শব্দটি তো রীতিমতো আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের যে শব্দযুগল অসাধু রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, শিল্পপতির রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে তা হল ‘ভুয়ো লেনদেন’। ইডির প্রধান অস্ত্র প্রিভেনশন অফ মানিলন্ডারিং আইনের মূল বিষয় হল বেআইনি বা ভুয়ো লেনদেন। সব মিলিয়ে আসল আর নকলের ফারাক করতেই জীবন নাজেহাল।
তবে ভোট এলে ভুয়ো শব্দটির ব্যবহার শতগুণ বেড়ে যায়। ভুয়ো ভোটার নিয়ে নালিশ জানাতে নির্বাচন কমিশনের দ্বারস্থ হয় রাজনৈতিক দলগুলি। বছরের গোড়ায় লোকসভা ভোটের বাদ্যি বাজতেই বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী ভুয়ো ভোটারের তালিকা সম্বলিত নথিপত্র বোঝাই ২৪টি ব্যাগ নিয়ে হাজির হয়েছিলেন রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী অফিসারের দফতরে। দাবি করেছিলেন, ১৭ লাখ ভুয়ো ভোটারের নাম-ঠিকানা জমা করেছেন। আরও দাবি করেছিলেন, ২০১৯-এর লোকসভা ভোটে তৃণমূল বিজেপির থেকে ১৭ লাখ ভোট বেশি পেয়েছিল। এই ভুয়ো ভোটারের ভোটে ২৪টি আসন দখল করে জোড়াফুল শিবির।
২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে ওই ১৭ লাখ ভোটারের কী ভূমিকা ছিল সেই প্রসঙ্গ এড়িয়ে যান শুভেন্দু। যদিও নির্বাচন কমিশন বিজেপি নেতার অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছিল। কমিশনের দাবি অনুযায়ী, বাংলায় ২০২৪-এর লোকসভা ভোট হচ্ছে সম্পূর্ণ নির্ভেজাল ভোটার তালিকা মেনে।
কমিশন শুভেন্দুর দাবি নস্যাৎ করে দিলেও ভুয়ো ভোটারের অভিযোগ সর্বদা মিথ্যা ছিল না। একটা সময় বরং গুরুতর সমস্যা ছিল। এখন রাজনৈতিক দল অভিযোগ না করলেও ভুয়ো ভোটার বাছাইয়ের উপায় আছে কমিশনের হাতেই। কম্পিউটারের বিশেষ সফটওয়্যারের মাধ্যমে জানা সম্ভব একই নাম-ঠিকানার মানুষ একাধিক জায়গায় আছে কি না। ২০০১ সাল থেকে নির্বাচন কমিশন ‘ক্লিন লিস্ট’ তৈরি শুরু করেছে। অর্থাৎ, গোটা দেশে একজন ভোটারের নাম একটি বুথেই শুধু নথিভুক্ত থাকবে।
এতেই থেমে না থেকে বাংলায় ভোটার তালিকা ভুয়ো ভোটার মুক্ত করতে নির্বাচন কমিশন ২০০৬-এর বিধানসভা ভোটে কেজে রাও নামে তাদের এক অবসরপ্রাপ্ত আধিকারিককে বাংলায় পাঠায়। সেই প্রথম রোল অবর্জাভার বা ভোটার তালিকা পর্যবেক্ষক নামে নতুন একটি পদ সৃষ্টি করে কমিশন। বস্তুত, আজ দেশে ভোটে যে সমস্ত কড়াকড়ি জারি আছে তার অনেকগুলিই বাংলার নির্বাচনে প্রথম কার্যকর হয়েছিল। যেমন সব বুথে অস্ত্রধারী পুলিশ, আধা সেনা মোতায়েন প্রথম হয়েছিল বাংলায়।
কেজে রাওয়ের প্রসঙ্গে ফিরি। সেবার বাংলায় এসে তিনি জেলায় জেলায় ছুটে বেড়ান ভুয়ো ভোটার ধরার কাজে। বেশ কিছু লোককে হাতেনাতে চিহ্নিত করেন, যাদের একাধিক জায়গায় নাম ছিল। তাঁর তৎপরতায় সেবার নয় লাখ ভুয়ো নাম বাদ যায়।
