
শেষ আপডেট: 10 March 2024 08:38
রবিবার তৃণমূলের ‘জনগর্জন সভা’ দিয়ে ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডের মতো বিশাল ময়দানে সমাবেশের আয়োজনে হাতেখড়ি হতে যাচ্ছে অভিষেক বন্দোপাধ্যায়ের। শুক্র ও শনিবার ব্রিগেডের প্রস্তুতি পর্ব তো বটেই, সমাবেশের নানা আয়োজনেও অভিষেক ও তাঁর নবীন নেতৃত্বের উপস্থিতি রাজনৈতিক মহলের নজর এড়ায়নি। তৃণমূল প্রকাশ্যে না বললেও দলের প্রচার এবং নানা সিদ্ধান্ত থেকে স্পষ্ট, রবিরারের সমাবেশ অভিষেকের ব্রিগেড, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে সভায় প্রধান বক্তা।
তৃণমূলের সর্ব ভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেকের নেতৃত্বে রবিবারের ব্রিগেড সমাবেশের আয়োজন দেখে অনেকেরই দেশের বৃহত্তম এই ময়দানে ৩২ বছর আগের একটি সভার কথা মনে পড়ে যাচ্ছে, যা ইতিহাস হয়ে আছে। ১৯৯২-এর ২৫ নভেম্বর আয়োজিত সেই সভাটি হয়েছিল রাজ্য যুব কংগ্রেসের ডাকে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তখন ওই সংগঠনের রাজ্য সভাপতি। সংগঠনের নামে ডাকা হলেও সেই ব্রিগেড ছিল একান্তই ব্যক্তি মমতা বন্দোপাধ্যায়ের উদ্যোগ। ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে সমাবেশের ইতিহাসে যার দ্বিতীয় নজির নেই।
সেবার যুব কংগ্রেস নেত্রী মমতা গোটা রাজ্য ঘুরে প্রচার চালিয়ে সেই সমাবেশের আয়োজন করেছিলেন। রাজ্য কংগ্রেস নেতৃত্বের সঙ্গে তখনই তাঁর সাপে-নেউলে সম্পর্ক। ফলে কংগ্রেসের কাছ থেকে আর্থিক এবং সাংগঠনিক সাহায্য-সহযোগিতা পাওয়ার প্রশ্নই ছিল না। সর্ব ভারতীয় যুব কংগ্রেস সভাপতি মনিন্দরজিত সিং বিট্টা এবং সন্তোষমোহন দেবের মতো কয়েকজন নেতা ছাড়া মমতা সেদিন আর কাউকে পাশে পাননি।
সমাবেশে অবশ্য সেই চালচুলোহীন দশার ছাপ ছিল না। ব্রিগেড ময়দান ছাপিয়ে রাস্তায় উঠে আসা ভিড়ের সমাবেশ দেখে মমতার জনপ্রিয়তায় সন্ত্রস্ত সিপিএম তথা বামফ্রন্ট সেই বিকালেই পাল্টা শক্তি প্রদর্শনের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে। চারদিনের মাথায় ২৯ নভেম্বর ব্রিগেডেই পাল্টা সমাবেশ ডাকতে বাধ্য হয় তারা। সেই সভাতেও ছিল কূল ছাপানো ভিড়।
যুব কংগ্রেসের ব্যানারে ডাকা সেই ব্রিগেডে কেন্দ্রের নরসিংহ রাও সরকারের মন্ত্রী মমতা বামফ্রন্টের মৃত্যুঘণ্টা বাজানোর ডাক দিয়ে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের কথা ঘোষণা করেন। বাংলায় কংগ্রেস রাজনীতিতে ততদিনে কতিপয় নেতা সম্পর্কে ‘তরমুজ’ শব্দটির ব্যবহার চালু হয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ যাঁদের বাইরেরা সবুজ, ভিতরটা লাল। মানে প্রকাশ্যে কংগ্রেস, তলে তলে সিপিএম।
প্রদেশ কংগ্রেসের তৎকালীন সভাপতি সোমেন মিত্রের সঙ্গে মমতার তখন মুখ দেখাদেখি বন্ধ। এক বছর আগে সেই পদের নির্বাচনে মমতা তাঁর কাছে হেরে যান। ভোটে কারচুপির অভিযোগ তুলে সেই থেকে কংগ্রেসের রাজ্য নেতাদের ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর সঙ্গে সংঘাতের পথে হাঁটা শুরু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের।
রাজনৈতিক পরিদর্শকেরা মানেন, মমতার ডাকে আয়োজিত সেই সভা ছিল বাংলায় বিরোধী রাজনীতির নতুন পথে চলার সূচনা। এক তরুণী হয়ে ওঠেন যাবতীয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। শাসক জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য অনিল বিশ্বাস, বিমান বসুরা বুঝে যান, কংগ্রেসের সোমেন-সুব্রত-প্রিয়রঞ্জনদের মতো মাঝবয়সি কিংবা প্রণব মুখোপাধ্যায়, অজিত পাঁজাদের মতো চেনা প্রবীণ নেতারা নন, রাজনীতিতে তুলনামূলকভাবে নবীন এই তরুণীকেই আগামী দিনে মোকাবিলা করতে হবে তাঁদের।
পাল্টা ব্রিগেডে বামফ্রন্টের নেতা-কর্মীদের মুখে তাই স্লোগান ছিল, ‘আয় দেখে যা মমতা, বামফ্রন্টের ক্ষমতা’, ‘আয় দেখে যা মমতা, সিপিএমের ক্ষমতা’ ইত্যাদি। নয় শরিকের জোট বামফ্রন্টের বাকি শরিকেরাও নিজের নিজের দলের নাম জুড়ে একই স্লোগানে গলা মিলিয়েছিলেন।
রবিবার প্রথমবার ৩৭ বছর বয়সি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ব্রিগেড সমাবেশ হতে যাচ্ছে। আশ্চর্যের হল ৩২ বছর আগে মমতার একক উদ্যোগে তাঁর প্রথম ব্রিগেড সমাবেশের সময় নেত্রীর বয়স ছিল ৩৭। রাজনৈতিক গুরুত্বের দিক থেকে অবশ্য রবিবারের ব্রিগেডের তাৎপর্য ৩২ বছর আগের সমাবেশের থেকে কোনও অংশে কম নয়। মমতার সভা ছিল নতুন কংগ্রেসকে আন্দোলনমুখী করে ক্ষমতায় ফেরানো। যে লক্ষ্যপূরণে তিনি শেষ পর্যন্ত কংগ্রেস ভেঙে নিজের দল গঠন করেন। ২০২৪-এর লোকসভা ভোটের মুখে অভিষেকের ব্রিগেডের লক্ষ্য মমতার তৈরি তৃণমূলকে অটুট রেখে নরেন্দ্র মোদী ও বিজেপিকে ইভিএমে জবাব দেওয়া।