তারা কি তৎকালীন শাসকদল সিপিএমের ভোটার ছিল? বলা মুশকিল। বলে রাখা ভল, নয় লাখ ভোটার বাদ যাওয়ার পর বিরোধীরা সমস্বরে দাবি করে, এবার বাম বিদায় নিশ্চিত। কারণ, নয় লাখ ভুয়ো ভোটার ছিল সিপিএমের যারা আর ভোট দিতে পারবে না। যদিও ফল হয়েছিল উল্টো। ২৩৫ আসনে জয়ী হয় বামফ্রন্ট।
তবে ভুয়ো ভোটারের সমস্যা শুধু ভোটার তালিকাতেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং আসল চ্যালেঞ্জ ভোটের দিন—রামের ভোট শ্যামের দেওয়া আটকানো। নির্বাচনে ভয়ঙ্কর দুটি অনাচার হল রিগিং বা গণহারে ছাপ্পা ও জাল ভোটারদের দাপাদাপি। বাংলার ভোটে রিগিং ভয়ঙ্কর রূপ নেয় ১৯৭২-এর ভোটে। অভিযোগ উঠেছিল, বহু বুথে আগের রাতে কংগ্রেসের লোকেরা ভোটকর্মীদের থেকে ব্যালট কেড়ে নিয়ে দলের প্রতীকে ছাপ মেরে ব্যালট বাক্সে ভরে দিয়ে যায়।
নিয়ম হল, ভোট শুরুর আগে ভোটার এবং প্রার্থীর এজেন্টদের খালি ব্যালট বাক্স দেখাতে হয়। অনিয়মের বুথগুলি নিয়ে কেউ টুঁ শব্দ করার সাহস দেখায়নি। এমনই ছিল সন্ত্রাসের পরিবেশ। সকাল ন’টা-সাড়ে ন’টার মধ্যে বহু বুথে একশো ভাগ ভোট পড়ে গিয়েছিল। বরানগর কেন্দ্রে জ্যোতি বসুর মতো প্রার্থীকে পর্যন্ত বেলা ১১’টার পর নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে হয়।
কিন্তু ভুয়ো বা জাল ভোটারের আসল কৃতিত্ব কিন্তু বোমা-বন্দুক না দেখিয়ে, চোখ না রাঙিয়ে স্রেফ বৈধ ভোটার সেজে ভোট দেওয়া। একটা সময় কম বেশি সব পাড়াতেই এই ব্যাপারে পিএইচডি করা লোকজন ছিলেন। ভোট শেষ হলে যারা বুক ফুলিয়ে ঘোষণা করতেন, কোন বুথে কতগুলি জাল ভোট দিয়েছেন। এমনই এক দাদার কথা মনে আছে, যিনি চার-দশ ফুটবলে খেপ খেলার মতো ভোটে দলবদল করতেন। কোনও ভোটে সদলবলে কংগ্রেস তো পরের নির্বাচনে সিপিএমের হয়ে গা ঘামিয়েছেন। এই ব্যাপারে কম-বেশি সব দলেই নারী ব্রিগেড বেশি সক্রিয়। উদ্দেশ্য ধরা পড়ে গেলেও যাতে বিবাদ বেশি দূর না গড়ায়।
বেশিদিন আগের কথা নয়, নদিয়ার গয়েশপুরের পুর ভোটে এক বুথে হাতেনাতে ধরা পড়েন তিন মহিলা। আধা সেনার এক জওয়ান তাঁদের পরিচয়পত্র দেখে নিশ্চিত হয়ে বুথে যেতে দেন। বেরিয়ে যাওয়ার সময় অন্য এক জওয়ান চিৎকার করে বলেন, এই তিনজনকে ওই ভোট কেন্দ্রেই অন্য এক বুথে ভোট দিতে দেখেছেন। পরে জানা যায় একবার নয়, মোট সাতবার ভোট দিয়েছেন তারা। কিন্তু আটকে রাখা যায়নি। তাদের দলের লোকেরা রে রে করে তেড়ে এসে আধা সেনার কবল থেকে তিন মহিলাকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়। তাতে চাকরি রক্ষা হয় ভোট কর্মীদের। কারণ, বোঝাই গিয়েছিল সর্ষের মধ্যেই ভূত ছিল। নইলে দু’জনে মিলে ১৪টা ভোট দিল কীভাবে?
বহু বছর আগে, আটের শেষ বা নয়ের দশকের গোড়ায় শ্যামপুকুর বিধানসভার উপনির্বাচনে দেখেছি, পাড়ার ছেলেছোকরা এসে বুথ ক্যাম্পে খবর দিচ্ছে অমুক বাড়ির কাকু বাজারে যাচ্ছেন, তমুক বাড়ির ভদ্রলোক মেয়েকে স্কুলে দিতে যাচ্ছেন। সঙ্গে সঙ্গে সেই ব্যক্তির নামে ভোটার স্লিপ নিয়ে একজন করে গিয়ে ভোট দিয়ে এল।
জাল ভোটাররা কি সব মস্তান, ক্রিমিনাল? না, তা কিন্তু নয়। একটা সময় সব দলেই কিছু কর্মী ছিলেন যারা জাল ভোট দেওয়াকে দলের প্রতি কর্তব্য বলে মনে করতেন। এমএ-বিএ পাশ, সরকারি-বেসরকারি অফিসে চাকরি করা নিপাট ভদ্রলোক পার্টির অ্যাসাইনমেন্ট মেনে জাল ভোট দিয়েছেন, এমন অসংখ্য দৃষ্টান্ত আছে। নির্বাচনকে বলা হয় গণতন্ত্রের উৎসব। এখনও ভোটের দিন উৎসবের মেজাজে বহু মানুষ দেদার জাল ভোট দেন। এই ব্যাপারে ‘জোর যার মুলুক তার’ নীতিই শেষ কথা। কোনও দলই ধোয়া তুলসী পাতা নয়।
দুই জমানাতেই সল্টলেক ছিল জাল ভোটিংয়ের স্বর্গরাজ্য। কারণ, সেখানে রাজনৈতিক দলের এজেন্টরাও প্রতিবেশীদের চিনতেন না। একবার খবরের কাগজে সল্টলেকে ভোটারের লাইনে মাঝবয়সি এক ব্যক্তির ছবি ছাপা হয়েছিল। সঙ্গে ছাপা হয়েছিল তাঁর সচিত্র পরিচয়পত্রের ছবিও। বিরাটির বাসিন্দা সেই ব্যক্তি জাল ভোট দিতে বিধাননগর পাড়ি দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন পশ্চিমঙ্গ সরকারের করণিক কর্মচারী।
এমন ভোটারদের আটকাতেই বছক কুড়ি আগে সল্টলেকে ঢোকার পাঁচটি মূল রাস্তায় ভোটের দু’দিন আগে থেকে ব্যারিকেড তৈরি করে গাড়ি, পথচলতি মানুষের দেহ তল্লাশি করা হত। অভিযান চলত হোটেল, গেস্ট হাউস, ফাঁকা বাড়িতে। এসব এখনও হয়, তবে আগের মতো নয়।
এই ভাবে যার ভোটটি অন্য কেউ দিয়ে দেয় তাঁর প্রতিক্রিয়া কেমন হয় তা বুঝেছিলাম লেকটাউনের বাসিন্দা কলকাতার একটি ইংরিজি দৈনিকের ফটোগ্রাফারকে প্রকাশ্য রাস্তায় হাউ হাউ করে কাঁদতে দেখে। ভোটের কাজের ফাঁকে লেকটাউনের স্কুলে নিজের ভোটটি দিতে গিয়ে শোনেন, ভোট পড়ে গিয়েছে। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেছিলেন, এজেন্টরা সব পাড়ার ছেলে। আমরা তিন প্রজন্মের বাসিন্দা। আমার ভোটও পড়ে গেল মানে তো এলাকার ছেলেরা আমাদের পরিবারের অস্তিত্ব স্বীকার করে না।
পশ্চিমবঙ্গই শুধু নয়, একটা সময় জাল তথা ভুয়ো ভোটারের দাপট ছিল আরও অনেক রাজ্যে। আর সেই কারণেই নয়েক দশকের গোড়ায় তৎকালীন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার টিএম শেসন সচিত্র ভোটার পরিচয়পত্র তৈরির প্রস্তাব দেন সরকারকে। সেই ভারতে তখন মোবাইল আসেনি। ক্যামেরাও সহজলভ্য নয়। কী করে কোটি কোটি ভোটারের ছবি-সহ পরিচয়পত্র তৈরি সম্ভব, এই প্রশ্ন তুলে অনেকেই শেসনকে উন্মাদ বলেছিলেন। সরাসরি পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
আর কে না জানে, ভোট নিয়ে সিপিএমকে যদি কেউ পীড়া দিয়ে থাকেন তবে তা তৃণমূল নেত্রী। ১৯৯৩-এ তাঁর ২১ জুলাইয়ের রাইটার্স বিল্ডিংয় অভিযানের মূল ইস্যু ছিল—‘নো এপিক, নো ভোট।’ ওই বছরই আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয় সচিত্র ভোটার পরিচয়পত্র।
তাতেও ভুয়ো ভোটার আটকানো যায়নি। শেষে ভোটার তালিকাতেও ভোটারের নামের পাশে ছবি ছাপার ব্যবস্থা হয়। ফলে পরিচয় গোপন করে রামের ভোট শ্যামের দেওয়ার অভিযোগ কমেছে। কিন্তু ছাপ্পা বা জাল ভোটের সমস্যা যেমন ছিল তেমনই আছে। বাংলায় বিশেষ করে পঞ্চায়েত ও পুরসভার ভোটে তো বিরোধীদের হারিয়ে দিতে ব্যালট গিলে নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
আগেই বলেছি, জাল বা ভুয়ো ভোট দিতে পারদর্শী লোকজন একটা সময় কম-বেশি সব পাড়াতেই ছিলেন এবং মহিলারা ছিলেন সমান পারদর্শী। এমনই একজন মহিলা জাল ভোটারের কাহিনি দিয়ে এই লেখা শেষ করব। ঘটনাটি কলকাতার মানিকতলার একটি বুথের। দুপুর দেড়টা-দুটো হবে। বুথ বেশ ফাঁকা। এক মহিলা এসে পোলিং অফিসারকে ভোটার স্লিপ দেখালেন। তিনি মহিলার নাম, ভোটার তালিকায় সিরিয়াল নম্বর ইত্যাদি গলা চড়িয়ে ঘোষণা করতেই একটি দলের ইলেকশন এজেন্ট প্রিসাইডিং অফিসারকে বলেন, স্যার স্যার একে ভোট দিতে দেবেন না। ইনি জাল ভোটার। উনি যাঁর ভোটটি দিতে এসেছেন তিনি আমার স্ত্রী। আমার স্ত্রী গুরুতর অসুস্থ।
জাল ভোটার ভদ্রমহিলাও কম যান না। ধরে পড়ে গিয়েছেন বুঝতে পেরে তিনিও অবাক করা নাটক মঞ্চস্থ করলেন। এজেন্ট ভদ্রলোককে মহিলা চিৎকার করে বললেন, ‘তুমি বাড়িতে আমাকে স্ত্রী’র মর্যাদা দাও না, এখানে পাঁচজনের সামনেও অসম্মান করলে। তুমি আজ বাড়ি ফেরো, তখন দেখাচ্ছি মজা। দেখি কে তোমাকে ভাতের থালা এগিয়ে দেয়।’
এইভাবে নিজেকে এজেন্টের স্ত্রী বলে দাবি করে মহিলা হন হন করে বুথ ছেড়ে বেরিয়ে যান। প্রিসাইডিং অফিসার এজেন্ট বেচারিকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, ‘দাম্পত্য বিবাদ পরিবারের মধ্যে রাখাই ভাল। বাড়ি ফিরে মিটিয়ে নিন। পাঁচজনে জানা মানে হাসির খোরাক হওয়া।’